Skip to main content
Internet Archive's 25th Anniversary Logo

Full text of "Bharater Sadhak Vol. 5"

See other formats







-গক্ুননাথ অআ্রাহ 


ককুণা শ্রকাশ্শনস্ ॥ কজুকা ভৰ-৯ 


প্রথম প্রকাশ ভান্র ১৩৫৯ 


০ 


প্রকাশক 

বামাচরণ মুখোপাধ্যায় 
১৮এ, টেমার লেন 
কলকাতা-৯ 





মুদ্রাকর 

অনিলকুমার ঘোষ 

দি অশোক প্রিপ্টং ওয্ষার্কস 
২০৯এ, বিধান সরণী 
কলকাতা -৬ 


প্রচ্ছদশিল্ী 
স্থপ্রকাশ সেন 


ভীথগ্চি্ন পরতাবীর 


খৃষ্টপূ্বব যষ্ঠ শতকের দ্বিতীয় পাদের কথা। বৈশালীর কুণ্পুর-এ 
সেদিন মহ! চাঞ্চল্য পড়িয়। গিয়াছে । 

বহু জ্ঞাতু-বীর ক্ষত্রিয়ের বাস এই বদ্ধিফুঃ জনপদটিতে। ইহাদের 
নায়ক সিদ্ধার্থের একসময়ে বড় প্রতাপ ছিল এই অঞ্চলে ; ছুতাগাক্রমে 
দুই বৎসর পূর্বের তিনি লোকান্তরে গিরাছেন। তীহারই কণিষ্ঠ পুন্র 
বর্ধমান চিরতরে আজ গৃহত্যাগ করিতে উদ্যত। শ্রমণধন্মে দীক্ষা শিয়া! 
তরুণ সাধক বাহির হইবেন মোক্ষের সন্ধানে । 

জীবনের বাভারনে আসিয়াছে মহামুক্তির হাতছানি, তাই সংসারের 
কোন বন্ধনই আজ আর তাহাকে আটকাইয়া রাখিতে পারে নাই | 
বিত্তবান পরিবারের সুখ ও এশ্বর্ষোর মধ্যে বর্ধমান লালিত, কিন্তু সব 
কিছু ভোগ সুখেই আজ তিনি একেবারে স্পৃহাহীন। রূপসী পত্রী 
যশোদীর প্রেম, কন্য। প্রিয়দর্শনার কচিমুখের আকর্ষণ, কোন কিছুই আর 
তাহাকে ঘরে টানিয়া রাখিতে সক্ষম নয়। 

জোষ্ঠ ভ্রাতা নন্দীবর্ধন বড় ভালোবাসেন এই বর্ধমানকে। আসন্ন 
বিচ্ছেদের বাথাঁয় চোখ ছুটি তাহার অশ্রু ছলছল হয়া উঠিয়াছে। আর 
একবার তিনি শেষ চেষ্টা করিয়া দেখিতে চাঁন, যদি কোনমতে তাহাকে 
ফেরানো যায় । 

অনুনয় করিয়া কহেন, “ভাই, বর্ধমান, আর একটিবার তুমি স্থির 
হয়ে ভেবে গ্ভাখো। তোমার বিহনে আত্ম-পরিজনের কি অবস্থা হবে? 
বিরহবিধুর যশোদাকে কি আর বাঁচানো যাবে? কান্নার চল নেমেছে 
তার চোখে, একেবারে সে ভেঙ্গে পড়েছে । তাঁর দিকে যে আমরা 


কেউ তাকাতে পারছিনে। আর তোমার শিশু কন্যা? তাঁর ভবিষ্যা 
কে ভাববে বলতো! ? আচ্ছা, সংসারে থেকে কি ধন্দম হয় না? মোক্ষ 
মিলতে পারে না ?” ৃ 

কিন্তু বর্ধমান যে আজ কৃতসঙ্কল্প। দৃঢ়ন্বরে উত্তর দেন, “বৃথা আর 
আমায় তোমর! বাঁধ! দেবার চেষ্টা করো! না। সংসার আমায় ত্যাগ 
করতেই হবে, নইলে কর্মের বন্ধন তো দূর হবে না! মুক্তিও হয়ে 
থাকবে স্মদূরপরাহত।? 

“মনে রেখো, আমাদের পিতা গ্রহণ করেছিলেন পার্খনাথের 
নিগ্রন্থধন্্ন। ধান্মিক শ্রীবক ব'লে তার খ্যাতিও ছিল অসাধারণ । তার 
কিন্তু, ভাই, গৃহত্যাগ করার দরকার হয়নি 1 

“সত্যিই পিতা আমাদের ছিলেন পরমধাম্মিক, ছিলেন আদর্শ 
গৃহী সাধক। তার রোপণ-কর! সেই ধন্মের বীজই যে আজ মুকুলিত 
হতে চাইছে আমার জীবনে । এ সত্য ষে আমি মনে প্রাণে উপলব্ি 
করছি। তাইতো শ্রমণধর্ম্ে দীক্ষা নিয়ে জীবনের সেই স্বাভাবিক 
পরিণতিকেই আমি এগিয়ে দিতে চাই ।” 

আত্মপ্রত্যয়ের কথা, আপন উপলব্ধির কথা বর্ধমান বলিতেছেন। 
এখানে তাই তর্ক চলেনা । তবুও আর এক যুক্তি টানিয়া আনিয়া 
নন্দীবদ্ধন কহিলেন, “কিন্তু, ভাই, ক্ষত্রিয়ের কাজ হচ্ছে, শক্তিবলে এই 
সংসারকে ধর্মের দিকে ধারণ ক'রে রাখা। সন্যাসী হয়ে সেই ক্ষাত্র 
ধর্নীকেই কি তুমি ত্যাগ ক'রছো। না ?” 

“দাদা, তুমি কি ভুলে গিয়েছো, খবভদেব থেকে পার্খনাথ এই 
তেইশটি তীর্থক্করই ছিলেন ক্ষত্রিয় তনয়। জীন বা বিজেতার আখ্যা 
এরাই পেয়েছেন, ষড়রিপুজয়ী এই ক্ষত্রিয়েরাই যে বাঁচিয়ে রেখেছেন 
আসল ক্ষাত্রধন্্ন। এদের পদচিহ্ন ধরেই তো আঁমি এগোতে যাচ্ছি।” 

নন্দীবদ্ধন বুঝিলেন, ভ্রাতা তাহার আপন লক্ষ্যে অবিচল। তবে 
ফেরানে। যখন যাইবেই না, আরে কিছুকাল তাঁহার এই সন্যাসকে 
'ঠেকাইয়া রাখার চেষ্টা করা যাক না কেন! 


চ 


কহিলেন, “ভাই, অন্ততঃ একটা অন্থুরোধ তুমি আমার রাখো। 
আরো কয়েকট! বৎসর তুমি গৃহে থেকে যাও। তাহ'লে আত্মপরিজনদের 
কিছুটা সান্ত্বনা হয়তো থাকবে ।” 

“ছু'বৎসর আগে, বাবা আর মা যখন লোকাস্তরে যান, তখনি আমি 
সংসার ত্যাগ করতে চাই। কিন্তু তোমার চাপে পড়ে তা পারিনি । 
তোমায় তখন কথা দিয়েছিলাম, আর ছু'বসর আমি গৃহে থাকবো 1” 

“হ্যা, স্বীকার করি, তোমার সে প্রতিশ্রুতি তুমি রেখেছে” 

দৃঢন্বরে বদ্ধমান এবার ভ্রাতাকে জানাইয়া দিলেন তাহার শেষ 
কথা-_“দাদা, তুমি জানো, এ ছু'বৎসর গৃহে আমি থেকেছি বটে, কিন্ত 
ভোগ বিলাসের কোন উপকরণই কখনো! স্পর্শ করিনি। সংঘম ও 
ত্যাগ তিতিক্ষার ভেতর দিয়ে গড়ে তুলতে চেয়েছি আমার ভাকী শ্রমণ- 
জীবনের প্রস্ততি। আজ আমার প্রতীক্ষিত লগ্ন এসেছে, আর তোমরা 
আমায় বাধা দিয়োনা । শ্রমণ-ধন্মে দীক্ষা নিয়ে আমায় বেরিয়ে পড়তে 
দীও মুক্তিসাধনার পথে 


অগ্রহায়ণ মাসের অপরাহব। ষণ্ডবনের আকাশে বাতাসে জড়াইয়! 
আছে শীতের শ্লথ মধুর আমেজ। স্বজন পরিবেষ্টিত বর্ধমান আসিয়া 
দাড়ান বনমধ্যস্থ অশোক তরুর নীচে। এখানেই আজ তাহার দীক্ষা- 
তনুষ্ঠান সম্পন্ন হইবে । 

চারিদিকে কৌতুহলী জনতার ভীড়। শুধু জ্ঞাতৃ-ক্ষত্রিয়েরাই নয়, 
বৈশালীর নানা অঞ্চল হইতে হাজার হাজার লোক সেখানে আসিয়া 
জুটিয়াছে। 

একটি একটি করিয়। মূল্যবান পরিচ্ছদ ও আভরণ বর্ধমান খুলিয়া 
ফেলিলেন। স্বহস্তে কর্তন করিলেন ঘনকৃষ্ণ কেশদাম। সব্বত্যাগী 
নিগ্রন্থ শ্রমণরূপে সম্পন্ন হইল তাহার বহু-ঈগ্লিত দীক্ষা । 

উচ্চারিত হইল নবীন সন্্যাসীর সঙ্কল্প বাণী-আজ হইতে সার! 
মন বাক্য ও কায় দ্বার। একান্ত নিষ্ঠায় তিনি পালন করিবেন অহিংসা, 


হট 


সত্য, অচৌর্ধ্য ও ব্রন্চর্য্যের ব্রত। সুখ ছঃখ, জীবন মৃত্যু সমজ্ঞানে 
করিবেন কন্মবন্ধনের মূলোচ্ছেদ। 

সংসার জীবনে এবার চিরবিচ্ছেদের পালা। পতিপ্রাণা যশোদার 
হৃদয় বেদনা ফাটিয়া পড়ে কান্নার অঝোর ধারে। কন্তা প্রিয়দর্শনার 
আয়ত নয়ন ছুইটি সজল হইয়া উঠে। সহত্র স্হত্র নর-নারীর হৃদয়ে 
নামিয়া আসে শোকের ছায়।। অভ্রাণের হিমেল হাওয়া সকলের করুণ 
দীর্ঘশ্বাসে ভারী হইয়া উঠে । 

ভাবাবিষ্ট বদ্ধমানের কোন দিকেই ভ্রক্ষেপ নাই। মন তাহার আজ 
অজানা রত্বের আশায় ডুবুরির মত অগাধ জলে ডুব দিয়াছে। 

যণ্ডবন ত্যাগ করিয়া ধীর পদক্ষেপে তিনি পরিব্রাজনের পথে 
বাহির হইয়া পড়িলেন। 

এবার হইতে তিনি এক নিগ্রন্থ শ্রমণ-_ গ্রন্থিহীন, বন্ধনহীন এক 
মুমুক্ষু সন্াসী | 

যে কটিবস্ত্র ও উত্তরীয় পরিধানে ছিল, তের মাস পরে তাহার 
চিহ্মাত্রও রহিল ন।। নিজের জীর্ণ বস্ত্র এক ভিখারীর গায়ে তুলিয়া দিয়া 
বর্ধমান হইলেন একেবারে দিগম্বর। সর্বন্বত্যাগের পথে, সব্ব পাশ- 
মুক্তির পথে যিনি পা! বাড়াইয়াছেন, অশন বজনের প্রয়োজন যে তাহার 
চিরদিনের তরে ফুরাইয়া গিয়াছে । 

সেদিনকার এই অভিনিক্রমণের মধ্য দিয়াই উত্তরকালে ঘটে 
বর্ধমানের সার্থকতর প্রকাশ, তিনি আবির্ভৃত হন তীর্থঙ্কর মহাবীররূপে। 
তাহার মহাঁজীবনকে কেন্দ্র করিয়াই শুরু হয় নিগ্র্থ ধন্মের রূপান্তর । 
উজ্জীবন, সংস্কার ও নব সংগঠনের মধ্য দিয়া আত্মপ্রকাশ করে 
বলিষ্ঠতর জৈনধন্ম্ম। 

মহাবীরের জীবন ও বাণী ভারতের জনচেতনার সম্মুখে তুলিয়া ধরে 
নৃতনতর ধন্মভাবনা, সমাজ ও সাঁধনজীবনের পুরোভাগে স্থাপন করে 
উদারতর আদর্শ, নৃতনতর মৃূল্যমান। বুদ্ধ তথাগতের উত্তরসূরীরূপে 
মহাবীর প্রচার করেন অহিংসার মহাত্রত। এ অহিংস।কে তিনি ড় 
$ 


করান এক দৃঢ়মূল দার্শনিক ভিত্তিতে, অন্ুগামীদের উদ্দ্ধ করেন জীব 
প্রেমের এক সুমহান চেতনায়। ত্যাগ, সংযম ও কৃচ্ছের মধ্য দিয়া 
মোক্ষদাধনার যে পথ তিনি দেখাইয়া! দিয়া যান, আড়াই হাজার বৎসর 
ধরিয়া ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনরর্শনকে তাহা প্রভাবিত 
করিয়াছে। 


সে যুগের ত্রাঙ্মণ্যসমীজ ছিল ক্ষয়িষুঃ ছিল আত্মবিস্বাত। আত্মিক 
শক্তি হারাইয়৷ এ সমাজ তখন প্রাণহীন অনুষ্ঠান ও বাহ্াড়ন্বরে মন্ত । 
_উপনিষদের খষির জ্ঞানময় ধন্ম আর নাই, কম্মীকাণ্ডের অধ্যাত্ম্য আদর্শ ও 
প্রেরণার চিহ্ন দেশের কোথাও খুঁজিয়া পাওয়া! কঠিন। পুরোহিত-তন্ত্ 
অধঃপতনের চরমে আসিয়া! পৌছিয়াছে, সমকালীন ধন্দম ও সমাজকে 
করিয়া তুলিয়াছে বহিন্মখী, আচার-সর্ববস্ব। 

সমাজের উচ্চ ও নীচস্তরে সেদিন দেখ! দেয় এক ছুস্তর ব্যবধান । 
ক্ষত্রির রাজ! ও বণিক শ্রেঠীদের জীবনে জমিয়া৷ উঠে ভোগ-লালসার 
পঙ্কিলতা। আর নিয়শ্রেণীর দরিদ্র, লাঞ্ছিত মানুষের জীবন ? সেখানে 
নাই কোন নিরাপত্তা বোধ, নাই কোন আশ! বা ভরসা, মনে তাহার 
কেবলই ধুমায়িত হইতেছে অসন্তোষের আগুন, জাগিতেছে প্রবল , 
প্রতিক্রিয়া। প্রাণহীন ধন্মীচরণ, আর বৈভব ও বিলাসের চাঁপের 
মধ্যে সাধারণ মানুষ সেদিন যেন একটু শ্বাস ফেলিতেও আর 
পাঁরিতেছে না। দিনের পর দিন এক নূতন আদর্শ ও জীবন পথের 
প্রত্যাশায় সে দিন গুণিতেছে। 

সে যুগের চিন্তাশীল অভিজাত মানুষের মনেও জাগিয়াছে জীবন 
জিজ্ঞাসা । কোথায় নিহিত রহিয়াছে ধম্মজীবনের পরম সত্য ? উপলবির 
পথটিই বা কোন্‌ দিকে? কোথায় সেই আলোক-দিশারী, যে এই 
দুর্গত সমাজকে পথের সন্ধান বলিয়া দিবে ? 

সমাজের এই মানসসঙ্কটের দিনে, বৈশালীর উপকণ্ঠে আবিভূর্তি হন 
মহাঁসাধক মহাবীর-তীর্ঘস্কর। ভোগ-লালসায় মত্ত সমকালীন সমাজের 

৫ 


পুরোভাগে আসিয়! দাড়ান এই সর্ববত্যাগী দিগম্বর সন্ন্যাসী, প্রদান 
করেন ধণ্মজীবনের নৃতনতর দিগনির্দধেশ । সর্র্ষ সমক্ষে তুলিয়া ধরেন 
ত্যাগ বৈরাগ্য ও কৃচ্ছাত্রতের বাণী, প্রদর্শন করেন মোক্ষপথ ।. 


স্ঞাতৃ-ক্ষত্রিয় সিদ্ধার্থ ও তাহার পত্রী ব্রিশলার পুক্র মহাবীর। এই 
পুক্রকে গর্ভে ধারণ করার আগে জননী এক অদ্ভুত স্বপ্র দর্শন করেন। 
জৈন আচার্ধ্য ভদ্রবানুর কল্লস্ত্রে ইহার এক আখ্যায়িক! রহিয়াছে ।_- 

গভীর রাত্রি, ঘন অন্ধকারে চারিদিক সমাচ্ছন্ন। কোথাও জনমানবের 
সাড়াশব্ নাই। ক্ষজিয়াণী ত্রিশল। শয়নগৃহে নিদ্রামগ্লা রহিয়াছেন। 
এ সময়ে তাহার মানস পটে ভাসিয়া উঠিতে থাকে পরপর চৌদ্দটি 
্বপ্ন-ৃশ্য | নিগ্রন্থ ধন্মমগ্ডলীতে এগুলি পরমশ্ডভকর বলিয়া খ্যাত। স্বপ্ন 
দেখিয়। তাহার নিজ্র। টুটিয়। যায়, সারা দেহ বিস্ময়ে আনন্দে রোমাঞ্চিত 
হইয়া উঠে। 

স্বামীর পালস্কে গিয়। ত্রিশলা তাহাকে জাগাইয়া তোলেন। ব্যগ্র 
স্বরে কহেন, “ওগে। শুন্ছো, ঘুমের ঘোরে আজ দেখলাম নানা আশ্চর্য্য 
স্বপ্ন । প্রথমটায় চোখের সামনে এসে দীড়ালে। এক মনোরম শ্বেতহস্তী, 
. তারপর এক জ্যোতির্ময় বলীবর্দ। দেখলাম, মুক্তোর মত শুভ্রবর্ণ এক 
সিংহ আকাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আমার কোলে । তারপর আর 
এক অপূর্ব্ব দৃশ্য ! হিমবন্তের শিখরে অধিষ্ঠিত রয়েছেন দেবী কমলা 
- হাঁতে তার লীলাকমল, চারদিকে ছড়ানে। অপার এঁশ্ব্ধ্যরাশি 1” 

পত্ঠীর কথা শুনিতে শুনিতে সিদ্ধার্থ উদ্দীপিত হইয়া! উঠিয়াছেন। 
সোৎসাঁহে কহিলেন, পপ্রয়ে, অপুর্ব তোমার এ স্বপ্ন ! তারপর আর কি 
কি দেখেছো» বলতো। !” 

“হ্যা, সামনে আমার ধীরে ধীরে ভেসে আসতে লাগলো এক গাছি 
মন্দারমালা, পর পর এলো চন্দ্র, সূর্য্য, ধ্বজা, কুস্ত, পদ্মসায়র ও 
ক্ষীর সমুদ্র। চোখে পড়লে! এক দিব্য ধাম, রত্বের পাহাড়, আর 
লেলিহান অগ্নিশিখা ।” ৰ 
& 


সিদ্ধার্থের চোখে মুখে আনন্দ উপচিয়া পড়িতেছে। কহিলেন, 
“প্রয়ে, দেবতাদের কৃপায় তুমি এক মহাকল্যাণকর ্বপ্ন দেখেছে৷। 
তোমার কোলে নিশ্চয়ই আসছে এক ক্ষণজন্া পুত্র । নিজ শক্তিবলে 
সে সর্ববজয়ী হবে, স্থ'পন করবে তার একাধিপত্য ।% 

পরের দিনই জ্যোতিষীদের ডাকাইয়া আন! হয়। এই স্বপ্নের 
নিহিতার্থটি সিদ্ধার্থ তাহাদের কাছে জানিতে চাহেন। 

বিচার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের পর তাহারা কহিলেন, “ক্ষজ্িয়াণীর 
এ স্বপ্ন আপনার পরম সৌভাগ্যের কথাই জ্ঞাপন করছে । আপনার 
গৃহে আবিভূর্তি হবেন এক দিকৃপাল পুরুষ । অগণিত মানুষের অধিনায়ক 
হয়ে এই পুঞ্ত স্থাপন করবেন এক বৃহৎ সাসমত্াজ্য। অথব! তিনি হবেন 
এক জীন বা ত্রিলোকজয়ী মহামানব । 

__-কল্পন্থত্রঃ ৪ (৮১) 

সিদ্ধার্থ ও ত্রিশলার অন্তর আনন্দে ভরিয়া উঠে, শুভদিনের 

প্রতীক্ষায় উভয়ে দিন গুণিতে থাকেন। 


খুঃ পূর্ব্ব ৫৯৯ অব্দের চৈত্র মাস। শুরা ত্রয়োদশীর রূপালী ডাঁদ 
রাতের আকাশে পাড়ি জমাইতে চলিয়াছে। এই রাতেরই এক পরম 
শুভলগ্নে শোনা গেল সিদ্ধার্থের ভবনে মঙ্গলশঙ্ঘের ধ্বনি, ভূমিষ্ঠ 
হইল এক অনিন্দ্যস্ুন্দর শিশু। এইটি তাহার দ্বিতীয় পুক্র। 

জননী ত্রিশল। দেবীর মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটিয়। উঠে। সেদিনকার 
দেখা স্বপ্ন এবার বুঝি তবে সার্থক হইতে চলিয়াছে। ঘর আলো-কর! 
এ শিশু কোন্‌ শুভ সম্ভীবন! দিয়া তাহার কোলে আসিয়াছে তাহা কে 
বলিবে? 

প্রস্থৃতি ও শিশুকে ঘিরিয়া এবার শুরু হয় পুরনারীদের আনন্দ 
উৎসব। দশদিন ধরিয়া কুগ্ুপুরের ক্ষত্রিয়দের এই উৎসব "চলিতে 
থাকে । 

বৈশালী রাজ্যের এবার বড় স্বুবসর। চাষীদের ঘরে ঘরে দেখা 


যায় শস্তের প্রাচ্র্য্য। ধনধান্তে সারা দেশ ভরিয়া উঠিয়াছে। পিতা 
তাই আদর করিয়! নবাগত শিশুর নাম রাখেন বর্ধমান । 

বিত্তবান পরিবারে, অভিজাত পরিবেশে শিশু দিনে দিনে বাড়িয়া 
উঠিতে থাকে। 


তখনকার দিনে, উত্তরভারতে কিছু সংখ্যক গণতন্ত্রী” রাজ্যও বর্তমান 
ছিল। মগধ, কোশল, বংস, অবস্তী প্রভৃতি রাজতন্ত্রী রাজ্যের পাশাপাশি 
দেখা যাইত বৈশালীর মত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে চালিত রাজ্য। 

ক্ষত্রিয়দের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠির শাসনভার ছিল নিজেদের নিবর্বাচিত 
অধিনায়কের উপর । দেশরক্ষা বা অন্য কোন জরুরী প্রয়োজন উপস্থিত 
হইলেই স্থানীয় অধিনায়ক ব1। গোষ্টিপতির৷ সঙ্ঘবদ্ধ হইতেন, সাধারণতঃ 
গণতান্ত্রিক ভিত্তিতেই পরিচালিত হইত তাহাদের কাজকন্দ্ন। এই সব 
বংশভিত্তিক সামন্তচক্রের কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত থাকিতেন একজন নৃপতি। 

বুজ্জি,:লিচ্ছবী, মল্ল প্রভৃতি বংশের সমবায়ে ও সমর্থনে বৈশালীর 
গণরাজ্য গঠিত হইয়ছিল। উত্তর ভারতের রাজনীতিতে তখনকার দিনে 
এই রাজ্যের প্রভাব বড় কম ছিল ন1। হৈহয়বংশীয় ক্ষত্রিয়প্রধান, চেটক 
ছিলেন এই সম্মিলিত রাষ্ট্রের অধিপতি । যুদ্ধ বিগ্রহের সময়ে ই'হারই 
নেতৃত্বে 'বিভিন্ন গোষ্টিগুলি সমবেত হইত। 

মহাবীরের পিতা সিদ্ধার্থ ছিলেন জ্ঞাতৃ-ক্ষত্রিযদের অধিপতি । শুধু 
তাহাই নয়, বৈশালীর সামন্তদের মধ্যে তখনকার দিনে তাহার প্রভাব 
ছিল অসামান্ত। বংশগৌরব, চরিত্র ও কন্ধকুশলতার গুণে রাষ্ট্র ও 
সমাজের অন্যতম স্তম্তরূপে তিনি গণ্য হইতেন। 

জৈনধন্দের বিশিষ্ট জাম্মীন গবেষক, মনীষী হেরমান্‌ জাকোৰি 
মহাবীরের পিতা সিদ্ধার্থ সম্পর্কে লিখিয়াছেন, “কুগ্ুগ্রাম ছিল বৈশালীর 
উপকণস্থিত এক ক্ষুদ্র জনপদ । স্পষ্টতঃই বুঝা যায়, এখানকার অধিপতি 
সামান্ত একজন ভূম্বামী ছাড়া আর কিছু হইতে পারেন না। জৈনেরা 
সিদ্ধার্থকে একজন শক্তিশালী রাজ বলিয়। ধরিয়া নিয়াছেন, উচ্ছুসিত 


৮ 


ভাষায় তাহার রাজকীয় এশ্বর্য্যের বর্ণনা করিয়াছেন। কিন্তু তথ্য 
বিশ্লেষণ করিলে দেখ যায়, সিদ্ধার্থ ছিলেন একজন বিশিষ্ট সামন্ত বা 
ভূম্যধিকারী। জৈন সাহিত্যে প্রায়ই তাহাকে ক্ষত্রিয় বল! হইয়াছে এবং 
তাহার পত্রী ত্রিশলাকে উল্লেখ করা হইয়াছে ক্ষক্্রিয়াণী বলিয়া। দেবী 
বা রাণী কোথাও বল! হয় নাই। কোনখানেই জ্ৰাতৃ-বংশীয় ক্ষত্রিয়দিগকে 
সিদ্ধার্থের সামন্ত বা অধীনস্থ বল! হয় নাই, সমান পদমর্য্যাদীবিশিষ্ট 
বলিয়াই গণ্য করা হইয়াছে । এসব দৃষ্টে মনে হয়, সিদ্ধার্থ কোন রাজা 
ছিলেন না, স্ববংশীয়দের শ্রেষ্ঠ নেতাও তিনি ছিলেন না। প্রাচ্যের সন্তান্ত 
ভূম্যধিকারীদের সাধারণতঃ যে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি প্রয়োগ করিতে 
দেখা যায়, তিনিও তাহাই মাত্র করিতেন। তবে সমপব্যায়ের অন্যান্য 
ক্ষত্রিয় নেতাদের অপেক্ষা তাহার প্রভাব প্রতিপত্তি অবশ্যই বেশী ছিল। 
ইহার কারণ, বৈবাহিক সুত্রে বড় বড় বংশের সহিত তাহার সম্বন্ধ স্থাপন । 
সিদ্ধার্থের পত্রী ত্রিশল! ছিলেন বৈশালীর রাজ। চেটকের ভগ্নী 1” . 

চেউকের কন্যাদের বিবাহ হয় মগধ, অঙ্গ, কৌশ্ান্বী, অবস্তী ও 
সিন্ধুসৌবীর-এর নৃপতিদের সঙ্গে। তাই আত্মীয় কুটুম্বদের দিক দিয়! 
সিদ্ধার্থের সামাজিক মর্যাদা ছিল অসাধারণ । 


এই আভিজাত্য ও বংশ গৌরবের সঙ্গে মহাবীর পিতা ও মাতার 
নিকট হইতে প্রাপ্ত হন তাহাদের ব্যক্তিত্ব ও সাধনার এতিহ্া। সিদ্ধার্থ ও 
ব্রিশলার জীবনে নিগ্রন্থিধন্্ অপরিসীম প্রভাব বিস্তার করে। তীর্ঘস্কর 
পার্খবনাথের প্রচারিত আদর্শ ও 'ধন্মাচরণের উপর দেখা যাঁয় তাহাদের 
অটুট বিশ্বাস। এই বিশ্বাস ও ধন্মবুদ্ধির প্রভাব মহাবীরের বালক 

জীবনে এক ্তুস্পষ্ট ছাপ রাখিয়া যায়। 
নিগ্রন্থ শ্রমণেরা, বন্ধন বা! গ্রন্থিহীন সর্ববত্যাগী সন্্যাসীরা পিতার 
গৃহে প্রায়ই আস! যাওয়া করেন। চরণোপান্তে বসিয়। বালক মহাবীর 
* জৈন হ্ত্র-হের্মান জাকোবি, সেক্রেড, বুক্স্‌ অব. গ্ভ ঈষ্ট 


ভলুযু--২২ (১২) 
& 


তাহাদের নানা অভিজ্ঞতার কাহিনী শুনেন। শ্রমণের' শ্রদ্ধাভরে বর্ণন! 
করেন প্রভূ পার্্বনাথের ত্যাগ তিতিক্ষা আর অলৌকিক সাধনজীবনের 
কথা। বালকের সারা অন্তর কি যেন এক অব্যক্ত আপ্তিতে গুমরিয় 
উঠে, মন তাহার কোথায় যেন উধাও হইয়া যায়। 

জৈন আচারাঙ্গ-স্ত্র মহাবীরের জনক ও জননীর ধর্মীনিষ্ঠা সম্বন্ধে 
লিখিয়াছেন, “বহুবৎসর তাহার! শ্রমণদের উপদিষ্ট ধন্ম পালন করেন, 
বিভিন্ন জীব সম্পর্কে যে অপরাধ অনুষ্ঠিত হইয়াছে সেজন্য তাহারা 
ধন্দয় নির্দেশ অনুযায়ী অনুষ্ঠান করেন অনুশোচনা, আত্মধিকার 
স্বীকারোক্তি ও প্রায়শ্চন্ত। শেষের দিনে কুশ-শষ্যায় শয়ন করিয়া 
শুরু করেন আমরণ উপবাস-ব্রত, চরমকৃচ্ছের মধ্য দিয়! দেহ তাহাদের 
হইয়া উঠে বিশীর্ণ ও মৃতকল্প। এই কঠোর তপস্তার পথ ধরিয়া তাহার! 
দেহত্যাগ করেন। অতঃপর দেবযোনিতে তাহাদের জন্ম হয়” 


বালক বয়স হইতেই মহাবীর বেশ বলশালী ছিলেন। ছুঃসাহসী ও 
তীক্ষধী বলিয়াও তাহার খ্যাতি কম ছিল নী”. 

একবার তিনি অন্যান্য বালক বালিকাদের সঙ্গে এক উপবনে 
বসিয়া খেলাধূলা করিতেছেন। হঠাৎ দেখা গেল এক বিশালকায় সর্প 
সেখানে আসিয়া উপস্থিত। চারিদিকে মহা হৈ চৈ পড়িয়া গেল। সঙ্গীর! 
ভয়ে যে যেদিকে পারে ছুটিয়া পলাইতেছে। মহাবীর কিন্ত এই 
সাঁপটিকে দেখিয়া মোটেই ভীত হন নাই। আগাইয়। আসিয়া হঠাৎ 
খপ. ক্রিয়। তিনি উহার লেজটি ধরিয়া ফেলিলেন। তারপর চক্রকারে 
কয়েকবার ঘুরপ।ক খাওয়াইয়। করিলেন দূরে নিক্ষেপ । 

ক্ষণপরেই তিনি ব্যস্ত হইয়া পড়েন নিজের খেলাধুলায়। কোন 
অপ্রত্যাশিত ঘটনাই যেন এখানে ঘটে নাই, এমনি তাহার মনোভাব । 

পিতা সিদ্ধার্থ পুভ্রকন্াদের শিক্ষায় বড় উৎসাহী ছিলেন। 
প্রতিভাধর বালক মহাবীরকে সর্ব বিষ্ঠায় পারদর্শী করিয়! তুলিতে তিনি 
কোন ত্রুটি রাখেন নাই। 


১৩ 


বর্ধমান ক্রমে যৌবনে পদার্পণ করিলেন । জনক জননী মহা চিন্তিত 
হইয়া উঠিয়াছেন, রূপসী ও সর্বগুণান্বিতা পাত্রী কোথায় পাওয়া 
যায়? চারিদিকে অন্বেষণের পর সন্ধান মিলিল। বৈশালীর নিকটে 
সমরবীর নামে এক সামন্ত রাজার বাস। তাহার কন্যা যশোদা পরম। 
রূপবতী, গুণেরও তাহার সীমা নাই। অচিরে তাহাকে পুন্রবধূরূপে 
বরণ করিয়া ঘরে আনা হইল । 

এই বিবাহের ফলে অনবস্া নামে বর্ধমানের এক কন্যা জন্মগ্রহণ 
করে। জৈন সাহিত্যে তাহার আর এক নাম দেখা যায়- প্রিয়দর্শনা | 


গৃহে বিত্তবৈভবের অবধি নাই। অপার স্সেহ, প্রেত" ও মায় 
মমতায় স্বজনের! সতত ঘিরিয়া রাখিয়াছে। কিন্তু তবু বধ্ধগ্রীনের হৃদয়ে 
কেন যেন শাস্তি নাই। কি এক অতৃপ্ত আকাজ্কায় ঠাহার চঞ্চল 
হইয়া উঠে, টানিয়া নিতে চায় দূর দৃরাস্তরে। জন্মার্টরের সান্বিক 
সংস্কার বারবার কেবলই মাথা ঠেলিয় উঠিতে চায়। বুকে জাপিয়া উঠে 
নৃতন স্বপ্ন, নূতন ভাবন!। গ্র্ভীয়া ফিরেন অজানা মহামুক্তির পথ । 

জনক জননীর ধন্মীচরণ ও জীবনাদর্শও বালক জীবনে একদিন যে 
বীজ রোপণ করিয়াছিলেন, যৌবনে এবার তাহা অঙ্কুরিত হইতে 
চাহিতেছে। | 
নিগ্রন্থ সন্্যাসীদের দেখা পাইলেই মহাবীর ব্যাকুল হইয়া তাহাদের 
শরণ নেন। উৎকর্ণ হইয়! শোনেন তাহাদের ধন্দমন উপদেশ। অহিংসা। 
সংযম ও কৃচ্ছু সাধনার কথা, মোক্ষের কথা শুনিতে শুনিতে মন শ্রদ্ধায় 
ভরিয়া উঠে, একাগ্র ভাবনায় সার অন্তর নিবিষ্ট হয়। বারবার অন্তরে 
প্রশ্ন জাগে, কবে হইবে কন্মের বন্ধন ক্ষয়, কবে হইবে পরমপ্রান্তি ও 
নির্বাণ লাভ ? 

মুক্তির তৃষ্জার নীচে চাপা পড়িয়া যায় সংসারজীবনের যত কিছু 
ভোগ সুখের আকর্ষণ। ধীরে ধীরে বর্ধমান হইয়া উঠেন অন্তম্ঘ্ঘীন, 
পরম উদাসীন। জনক ও জননীর তিরোধানের পর সংসার ত্যাগের 


১১ 






যে চেষ্টা তিনি করিয়াছিলেন, স্রেহশীল জ্যোষ্ঠভ্রাতা নন্দীবর্ধনের বাধা- 
দানের ফলে তাহা জন্তব হয় নাই। আজিকার সন্ধ্যায় ষণ্ডবনের এই 
সন্যাস-দীক্ষা তাহার মুক্তির তোরণ উন্মোচিত করিয়া দিল। 

মোক্ষকামী সন্্যাসী হিসাবে এবার হইতে নিজের দেহাত্মবোঁধ তিনি 
বিসজ্জন দিবেন। কোন লক্ষ্যই তাহার থাকিবেনা এ দেহের রক্ষণ বা 
বিনাশের দিকে। শক্র মিত্র সকলেরই প্রতি তিনি বজায় রাখিবেন 
সমভাব, আর কায়মনোবাক্যে হইবেন অহিংস। শ্রমণের যতিধ্ম 
হইতেছে ক্ষমা, মার্দব ( নম্রতা ) আর্জব ( সরলতা ), লোভহীনতা, 
অকিঞ্চনতা, সত্য, সংযম, তপস্তা, শৌচ ও ব্রহ্ষচর্য্য । আপ্রাণ চেষ্টায় 
এই দশটি ব্রতই এখন হইতে তাহাকে পালন করিতে হইবে। 


পরিব্রাজন ও তপস্তার কালে যে অসামান্য সংযম, কৃচ্ছু ও ত্যাগ- 
তিতিক্ষা মহাবীরের জীবনে দেখা যায়, সাধন জগতে তাহার তুলনা 
সহজে খু'জিয়া পাওয়া যাইবে না । 

প্রচণ্ড শীতের দিনে অপর সাধকের যখন্‌আগুন জ্বালাইয়! আত্মরক্ষা 
করিতে ব্যস্ত, তিনি তখন নগ্রদেহে উন্মুক্ত আকাশের নীচে ধ্যান 
করিতে বসেন। গ্রীষ্মের ছুঃসহ দহনের মধ্যেও তিনি তেমনি থাকেন 
নিবিবকার। এক এক দিন দেখা যায়, মধ্যাহ্ন সুর্য্যের অগ্রিবর্ধণের 
মধ্যে ধ্যান নিমীলিত নেত্রে তিনি উত্তপ্ত শিলাখণ্ডের উপর অবলীলায় 
বসিয়া আছেন। 

দেহের এই নির্যাতনের মধ্য দিয়াই যে তরুণ সাধক তাহার 
'দেহাত্মববৌধের মূল উৎপাটন করিতে চান 

অনশন ও অর্ধীশনে দেহ ধীরে ধীরে ক্ষীণ হইয়া আসিতে থাকে। 
পাদপরিক্রমার পথে মাঝে মাঝে এক একটি স্থানে ছুই এক রাত্রির জন্য 
তিনি অবস্থান করেন, তারপর আবার শুরু হয় তাহার পথ চলা।' শুধু 
বর্ষাকালে এই পরিব্রাজন তাহাকে স্থগিত রাখিতে হয়। পথঘাট তখন 
দুর্গম হইয়া! উঠে, কোন নগরে থাকিয়া তিনি চতুম্মাস্ত যাপন করেন। 


১২ 


আর তখন তাহার বিশ্রামের স্থান হয় কোন পরিত্যক্ত জীর্ণ কুটির, শ্বাশান 
বা নির্জন উদ্ান। | 

পদত্রজে দীর্ঘপথ অতিক্রম করিয়া বদ্ধমান এবার উপস্থিত হন 
অস্থিগ্রামে। কৃক্ছুত্রতী একদল প্রবীণ নিগ্রন্থ শ্রমণ এখানে বাস 
করেন। তীর্থন্কর পার্খবনাথের সাধনার ধারক ও বাহক এই সাধকের]। 
ইহাদের কাছে বৎসরকাল অবস্থান করিয়া বদ্ধমান শ্রমণধম্মের নিগুঢ় 
তত্বাদি শিক্ষা করেন। তারপর আবার বাহির হন পরিব্রাজনে। 

ুর্গম, বন্ধুর, কণ্টকিত সাধন-পথ সম্মুখে প্রসারিত। প্রতিদিনের 
ছুখ কণ্ট ও ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়া এই পথ তাহাকে অতিক্রম 
করিতে হইবে, তিল তিল করিয়া সাধনা ও সিদ্ধিকে গড়িয়া তুলিতে 
হইবে। জন্গযাস জীবনকে এবার দিনের পর দিন যাচাই করিয়া নিতে 
হইবে সংসারজীবনের কষ্টিপাথরে । 

সাধক মহাবীরের এ সময়কার দৈনন্দিন জীবনে ছিল কঠোরতম 
নিয়মানুবত্তিতা। রাত্রিতে তিন ঘণ্টার বেশী তিনি নিদ্রা যাইতেন না। 
অবশিষ্ট সময়ের বেশীর ভাগই কাটাইতেন পরিব্রাজন, আত্মবিশ্লেষণ, 
আত্মবিচার ও ধ্যান ধারণায় । 

দীর্ঘ উপবাস ছিল হার সাধন-প্রচেষ্টার এক বৃহৎ অঙ্গ । আর এই 
উপবাস অন্তে পারণ করিতেন ভিক্ষালন্ধ আহার্ষ্য দ্বারা। তাহার এই 
ভিক্ষা সংগ্রহের রীতিরও এক বৈশিষ্ট্য ছিল। যদি দেখিতেন, গৃহস্থের 
বাড়ীর সম্মুখ অপর কোন প্রার্থী দ্াড়াইয়া আছে, অথবা কোন 
কুকুর বিড়াল ব1 কাক খা্ছের প্রত্যাশায় বসিয়া আছে, তবে তখনি 
সেখান হইতে চুপি চুপি তিনি অন্তাত্র সরিয়া পড়িতেন। পাছে অপর 
জীবের আহারে বাধা জন্মে, এজন্যই ছিল তাহার এই সতর্কতা । 


বসর ছুই পরের কথ । সেবারকার বর্ষায় চতুন্াস্ত যাপনের জন্য 


মহাবীর নালন্দায় আসিয়াছেন। 
মগধের রাজধানী রাজগৃহের উপকণ্ঠে নালন্না অবস্থিত। ব্রাঙ্গণ্য 


১৩ 


ধশ্মের আওতার বাহিরে পূর্ব ভারতের এই অঞ্চলটিতে তখন নৃতন 
নৃতন ধন্দমমত ও আদর্শ প্রচারিত হইতেছে। বিশিষ্ট ধর্নীনেতা ও 
দার্শনিকদের আনাগোনা তখন নালন্দায়। চারমাস এখানে অবস্থানের 
স্বযোগ পাইয়। মহাবীর খুশী হইয়া উঠিলেন। 

মোক্ষ প্রাপ্তির জন্য, পরম সত্য উপলব্ধির জন্য সার! অন্তর তাহার 
উদ্বেল হইয়া উঠিয়াছে। নিগ্রশ্থি ধন্মের পুরাতন পথ এবং ধর্মাদর্শ 
ধরিয়াই তিনি চলিতেছেন। কিন্তু মন তাহার তেমন ভরিয়া উঠে কই? 
কঠোরতর সাধনা, চরমতম কৃচ্ছ্ত্রতের জন্য তিনি এবার দৃ্প্রতিজ্ঞ। 
প্রতিভাবান ও শক্তিমান সাধক মহাবীর। তাই নূতনতর পরীক্ষা- 
নিরীক্ষার জন্যও মন তাহার বড় অধীর হইয়! পড়িয়াছে। 

ঠিক এই সময়ে নালন্দায় মঙ্খলীপুক্র গোশালের সহিত তাহার 
সাক্ষাৎ । 

আজীবিক * সম্প্রদায়ের এক তরুণ সাধক এই গোঁশাল। সাধন- 
জীবনে চরম ত্যাগ তিতিক্ষার সঙ্কল্প তিনি ইতিপুবে্রে গ্রহণ করিয়াছেন । 
দেহের আচ্ছাদনের জন্য একটুকরা বস্ত্রের প্রয়োজনও তাহার নাই। 
একেবারে তাই উলঙ্গ । কুচ্ছু ও কঠোর তপস্তার মধ্য দিয়! গোশাল 
আপন অভীষ্ট সাধনের পথে আগাইয়া চলিয়াছেন । 

. * নিগ্রন্ধ ও আজীবিকগণ ধর্মীয় মতবাদের দিক দিয়া পরস্পরের খুব 
ঘনিষ্ঠ, কতকগুলি বিষয়ে তাহাদের মধ্যে মতের এঁক্াও বর্তমান। ইহার 
কারণ, দুইটি মতবাদের ধারাই পার্খশনাথের শিক্ষার ভিত্তিতে গড়িয়! উঠিয়াছিল। 
ডক্টর বেোণীমাধব বড়ুয়া বলেন, আজীবিক ধর্মের অই্-মহানিমিস্ত সথত্রগুলি 
পার্শনাথের অহ্ুগামীদের অন্থন্থত ণদশ পূর্বব' শাস্ত্র হইতে নেওয়া হইয়াছে। 

আজীবিকেরা আত্মার অন্তিত্তে বিশ্বাসী ছিলেন। তাহাদের মতে, 
মানুষের ভাগা পূর্ব হইতেই তাহার কর্মফল অন্থ্যায়ী নিদিষ্ট আছে, ইহা 
এড়ানোর উপায় নাই। এই সম্প্রদায়ের সাধকের উলঙ্গ থাকিয়! চরম কুষ্ঠ 
সাধন করিতেন। উত্তরকালে ইহাদের একদল সাধক খ্যাতি অর্জন 
করিয়াছিলেন । সম্রাট অশোক ও তাহার পৌত্র দশরথ ইহাদের জন্য পর্বত 
ক্রোড়ে কতকগুলি সাধনগুহা নিশ্নাণ করিয়৷ দেন। 
১৪ 


তরুণ সন্গ্যাসী মহাবীরের খ্যাতি তখন চারিদিকে প্রচারিত হইতেছে । 
স্টাহার আগমনে রাজগৃহ ও নালন্দায়ও তাই চাঞ্চল্য পড়িয়া গেল। 
বিশিষ্ট নাগরিকের এই ত্যাগত্রতী নবীন শ্রমণের কাছে যাওয়া আসা 
শুরু করিয়। দিলেন । 

গোশালও সেদিন মহাবীরকে দর্শন করিলেন । আর সঙ্গে সঙ্গে বাঁধা 
পড়িয়া গেলেন এক ছুন্সিবার আকর্ষণে । নবাগত এই তরুণ সাধকের 
চোখে মুখে দিব্য আনন্দের দীপ্তি। অপুর্ব সম্মেহন রহিয়াছে তাহার 
ব্যক্তিত্বে। এমন সহজ অনাসক্তি, এমন ধ্যাননিষ্ঠাও গোশালের চোখে 
বেশী পড়ে নাই। আপন শ্ব।ভাবিক, শক্তি ও মহিমার দিক দিয়া এ এক 
অনন্যসাধারণ সন্গ্যাসী! গোশাল মন স্থির করিয়া ফেলিলেন, ইহারই 
সাহচর্য্যে এখন হইতে থাকিবেন, উহারই নির্দেশে নিজের সাধন জীবনকে 
করিবেন নিয়ন্ত্রিত। 

গোশালকে মহাবীর শিষ্যরূপে গ্রহণ করেন। * আর এখন হইতে 
তাহারা একত্রেই অবস্থান করিতে থাকেন। 

সাধক হিসাবে গোশালের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাহার কৃচ্ছাভ্যাস 
ও অপরিগ্রহ। কোন কিছু চাওয়া পাওয়ার ধার না ধারিয়! নগ্নরূপে 
তিনি অবস্থ।ন করেন, স্বেচ্ছ।মত যত্রতত্র করেন বিচরণ। অপরিগ্রহের এই 
পুণতির রূপটি মহ।বীরকে বড় আকৃষ্ঠ করে। সঙ্গে সঙ্গে ভাবিতে বসেন, 
সত্যই তো! সব কিছু ত্যাগ করিয়াই যদি ঘরের বাহির হইয়াছেন, 
তবে এই এক টুকরা আচ্ছাদনের মৌহ আর রাখা কেন? সন্যাসী 
হইয়া লোক লজ্জার ভরই বা কেন তিনি রাখিতে যাইবেন £ 

সম্পন্ন ও সন্ত্ান্ত ঘরের ছেলে মহাবীর । তাই কি সংস্কারে তাহার 
সন্ন্যাসী হইয়াও উলঙ্গ হইতে বাঁধিতেছে? 


* জৈন আচাধ্য ও শাস্ত্রকারের। মঙ্খলীপুভ্র গোশালকে মহাবীরের 
শিশ্যুরূপে বর্ণনা করিয়/ছেন। কিন্ত হোরের্ণলে, ডক্টর বড়,য়া প্রভৃতি একদল 
গবেষকগণ মনে করেন, নবীন সাধক মহাবীরই প্রথমে নগ্ন সাধক গোশালের 
কচ্সাধন দেখিয়া আকৃষ্ট হন, তাহার সাহ্চর্ধ্য কামনা করেন। 

৯৫ 


সিদ্ধান্ত স্থির করিতে আর একটুও দেরী হয় নাই। কোমরে 
জড়ানে। বসনখানি তখনি এক ভিখারীকে দান করিয়। ফেলিলেন। শ্রমণ 
মহাবীর এবার হইতে একেবারে দিগন্বর ! 

মহাবীর ও গোশাল কিন্তু খুব বেশীদিন একত্র থাকিতে সক্ষম হন 
নাই। ছয় বৎসরের মধ্যেই তাহাদের বিচ্ছেদ ঘটে । 

অল্পকাল পরেই উভয়ের দৃষ্টিভঙ্গী ও মতের পার্থক্য স্পষ্টতর 
হইয়া উঠিতে থাকে । মহাবীরের মতে, জীবের দেহ মন পূর্ববজন্মের 
কণ্ধমরফলের দ্বারাই অজ্জিত। কিন্তু এ কম্মরফল তাহার ভবিষ্যতের নিয়ামক 
নয়, এ ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রিত হয় তাহার নিজের কম্মী ও নিজের প্রচেষ্টার 
দ্বারা। তাই মানুষের আত্মবিশ্বাস, আত্মশক্তি ও সাঁধনাই মহাবীরের 
কাছে সব চাইতে বড় কথা । 

গোশাল কিন্তু এ মতবাদকে মানিয়া নেন নাই। অধৃষ্টবাদকে 
তিনি টানিয়। নিয়া চলেন এক চূড়ান্ত পর্য্যায়ে। তিনি প্রচার করিতে 
থাকেন, মানুষের ভাগ্য সম্পূর্ণরূপে তাহার পুর্ববজন্মেরই অধীন। সাধনা 
বা পুরুষকার ছারা তাহার পরিবর্তন কখনো! সম্ভব নয়। পাপ বা পুণ্য, 
শুভ বা অশুভ কন করারও তাই কোন প্রশ্ন উঠে না । 

এই মতবাদের ধারা ধরিয়া গোশাল ক্রমে নামিয়া আসেন নৈতিক 
অধঃপতনের দিকে । অবশেষে বিরক্ত হইয়া মহাবীর একদিন তাহাকে 
ত্যাগ করিয়া যান। 

অল্প কিছুদিনের মধ্যে গেশালের উচ্চাকাজ্ষা৷ সীম! ছাড়াইয়া উঠে, 
নিজেকে তিনি কেবল-জ্ঞানের অধিকারী ও তীর্থঘস্কর বলিয়া ঘোষণা 
করিতে থাকেন। খুব বেশী লোকে এ সময়ে তাহাকে এই মর্ধ্যাদা 
দিতে ঢাহে নাই, তাহার অনুগামীও হয় নাই। কিন্তু আজীবিক 
সম্প্রদায়ের নেতারপে নগ্ন সাধক গোশাল উত্তর ভারতের নান। স্থানেই 
পরিচিত হইয়া উঠেন । ৃ 

মৃত্যুর পূর্ব্বে গুরুত্যাগ্গী গোশাল ভ্রম বুঝিতে পারেন, আত্মগ্রানি ও 
অন্ুশোচনায় জর্জরিত হইয়! মহাবীরের কৃপা ভিক্ষা মাগেন। 


১৩৬ 


বারবার আসে অজানা রাজ্যের হাতছানি । দিনের পর দিন মুমুক্ষু 
মহাবীরকে টানিয়া নিয়া চলে স্ুদূরের অভিযাত্রায়। কে বলিবে 
কোথায় এ পথের শেষ? যে পরমতৃষা বুকে নিয়! তিনি সর্বস্ল তাগ, 
করিয়াছেন, কে জানে কবে হইবে তাহার নিবৃত্তি ? 

অবিরত চলিয়াছে সাধনার তীব্র সংগ্রাম। যড়রিপু তাহাকে জয় 
করিতেই হইবে, হইতে হইবে 'জীন?। পরাজ্ঞান তাহাকে লাভ করিতেই 
হইবে, হইতে হইবে 'কেবলী”। কঠোরতপা৷ সাধক দিনের পর দিন 
দেহাত্ববোধের বিনাশ চাহিতেছেন, খুঁজিতেছেন মনের বিলয় সাধন। 
কিন্ত তাহার সে আত্মিক সংগ্রাম জয়যুক্ত হইতেছে কই ? 

স্বগ্নভীর আত্মবিশ্বাস ও নিষ্ঠায় ভর করিয়া ছুপ্সিবার বেগে তিনি 
আরও আগাইয়া চলিতে থাকেন । 


সেদিনকার পরিব্রাজক জীবনে, সাধন পথের নানা স্তরে দিনের পর 
দিন মহাবীরকে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা, কত বিচিত্র অনুভূতিই ন অর্জন 
করিতে হইয়াছে । 

দিগম্বর মৌনী তাপস স্বেচ্ছামত নানাস্থানে ঘুরিয়া বেড়ান। ধ্যানের 
আবেশেই বেশী সময় তাহার অতিবাহিত হয়, আবার এই ধ্যান টুটিলেও 
থাকেন অস্তন্ম্যধীন। বাহ জগতের সাথে, সমাজের মানুষের সাথে 
তাহার যোগাযোগের অবকাশ কোথায়? তাই কেহ ভাবে উন্মাদ, 
কেহ তাহাকে ভর্থসনা করিয়। বলে--কপটা সন্গ্যাসী। কেহ বা শ্লেষের 
স্থুরে মন্তব্য করে, “উলঙ্গ হলেই যদি সাধু হওয়। যেতো, তবে তো পশুর 
দীবীই থাকতো। সকলের আগে ।” 

পর্যাটন পথে কত গঞ্জনা, কত অপমান ও অত্যাচার মহ্তাবীরকে 
সহিতে হয় তাহার সীম! নাই। কিন্তু সত্যসন্ধ বীরের মতই এ লাঞ্ছন1 ও 
আঘাত তিনি সহ্য করিয়া যান। অন্তরে গাঁথা রহিয়াছে অটুট সঙ্কল্প-_ 
অহিংসার সাধনায় তাহাকে সিদ্ধিলাভ করিতেই হইবে । শত্রু ও মিত্রের 
মধ্যে দেখিতে হইবে এক পরম সাম্যকে। তাছাড়া, নিগ্রহ ও অনুগ্রহ, 


২ ১৭ 


ভারতের সাধক 


জীবন ও মৃত্যুর বোধ জীবনে সমান না হওয়া অবধি পুর্ণজ্ঞানী হওয়ার, 
“কেবলী' হওয়ার সাধনা যে তাহার শুধু স্বপ্নই রহিয়। যাইবে ! 

ধ্যানলোকের আরো গভীরে মহাবীর ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হইয়া 
যান। সুশ্স্পতর রাজ্যের নান দিব্য অনুভূতি যেমন এ সময়ে তাহার 
সাধনসত্তায় আত্মপ্রকাশ করিতে থাকে, তেমনি আসিতে থাকে একের 
পর এক কঠোরতর পরীক্ষা । 

এই সঙ্গে ছুস্তর বাধারূপে উপস্থিত হয় রিপুর নান! সুক্ষ প্রলোভন, 
দহন-জালা ও নির্য্যাতন।* কিন্তু এ সব কোন কিছুই তপোনিষ্ঠ 
মহাবীরকে তাহার সাধনপথ হইতে বিচ্যুত করিতে পারে নাই। 

আপন সাধনার শক্তিবলে ধ্যানের পর ধ্যানের স্তর তিনি অতিক্রম 
করিয়া গিয়াছেন, অজ্জন করিয়াছেন বিপুল তপৈশ্বধ্য । আর এ এশ্বর্ষা 
তিনি বহন করিয়াছেন বিস্ময়কর নিলিপ্তি ও অনাসক্তির মধ্য দিয়া | 


সাধন জীবনে মহাবীরকে মাঝে মাঝেই মৌনব্রত অবলম্বন করিতে 
দেখা যাইত। প্রাণসংশয় হইলেও এ সময়ে কখনো তাহাকে এ ব্রত 
ভঙ্গ করিতে দেখ। যায় নাই। 

পুর্ব ভারতের নানা স্থানে ভ্রমণ করিতে করিতে মহাবীর সে-বার 
রা দেশের গহন অরণ্যঅঞ্চলে আসিয়! উপস্থিত হন। এখানকার বুনে 
অধিবাসীদের হাতে এ সময়ে কিছুদিন তাঁহাকে অবর্ণনীয় অত্যাচার সঙ্্য 
করিতে হয়। 

দেহাত্মববোধ বিলোপ করার জন্যই বীর সাধক তাহার এই কঠোর 
সাধনা চালাইয়া যাইতেছেন। তাই নীরবে, নিবিবকার চিত্তে এই সব 
অকথ্য নির্যাতন তিনি সহ্য করিয়া চলেন। 
_..* বৌদ্ধশান্ত্রে উল্লেখিত সাধনার বিদ্বকারী “মার”-এর মত জন শাস্ত্রেও 
রহিয়াছে মহাবীরের নিধ্যাতনকারী দেবতা, সঙ্গমমকের কাহিনী । কথিত 
আছে, নিজের অজ্জিত সাধন শক্তিবলে অমিতপরাক্রম সাধক মহাবীর তাহাকে 
পরাভূত করেন। 
১৮৮ 


কচ্ছুত্রত ও অদ্ধাশনে দেহ ক্ষীণ। উলঙ্গ সাধক ভাবাবিষ্ট হইয়৷ পথ 
চলিতেছেন। দেখিলে মনে হয়, বুঝিবা কোন্‌ এক উন্মাদ। যেখানেই 
মহাবীর উপস্থিত হন বুনোরা তাহাকে তাড়া করিয়া আসে, কুকুর 
লেলাইয়া দেয়, অশেষরূপে করে নিধ্যাতিন। 

ঠজনশাস্্ এ সময়কার অবস্থার বর্ণনায় লিখিয়াছেন --“কখনো 
তাহার মাথায় পড়ে লাঠি, বধিত হয় কিল ঘুষি। কখনে! বা তাহার 
দিকে ছু'ড়িয়া মার! হয় স্ৃতীক্ষ বর্ষা, অথবা মাটির ঢেলা ও কলসীর কানা । 
আসভা জংলীর। তীহাকে দেখিয়া চীৎকার করে, প্রহার করে বারবার । 

«একবার এবস্থনে তিনি নিষ্পন্দ হঈয়া বসিয়া আছেন, তাহার 
দেহের মাংসই উহ্ারা খানিকটা কাটিয়া ফেলে, উৎপাটন করে মাথার 
চুল, ধুলি ছড়াঈয়া দেয় চোখে মুখে সব্বাঙ্গে । 

“তাহার দেহটি ধরিয়া উদ্ধে নিক্ষেপ করে, সজোরে তিনি পতিত 
হন মুত্তিকায়। কখনে। বা ধানাসনে উপবিষ্ট থাকার কালে তাহার উপর 
কর। হয় চরম উপদ্রব । মভাতীাপসের দেহাম্মবোধ তিরোচিত হইয়াছে, 
তাই সমস্ত কিছু বাথা বেদনা ও অপমানের জ্বাল সহ্য করিতেছেন 
নীরবে, নম্রচিত্তে। 

“সংগ্রামের পুরোভাগে থাকিয়া বীর যোদ্ধা যেমন থাকেন ছদ্ধর্য শত্রু 
দ্বারা বেষ্টিত, মহাবীর ছিলেন ঠিক তেমনই । সকল কিছু নির্যাতন ও 
দুখের মধ্যে শ্রদ্ধেয় তাপস একেবারে অচঞ্চল। ধীর অকম্পিত চরণে 
তিনি অগ্রসর হইয়া চলেন নিব্বাণের পথে ।” 

_-আচারাঙ্গ স্থত্র ১ (৮), (৪) 


সে-বার এক অচেন। রাজ্যের মধ্য দিয়! তিনি পরিক্রমা করিতেছেন । 
সামনেই পড়িল সেখানকার রাজধানী । মহাবীর স্থির করিলেন, এই 
রাত্রির মত এখানে বিশ্রীম করিবেন। আবার প্রত্যুষেই বাহির হইয়া 
পড়িবেন পর্যটনের পথে। 

রাত্রির তখন শেষ যাম। পদযাত্রা শুরু করার ইহাই উপযুক্ত সময়। 


১৪৪ 


কৃত্যাদি সারিয়া মহাবীর সবেমাত্র রাস্তায় বাহির হইয়াছেন, অমনি কোথ। 
হইতে নগররক্ষীরা ছুটিয়া আসিয়। তাহাকে ধরিয়া ফেলিল। 

কয়েকদিন যাবৎ এখানে চোরের বড় উপদ্রব চলিয়াছে, বহু চেষ্টায়ও 
অপরাধীদের ধরা যায় নাই। আজ রাত্রিতে নগরপাল নিজেই সদলবলে 
পাহারার কাঁজ পরিদর্শন করিতে আসিয়াছিলেন। তাই রক্ষীরা সবাই 
মহ! কন্মতৎপর। নিকটেই তাহাদের কয়েকজন ওৎ পাতিয়া ছিল, 
শেষ রাত্রে মহাবীরকে পথে বাহির হইতে দেখিয়াই তাহাকে জাপ টাইয়া 
ধরিয়৷ ফেলিয়াছে। 

ধৃত লোকটি বিদেশী। তাই রক্ষীদের সন্দেহে আরো ঘনীভূত হয় । 

“শালা চোর। বল্‌ দেখি তোর নাম কি? কোথা থেকে এখানে 
এসেছিস্‌? দলের আর সব কই ?”--গলাধাকা দিতে দিতে প্রহরীর 
প্রশ্নবাণ বর্ষণ করিতে থাকে। 

মহাবীর কিন্তু একেবারে নিরুত্তর। কিছুদিনের জন্য মৌনী থাকার 
সঙ্কল্প নিয়াছেন, যত কিছু অত্যাচারই ইহারা করুক, একটি কথাও তাহার 
' মুখ দিয়! আজ বাহির হইবে না। 

অব্যর্থ মুষ্টিযোগ - কিল চড়, লাথি অনেক প্রয়োগ করা হইতেছে, 
কিন্ত কি আশ্চর্য্য! লোকটার মুখ দির। একটি কথাঁও বাহির কর! গেল 
না! তবেকি এবোবা? 

চতুর এক নগররক্ষী জঙ্গীদের কহিল, “তোমরা বুঝতে পারছো না, 
এ একেধারে আসল পাকা চোর । দেখছোনা ? উলঙ্গ হয়ে বেরিয়েছে, 
'আবার করছে বোবার ভান। কিল ঘুষিতে এর গল! থেকে রা" বেরুৰে 
না, আরো বড় সাজ। দেওয়া চাই। কিন্তু ভাই, তা দেবার অধিকার তো 
তোমার আমার নেই। বরং এটাকে এখনই হি'চড়ে টেনে নিয়ে চল 
নগরপালের কাছে ।” 

রক্ষীদের পাহারার কাজ দেখাশুন। করিয়া নগরপাল সবেমাত্র 
গৃহে ফিরিয়া আসিয়াছেন। একে রাত্রি জাগরণ, তছৃপরি মেদবহুল 
শরীরে লাগিয়াছে শকটের ঝাঁকুনি। শরীরট। তেমন ভাল নাই, তাই 


ও 


স্থরা পান করিয়া একটু চাঙ্গা হইতেছেন। এমন সময় রজ্জুবদ্ধ মহাবীরকে 
নিয়া সকলে সেখানে উপস্থিত । 

“ুজুর খুব ভাল খবর । চোর ধরা পড়েছে । ধর! না পড়বেই বা কেন? 
আজ যে হুজুর নিজে রোদে বেন্লিয়েছিলেন ।” 

নগরপালের স্ুরারঞ্সিত নয়ন ছুটি প্রসন্ন হয়া উঠিল। কহিলেন, 
“বেশ, বেশ । কিন্তু ব্যাটা কিছু স্বীকার করেছে ?” 

“না হুজুর, এ একেবারে কুলীন চোর। আমাদের সাথে কোন 
কথাই বল্‌্ছে না” 

“কি দাওয়াই দেওয়া হয়েছে ?” 

“আজ্ঞে ছোট দাওয়াই সব শেষ হয়েছে । এবার আপনার ভুকুম, 
চাই 1” 

উত্তেজিত কষ্টের আদেশ আসিল, “এক্ষুণি বড় দাওয়াই লাগাও । 
ব্যাটার গলয় ফাঁস চডাও। এখনি পেটের সব কথা নিংড়ে বেরিয়ে 
আসবে । যাঁও 1” 

মহাবীরকে টানিয়া বধাভূমিতে নিয়া যাওয়া হইল। মার এদিকে 
সুরাপাত্র হস্তে হুজুর রত রহিলেন ক্লান্তি অপনোদনে। 

ফাসী দিবার পুব্রবে মহাবীরকে শেবারের মত প্রশ্ন করা হঈল। 
কিন্তু পুরর্ববং তিনি নিব্বাক। শমনদূতের মত প্রহরীর দল চারিদিকে 
দণ্ডায়মান। গলায় তাহার ফী(সীর দড়ি জড়ানো হইতেছে, আর তিনি 
ঈাড়াইয়া আছেন একেবারে নিৰিবকারভ'বে, অপার প্রশীস্তি নিয়! । বাহ 
স্তর কোন চেতনাই তাহার মধ্যে নাই । এ যেন নিলিপ্তি ও জনাসক্তির 
এক জীবন্ত বিগ্রহ । 

কিন্তু প্রহরীর এবার বড় বিপদে পড়িল। জৈনশান্ত্র এ কাহিনীর 
বর্ণনায় লিখিয়াছেন -যতবারই তাহার! মহাবীরের গলায় রজ্ভুর গ্রন্থি 
আটিতে যায়, ততবারই হয় বিফলমনোরথ। কি করিয়া! যে এ রজ্জুগ্রন্থি 
ফস্কিয়া যায় তাহ। তাহাদের বোধগম্য হয় না। এ এক মহ! ব্ল্মিয়কর 
কাণ্ড ! 

১, 


কথিত আছে, পর পর সাতবার এ চেষ্ট। ব্যর্থ হইলে রাজকশ্ম্ীচারীদের 
চৈতন্যোদয় হয়। তাহাদের ধারণ। জন্মে, নিশ্চয়ই ইনি কোন শক্তিশালী 
সাধক, নতুবা! এমন অলৌকিক ঘটনা বারবার ঘটা সম্ভব নয়। অতঃপর 
মহাবীরকে তাড়াতাড়ি তাহার! বিদায় দেয়। 


সে-বার চম্পানগরে বর্ষার চতুম্মীস্ত যাপন করিয়া মহাবীর পর্যটনে 
বাহির হইয়াছেন। ঘুরিতে ঘুরিতে একদিন তিনি ছাম্মানি নামক গ্রামে 
আসিয়া উপস্থিত। 

গ্রামের উপান্তে গাছের ছায়ায় বসিয়! বিশ্রাম করিতেছেন, এমন 
সময় এক রাখাল তাহার বলদটি সঙ্গে নিয়। উপস্থিত । কহিল, “মশাই তো! 
এখানে বসেই রয়েছেন। আমার এই বলদটা রইলো। আমি একটু 
জরুরী কাজে গ্রামের ভেতরে যাচ্ছি। এটা ততক্ষণ কাছাকাছি চ'রে 
বেড়াক। আপনি দয়া ক'রে একটু দৃষ্টি রাখবেন এদিকে 1” 

মহাবীর এসময়ে মৌন অবলম্বন করিয়া আছেন। এ মৌনকে 
সম্মতিরই লক্ষণ মনে করিয়া লোকটি নিশ্চিন্ত মনে তাহার কাজে চলিয়৷ 
গেল। 

এদিকে বলদটি ঘাস খাইতে খাইতে কোন্‌ দিকে চলিয়া গিয়াছে 
ধ্যানস্থ মহাবীর তাহা! লক্ষ্য করেন নাই। 

রাখাল ফিরিয়া আসিয়াই প্রশ্ন করিল, “এ কি মশাই? আমার 
বলদট। চলে গেল কোথায় ?” 

এ যেন এক প্রস্তর মৃ্তিকে প্রন্ম করা! মহাবীর নিষ্পন্দ নিম্পলক 
হইয়া চাচিয়া আছেন, কোন সাড়া শব্দই নাই। 

রাখাল হস্তদস্ত হইয়া চারিদিকে ছুটাছুটি করিতে থাকে বটে, কিন্তু 
বলদটির কোন সন্ধানই সেদিন আর পাওয়া গেল না। 

ক্রুদ্স্বরে এবার সে চীৎকার করিয়া বলিল,_-“মশীই যে একেবারে 
পাথর বনে বসে আছেন। বলি, বলদটা কোন্দিকে গেল, তাও তো 
একবার মুখ খুলে বলতে পারেন ?” 
ষ্খ 


মহাবীর তখন অন্তম্ম্থীন, অর্ধাবাহা অবস্থায় রহিয়াছেন। এসব 
কোন কথাই তাহার কাণে পৌছিল না। পেঁইছিলেও মৌনব্রত ভাঙ্গিয়া 
কোন উত্তর হয়ত তিনি দিতেন না। 

ক্রোধে ক্ষিপ্ত হইয়া রাখাল তখনই নিকটস্থ গাছের এক শুষ্ক শাখা 
টানিয়া আনে। এই শাখাটি ভাঙ্গিয়া তৈরী করে ছুইটি তীক্ষ কীলক। 
মহাবীরের ছুই কর্ণরন্ধ্ে এ দুইটি সজোরে ঢুকাইয়া দিয়া বলে, “ধৈর্ষ্যের 
বাঁধ এবার আমার ভেঙ্গে গিয়েছে । যেকাণ দিয়ে আমার কথ। নিলে 
না, এভাবে আজ তা৷ একেবারে বন্ধই ক'রে দিলাম |” 

কর্ণরন্ধ ফাটিয়া টস্‌ টস্‌ করিয়া রক্ত ঝরিতেছে, অথচ মহাবীরের 
তখনো কোন হুস নাই। কিছুকাল পরে বাহাজ্ঞান ফিরিয়া আসিল, 
কিন্ত তখনো! তাহার যেন করিবার কিছুই নাই। যেমন নিধিবকারভাবে 
এই পৈশাচিক নির্যাতন সহ্য করিয়াছেন, তেমনি প্রশান্ত চিন্তে ক্রোধান্ধ 
রাখালটিকে করিলেন মার্জনা ৷ এক নৈব্যক্তিক ভাবে তিনি তখন জাবিষ্ট। 
কাহার কর্ণরন্ত্র ? কে শলাক। দ্বার। বিদ্ধ করে? কে-ট বাবোধ বরে 
ক্ষতের তীব্র বেদন! ? 

কাণের এই কীলক ও ক্ষত নিয়াই ভবলীলাক্রমে আবার পথে 
বাহির হইয়া পড়েন। 

অতঃপর এখান হইতে তিনি পাবা গ্রামে গিয়া পে ছান। সেখানে 
তাহার কাণের এই ছুরবস্থাটি হঠাৎ কবিরাজ খরক-এর চোখে পড়ে। 
পরম যত্রের সহিত তিনি কাষ্ঠের এ শল্য ছুটি উৎপাটন করিয়া 
ফেলেন। বেশ কিছুদিন সেখানে তাহার চিকিৎসাধীনে থাকার পর তবে 
মহাবীরের এই কর্ণক্ষত নিরাময় হয় । 

ছুঃখ-বেদনা ও লাঙ্না অপমানকে এমন করিয়। সহ্য করার শক্তি 
সেদিনকাঁর অনেক কঠোরতপা! সাধকের মধ্যেই দেখা যায় নাই। এই 
সাধন-শৌর্ধযাই এই সর্ধ্বত্যাগী ক্ষত্রিয়বীরকে উত্তরভারতে পরিচিত করিয়। 
দেয় মহাবীর-রূপে । অতঃপর এই নামেই তিনি সর্বত্র অভিহিত হইতে 


থাকেন। 


৩ 


বৎসরের পর বৎমর এমনিভাবে প্রব্রজ্যা, কৃচ্ছু ও তীব্র তপন্তার 
মধ্য দিয়া কাটিয়া গেল। তারপর দীক্ষিত জীবনের ত্রয়োদশ বৎসরে 
দেখা দিল বহু-ঈপ্সিত মহাঁমুক্তির অভ্যুদয় । 

খজুবালুকা নদীর বালুতট ধরিয়া মহাবীর সেদিন 'আগাইয় 
চলিয়াছেন। পথেই পড়িল জন্তীয় নামক ক্ষুদ্র গ্রাম। এই গ্রামের প্রান্তে 
এক শালবৃক্ষের নীচে তিনি আসন পাতিয়। বসিলেন। | 

সম্মুখে ধুধু করে দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তর, আর উদ্ধে রহিয়াছে উদার 
আকাশের মহাবিস্তার। আসনে উপবেশনের পর মহাবীর ধীরে ধীরে 
ধ্যানের গভীরে ডুবিয়া গেলেন। সার! দেহ মন নিশ্চল নিম্পন্দ। বাহ্থা 
জগতের সমস্ত কিছু চেতন! তাহার তিরোহিত হইয়াছে ।. 

ক্রমাগত ছুই দিন এভাঁবে কাটানোর পর তিনি পেঁইছিলেন ধান- 
লোকের চরম স্তরে । নিঃসীম নিস্তরঙ্গ মহাঁপারাবারের গর্ভে সবর্ব সত্তর 
তখন বিলীরমান। সব্বত্যাগী মহাসাধকের জীবনে এবার উদ্ভাসিত 
হইয়া উঠিল কেবল-জ্ভান। নিগ্রন্থি-ধন্মপাধনার শ্রেষ্ঠতম সাফলা ভ্িনি 
অজ্জন করিলেন । 

প্রসিদ্ধ জৈন শাস্ত্রকার, আচাধ্য ভদ্রবান্ধ তাহার এ সাফলোর বর্ণনা 
প্রসঙ্গে লিখিয়াছেন, “তৎকালে পরম শ্রদ্ধেয় মহাবীর হইলেন জীন, অর্থাৎ 
---কেবলী। তিনি তখন সব্বজ্ঞানী, বিশ্বের সর্ব বস্তুর উপর তাহার 
এই জ্ঞানের ধার! হইয়াছে ওতপ্রোত। এই স্থষ্টির দেবতাকুলের, মন্ত্র 
এবং দানব গোষ্ঠির সব কিছু তিনি জ্ঞাত হইয়াছেন, দর্শন করিয়াছেন : 
মানুষ, পশু, দেবতা, নরকের জীব বা আর যাহাই হোক না কেন, কি 
তাহাদের ধ্যান ধারণা এবং চিন্তাধারা, কি তাহাদের জীবন ধারণের 
উপায়, তাহা! এই মহাতাপসের আর অজ্ঞাত নয়। এই বিশ্বের জীব- 
জগতের প্রকাশ্য বা গোপন স্ব কিছু ক্রিয়াকলাপই তাহার জ্ঞানময় 
দৃষ্টির সমক্ষে প্রতিভাত; তিনি অর্থ, তাই তাহার কাছে গোপন বা 
আবৃত কোন কিছুই নাই। স্থষ্টির জীবকুলের চিন্তা বাক্য ও ক্রিয়া, 
সম্বন্ধীয় জ্ঞান সবই তীহার অধিগত 1” -_কল্প্থত্র, ১২১ 


২৪ 


কেবল-জ্ঞনী মহামুক্ত তাপস সেদিন কিন্তু মানুষের সমাজ হইতে 
দুরে সরিয়া! থাকেন নাই । আপন সাধনার উত্তঙ্গ শিখর হইতে তিনি 
ন্বামিয়া আসেন জনজীবনের শ্যামল সমতল ভূমিতে । 


কণ্ঠে নবলন্ধ সতোোর বাণী, চোখে, মুখে দিব্য আনন্দের ছটা, হস্তে 
মানৰ কল্যাণের আলোক-দীপ --কে এই অপুর্ব মহাপুরুষ ? 

একটিবার ষে তাহাকে দেখে, সে আর নয়ন ফিরাঈতে পারে না। 
ক্ষণকালের জন্যও যে সান্িধ্যে আসে আয্মসমর্পণ না করিয়া তীহার আর 
উপার থাকে না। সকল তর্ক, সকল বিরোধিতা এই অসামান্য পুরুষের 
সম্মুখে কি করিয়! যেন স্তব্ধ হইয়া যায়। সিদ্ধকাম এই মহাপুরুষের 
যোগৈশ্বর্ষোর দীপ্চি মানুষের নয়ন ঝল্সাইয়া দেয়, আবার তাহার 
প্রেম ও করুণার স্পর্শ তাহাদের বিগলিত করে চালিত করে অধ্য।্ম 
জীবনের পরম কল্যাণের পথে। 

মহাঁবীরের সাধনা ও সিদ্ধির কথ। লোকমুখে ছড়াইতে থাকে, আর 
তাহার চারিদিকে দলে দলে জড়ো হইতে থাকে নিগ্রস্থ শ্রমণ ও ভক্ত 
গৃহস্থের দল। শুধু কেবল-জ্ঞানী সাধক-রূপেই নয়, মানবংত্রাতি। তীর্ঘস্কর- 
রূপেও সকলে এবার তাহাকে বরণ করিয়া নেয় । 

জীবন-নদীর তীরে ধাঁহার প্রসাদে হয় উত্তরণ, পার-ঘাটে বা তীর্ঘে 
পৌছাইয়া যিনি দেন পরমাশ্রয়, তিনিই যে তীর্থ্কর ! লাঞ্থিত, নিপীড়িত, 
লক্ষভষ্ট মানবের কাছে এই বূপেই সেদিন ঘটে মাবীরের আবির্ভাব ! 
নিজের এই তীর্ধঘস্করজীবনের মঙ্গলঘটখানি জনচৈতন্যের পুরোভাগে 
স্থাপন করিয়া তিনি জানান তীহার উদাত্ত আহ্বান । 


পৌরুষদৃপ্ত যে ভঙ্গীতে, আত্মপ্রত্যয়ের যে বজ্রনির্ধোষে সেদিন 
আপন উপলব্ধির কথা! মহাবীর ঘোষণা করেন, সারা সমাজের বুকে 
সেদিন তাহ! চাঞ্চল্য আনিয়! দেয়। মুক্তিকামী সাধক ও সাধারণ মান্ৃষ 
দলে দলে ছুটিয়া আসে এক অমোঘ আকর্ষণে । 


৫ 


সমবেত নিগ্রশ্থ সন্ন্যাসীদের কাছে সিদ্ধ সাধক মহাবীরের প্রথম 
ঘোষণার কথাটি সমকালীন বৌদ্ধশান্ত্রেও উল্লেখিত আছে। তিনি 
বলিতেছেন--“শোন তোমরা, সাধনায় আমি অজ্জন করেছি সাফল্য, 
হয়েছি সর্বজ্ঞ, সর্বদা । কোন কিছুই আজ আমার জানার বাইরে নেই। 
চলস্ত বা দণ্ডায়মান অবস্থায়, নিদ্রায় বা! জাগরণে, সব্ব সময়েই পরাজ্জান 
বিরাজিত থাকে আমার ভেতর হে নিগ্রন্থ সাধকের দল; অতীত জীবনে 
তোমর৷ যে পাপকন্ম করেছে৷ আজ তাকে নিঃশেষ ক'রে ফেলতে হবে 
চরম কৃচ্ছুত্রত ও নৈষ্টিকতার ভেতর দিয়ে। এখন থেকে তোমরা চিন্তায়, 
বাক্যে ও ক্রিয়াকলাপে থাকবে স্ুসংযত, তারই ফলে ভবিষ্যতের কর্ম 
হতে থাকবে ক্ষীয়মান। এমনি ক'রেই সান্ত্িকতা, অনুশোচনা ও নূতন 
কম্মবন্ধন ক্ষয়ের ছারা নিশ্চিতরূপে তোমাদের পুনর্জন্মের সম্ভাবনা বিনষ্ট 
হবে। এর ফলে নূতন কন্ম বন্ধনের পাকে আর তোমাদের জড়িয়ে 
পড়তে হবে না। সকল কিছু বেদনার জ্বালা হবে তিরোহিত, মন ও 
চিত্তের ঘটবে বিলয়।” --মজবঝিম্‌, ১ 

শুধু সংসারত্যাগী স।ধননিষ্ট শ্রমণদেরই নয়, সংসারধ্মী শ্রাবকদেরও 
মহাবীর শুনাইলেন তাহার আশ্বাসের বাণী। কহিলেন, “নিষ্ঠাভরে আমার 
ধন্মউপদেশ পালন ক'রে চলো? তাহলে গৃহী মানুষ হয়েও তোমর। 
পেতে পারবে অলৌকিক দৃষ্টি ও সাধনৈশ্ব্যা--হবে তোমাদের কর্মা- 
বন্ধনের ক্ষয়।” | 

উত্তরকালে মহাবীরের প্রধান শিষ্য, ইন্দ্রভৃতি গৌতম একবার প্রশ্ন 
করিয়াছিলেন, “প্রভু, আপনি একি করছেন ? সন্গ্যাসী আর গৃহস্থ সাধকের 
মধ্যে কোন পার্থক্ই যে আপনি রাখতে চান না! এ আপনি এক 
মহা অবিচার করছেন। সর্বস্ব ছেড়ে, কৃচ্ছুত্রত নিয়ে যে শ্রমণেরা 
দুশ্চর তপন্তার পথে এগিয়ে আসে, তাদের জন্য বিশেষ সাধন-পন্থ! 
রচিত হবে না? সন্যাসী আর গৃহী হবে সমান ?” 

মহাবীর তিরস্কারের স্থরে উত্তর দেন, “ন! ইন্দ্রভৃতি, আমার 
প্রচারিত ধন্ম্ম হবে সর্বজনীন, এ হবে সত্যকার উদার ধন্ম। এখানে 


৬ 


বৈষম্যের কোন স্থান নেই। এ ধন্মের কাছে সন্ন্যাসী ও গৃহীর অধিকার 
আর মর্য্যাদী একেবারে সমান। --উবাসগ-দসাও) ভাষণ, ১ 

সাধনার অধিকারিণী হিসাবে নারীদের যথোপযুক্ত মর্য্যাদা দিতেও 
তিনি কখনো কার্পণ্য করেন নাই । সন্্যাসধম্মী পুরুষ ও স্ত্রী সাধিকাদের 
সাধন প্রণালী তিনি একই রাখিয়াছিলেন। তাছাড়া, উত্তরকালের প্রচার 
পরিক্রমায় দেখা যাইত, মহাবীর ও তাহার শ্রমণদের সঙ্গে নারী 
সন্নাসীরাঁও অংশ গ্রহণ করিতেছেন । 


প্রচার-রত মহাবীর সেদিন মধ্যমা-পাবায় আঙিয়৷ পৌছিয়াছেন। 
চারিদিকে অমনি বার্তা রটিয়া গেল, তীর্ঘন্কর তাহার নবধন্মের নিগুঢ় তত্ব 
সকলের কাছে ব্যাখা। করিবেন, আর মুমুক্ষুদের দান করিবেন তাহার 
কপা-প্রলাদ | 

নগরীর উপকগে মহাসেন নামক রম্য উপবন। ইহারই এক কোণে, 
তরুচ্ছায়াতলে মহাবীরের বিশ্রামের আমন পাতা হইয়াছে । অপরাহ্ন 
হইতে না হইতে হাজার হাজার নরনারী সেখানে আসিয়া সমবেত 
হইল । কেহ সত্যকার ধন্দু-উপদেশের কাঁডাল, কেহ ব্যগ্র এই বনু খ্যাত 
মহাপুরুষের দর্শন লাভের জন্য । কেহ বা ছুটিয়া আসে শুধু অহেতুক 
কৌতুহল নিয়া । 

মুগ্ডিতশির দিগন্বর সন্ন্যাসী উদাসনেত্রে বৃক্ষতলে উপবিষ্ট রহিয়াছেন ; 
এ যেন ত্যাগ বৈরাগ্যের এক মূর্ত বিগ্রহ। আর সমবেত জনসঙ্ঘ 
মোহাবিষ্টের মত নিম্পলক নেত্রে তাহার দিকে চাহিয়া আছে। 

মহাবীর তাহার ভাষণ শুরু করিলেন। বড় অদ্ভুত ভঙ্গী তাহার 
উপদেশ দানের ! কুটতর্কের কচকচি নাই, নাই তাত্বিক বিশ্লেষণের 
দৌরাত্ম্য / প্রাঞ্জল, সরস কথায় সাধন জীবনের সহজ পথটির সন্ধান 
অবলীলায় তিনি বলিয়! দিতেছেন। আরে। বিস্ময়ের কথা, প্রাচীন 
আচার্যদের কঠিন সংস্কৃত ভাষা তিনি ব্যবহার করিতেছেন না, তত্ব ও 
উপদেশ প্রচার করিতেছেন সর্ববজনবোধ্য অদ্ধমাগধী ভাষায়। 


৭ 


দয়ার কণ্ঠে মহাবীর বলিতে থাকেন ত্রিতাপদগ্ধ মানবের অপার ছুঃখ 
বেদনার কথা । আশ্বাস দেন মহামুক্তির। সন্ধান দেন কন্ধবন্ধন ক্ষয়ের। 
মন্তরমুদ্ধের মত দর্শনার্থীর তাহার এই অপূর্ব্ব ভাষণ শ্রবণ করে। শ্রবণ 
করিয়া মুগ্ধ হয়। সঙ্গে সঙ্গে এই অলৌকিক ব্যক্কিসত্তার কাছে বাঁধা 
না পড়িয়া তাহাদের উপায় থাকে না। 

ভাব ও ভাষার দিক দিয়া শক্তিধর নবীন আচাধ্য জনসাধারণের 
সঙ্গে এক নিবিড় যোগাযোগ স্থ।'পন করেন, তাহাদের একান্ত আপনজন 
হইয়া উঠেন। 

সোমিলাচাধ্য এই নগরের এক প্রভাবুশালী ব্রাহ্গণ। সেদিন 
তাহার গৃহে এক বৃহৎ যজ্ঞের অনুষ্ঠান্‌ চলিতেছে । দেশ বিদেশের বহু, 
বেদজ্ঞ পণ্ডিত এখানে উপস্থিত। খ্যাতনাম। আচার্য ইন্দ্রভূতিও একদল 
কৃতী শিষ্যসহ এই যজ্ঞে আমন্ত্রিত হইয়া আসিয়ছেন। 

রাজপথ দিয়া দলে দলে নরনারী মহাসেন বনের দিকে চলিয়াছে। 
ইন্দ্রভূতি এক পথচারীকে ডাকিয়৷ প্রশ্ন করিলেন, “ওহে, নগরে কি কোন 
বিশেষ প্রমোদের আজ ব্যবস্থা হয়েছে? তোমর। সবাই কোথায় 
চলেছো। বলতো |” 

“সে কি আচাধ্য! আপনি কি জানেন না, মহাবীর তীর্থন্করের 
আজ শুভাগমন ঘটেছে এখানে । তাই তো! এই জনজ্রোত।” 

ইন্্রক্ূতি ভালরূপেই জানেন, এই পুববায় দেশে ব্রান্মণ্য-ধন্ম আজ 
স্তিমিত হইয়া পড়িয়াছে, আর উগ্রতর হইয়। উঠিতেছে বেদবিরোধী, 
পুরোৌহিততন্ত্ববিরোধী নান! মতবাদ | আর্ববাচীন ধন্মীমতের জন্য এ অঞ্চল 
কম কুখ্যাতি অর্জন করে নাই। 

জ্রকুঞ্চিত করিয়া পণ্তিত কহিলেন, “কে হে তোমাদের এই মহাবীর ? 
তীর্থস্কর উপাধিই বা কে দিয়েছে তাকে, শুনি? ব্যাপারট। খুলে বলতো, 
বাপু!” 

“আচার্য্য, আপনি দেখছি এ দিকৃকার কোন সংবাদই রাখেন না। 
মহাবীর হচ্ছেন নিগ্রশ্থদের নায়ক, নূতন জৈনধন্মের প্রবর্তক। কঠোর 


২৮ 


তপস্তার বলে অসামান্ত যোগৈশ্বধ্য তিনি অর্জন করেছেন, হয়েছেন 
সব্ববজ্ঞ, সর্বশক্তিমান । লোকমুখে শুনেছি, যে একবার তার মুখের ভাষণ 
শোনে, সে-ই মন্ত্রমুগ্গের মত হয়ে যায়|” 

“তাহলে তো দেখ ছি, তোমাদের মহাবীর এক এন্দ্জালিক। আপন 
সিদ্ধাইর বলে মানুষকে সে মোহিত ক'রে ফেলে । কিন্তু সে তো। জানে না, 
আচার্য্য ইন্দ্রভূতি জাজ এ নগরে উপস্থিত। অপেক্ষা কর, আজই আমি 
এই যাছুকরের যাছুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছি। সব্বসমক্ষে তাঁর উদ্ধত শির 
নত করিয়ে তবে তাকে আমি ছাড়বো” 

তখনই শিষ্যদের নিয়! ইন্দ্রভূৃতি মহাসেন উপবনে গিয়া! পৌছিলেন। 
মহাবীর তখন উদাত্ত কণ্ঠে তাহার উপদেশ দিয়া চলিয়াছেন। অন্তরের 
রান্তস্তল হইতে অনর্গল নির্গত হইতেছে সত্যোপলব্ধির এক একটি জীবস্ত 
বাণী, জার শ্রোতাদের অন্তরে চিরতরে তাহ! অঙ্কিত হউয়া! যাইতেছে । 

ইন্দ্রভূতি সভার এক কোণে গিয়! দাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই ভাবাবিষ্ট 
মহাবীর বলিয়। উঠিলেন, “আচার্য ইন্দ্রভূতি, ওখানে দীড়িয়ে কেন? 
এসো, এসো, মঞ্চের কাছে এসে বসো ।” 

ইন্্রভৃতি তো৷ মহা বিস্মিত! একি! এ তরুণ আচাধ্য কি করিয়া 
তাহার নাম জানিল! ইতিপূর্বে কোনদিন তাহাদের সাক্ষাৎ হইয়াছে 
বলিয়া তো৷ মনে পড়ে না । 

আঁচার্যের কাঁণে ঝন্‌ ঝন্‌ করিয়া বাজিতেছে মহাবীরের আহ্বান। 
বড় তীক্ষ, সুস্পষ্ট ও আত্মপ্রত্যয-ভরা তাহার কথা কয়টি। 

মঞ্চের কাছে আগাইয়া যাইতেই মহাবীর বলিয়া উঠিলেন, “আচার্য্য, 
বুদ্ধ বয়সে বৃথাই শুধু পুঁথিপত্র ঘেঁটে মরছো” অন্তরের আসল প্রাশ্থের 
উত্তর তোমার যে আজো মেলেনি। আত্মার অস্তিত্ব সম্বন্ধে তুমি এখনো 
সন্দিহান কেন বলতো ? 

বিস্ময়ের পর আবার এ এক নূতনতর বিম্ময়। ইন্দ্রভূতির অন্তরের 
অন্তস্তলে প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে যে বহু পুরাতন সংশয়, নবীন আচাধ্য আজ 
তাহাই কৌথ। হইতে টানিয়া বাহির করিয়াছে ! তাহার মত শক্তিমান 


৪ 


আচার্য্যের মনের 'ছুয়ার ভেদ করা! তো সহজ কথা নয়। বুঝিলেন, সত্যই 
মহাবীর তপস্তাঁবলে অপরিমেয় যোগৈশ্বর্ধ্য অর্জন করিয়াছেন । 

কিছুক্ষণের মধ্যেই ইন্দ্রভূতির চেতনার সব কিছু ওলট পালোট হঈয়া 
গেল। সর্ববসন্তা মথিত করিয়া! বারবার উত্থিত হইতে লাগিল অস্তরাত্মার 
বাণী--“ওরে, এই সেই প্রেরিত মহাপুরুষ, যে তোর জীবনের নিয়ন্তা, 
যে তোর মোক্ষপথের চিহ্নিত পরিচালক 1 

মাচাধ্যের সমস্ত কিছু দ্বিধা সঙ্কোচ ভয় কোথায় যেন একেবারে 
ান্তঠিভ হইরাছে। সভাস্থ অগণিত লোকের মধোঃ নিজ শিষ্যদের 
সম্মুখে, অবলীলায় তিনি মহাবীরের কাছে উপদেশপ্রার্থা হইলেন । 

করুণাঘন তীর্রক্করের পবিভ্র স্পর্শ ও তঝোপদেশ ইন্দ্রভূতির জদয়ে 
সেদিন সত্যের উপলব্ধি জাঁগাইয়। তুলিল। তাহার চরণে আত্মসমর্পণ 
করিয়া আচাধা এবার শ্রমণদীক্ষা গ্রহণ করিলেন। 

মহাবীরের প্রথম ও প্রধান শিয্, শ্রমণ সজ্বের নায়ক 'গণধর” এই 
ইন্দ্রভৃতি আচা'ধ্য। এখন হতে তীর্ঘস্করের ধর্ম্মান্বোলনের শ্রেষ্ঠ ধারক ও 
বাহকরূপে তিনি পরিচিত হইয়া উদেন। জৈনশাস্ত্র মহাবীরের যে সব 
উপদেশ ও ভাষণের উল্লেখ করিয়াছেন তাহা সাধারণতঃ এই আচার্যাকে 
উপলক্ষ করিয়াই বলা! হইত। 

ঈন্দ্রভৃতির আত্মসমর্পণের পর তাহার ভ্রাতা আচাধ্য অগ্নিভূতিও 
মহাবীরের শিশ্ত্ব গ্রহণ করেন। উভয়েরই তখন শিষ্যসংখ্য। ছিল প্রচুর, 
আগার্ধ্যদ্বয়ের সঙ্গে তাহারাও সকলে জৈনধন্খম গ্রহণ করেন। এ সময়ে 
পরপর আরে। নয়জন প্রসিদ্ধ পণ্ডিতও মহাবীরকে গুরুরপে বরণ 
করিয়া নেন। 

তগুলি বিশিষ্ট আচার্যের আগমনে মহাবীরের ধঙ্শান্দোলন আরও 

তীব্র হইয়। উঠে। চারিদিকে তাহার জয় জয়কার পড়িয়া যাঁয়। 


মধ্যমা-পাবা হইতে বিদায় নিয়া মহাবীর রাজগৃহে আসিয়া পৌছিয়া- 
ছেন। মহারাজ শ্রোণক বিশ্বিসার তখন মগধের রাজসিংহাসনে । ন্বীন 


৩৩ 


তীর্থস্কর মহাবীরের যথোপযুক্ত অভ্যর্থনায় সেদিন তিনি ত্রুটি করেন নাই। 
নহারাণী চেল্পনা ছিলেন মহাবীরের মাতল কন্যা । ধরন্দীজগতের এক 
শক্তিধর নেতারূপে মহাবীরের অভ্যুদয় দেখিয়া তাহার আনন্দের সীম 
ছিল না। এবার স্টাহাকে নিকটে পাইয়। প্রাণ ভরিয়া তিনি অভিনন্দিত 
করিলেন। রাজ অন্তঃপুর হইতে আরম্ত করিয়া রাজসভা, শ্রেীসমাজ, 
জনসাধারণ, সকলেই মহাবীরকে শ্রদ্ধাধ্য দান করিল। 

পাত্রমিত্র সহ মহারাজ শ্রেণিক সেদিন মহাবীরকে দর্শন করিতে 
আপিয়াছেন। শ্রদ্ধার্থা দানের পর প্রশ্ন, করিলেন, “ভগবান, এক 
অভিজাত ক্ষত্রিয় বংশে আপনার জন্ম । যে তরুণ বয়সে মানুষ স্বভাবতই 
ভোগন্থুখ ও আমোদ প্রমোদে দিন কাটায় সেই বয়সে আপনি গ্রহণ 
করেছেন জন্যাস, কঠোর তপস্তা ক'রে হয়েছেন জীন। একিক'রে 
সম্তপ হল? আপনি আমার কাছে এ রহস্য উদ্ঘাটন করুন।” 

স্ুম্মিত হাস্তে মহারাজ ও তান্যান্য দর্শনার্থীদের মহাবীর তাহার 
আমা জানান। তারপর প্রশান্ত কণ্ঠে বিবৃত করিতে থাকেন তাহার 
অধ্যাত্বজীবানের অভিযাত্রার কথা৷ বন্ধন যুক্তির যে ব্যাকুলতা একদিন 
তাহাকে ঘরের বাহির করে, সেই ব্যাকুলতাই আনিয়া দেয় কৃচ্ছু ও 
কঠোর তপস্তার প্রেরণা । “কেবল-্জান” ও মোক্ষ লাভের পর আজ 
তিনি ফিরিয়া আসিয়াছেন আর্ত মানবের কাছে, করাঘাত করিতেছেন 
তাহাদের দ্বারে ছ্বারে। কন্মাবন্ধন আর ছঃখবেদনার হাত হইতে চিরমুক্তির 
পথ-সন্ধান তিনি বলিয়া বেড়াইতেছেন। 

জৈনধশ্মের নিগুট উপাদেশগুলি তীহার যুখে শোনার পর মগধরাজ 
করজোড়ে কহিলেন, 

“ভগবান, আজ আমি মনে প্রাণে উপলব্ধি করছি, মানব জীবনের 
শ্রেষ্ট স্যবহার আপনি করেছেন। অধ্যাত্ব-জীবনের পরম পথ আপনি 
করেছেন অতিক্রম। শুধু আপনার এই বীরধন্ম্ী তপস্াই রক্ষা করতে 
পারবে তাদের, যারা আত্মবিশ্বাস হারিয়ে হয়ে পড়েছে ছুব্বল। সমগ্র 
মানব সমাজেয় সংত্রাতারপে আপনি পূজিত হবেন। হে মহাতাপস, 


১ 


আপনি আমার সব কিছু ক্র বিচ্যুতি আজ ক্ষমা করুন, করুণাবলে 
কাছে টেনে নিয়ে সত্য পথে আমায় স্থাপন করুন। এতক্ষণ নান৷ 
অবান্তর কথ। বলে আপনার ধ্যান-ধাবণায় বিদ্ব ঘটিয়েছি ; এজন্য আমি 
মাজ্জন! ভিক্ষা চাইছি।” 

জৈনশাস্ত্র উত্তরাধ্যায়ন বলিতেছেন, “রাজন্যবর্গের মধ্যে সিংহ সম 
যিনি বিরাজিত, সেদিন তাপস-সমাজের সিংহ-পুরুষের প্রশক্তিবাণী তিনি 
এইরূপে উচ্চারণ করিলেন। তারপর পবিত্রচেতা হইয়া রাজ্জীবুন্দ এবং 
আত্মীয় ও অমাত্যগণসহ ধর্মের শরণ গ্রহণ করিলেন ।” 

শুধু মগধের রাজ পরিবারই নয়, এ সময়ে উত্তর ভারতের বন্ছ 
ক্ষত্রিয় রাজ ও সামন্তই মহাবীরের শিষ্য, ভক্ত ব৷ অনুরাগী সমর্থক হইয়া 
উঠেন। বিদেহ রাজ্যের বৃজ্জি-লিচ্ছবীরা মহাবীরকে সোৎসাহে গ্রহণ 
করেন তাহাদের জাতির এক বরেণ্য পুরুষরূপে । তাছাড়া, চম্পা শ্রাবস্তী, 
কৌশান্বী, কাশী ও সিন্ধু সৌবীর প্রভৃতি উত্তর ভারতীর রাজোও তাহার 
শিষ্য ও অনুরাগীদের সং্য। ক্রমে বুদ্ধি পাইতে থাকে । 


সেবার মহাবীর শ্রাবস্তীতে অবস্থান করিতেছেন। প্রতিদিনই 
সন্ধ্যায় তাহার ধন্মসভার অধিবেশন বসে। অগণিত নরণারী সেখানে 
আসিয়া ভীড় জমায়, মহাপুরুষের উপদেশ ও তন্ত ব্যাখ্যা শুনিয়া সকলে 
কৃতার্থ হয়। 

মজ্ঘলীপু্র গোশালও এ সময়ে এ নগরীতে বাস করিতেছেন। 
গোশালের উচ্চাকাজ্ষার যেন আর সীম! নাই। একদল সন্্যাসীকে 
তিনি সঙ্গে জুটাইয়া নিয়াছেন আর উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করিতেছেন_-তিনি ' 
কেবল-জ্ঞানী, তীর্থস্কর। অথচ মহাবীরের সান্নিধ্য ত্যাগ করার পর 
হইতে সাধনার দিক দিয়া তিনি হইয়াছেন লক্ষাত্রষ্ট ধীরে ধীরে নামিয়া 
আসিয়াছেন নৈতিক অধঃপাতের পথে। 

সেদিনকার ভাষণে, প্রসঙ্গক্রমে মহাবীর কেবল-জ্ঞান সাধনার কথ।র 
উল্লেখ করেন । কহিতে থাকেন, “চরম ত্যাগ, বৈরাগ্য ও পবিত্রতা ছাড়া, 


৩২ 


দেহাত্মবোধের বিলয় কেউ কখনে৷ লাভ করেনি । অবশ্তঠ আজকাল 
কেউ কেউ উপযুক্ত সাধনা না ক'রেই এ জ্ঞান লাভ করেছেন বলে দাবী 
করেন। আমার প্রাক্তন শিষ্য গোশালও এমনিতর ধৃষ্টতা দেখিয়ে বেড়াচ্ছে, 
নিজেকে কেবল-জ্ঞানী ও তীর্থস্কর বলে সে ঘোষণ। করছে ।” 

সেদিনকার এই মন্তব্য গোশালের কাণে গেল। পরদিনই একদল 
শিষ্যাসহ উত্তেজিতভাবে তিনি মহাবীরের ধন্মসভায় আসিয়া উপস্থিত। 
সকলে প্রমাদ গণিল: আত্মন্তরী গোশাল আজ একটা! কাণ্ড না বাধাইয়। 
ছাড়িবে না। 

উদ্ধতকে মহাবীরকে তিনি কহিলেন, “হে কাশ্প, তুমি নাঁকি 
সবার কাছে প্রচার করছো, অ।মি তোমার শিষ্য ? যদি এ কথ! বলে থাকে৷ 
তবে তুমি এক মস্ত ভুল করেছো 1” 

শ্মিতহাস্তে মহাবীর উত্তর দিলেন, “সে কি গোশাল, তূমি কি এত 
শীগর্গরই সব কথা বিস্মৃত হয়ে গেলে? তুমি কি বলতে চাও আমার 
কাছ থেকে তুমি সাধন-নির্দেশ নাওনি ?” 

“না আযুস্মন্ এ তোমার মারাত্মক ভুল। তোমার শিষ্য গোশালের 
মৃত্যু ঘটেছে বহুদিন যাবৎ। আমি হচ্ছি এক নূতন ধর্মের, নূতন 
দার্শনিকতার প্রবর্তক। আমার প্রকৃত নাম, উদায়ী কুপ্ডিয়াষান। শুনে 
রাখো, যুগে যুগে যখনি আমার আত্মার আবরণরূগী দেহটি জরাজীর্ণ হয়ে 
ওঠে, তখনি আমি এটাকে করি পরিত্যাগ, আবার প্রবিষ্ট হই নূতন কোন 
দেহে । তবে এট। ঠিক, বর্তমানে আমি গোশালের দেহকেই আশ্রয় 
করেছি। কারণ, এই দেহ দৃঢ় এবং কর্মক্ষম ; এটাকে আমার কাজ চলার 
উপযোগী বলে আমি মনে করেছি । জান্বে, এ হচ্ছে আমার সপ্তম দেহ। 
এই দেহের খোলসে আমি আরে! ষোল বৎসর বাঁচবো । তারপর লাভ 
করবো! নিববাণ।” ূ 

বড় অদ্ভুত গোশালের এই আত্মা-সঞ্চালন ও পরকার়-প্রবেশের 
দাবী! সভামধ্যে চাপা গুগ্রনধ্বনি শোন। গেল। মহাবীর কি উত্তর 
দেন তাহ! শোনার জন্য সকলে উৎকর্ণ হইয়৷ আছেন। 


৩৩ 


তিনি কিন্তু তেমনি প্রশীন্ত,তেমনি অবিচল । শুধু একবার গোশালের 
দিকে তীক্ষ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি হানিয়া কহিলেন, “গোশাল, কেন শুধু শুধু 
এই অলীক কাহিনীর লুতাতন্ত রচনা করতে চাচ্ছে! ? কেন বৃথা এই 
আত্মগোপনের চেষ্ট৷? তুমি নিজে সব চাইতে বেশী জানো, তুমি আমারই 
শিশ্য--মঙ্খলীপুক্র গোশালক |” 

এবার গোশালের সমস্ত কিছু সংযমের বাঁধ ভাঙ্গিয়া গেল । ক্রুদ্ধন্বরে 
চীৎকার করিয়। মহাবীরের প্রতি বর্ষণ করিতে লাগিলেন অপমানকর 
নানা কটবাক্য। 

এই বাক্যুদ্ধের প্রসঙ্গে প্রাচীন জৈনশান্ত্র এক অলৌকিক শক্তি- 
সংঘাতের কাহিনী বর্ণনা করিয়াছেন __ 

প্রথম জীবনের দীর্ঘ কৃচ্ছুত্রত ও 'কঠোর সাধনার ফলে গোশাল 
কতকঞ্চলি সিদ্ধাই আয়ত্ত করিয়াছিলেন। এবার তাহারই একটি 
সিদ্ধাই--'তেজোলেশ্যা” শক্তি তিনি মহাবীরের উপর প্রয়োগ করিলেন । 
মহাবীরের যোগশক্তির কাছে সেদিন কিন্তু তাহার এই সিদ্ধাই সাধ্যকরী 
হয় নাই । নিক্ষিপ্নু “তেজোলেশ্যা' মহাবীরের দেহে প্রতিহত হ5য়া আবার 
'গরবিষ্ট ভঈল তাহারই নিজদেহে | 

সঙ্গে সঙ্গে গোশালের দেহে দেখ। দিল এক স্ত্রতীত্র জ্বালার আক্রমণ, 
এ জ্বাল বড় অসঙন্থ, বড় প্রাণাস্তকর । 

অচঞ্চলভাঁবে, অপুর্ব নিলিপ্তভাব নিয়া মহাবীর সম্মুখে দণ্ডায়মান । 
যেন কোন ছন্দ সংঘাতই এখানে আজ ঘটে নাই। 

গোশাল এবার মরীয়! হইয়া অভিশাপ দিলেন --“হে কাশ্যপ, তুমি 
ডেবোনা যে, আনার হেজোলেশ্টা-শক্তি একেবারে বিফল হয়ে যাবে। 
কোননতেই এর হাত থেকে তোমার নিস্তার নেই। আজ হতে ছয় 
মাসের ভেতর ছুঃমহ রোগে ভূগে হবে তোমার মৃত্যু 1” 

ধীর সংযত কণ্ঠে মহাবীর কহিলেন, “শোন গোশাল, আমার জন্য 
তোমার চিন্তিত হবার প্রয়োজন নেই। আমি আমার নির্ধারিত আয়ুক্কাল 
অবধিই বাঁচবো । আরো ষোল বসর আমায় এ সংসারে থাকতে হবে, 


৩৪ 


তাঁর্ধঙ্কর মহাবীর 


কিন্ত দেখতে পাচ্ছি, তোমার দিন এসেছে ঘনিয়ে। তপঃশক্তির অপচয় 
ক'রে নিজের বিনাশ তুমি তাড়াতাড়ি ডেকে আন্লে। সাতদিনের বেশী 
তোমার আয়ু নেই । মৃতু ঘটবে তোমার দাহ-জ্বরে 1” 

ঠিক সপ্তম দিনেই পথন্রষ্ট জন্যাসী গোশালকের দেহত্যাগ হয়। 
যৃত্রার পুবেবে তাহার জীবনে দেখ দিয়াছিল তীব্র অন্থুশোচনা ! এ সময়ে 
নহাবীরের কাছে তিনি ক্ষমা চাহিয়। পাঠাইয়াছিলেন। 

নহাবীরের মতবাদ এবং জৈনধন্মের পরিণতির ইতিহাস ষাহার! 
অন্তধাবন করিতে চান, গোশালের প্রসঙ্গ তাহাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ । 
নৈতিক স্থলন ও পাপাচারের যে কলঙ্ক গোশালের জীবনে দেখ। দেয়, 
মহাবীরকে তাহ। অতান্ত উদ্দিগ্ন করিয়া তোলে । শ্রমণদের জন্য এবার 
কঠোরতর বিধানের প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলন্ধি করেন । মানুষের 
পৃর্ধনিদ্দিন্ট ভাগো গোশ!ল একান্তভাবে বিশ্বাস করিতেন: তাই 
পুরুবক(রি বা বাক্তিগত প্রয়াস তাহার কাছে ছিল একেবারে নিরর্থক । 
এই মতবাদ অনেক সময় সাধককে কিরূপে নৈতিক আদর্শ হইতে বিচ্যুত 
»নেঃ সহ্তাবীর তাহা লক্ষা করিয়াছেন। তাহার জৈনধন্মে তাই এই 
শলুণ্রে নিক্ষিয় আদুষ্টবাদকে সযত্ে পরিহার করা হয়। শুধু তাহাই নয়, 
এ ধন্দ শিক্ষা দেয় -কন্মুই আমাদের সকল কিছুর নিয়ামক, তবে, পুর্ব্ব- 
উগের নঞ্চত তকে আমরু! বর্ধমানের আচাকঃ অচিরণ ও স'ধনা দ্বারা 
ক্ষত করিও। আনিতে পারি। 

নাদ্ধের মত মহাবীর নৃতন ধন্ম ব। নূতন দার্শনিকতার প্রবর্তন করেন 
নটি । তিনি গ্রহণ করেন সংস্কারক ও উল্জীবনকারীর ভূমিকা । আর 
নিজের এই কর্মপাধনার স্তরে স্তরে ঢালিয়। দেন নিজ জীবনের অলৌকিক 
শক্তির ধার! । 


উত্তরকালে ভারতের সর্বত্র সন্গ্যাসী-সঙ্ৰ প্রবন্তিত হইতে থাকে। কিন্তু এ 
ধারণ! সম্পূর্ণদপে ভ্রমাত্মক। সনাতন হন্দুধর্দে চিরদিনই সঙ্্যাসাশ্রমের জন্য 
এক মর্যাদাপূর্ণ স্থান চিহ্নিত রহিয়াছে। ক্রান্মণ্য যুগের সন্যাসীর! দীক্ষার 


৩৫ , 


ভারতের সাধক 


প্রাচীন নিগ্রন্থ ধন্্মকে তিনি দিলেন নুতনতর রূপ, নূতন করিয়া 
করিলেন তাহার প্রাণপ্রতিষ্ঠা। পার্্বনাথ-পন্থী সন্ন্যাসীরা অহিংসা, সত্য, 
অস্তেয় ও অপরিগ্রহ এই চারিটি ব্রত পালন করিতেন। তাহাদের এ 
ধম্মীকে বল৷ হইত চতুর্যাম ধর্ম। কঠোরতপা। মহাবীর এবার ইহার 
সহিত যোগ করিলেন -অপরিগ্রহ-ত্রত। তাই তাহার প্রচারিত শ্রমণধন্ম 
পরিচিত হইল পঞ্চযাম ধর্মরূপে । 

মহাবীরের প্রেরণায়, তাহার ত্যাগপুত জীবনের আদর্শে ধীরে ধীরে 
এক সুসংগঠিত জৈন সন্যাসী-সঙ্ঘ গড়িয়া উঠে। উত্তরকালে ভারতীয় 
জনজীবনে ইহার প্রভাব দূরপ্রসারী হইয়াছিল । 

অসামান্য সগঠন প্রতিভার অধিকারী মহাবীর । এই প্রতিভার বলে 
নবধন্ম্রকে তিনি শক্তিশালী ও দৃমূল করিয়া! তুলিলেন। তাহার ধর্ম ও 
সমাজের ভিত্তি হইল সর্বত্যাগী শ্রমণ ও ধন্দ্াচারী গৃহস্থ শ্রাবকের দল। 
সেদিনকার এই সংগঠন কুশলতার সহিত যুক্ত হয় মহাবীরের প্রেরণা ও 
প্রাণশক্তি। ইহার ফলেই জৈনধর্ম লাভ করিয়াছে তাহার স্থিতি ও 
প্রতিষ্ঠ।। 

জৈন ও বৌদ্বধন্্্ উভয়েই ছিল বেদবিরোধী । আর -মহাবীর ও বুদ্ধ 
উভয়েই প্রায় একই সময়ে, একই বৈপ্লবিক চেতনা নিয়া আবিভূ্ত হন। 
অথচ দেখা যাইতেছে, বৌদ্ধন্মী আজ জন্মভূমি হইতে প্রায় অস্তহিত 
হইলেও জৈনধন্্ম এখনো! সেখানে বাঁচিয়া রহিয়াছে। 

ধন্ম সম্বন্ধে মহাবীর নিজে কোন গ্রন্থ রচনা করিয়া যান নাই। 
দীর্ঘ ত্রিশ বৎসরের প্রচার-জীবনে যেসব ভাষণ ও উপদেশ তিনি দিয়। 


সময় অহিংসা, সত্য, অচৌধ্য, ব্রহ্মচর্ধ্য ও উদাধ্যের পবিত্র সঙ্কল্প গ্রহণ করিতেন। 
(কৌধায়ন, ঢা, ১০, ১৮, দ্রঃ বুহুলের-এরর অন্থবাদ-_সেক্রেড, বুকস্‌ অব 
ছ্য ইষ্ট, ভলুযু, ১৪, পৃঃ ২৭৫ )। 

জাঁকোবি হেরমান্-এর মতে, জন ও বৌদ্ধ শ্রমণ আশ্রমগুলি ব্রাহ্মণা- 
সংগঠন হইতেই প্রেরণা লাভ করিয়াছে, তাহারই আদর্শ গ্রহণ করিয়াছে। 
অধ্যাপক মাক্সমুলের, বুহুলের, কার্ণ প্রভৃতিও এই মতের সমর্থক | 


৮১] 





গিয়াছেন, অস্তরঙ্গ শিষ্যদের সহিত যে কথোপকথন হইয়াছে, তাহারই 
ভিত্তিতে উত্তরকালে গড়িয়া উঠিয়াছে তাহার ধন্দুতত্ব, দর্শন ও জীবন- 
ভাষ্য । জৈন উত্তরসূরী, শ্বেতাম্বর ও দিগন্বর* আচার্ষোরা! তাহাদের 
ধশ্-সাহিত্যের যে বিরাট দৌধ গড়িয়া গিয়াছেন, মনীযা ও বিচার- 
শক্তির দিক দিয়া আজিও তাহা বিস্ময়ের স্থষ্টি করে। অপরের মতবাদ 
খগ্ডন এবং নিজ ধর্খের প্রতিষ্ঠঠর জন্য এই আচাষ্যের! ন্যায়শান্ত্রের 
সাহায্য গ্রহণ করিয়াছিলেন। এই ন্যায়-চচ্চায় তাহ।দের অসাধারণ 
মনীব! ও সক্ষম বিচারবোধের পরিচয়ও পাওয়া গিয়াছে। 

জৈন দার্শনিকেরা কোন বিষয়বস্তূকে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণ হঈতে 
দেখেন না, ইহাকে তীহারা দেখেন সাতটি বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী হইতৈে_- 
ইহার নাম সপ্তভঙ্গী হ্যায় এই ধরণের প্রত্যেকটি বিচার ও সিদ্ধান্তের 
সঙ্গে জড়িত থাকে স্তাৎ অর্থাৎ হইতে পরে? শব্দটি । এজন্য এই ন্যায় 
ভিত্তিক দর্শনকে বল৷ হয় স্ত।দ্বাদ । অনেক দৃষ্টিকোণ হইতে তত্বের 
বিচার বিবেচনা করা হয় বলিয়া জৈনেরা! তাহাদের এ দর্শনকে বলেন 
অনেকান্তবাদ। এই অনেকান্তবাদ জৈনদের অনেকাংশে পরমতসহিষু: 
করিয়। তুলিয়াছে। 

শ্বেতান্বরদের সংগুহীত জৈন-আগম বা জৈন-সিদ্ধান্ত শাস্ব অজ, 
উপাঙ্গ, প্রকীর্ণ, ছেদস্ূত্র, মুলস্ূত্র প্রভৃতি বিভাগে বিভক্ত। ইহাদের 
% শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর এড দুই সম্প্রদায়ে জনের বিশক্ত । আঙ্গমানিক 
খুঃপুঃ এক শতকে ইহাদের বিভেদ ঘটে। ধর্মের মূল তত্ব সম্পর্কে শ্বেতান্বর ও 
দিগশ্বরেরা একমত, কিন্ত কতকগুলি আচার আচরণ ও শাস্ত্রীয় তত্ব সম্পর্কে 
তাহাদের মতভেদ রহিয়াছে । দিগন্বরের| কৃচ্ছাভাানী, একেবারে উলঙ্গ। 
পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতে এখনো অল্পসংখাক দ্িগস্বর শ্রমণ রহিয়াছেন। ইহারা 
ভিক্ষাজীবি, মুঙ্ডিতশির, পরিধানে কোন বন্ত্রাদি নাই। হস্তস্থিত একখণ্ড 
ময়ূরপুচ্ছের পাখাদ্বার৷ তাহাদিগকে নগ্ন কটিদেশ আবৃত রাখিতে দেখা! যায়। 

দিগম্বরদের মতে, সন্গ্যাসীর1 সম্পত্তির অধিকারী হইলে বা বস্ত্র পবিধান 
করিলে মোক্ষ পাইতে পারে না। স্ত্রীলোককে তাহারা মোক্ষের অধিকারিণী 
বলিয়া মনে করেন না, মোক্ষলাভের জন্য পুরুষ জন্ম অপরিহার্য । দিগম্বরগণ 


৩৭ 


প্রতিটি বিভাগে আবার কালক্রমে বুতর উপরিভাগ রচমা করা হইয়াছে । 
তাছাড়া, টীক। ভাষ্ের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয়। 
শান্ত্রগ্রন্থের মধ্যে আচারাঙ্গ, স্ত্রকৃতাঙ্গ ও উত্তরাধ্ঠায়ন হইতেই 

মহাবীরের ধন্ম ও দর্শনের বেশীর ভাগ পরিচয় মিলে । 

দিগম্বর সম্প্রদায়ের আচার্য্েরাও কতকগুলি প্রামাণিক গ্রন্থ রচনা 
করিয়। গিয়াছেন। খুষ্ট প্রথম শতকের উমাস্বাতী হইতে শুরু করিয়া 
খৃষ্ট নবম শতক অবধি জিনসেন, গুণভদ্র প্রভৃতি যে সব সিদ্ধান্তগ্রন্থ 
লিখিয়! গিয়াছেন, তাহাও জৈনশাস্ত্রের এক অতি মূল্যবান অংশ । 


আত্মার বিকাশ সাধন করিয়া মোক্ষ বা মুক্তিলাভই জৈনশান্ত্রের 
প্রধান লক্ষ্য । এই মোক্ষ সাধনের তাত্বিক ভিত্তি গড়া দরকার । তাই 
আচাধ্যেরা আত্মা কি, কি ভাবে ইহা সংসারে বারবার ভ্রমণ করে, 
কম্মবন্ধন কি করিয়া ঘটে, কি করিয়াই বা বন্ধন হইতে মুক্তি হয় প্রভৃতি 
নবতত্বের & নিপুণ আলোচনা করিয়াছেন। 

জৈনধন্্ন মূলতঃ বহুত্ববাদী, বস্তবাদী। এই ধন্্মত তানুঘায়ী জড়- 
বন্তও সনাতন। ইহার স্থপ্টি নাই, বিকাশও নাই । এই জড়ের আকার বা 
অধয়তনের হাঁস বৃদ্ধি হইতে পারে, কিন্তু ইহার ভিতরকার পরিমাণ 


ঠিকই থাকে। 


আরও বলেন, মহাবীরের দেহরক্ষার সঙ্গে সঙ্গেই জৈনশান্ত্র তিরোহিত হইয়াছে 
এবং শ্বেতাত্বরদের রচিত ধন্মশান্ত্রসমূহ প্রামাণিক নয়। মহাবীরের জন্মকাহিনী 
এবং বিবাহ সম্পর্কেও উভয় সম্প্রদায়ে মতভেদ আছে। 

শ্বেতাম্বরের! প্রাচীন আচারের কঠোরত অনেকাংশে বঙ্জন করিয়া 
চলেন। উহাদের সংখ্যা বর্তমানে বিশ লক্ষের বেশী হইবে না। পোকামাকড় 
মারিবার ভয়ে টজনেরা কখনো চাষবাস করেন না, তাই বৃত্তির দ্রিক দিয়া 
প্রধানতঃ ইহার! ব্যবসায়ী । 


* জীব, অজীব, আন্্রব, বন্ধ, পুণ্য, পাপ, সংবর, নির্জরা ও মোক্ষ এই 
নয়টি তত্বই হইতেছে জৈন দারশনিকদের বহু বিশ্লেষিত নবতত্ব। 
৬৮ 


আত্মা এবং আকাশ ভিন্ন আর সমস্ত কিছুই জড়বস্তু বা পুদ্গল 
হইতে উৎপন্ন হয়। এ বস্তু সর্বদাই সং্লেষিত ও বিশ্লেষিত হয়-- 
“পুরয়ন্তি গলস্তি ৮” তাই নাম দেওয়া হইয়াছে পুদ্গল । 

জৈনেরা বলেন, কন্মনও একটি সক্ষম জডবস্ত, সমস্ত বিশ্বস্ষ্টিতে ইত 
রহিয়াছে ওতপ্পোত। আর এদিকে জীবের স্বভাব হইতেছে গতিশীলতা 
মোক্ষের দিকে উহা সততই অগ্রসর হইতেছে । আপন চলার পথে আত্মা 
বা জীব বখন বাহ্য জগতের উপাদানের সংস্পর্শে আসে, কার্দের সুক্ষ 
জড়কণ! তখন আত্মার ভিতর অন্ুপ্রবিষ্ট হয়। আত্মা ও কর্খ-পুদগলের 
এই বন্ধনই হয় উদ্ধগতির প্রধান বাঁধা । এবাধাকে অপসারণ করিতে 
পারিলেই জীব মোক্ষ লাভ করিতে পারে। | 

ধন্মী ও অধন্কে, পাপ ও পুণ্য শব্দকে আমরা যে অর্থে ব্যবহার করি 
জৈন আচার্ষোরা তাহা! করেন নাই। তাহাদের মতে, জীবের স্মভাবগত 
যে গতি, তাহাকে চালনা করার শক্তি ধঙ্ম্নের নাই । এ গতির উহা সহায়ক 
মাত্র । মতস্যকে জলে ধাবিত হইতে দেখ। যায়, এ গতিবেগ তাহ!র নিজন্ব। 
কিন্তু জলের সহায়তা না পাইলে এ গতির প্রকাশ সম্ভব হয় না । 
অপরদিকে, জৈন মতে অধন্ম হইতেছে স্থিতির সহায়ক । 

জৈন দর্শন ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করে নাই । এ দর্শনের মতে, 
সমগ্র বিশ্ব স্থপ্টির মূল বিভাগ ছুইটি। একটিতে রহিয়াছে অসংখ্য আত্মা, 
অপরটিতে জড় উপাদান। অনাদিকাল হইতে ইহারা বর্তমান রহিয়াছে, 
পরিবর্তনও ঘটিতেছে অবিরত। কিন্ত এ পরিবর্তনের মূলে রহিয়াছে 
প্রকৃতির শক্তি। ঈশ্বরের শক্তি ব! ক্রিয়া বলিয়া এখানে কিছু নাই ।* 

সর্বশক্তিমান ঈশ্বর জগৎ স্যষ্টি করিয়াছেন --জৈনন্ূরীর! ইহ। মানেন 
না। তাহাদের মতে, যাহার তাস্তিত্ব নাই তাহা নূতন করিয়া স্থ্টি কর! 
যায় না। যাহার অস্তিত্ব আছে তাহারও বিনাশ কখনো! সম্ভব নয়। 
আসল কথা, বিশ্বস্থপ্টির মূল উপকরণসমূহ অনাদিকাল হইতেই আছে. 
. *দ্রঃ-ভিহিষ্টরী অব. ইত্ডিয়ান ফিলসফি (টজনিজম্‌ )-ডক্টর এস, এন, 


দ[সগুপ্ত ; ্টাডিজ ইন জন্‌ ফিলসফি-জেটিয় নাথমল । 
৩টি 


আর অনাদিকালের নিয়ম মত তাহাদের পরিবর্তন সাধিত হইতেছে । 
এজন্য ঈশ্বর নামক একজন অ্ঠাকে স্বীকার করার প্রয়োজন কোথায়? 
তা! ছাড়া, প্রশ্ন উঠে, এই অঙ্টার স্মপ্রিকর্ত!-কে ? উত্তরে হয়তো বল! হইবে 
তিনি স্বয়ন্তু, সনাতন। জৈনশাস্ত্র এখানে বলিবেন, একজন ত্রষ্টা যদি 
নিজে উদ্ভুত হন, অনাদিকাল হইতে যদি বর্তমান থাকিতে পারেন, যুক্তির 
দিক দিয়! স্থির জড় উপাদীনই বা! সেরূপভাবে কেন উদ্ভুত হইতে 
পারিবে না। কেন ইহা চিরবর্তমান থাকিতে পারিবে না ? 

ইীশ্বরেব্র অস্তিস্থ জৈনেরা মানেন না। কিন্তু সাধনবলে ঈশ্বরে 
আরোপিত গুণাবলী, শক্তি ও জ্ঞান অর্জন করা যায়, ইহা তাহারা বিশ্বাস 
করেম। সর্বজ্ঞ, সবর্বদশীণ চির আনন্দের অধিকারী অর্ৎদের সার্থক 
জীবন জৈন সাধকের পরম কাম্য মনে করেন। 

জৈনশাস্ত্রকারেরা ঈশ্বরবাদ যেমন অস্বীকার করিয়াছেন, তেমনি 
অবতারবাদকেও মানিয়া নেন নাই। কিন্ত মুক্তিসংগ্রামী বীর সাধকের 
প্রশত্তিতে, মোক্ষপ্রপ্ত মাঁম।নবের জয়গানে তাহার! মুখর হইয়া উঠিয়াছেন। 
ঈশ্বরপ্রেরিত পুরুষের স্থলে নিজেদের হদয়বেদীতে তাহারা বসাইয়াছেন 
ঈশ্বরপপ্রতিম মহাঁপুরুষকে * 

সাধনকামী মানুষকে জৈন আচার্যোরা এক পরম আশ্বীসের বাণী 
শুনাইয়া যীন। তাহারা বলেন, যে সব অর্ৎ ও মহাপুরুষ মুক্তি অজ্জন 
করিয়াছেন তাহারা আমাদেরই মৃত, মানুষ, জন্ম জন্মান্তরের সাধনবূলে 
অতীষ্ট তাহাদের সিদ্ধ হইয়াছে, হইয়াছে আত্মার পূর্ণ তম. রিকাঁশ। 

মনুহাবীরের জৈনধন্ম আত্মশক্তিবলে মুক্তিলাভের ধন, বীর বা জীনের 
ধন্ম। ত্যাগ তিতিক্ষা ও সাধননিষ্ঠার মধ্য দিয়া যে কোন মানুষই এই 


* পরবর্তীকালে জৈন ধর্্মাচরণে ভক্তিবাদ ও পুজা অর্চনার প্রচলন খুবই 
দেখ! গিয়াছে । “পঞ্চ পরমেষ্টির উপাসনা জনদিগের নিত্যকর্ম্ের অন্তর্গত। 
জৈনদিগের ধর্ম পিপাসা এই উপাসনা দ্বার পরিতৃপ্ত হয়। পরমেষ্টিদিগের 
স্মরণ করিয়া তাহারা চিত্তশুদ্ধি করেন এবং তাহাদের অনুসরণ করিয়া মোক্ষ 
লাভের আশা করেন। ইঈশ্বরবিহীন টজনধর্শে প্রকূতপক্ষে ভক্তির স্থান নাই। 
৪০ 


উচ্চ অবস্থা লাভ করিতে পারে । শুধু তাহাই নয়, মনুষ্জন্মই একমাত্র 
ক্ষেত্র যেখানে মোক্ষ অভিভত হইতে পারে, --আত্ম বিকাশের এ সুযোগ 
দেবতাদেরও নাই । 

মোক্ষ কি? এ প্রাশ্নের উত্তরে মহাবীরের অন্ু্গামীরা বলেন, সম্পূর্ণ 
কন্মক্ষয়ের অবস্থায়ই মোক্ষ। এই পরম অবস্থা লাভের জন্য চাই সম্যক 
দর্শন, সম্যক জ্ঞান ও অম্যক চরিত্র । জৈনশান্ত্রে এগুলিকে ত্রিরত্ব বল৷ 
হইয়াছে । সত্যের প্রতি শ্রদ্ধ ও বিশ্বাস এবং প্রকৃত তত্বের নির্ণয় হইতেছে 
সুম্যক দর্শন। জীব, অজীব, আত্মব প্রভৃতি তত্বের উপলব্ধির নাম সম্যক 
জ্ঞীন। সংযম, ত্যাগ, ইন্জ্রিয় নিগ্রহ ও শুদ্ধ আচরণের মধ্য দিয়া আত্মপ্রকাশ 
করে সম্যক চরিত্র । 

এই পুথিবীতে রূপ, রস, স্পর্শ, গন্ধ প্রভৃতির নানা প্রলোভন 
ছড়।নো রহিয়াছে, এই সংস্পর্শে জাসিয়া জীবের পক্ষে সম্যক চরিত্রলাভ 
করা স্বকঠিন। তাই জৈন সাধকের! নৈতিক ভিত্তি ও শুদ্ধ আচরণের 
উপর সব্বাধিক গুরুত্ব দিয়াছেন। আর সাধন জীবনের মূল ভিত্তিরূপে 
স্থাপন করিয়াছেন অহিংসা, সত্য, অচৌর্ধয, ত্রহ্ষচর্য্য ও অপরিগ্রহ-- এই 
পঞ্চমহা ব্রত । 


মহাবীরের সাধনায় অহিংসার স্থান সবে্বোপরি। ইহ] নেতিবাচক নয়, 
শুধু হিংসাহীনতায়ই ইহ! পর্যবসিত নয়। এই অহিংসার মূলে রহিয়াছে 
উপুলুরি ও বিশ্বাস । তাহার অনুগামীর! বিশ্বাস করেন, প্রত্যেক জীবের 
মধ্যে _আত্মা- বিরাজ করিতেছে । তাই জীবেরা পরস্পরের, সহিত 
আল্মীয়তাবোধে -যুক্ত। তাহারা! আরও মনে. করেন, প্রত্যেক আত্মার 
মুধ্যেই..এক বিরাট. সম্তাবন! বর্তমীন। গ্ুত্যেক আত্মার মধ্যে অপর 


কিন্তু মানব মনের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিবশতঃ তীর্ঘক্করদিগের প্রতি ভক্তি ও 
তাহাদের পৃজা জৈন সমাজে প্রচলিত হইয়াছে । ঠজন সম্প্রদায়ের এক অংশ 
টবফব। তাহার শ্রীকৃষ্ণের উপাসনা করেন ।” (ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস-_ 


১ম খণ্ড, শ্রীতারকচন্দ্র রায় ) 
৪৬ 


আত্মার, সমান হইবার শক্তি_রিছামান-স্রহিয়াছে। অর্থাৎ মানুষ ও 
পশু উভয়ের জীবনই সমমূল্য । অহিংসাকে তাই তাহারা শ্রেষ্ঠ ব্রতরূপে 
গ্রহণ করিয়াছেন । 

এই অহিংসাত্রতের ভিত্তি জৈন কন্মবাদের উপর প্রতিষিত। কম্ম ও 
অহিংসার পারস্পরিক নির্ভরতা সম্পর্কে জৈনধন্মের প্রসিদ্ধ গবেষক 
ডক্টর চালেটে ক্রাউসে লিখিতেছেন, “কন্ম্রের বিধান এমনই যে, যদি 
কোন জীব অপর জীবকে, তা সে যত নিকুষ্ট স্তরেরই হোক না কেন, 
আঘাত ব! ছূঃখ যন্ত্রণ। দেয়, তাহার ফলে সে নিজেরই ক্ষতি সাধন করিয়া 
বসে। তাছাড়া, আভ্যন্তরীণ যে উন্নতির স্তরে সে উঠিয়াছে সেখান 
হইতে কম-বেশী খানিকটা সে বিচ্যুতও হয়, অনিবাধ্য প্রাকৃতিক নিয়মে 
তাহার ভিতরকার সামগ্রস্য ও সাম্যভাবের উপর এক আঘাত নামিয়! 
আসে। 

“একজনের ছুঃখ কখনোই অপর একজনের প্রকৃত সুখ স্থর্টি করিতে 
পারে না। আপাত দৃষ্টিতে যাহা আমরা দেখি, তাহা! দেখি আমাদের 
নিজেদেরই দৌষে। বুঝিবার মত সুক্ষ নুভূতি আমাঁদের নাই বলিয়াই 
চিরস্তন ন্যায়বিধানের কাধ্যকারিতা আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। 
“অহিংস! পরমো ধন্মন৮ নীতিটি তাই জৈন সাধকদের দৈনন্রিন জীবনে 
এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করিয়া বসিয়াছে।” 

তাত্বিক আদর্শ ও প্রয়োগনীতি উভয় দিক হইতেই অহিংসাবাদ 
জৈনধন্মে যে স্থান পরিগ্রহ করিয়াছে, জগতের অন্য কোন ধণ্রে তাহার 
তুলন! মিলিবে না । 

এই অহিংসাবাদ ও কম্মবাদ কিন্তু কন্মের বন্ধন ব1 নিয়তির কাছে 
কখনো আত্মসমর্পণ করিতে বলে নাই। জৈন সাধকের পথ সংগ্রামশীল 
আত্মজয়ীর পথ, বীরের পথ । অগণিত প্রলোভন ও ছুস্তর বাধা ছড়ানে৷ 
রহিয়াছে সাধনার পথে, মহাবীর ও তাহার অনুগামী আচার্য্যেরা 
তাই ছঃখ দহন ও কৃচ্ছু সাধনার উপর সর্ববাপেক্ষ। বেশী জোর দিয়াছেন। 
সাধন-সমরের চরম প্রস্তুতিকে তাহার! বড় করিয়। দেখিয়াছেন। 


৪২ 


দেহাতআবোধের বিলোপ সাধন করিতে হইবে, তাই মহাবীর দেহ- 
নিগ্রহ ও কৃচ্ছের এত পক্ষপাতী । কিন্তু সাধনার পথে তিনি প্রকৃত 
গুরুত্ব দিয়াছেন কামনাঁ-বাসনা, ক্রোধ ও অভিমান ত্যাগের উপর। 

তিনি বলিয়াছেন, “কম্ধী বিনষ্ট করার পথ বড় স্ুক্ষ্প, বড় হূর্গম। 
সত্যজ্ঞান অজ্জনের আশায় অনেকে সন্যাসী হয়, ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন 
করে, নগ্নাবস্থায় বাস করে। সারা মাস ধরিয়া উপবাসীও হয়তো 
থাকে। কিন্তু কামনা বাসনার মূল উৎপাটনে তাহারা সমর্থ হয় না । 
কলে কন্মচক্র হইতে মুক্ত হওয়া দুরের কথা, তাহাতে আরো বেশী 
জড়াইয়। পড়ে। মোক্ষ ব আত্মিক মুক্তি সম্পর্কে যত বড় বড় কথাই 
তাহারা বলুক না কেন, ইহলোক বা পরলোক সম্বন্ধে সত্যকার জ্ঞান 
কি তাহার! দিতে সক্ষম? সত্যপথের দিগ২নির্দেশ শুধু তাহারাই দিতে 
পারেন, মোক্ষের জন্য ধাহার। বীর যোদ্ধার মত কোমর বাঁধিয়াছেন + 
ক্রোধ অভিমান মায়া-মোহ প্রভৃতি পদদলিত করিয়। হইয়াছেন সম্পূর্ণরূপে 
অহিংস, সব্ব ক্লেশের বিনাশ সাধন করিয়া হইয়াছেন শান্তির মূর্ধ 
্বগ্রত |” -- স্মত্র-কৃতাঙ্গ স্ত্র 


মহাবীরের ধন্মতব্, জীবনাদর্শ ও সাধনা তাহার জীবিতকালেই 
বিস্তার লাভ করে । তাছাড়া, সমকালীন অন্যান্য ধন্ম ও সমাজও তাহা দ্বার 
প্রভাবিত হয়। লক্ষ্য কর! যায়, তীহার প্রচারিত পঞ্চমহাব্রত বৌদ্ধদের 
ধন্মাচরণেও স্থান পাইয়াছে। বৌদ্ধশাস্ত্রে জৈনধন্মের পরিভাষাও কম 
ব্যবহাত হয় নাই। 

মজ ঝিম-নিকায়-এর মত প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রস্থেও আমর! এমন সব 
জৈন শ্রমণের উল্লেখ পাই ধাহারা তীর্ঘস্কর মহাবীরের অনুসরণ করিয়া 
কঠোর তপস্তায় ডুবিয়া রহিয়াছেন। স্পষ্টই বুঝা যায়, এ সময়ে শুধু 
ক্ষত্রিয়েরাই নয়, নিগ্রশ্থ সন্ন্যাসী এবং সাধারণ মানুষও দলে দলে 
মহাবীরের প্রচারিত ধর্মের শরণ নিয়াছেন। 

তখনকার দিনে বৌদ্ধেরাই ছিলেন মহাবীরের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী । 


৪৩. 


এই বৌদ্ধদেরই ধন্মশান্ত্র অ্গুত্তর-নিকায়-এ জৈন শ্রমণদের কল্যাণকর 
আদর্শ ও কর্মের সুন্দর বর্ণনা রহিয়াছে। সেখানে জৈন তাপস 
কোন এক ব্রত অনুষ্ঠানের দিনে শ্রাবক ব৷ গৃহী উপাঁসককে বলিতেছেন, 
“শত যোজন দূরে---পূর্ের্ পশ্চিমে, উত্তরে বা দক্ষিণে যেখানেই অপর 
কোন জীব অবস্থান করুক ন! কেন, তাহার প্রতি তোমার হাতের যষ্ঠি 
কখনে। করিওনা উত্তোলন । ...দেহের আচ্ছাদন বস্ত্র দূরে ফেলিয়া! দিয়া 
বল- কোথাও আমার কিছু করণীয় নাই, কোন কিছুর প্রতি মায়া বা 
আকর্ষণও আমার নাই ।” 

অহিংসা ও অপরিগ্রহের এই কল্যাণবাণীই জৈন সন্যযাসীরা এ সময়ে 
গৃহীদের মধ্যে গিয়। প্রচার করিতেন । 


প্রাচীন নিগ্রন্থ ধর্মের সংস্কীর ও উজ্জীবন করিয়াই মহাবীর ক্ষান্ত 
হন নাই। অপুর্ব বাক্তিত্ব ও সংগঠন শক্তিবলে নবধন্মকে তিনি স্থাপন 
করেন সুদৃট ভিত্তির উপর | কঠোর নিয়মের শৃঙ্খলে সন্যাসী-সঙব ভাবদ্ধ 
হয় এবং প্রধান শিষ্য "গণধর? বা দল-নেতাদের উপর পড়ে সঙ্ষের 
বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব। 

শ্রাবক ও শ্রাবিক। অর্থাৎ গৃহী উপাসক ও উপাসিকারা ছিলেন 
জৈনধন্মের বৃহৎ স্তম্ত বিশেষ । সন্ন্যাসী সজ্বের পিছনে থাকিয়। যে সমর্থন ও 
শক্তি ইহারা! জোগাইয়া গিয়াছেন তাহাই জৈনসমাজকে এতকাল দুঢ়সংবদ্ধ 
করিয়া রাখিয়াছে । 

সন্নযাসিনীদের সঙ্ঘগঠন .মহাবীরের জীবনের এক বৃহৎ কম্ম। 
এতিহাসিক ও শাস্ত্রীয় তথ্যাদি ইইতে দেখা যায়, এদিক দিয়! গোড়া 
হইতেই তিনি গৌতম বুদ্ধ অপেক্ষা অনেক বেশী উদারপন্থী ছিলেন। 

তাহার শ্রমণিকা সজ্বের নেত্রীপদে অধিষ্ঠিতা ছিলেন বিশিষ্টা শিল্ধা 
চন্দনা । এক অদ্ভূত যোগাযোগের মধ্য দিয়া মহাবীরের সহিত চন্দনার 
সাক্ষাৎ ঘটে, তারপর শুরু হয় এই সাধবী মহিলার জীবনে এক আশ্চর্য্য 
রূপান্তর । 
৪৪ 


তক ন নহাবার় 


মহাবীর তখন পরিব্রাজক ৷ সর্ধত্যাগী উলঙ্গ সন্যাসী স্বেচ্ছামত 
নানা স্থানে ঘুরিয়! বেড়াইতেছেন। সেদিন তিনি কৌশাম্ী নগরে আসিয়া 
উপস্থিত । চরম হুঃখদহন ও নিধ্যাতনের মধ্য দিয়া এ সময়ে চন্দনাও 
আজিয়া! দীড়াইয়াছেন এক সঙ্কটের মুখে । ঠিক এই ঘোর ছুর্দিনেই 
তাহার জীবনে আবিভূতি হন মহাবীর । 
_ চন্দনার ভাগ্য বিপধ্যয় ও তাহার সৌভাগ্যোদয়ের মনোহর 
আখ্যায়িক! জৈনশান্ত্র বর্ণনা করিয়াছেন ।__. 

অঙ্গদেশের এক সামন্ত রাজার কন্যা এই চন্দনা । যেমন অলোক- 
সামান্য তাহার রূপ, তেমনি অজস্র গুণের তিনি অধিকারিণী। পিতৃগৃহে 
সুখ ও এশ্বর্ষ্যের অবধি নাই। জীবনধারা বহিয়া চলিয়াছে একটান৷ 
আনন্দের ছন্দে । হঠাৎ একদিন তাহার এই সুখময় জীবনে এক ছ্দ্দ 
নামিয়া আসে । 

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাঁজরাজড়। ও সামস্তের! প্রায়ই তখনকার দিনে যুদ্ধ- 
বিগ্রহে লিপ্ত থাকিতেন। এমনই এক যুদ্ধে চন্দনার পিতা হন পরাজিত ও. 
রাজ্যচ্যুত। নানা ভাগ্য বিপর্যয় ও অবস্থান্তরের মধ্য দিয়া হৃতসর্ববস্ব 
চন্দনা একদিন আসিয়া পৌছেন কৌশান্বী নগরে। জীর্ণমলিন বেশ, 
ক্রিষ্টতনু এই ছুঃখিনী তরুণীর সহিত ধনী বণিক বৃষভসেনের হঠাৎ সাক্ষাৎ 
হয়। দয়. করিয়। নিজ গৃহে তিনি তাহাকে পরিচারিকার কাজ দেন। 
এবার হইতে দাসীবৃত্তি নিয়াই চন্দনার দিন চলিতে থাকে । 

কিন্ত ভাগ্যের বিড়ম্বন। এখানেই শেষ হয় নাই । বণিক পত্রী ছিলেন 
অতিরিক্ত সন্দেহে বাঁতিকগ্রত্তা। রূপসী তরুণী চন্দনার প্রতি তাহার 
স্বামী পাছে অনুরক্ত হইয়া! উঠেন, এজন্য তাহার শঙ্কার অবধি ছিল 
না। এই নূতন দাসী ছিল তীহার ছুই চক্ষের বিষ, তাই তাহার উপর 
সদাই চলিত তাহার অকথ্য অত্যাচার। 

এমনই সময়ে বণিক বুষভসেনের দ্বারের সম্মুখে সেদিন দর্শন দিলেন 
মহাবীর । 

নগ্ন, সর্ব্বত্যাগী সন্ন্যাসীর একি অপরূপ দিব্যকান্তি ! দৃষ্টিতে একি 


৪৫ 


ভারতের সাধক 


সব্ধবহূখজ্বালা-হর অমৃত প্রলেপ ! চন্দনার অন্তরের অন্তস্তল হইতে 
কে যেন বারবার ডাকিয়া বলিতে থাকে “ওরে, আর ভয় নেই, ছুয়ারে আজ 
এসে দীড়িয়েছেন তোর প্রভু, সব্বছূঃখ যন্ত্রণার ঘটবে আজ অবসান। 
অমৃতময় জীবনের পথে ইনিই হবেন তোর নিয়ন্তা। এর কাছেই কর্‌ 
আত্মসমর্পণ |” 

ছুটিয়া গিয়া চন্দন] কিছুটা মিষ্টি ও ফল নিয়া আসেন । মহাবীরের 
করপুটে তাহা ঢালিয়া দিয়! লুটাইয়া৷ পড়েন তাহার চরণতলে । 

চন্দনার নিবেদিত এই আহার্্য দিয়াই মহাবীর সেদিন তাহার দীর্ঘ 
উপবাসের পারণ সম্পন্ন করিয়াছিলেন । 

মহাবীরের উপদেশ ও সাধন গ্রহণ করিয়া ফে অধ্যাত্ম-সম্পদ চন্দন! 
আহরণ করেন, উত্তরকালে তাহাই এই সাধিকাকে চিহ্চিত করিয়া দেয় 
সাধবীসজ্ঘের নেত্রীরূপে । 

মহাবীরের উদার আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতায় জৈনদের মধ্যে এক 
নুসম্বদ্ধ সন্নাসিনী সম্ঘ গড়িয়া উঠে। তীর্থঙ্করদূপে যখন তিনি প্রচারে 
বহির্গত হতেন, তখন এই সন্াসিনীাদের তাহার সঙ্গে দেখা যাইত | 


শ্বাবকা বা! গৃহী উপসিকাদের মধ্যে রেবতী ও স্ুলম! প্রভৃতির নাম 
উল্লেখযোগ্য । আজিকাঁর দিনেও ধাম্মিক জৈন-গৃহস্থেরা এই মহীয়সী 
নারীদের নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে । 

সে-বার শ্রাবস্তীর ধন্মসভায় ত্রুদ্ধ গোশাল মহাবীরের উপর তাহার 
“তেজোলেধ্যা" সিদ্ধাই প্রয়োগ করে। প্রতিহত হইয়াও এ শক্তি 
মহাবীরের দেহে ছড়াইয়া দেয় এক তীব্র দহন-জ্বাল। । শিষ্েরা! ব্যস্ত 
হইয়! নানা উষধ প্রয়োগ করিতেছেন, দিনরাত পরম যত্রে সেবা শুশ্রাঘ 
চলিতেছে । কিন্ত কিছুতেই এ জাল! দূর হইতেছে ন1। 

অন্তরঙ্গ শিষ্য ও সেবকদের ডাকিয়া মহাবীর একদিন কহিলেন, 
“তোনরা এত ব্যস্ত হয়ো না। গোশীলের তেজোলেম্যা আমার সত্যকার 
কোন হানি করতে পারবে না। তবে দেহের স্বাভাবিক ভোগটাকে 


৪৬ 


চলতে দিতেই হবে। আর, আমি জানি, আমার এ জ্বালার নিবৃত্তি 
ঘটবে সেই দিন যেদিন শ্রাবস্তির শ্রেষ্ঠ সাধিকার হাতের তৈরী সুমিষ্ট খাগ্ 
আমি ভোজন করবো 1” 

শিষ্কেরা চমকিয়। উঠিলেন। কে এই ভাগ্যবতী নারী? কোথায় 
থাকেন এই শক্তিমতী সাঁধিক! ? 

সাগ্রহে সকলে কহিলেন “প্রভু, দয়া করে তার নাম বলুন। আমর 
এখনি তার কাছে ছুটে যাচ্ছি।” র 

“নাম হচ্ছে তার রেবতী । এই নগরীর জনারণ্যের ভেতর নীরবে 
সে আত্মগোপন ক'রে আছে। গুহবন্ধনে বাম করেও নিরন্তর করছে 
কন্মবন্ধন ক্ষয়ের সাধনা । সে ত্যাগ করেছে তার সবব কামন। বাসনা, 
হয়েছে পূর্ণরূপে আত্মনিবেদিতা । তোমরা রোজ যেমন তিক্ষায় বেরোও, 
সাজে তেমনি যাঁও। রেবতী বাতায়ন থেকে তোমাদের দোখেই আগ্রহভরে 
দুয়ারে ছুটে আসবে, ঢেলে দেবে তার নিজ হাতের তৈরী মিষ্টি মোরববা!। 
"-উ করবে আমার এই রোগ-জ্বালার উপশম ।” 

রেবতীর প্রদত্ত সুমি খাগ্য গ্রহণের সঙ্গে মঙ্গে মহাবীরের দেহের 
দ্বাল! সেদিন দূর হঈয়। ঘায়। টজনশাস্ত্র ও জৈন কিন্বদন্তী তাই শ্রাবিকা 
“ববতীর প্রশস্তিতে মুখর হইয়। রভিয়াছে । 


মহাবীরের নবধন্ম্ের গ্রচার ও প্রতিষ্ঠা সে লনয়ে নিতান্ত সহজে 
সম্পন্ন হয় নাই। গোড়ার দিকে মঙ্খলীপুল্র গোশালের বিরোধিতা ও 
অপপ্রচার তাহার কাজের পথে অস্ুবিধার স্গ্রি করে । তারপর 
বাধ আসে মহাবীরের নিজ জামাতা জামালীর কাছ হইতে । জামালী 
তাহার শিত্যত্ব গ্রহণ করেন, কিন্তু অল্পদিন পরেই দেখ! যায় উচ্চাকাক্ক্ষার 
বশে তিনি নিজেই এক সম্প্রদায় গঠন করিয়া বসিয়াছেন। এই সম্প্রদায় 
পরিচিত হইয়! উঠে বহুরত সম্প্রদায় নামে । উত্তরকালে কিন্তু জামালীর 
ভা্িকাংশ অনুগামীই তাহাকে তাগ করিয়া আসে, মহাবীরের আশ্রয় 

তাহারা প্রাপ্ত হয়। | 
৪৭ 


বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আচার্যেরা এ সময়ে পূর্ববভারতে নৃতন নৃতন 
মতবাদ প্রচার করিয়া বেড়াইতেছিলেন। মহাবীরকে বারবারই তাহাদের 
প্রতিদ্দ্বিতা ও সংঘর্ষের সম্মুখীন হইতে হইয়াছে। * বৌদ্ধ শাস্ত্র 
সুত্তনিপাত এই প্রসঙ্গে সপ্তয় বেলটটীপুত্ত পকুধ কাচ্চায়ন, অজিত 
কেশকম্বলী, পুরণ কাশ্যপ ইত্যাদির নাম করিয়াছেন। তাছাড়া, প্রায় 
তেরা প্রকার সম্প্রদায়ের উল্লেখও সেখানে রহিয়াছে । জৈন সাহিত্যেও 
সমকালীন বহুতর ধন্মমণ্ডলী ও উপমগ্ডলীর বর্ণন। পাওয়া যাঁয়। 

কিন্ত মহাবীরের ধশ্মের সব্বাপেক্ষা বড় প্রতিদ্ন্বীরূপে এ সময়ে 
আত্মপ্রকাশ করে বৌদ্ধধন্মী। মহাবীর নিজে কিছুটা বয়োবৃদ্ধ হইলেও 
তিনি ও বুদ্ধ ছিলেন প্রায় সমসাময়িক । উত্তর ভারতের একই অঞ্চলে 
উভয়ে ধর্ম-প্রচার করিয়া বেড়াইয়াছেন, প্রায় সমশ্রেণীর মানুষের সমর্থনও 
তাহারা পাইয়াছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই ছুই ধর্মন(চার্য্যের 
মধ্যে যোগাযোগ ও সাক্ষাৎ কখনে ঘটে নাই। 

সমকালীন এতগুলি ধন্ম আন্দোলনের প্রতিযোগিতার মধ্যে মহাবীর 
গড়িয়া তোলেন এক বিরাট ধন্দ্রসৌধ। তাহার অপরিমেয় চরিত্রবল, 
ব্যক্তিত্ব, সাংনৈশবর্্য ও সংগঠন কুশলতা এ সৌখের ভিত্তিকে দৃঢ়তর 
করিয়াতোলে। অগণিত শ্রমণ ও শ্রাবকদের মিলিত সমর্থন এই নব 
ধন্মে সঞ্চারিত করে শক্তি ও গতিবেগ |* 

কঠোর তপস্তা ও কেবল-্ঞান লাভের পর শুরু হইয়াছে মহাবীরের 
আচার্ধ্য-জীবন। দীর্ঘ ত্রিশ বৎসরের অন্রান্ত শ্রম ও নিষ্ঠায় বহু ভক্ত ও 
শিষ্যদের তিনি গড়িয়! তুলিয়াছেন । কিন্তু এখনো, এ বৃদ্ধ বয়মেও তাহার 
উৎসাহ ও কশ্মতৎপরতার যেন শেষ নাই । 

সাধনা ও সিদ্ধির শেষে লোককল্যাণের যে মহাত্রত তিনি গ্রহণ 

* জৈন ও বৌদ্ধশান্ত্র উভয়ই মহাবীরপন্থী বিশিষ্ট আাবকদের কথা উল্লেখ 
করিয়াছেন। ইহাদের মধ্যে রহিয়াছেন, বণিজ গ্রামের ধনাঢ্য নাগরিক 
'আনন্দ, বলক গ্রামের উপালী, শ্রেী মিগার (বৌদ্ধ শাস্ত্রে বঘিত বিশাখার 
শ্বশুর) মগধরাজ বিশ্বিসারের পুত্র অভয়, লিচ্ছবী সেনাপতি সিংহ ইত্যাদি । 
৪৮ 


করিয়াছেন দিনের পর দিন তাহাই এবাঁর উদ্যাপন কারয়া যাইতে চান 
অঙ্গ, মগধ, বিদেহ, কাশী, কোশল, পাঞ্চাল প্রভৃতি দেশে দিগম্বর প্রবীণ 
তাপস তাহার আদর্শ: ও বাণী প্রচার করিয়৷ ফিরেন। এই সব ধর্মীয় 
উপদেশ, সুত্র ও ভাষ্তু হইতে ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিতে থাকে জৈনশান্ত্রের 
ভিত্তি। অহিংসা মন্ত্র প্রচারের ফলে জনসমাজে জাগিয়া উঠে নৃতনতর 
চেতনা দেখা দেয় মানবধশ্মের এক নূতনতর রূপ । 

সমকালীন সাহিত্য হইতে দেখা! যায়, এই সময়ে কেশীকুমার প্রভৃতি 
প্রাচীন পার্্বনাথ-পন্থী নিগ্রন্থ শ্রমণেরাও মহাঁবীরকে তাহাদের নেতা 
বলিয়া ঘোষণ। করেন, প্রদান করেন শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি। একবাক্যে সকলে 
তাহ!কে মানিয়া নেন চতুবিবংশতিতম তীর্থস্কররূপে । 

মহাবীর শুধু তাহার আদর্শ এবং তত্বোপদেশই প্রচার করিয়া বেড়ান 
নাই, আপন জীবনে তাহার পুর্ণ রূপায়নও তিনি দেখাইয়া যান। তাহার 
তহিংসা ও মোক্ষের পরম বাণী মূর্ত হইয়া উঠে তাহার নিজের ব্যক্তিসত্তা ও 
আচার আচরণের মধ্যে । নৈতিকতার যে বাস্তব আদর্শ, ধন্দীসাধনার যে 
কার্য্যকরী পশ্থাসমূহ তিনি দেখাইয়া যান, সবগুলিই ছিল তাহার নিজ 
জীবনে পরীক্ষিত। 

সমাজের সেই অধঃপতনের যুগে, আপন জীবন সাধনার মধ্য দিয়া 
তিনি নৃতন করিয়া তুলিয়া ধরেন মানব জীবনের পরম লক্ষ্যকে” এলক্ষ্য 
হইতেছে মোক্ষ, মহামুক্তি। 

উদাত্ত কণ্ঠে আরও তিনি ঘোষণা করেন,”_ভোগস্থুখ, বিস্তবৈভব বা 
ক্ষমত। অধিকারের মধ্য দিয়া এ লক্ষ্যে উপনীত হওয়া যায় না। এজন্য 
চাই চরম ধৈর্ধ্য, নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগ_ চাই অফুরন্ত প্রেম ও করুণা । 

অগণিত সাঁধক ও মুক্তিকামী মানুষ সে যুগে তীর্ঘঙ্কর মহাবীরের এই 
আদর্শ হইতে প্রেরণ। লাভ করে। তাহার ব্যক্তি ও ত্যাগপৃত জীবনের 
সহিত সম্মিলিত হয় সেদিনকার হাজার হাজার জৈন শ্রমণ ও শ্রাবকের 
ধন্মধৃত জীবনের প্রভাব, প্রাণহীন সমাজকে ইহা মহত্বর চেতনায় উদ্ধ্ধ 


করে। 
৪ ৪৯ 


জৈনধশ্মের প্রচার ও প্রসার উত্তর ভারতে এক নৃতনতর নৈতিক 
আন্দোলন গড়িয়া তোলে, সাধারণ মানুষের ব্যক্তিজীবনে জাগাইয়া 
তোলে শুচিতা ও সংঘমের বোধ। জৈন অহিংসাবাদ সমাজ ও রাজনীতিতে 
আনিয়। দেয় উদার মানবীয় দৃষ্টিভঙ্গী । 

মহাবীরের কম্মবাদের আদর্শও কম কল্যাণকর প্রভাব বিস্তার করে 
নাই। মোক্ষলাভে প্রত্যেক মানুষেরই চিরন্তন জন্মগত অধিকার রহিয়া 
গিয়াছে। মহাবীরের কম্মবাদ এই অধিকারকে নূতন করিয়৷ স্বীকৃতি 
দেয়। ফলে সেদিনকার সামাজিক ও জাতিগত বৈষম্যের উপর পতিত 
হয় এক প্রচণ্ড আঘাত। তাহার দার্শনিক মতবাদ ঘোষণ! করে,__ 
জীবজগতের প্রতিটি হিংসাত্মবক কার্য্েরই রহিয়াছে এক দূরপ্রসারী 
প্রতিক্রিয়া । তাই তাহার ধর্ম্মের আদর্শ মানুষের হৃদয়ে এক উচ্চতর 
সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগাইয়া তোলে। 

মহাবীরের প্রচারিত ধন্ম ভারতীয় সভ্যতা, সংস্কৃতি ও শিল্পকলার 
যে উৎকর্ষ সাধন করে, যে মূল্যবান এঁতিহ রাখিয়! যায়, আজিও তাহা 
এদেশের পরম সম্পদ হইয়া আছে * 


দীর্ঘ ত্রিশ বৎসরের আচার্য-জীবন এবার ধীরে ধীরে তাহার শেষ 


অঙ্কে আসিয়া উপস্থিত। 

প্রচার পর্যটনের পথে তীর্থস্কর মহাবীর সেদিন মধ্যমা-পাবাতে 
আসিয়! পৌছিয়াছেন। তাহার ইচ্ছা, এখানেই বর্ধার” চতুন্মীস্ত যাপন 

* প্রাচীন $জনক্রীদের বিদ্যাচচ্চার উৎসাহ স্থবিদ্িত। ইহার ফলে দর্শন, 
ধর্ম, পুরাণ প্রভৃতি যেমন শত শত রচিত হইয়াছে, তেমনি দেখা দিয়াছে 
অজন্ত্র কাবা, উপন্যাস, নাটক, অভিধান, ব্যাকরণ, গণিত ও জ্যোতিষী 
বিষয়ক গ্রন্থ । মনীষী বার্থ তাহার "রিলিজিয়দ্স অব ইতিয়া? গ্রন্থে লিখিয়াছেন, 
জৈনের। ভারতের সাহিত্য ও বিজ্ঞানের আলোচনায় অপর যে কেহ অপেক্ষা 
অনেক বেশী দক্ষতা ও কর্মতৎপরত৷ দেখাইয়াছেন। বিশেষ করিয়া এদেশের 
২.০ ব্যাকরণ এবং ভাবকল্পনাময় সাহিত্য তাহাদের দানে সমৃদ্ধ 

[ছে। 


৫ 


ভাবহ্ধর মহাবার 


করিবেন। রাজ! হস্তিপালের শুক্কষশালায় পরম সমাদরে তাহার ও ভক্ত 
শিষ্যদের বাসের স্থান করিয়া দেওয়া হইল । 

নগরে মহাবীরের শুভাগমন হইয়াছে, এ সংবাদ শুনিয়া সকলের 
উৎসাহ ও আনন্দের অবধি নাই | চারিদিক হইতে দলে দলে লোক 
মধ্যমা-পাবাতে ভীড় করিতে থাকে । মহাজ্ঞানী তীর্থস্করের ভাষণ তাহারা 
শ্রবণ করে, তাহার আশীষ লাভে ধন্য হয়। 

৫২৭ খুঃ পুর্ধবাব্দের এক এঁতিহাসিক দিন ! 

রাত্রির ঘন অন্ধকার ক্রমে তরল হইয়া আসিতেছে, অরুণোদয়ের 
আর বেশী বাকী নাই। রাত্রি আর দিনের এই পরম সন্ধিক্ষণে মহাবীর 
শুরু করিলেন তাহার শেষ ভাষণ । 

অন্তরঙ্গ ভক্তের! করুণ নয়নে নিনিমেষে তাহার দিকে তাকাইয়া 
আছেন। আঁকার ইঙ্গিতে তীর্ঘঙ্কর আগেই জানাইয়া দিয়াছেন, আজই 
তাহার পরিনিবর্ধাণের পরম লগ্ন উপস্থিত। ভাষণ শেষে সাইকে জানান 
তাহার ন্রেহাশীষ, তারপর নিমজ্জিত হইয়। পড়েন মহাধ্যানে । প্রতীক্ষিত 
লগ্নে মরজীবনের উপর নামিয়া আসে চিরযবনিক1। 

জৈনশাস্ত্র কল্পন্ত্র বলিতেছেন, “সেই বর্ধার চতুর্থমাসে, সপ্তম 
পক্ষকালে, কান্তিকের কৃষ্ণা তিথির শেষ রাত্রিতে, পাবা নগরীতে রাজা 
হস্তিপালের অধিকরণ-কেন্দ্রে শ্রদ্ধেয় তাপস মহাবীরের তিরোধান ঘটিল। 
সংসার হইতে তিনি অন্তহিত হইলেন ; জন্ম জর1 ও মৃত্যুর বন্ধন চিরতরে 
হইল খণ্ডিত ; তিনি হইলেন সিদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্ত, সর্ববহুঃখাস্তকৃৎ্, মোক্ষপ্রাপ্ত ও 
সর্ধহ্ঃখের অতীত 1” -__কল্পসৃত্র, ১২৩ 

বাহাত্তর বৎসরের প্রবীণ মহাসন্নাসীর জীবনে লোককল্যাণের যে 


জন সাহিত্যের দ্বার] উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের প্রধান ভাষাগুলি উপকৃত 
হইয়াছে ।* জন স্থাপত্য ও ভাস্বর্যাও এদেশের সংস্কৃতি ও শিল্পসাধনার ক্ষেত্রে 
কম গুরুত্ব অর্জন করে নাই। উদয়গিরি, খগ্ডগিরি, মথুরার প্রত্বতাত্বিক আবিষ্কার, 
গীর্নার, শক্রপ্তয়, আবৃপাহাড় প্রভৃতি স্থানের শিল্প-নিদর্শনে ইহার গৌরবময় 
পরিচয় মিলে । 


৫১ 


ভীরতের সাধক 


ব্রত উদযাপিত হইতেছিল, আজ তাহাতে ছেদ পড়িয়া গেল। সমগ্র 
মধ্যমা-পাবাতে নামিয়া আসিল এক তীব্র শোকোচ্ছুম। 

কাশীর মল্প ও কোশলের লিচ্ছবীবংশীয় বিশিষ্ট ক্ষত্রিয় সামস্তের! 
এ সময়ে পাবাতে উপস্থিত ছিলেন। 

অগ্রণী হইয়! তাহারাই তীর্ঘস্করের শেষ কৃত্যের ভার গ্রহণ করিলেন। 
দেহ সৎকারের প্রাক্কালে তাহারা বলিয়! উঠিলেন, “ভগবানের তিরোধানের 
ফলে আজ জ্ঞানের আলোক তিরোহিত হয়েছে । ভাই সব,এসো, তার 
পরিবর্তে আমরা আজ এখানে জ্বালিয়ে রাখি আমাদের পাধ্থিব প্রদীপের 
আলো ।”. 

সমগ্র মধ্যমা-পাঁব। নগরী আলোয় আলোময় হইয়া উঠিল। 

কান্তিকী অমাবস্তার দীপালী উৎসবের মধ্য দিয়া আজিও লক্ষ লক্ষ 
জৈন ভক্ত তীর্ঘঙ্করের তিরোধানের কথ৷ স্মরণ করে_ তাহার জ্ঞানময়, 
জ্যোতিশ্ীয় জীবনের স্মৃতি জাগাইয়া তুলিতে চায়। 


হু 


জ্ঞানছেব 


মহারাষ্ট্রের ধন্মী ও সংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহকরূপে ভক্তবীর 
» জ্ঞানদেব আবিভূর্তিহন। আত্মিক সাধনার যে পবিত্র ধারা এই মহাপুরুষের 
জীবনকে কেন্দ্র করিয়! উৎসারিত হয়, সমাজের সর্বস্তরে তাহ্‌। ছড়াইয়া 
পড়ে, আনিয়া দেয় অপূর্ব উজ্জীবন। 

ত্রয়োদশ শতাব্দীর মধ্যভাগ। মারাঠার নাথপন্থী সাধনার এক বিশিষ্ট 
সংবাহকরূপে যোগী গহিনীনাথের অভ্যুদয় এ সময়ে ঘটিতে দেখা যায়। 
আবার ইহারই পাশাপাশি আত্মপ্রকীশ করে পংধরপুরের তক্তিবাদী 
সম্প্রদায়, বিঠঠলদেবের পুজা অঙ্চন ও নাম কীর্তনের মধ্য দিয়া চার! | 
মুক্তি-পথের সন্ধান খুঁজিয়া ফিরে। 

যোগপন্থা আর ভক্তিবাদ, এই ছুয়েরই মিলনবাণী একদিন বায 
উঠে মহাসাধক জ্ঞানদেবের কঠে। তাহার অলৌকিক শঙ্তি, প্রতিভা ও 
ভাবুকতার মধ্য দিয়া রূপায়িত হয় এক সমন্বয়ধন্ম্ণ সাধনা । উন্মুক্ত হয় 
জ্ঞানমিশ্রা ভক্তির ধারাস্রোত তাহার শ্রেষ্ঠ মানস অবদানরূপে সেদিন 
দেখা দেয় ধন্মসাহিত্যের অবিস্মরণীয় কীত্তি__জ্ঞানেশ্বরী, অন্ুভবামূত 
অভঙরাজী । 

জ্ঞানদেবের ভক্তিসাধনার ধারাটি বাহিয়াই মারাঠার জনজীবনে 
একের পর এক আত্মপ্রকাশ করেন নামদেব, একনাথ ও তুকারামের মত 
অসামান্য সাধকের দল। ভক্তিরসের অমৃত বর্ষণে শুধু মারাঠীরাই নয়, 
সার! দাক্ষিণাত্যবাসী তৃপ্ত হয়, ধন্য হয়। 

পৈঠণার কাছে, গোদাবরীর উত্তর তীরে অবস্থিত আপেগীও। এই 
গ্রামেরই কুলকর্ণি বা! প্রধান” হইতেছেন বিঠঠলপস্ত। গৃহের অবস্থা 


€৩ 


ভারত পাধক 


তাহার বেশ স্বচ্ছল, মানসম্ভ্রম, প্রতিপত্তিও কম নাই। কিন্তু বিঠঠলপন্তের 
মনে কোন সুখ নাই, সংসারে নাই কোন আকর্ষণ। জমিজমা টাকা- 
কড়ির অভাব কিছু নাই, বয়সও যথেষ্ট হইয়া গেল। কিন্তু "মাজ অবধি 
পুক্রমুখ দর্শন কর! তাহার ভাগ্যে আর ঘটিয়া উঠিল না। 

পত্বী রখুমাবাঈর মনেও এই একই ছুঃখ । কত সাধুসন্তের কাছে তো 
এ যাবৎ শরণ নিলেন। পংধরপুরের বিঠোবাজী এক পরম জাগ্রত বিগ্রহ, 
তাহার চরণেও কম মাথ কুটিয়! আসেন নাই। কিন্তু ভগবান আশ! 
পুরণ করিলেন কই ? 

বিঠঠলপস্ত দিন দিন বড় উদাসীন, বড় অিয়মান হইয়া পড়িতেছেন। 
কোন কাজেই আজকাল আর তাহার মন লাগে না! শুধু একান্তে বসিলে 
পত্বীর কাছে মাঝে মাঝে মনের কথা খুলিয়া! বলেন, “না গো শুধু শুধু 
ভূতের বেগার খাটা আর যেন ভাল লাগছে না। এক একবার মনে হয়, 
সব ছেড়ে-ছুড়ে দিয়ে কাশীতে চলে যাই। সন্সযাসদীক্ষা নিয়ে শেষ 
পাড়ানির কড়ি কিছু যোগাড় করি ।৮ 

রখুমাবাঈ নীরবে সব শোনেন । একথার কি উত্তরই-বা তিনি দিবেন ? 
অজানিতে শুধু বাহির হইয়া পড়ে করুণ দীর্ঘশ্বাস, চোখছুটি হঠাৎ কখন 
অশ্রুসজল হইয়া উঠে। 

কিছুদিনের মধ্যেই বিঠঠলপন্তের বৃদ্ধ পিতা দেহরক্ষা করিলেন। 
পুত্রের সংসার বিরাগ এবার হইতে আরো বাড়িয়া গেল। 


রখুমাবাঈর পিতা সিধোপস্ত ছিলেন আড়ন্দি গ্রামের কুলকর্ণি। 
অনেকদিন পর কন্যার খোঁজ নিতে সেদিন আপের্গাও”এ আসিয়াছেন। 
একথ। সেকথার পর বৃদ্ধ শ্বশুর জামাতা বাবাজী বিঠঠলপস্তকে ধরিয়া 
বসিলেন, “বাবা, আমিতো দিন দিনই হয়ে পড়ছি বুড়ো, অশক্ত! 
আর কটা দিনই বা বাঁচবে! । যা কিছু বিষয় সম্পত্তি আছে, সে তো৷ ভোগ 
করবে তোমরাই ।, এ দিকে তোমার বাবাও আমাদের মায়া কাটিয়ে 
চলে গেলেন! আমি বল্ছি কি, তোমরা ছুজনে আড়ন্দিতে আমার 


€৪ 


ভ।ল০নব 


বাড়ীতেই উঠে চলে এসো । যে কটা দিন বাঁচি, মেয়ের হাতের সেবা 
পেয়ে যাই। সে যে আমার একমাত্র সন্তান 1” 

বিঠঠলপন্ত মনে মনে ভাবিলেন, মন্দ কি? তাহার নিজের আর 
সংসারের আকর্ষণ তেমন নাই, সন্ন্যাস নিবার ইচ্ছা দিন দিন কেবলই 
বাড়িয়। চলিতেছে । শ্বশুরালয়ে থাকার প্রস্তাবটা একেবারে উড়াইয়া 
দিবার মত নয় । পত্র।কে স্থায়ীভাবে ওখানকার তত্বাবধানেই রাখা! যাইবে । 
তারপর নিজে একদিন স্ুুযোগমত বাহির হইয়া পড়িবেন অভীষ্ট সাধনের 
পথে। 

আপেগাও-এর বসবাস তুলিয়া দিয়া স্বামী-স্ত্রী একদিন আড়ন্দিতে 
উঠিয়৷ আঁসিলেন। ্‌ 

সংসারবিরাগী বিঠঠলপন্তের পক্ষে আর বেশীদিন গৃহে থাকা সম্ভব 
হয় নাই। পত্রীকে কোনমতে বুঝা ইয়া সুঝা ইয়া, তাহার কাছে অনুমতি 
নিয়া, একদিন তিনি কাশীধামে চলিয়া গেলেন। সদ্গুরুর নিকট হইতে 
নিলেন সন্যাস-দীক্ষা। 


ছুই তিন বৎসর পরের কথা । আড়ন্দির সিধোপস্তের বাড়ীতে সেদিন 
গ্রামের লোক ভাঙিয়৷ পড়িয়াছে। মহাত্মা! রামানন্দস্বামী পরিব্রাজনের 
পথে এ অঞ্চল দিয়া যাইতেছিলেন। কৃপা করিয়া এই গ্রামের কুলকণ্ণি 
সিধোপন্তের অঙ্গনে তিনি পদার্পণ করিলেন । 

চারিদিকে দর্শনার্থার ভীড়। একে একে সকলেই মহাত্মাকে প্রণাম 
নিবেদন করিতেছে । অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে রখুমাবাঈও আগাইয়া 
আসিলেন। হাতের ডালায় একরাশ ফুল-ফল । পরণে লালপাড় গরদের 
শাড়ি, সি'খিতে জ্বলজ্বল করিতেছে সি'দুরের দাগ । অপরূপ কল্যাণী মুস্তি। 
ভক্তিভরে ভূমিতে লুটাইয়! প্রণাম জানাইলেন। 

মহাত্মার নয়ন দুইটি প্রসন্নতার দীপ্তিতে উজ্জল হইয়া! উঠিয়াছে। 
আশীব্বাদ করিলেন-_“মাঈ, তুমি পুজ্রবতী হও, সৎ ও সাধু পুজ লাভ কর, 
আনন্দে থাকো ।” 


৫৫ 





রখুমাবাঈ আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। এ আশীর্বাদ আজ যেন 
কাটার মত তাহার বুকে বি'ধিতেছে। ছুই নয়ন বাহিয়া গড়া ইয়া পড়িল 
অশ্রুর ধারা কাদিতে কাঁদিতে মহাতআ্মার পদপ্রান্তে তিনি বসিয়া পড়িলেন। 
পাঁড়া-পড়শীরা করুণনেত্রে তাহার দিকে তাকাইয়া আছে । সকলেই নীরব 
বিস্ময়ে দণ্ায়মান, কাহারো মুখে একটি কথা নাই। 

একি অদ্ভুত আচরণ এই নারীর? যে আশীর্বাদ মহাত্া আজ 
তাহাকে করিয়াছেন, তাহাতে যে কেউ নিজেকে মহা ভাগ্যবতী বলিয়৷ 
মনে করিবে । কিন্তু সে এমন কাঁদিয়া আকুল কেন? 

বাড়ীর একজন আগাইয়া আসিল। কর-জৌড়ে কহিল, “মহারাজ; 
আপনি পরম দয়াল, বাকৃসিদ্ধ মহাপুরুষ, কিন্তু দুঃখের কথা! কি বলবো, 
আমাদের রখুম! বড় ছূর্ভাগিনী। স্বামী তার থেকেও নেই । আজ প্রায় 
ছ'বংসর যাবৎ সে সংসার ত্যাগ করেছে। নিয়েছে সন্যাস। তাই, 
মহারাজ, এজন্মে সম্তানলাভ আর এর ভাগ্যে নেই ।” 

স্বামীজী মহারাজ স্েহভরা কে রথুমাবাঈকে কহিলেন, “মা, তুমি 
কেঁদোনা, মনে সংশয় বা ছুশ্চিন্তাও কিছু রেখো না। আমার মুখ দিয়ে 
কথা যখন বেরিয়েছে সন্তান তোমার হবেই । শুধু তাই নয়, আমি দেখতে 
পাচ্ছি, কয়েকটি পুক্রকন্তাই তোমার হবে। সারা মারাঠ৷ দেশে তারা 
চমক লাগিয়ে দেবে । মাঃ আমার কথা কখনো মিথ্যে হয় না 1 

এবার বাড়ীর লোকদের ডাকাইয়৷ প্রশ্ন করিলেন, “আচ্ছা, তোমরা! 
আমায় বলতো, এই মাঈর স্বামীর কি নাম? কোথায় সে গিয়েছে? 
কোথায়ই বা! হয়েছে গুরুকরণ ?” 

“মহারাজ, তার নাম হচ্ছে বিঠঠলপন্ত। শুনেছি, কাশীর কোন্‌ এক 
মহাপুরুষের কাছে দীক্ষা নিয়েছে” 

“আরে, রসো, রসো। এযে দেখছি আমারই শিষ্য । আমিই তাকে 
দিয়েছি সন্ন্যাস। তারপর পাঠিয়েছি পরিব্রাজনে ।” 

রখুমাবাঈর শিরে কল্যাণহস্তটি রাখিয়া মহাত্মা কহিলেন, “মাঈ, 
আনন্দে থাকো৷। কোন ভয় নেই । আমি কথ। দিচ্ছি, তোমার স্বামী কাশীতে 


€ঙ 


ফিরে এলেই আমি তাকে দেশে পাঠিয়ে দেবো । ঈশ্বরের ইচ্ছায়, আরে 
কিছুদিন তাকে সংসারধশ্ম করতে হবে ।” 
সদলবলে পরদিন রামানন্দ স্বামীজী আড়ন্দি ত্যাগ করিলেন । 


কয়েক মাস গত হইয়াছে । বিঠঠলপস্ত একদিন কাশীতে ফিরিয়া 
আসিয়! গুরুজীর পাদবন্দন৷ করিলেন। নীরবে দ্ীড়াইয়া শুনিলেন 
আড়ন্দির ঘটনার কথা গুরুজীর প্রতিআ্খতি দানের কথা । 

মহ! পরীক্ষা আজ তাহার সম্মুখে । কাতর স্বরে কহিলেন, “বাবা, 
ত কি ক'রে সম্ভব হবে? আবার গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশ করলে, পুক্র কন্া। 
নিয়ে ঘর করলে আমি ষে ধন্মে পতিত হবো 1” 

“বেটা, তুমি কি বুঝতে পারছে না, এ সবই প্রভৃজীর ইচ্ছ।? আমার 
মুখ দিয়ে তারই ইচ্ছ। সেদিন প্রকটিত হয়েছে। আসলে আমি ছিলাম 
নিমিত্তমাত্র। কেন তুমি এতো ভাবছে? এঁশী প্রয়োজনে মানুষের গড়া 
আইন কানুন কত সময় বিপধ্যস্ত হয়ে যায়। জানতো, ব্যাসদেবকেও 
পুজ্রোৎপাদন করতে হয়েছিল। তুমি ব্যাস নও, সাধারণ জীব। তাই 
তোমায় পুক্রোৎপাদনের সঙ্গে আরে! কিছুকাল গৃহস্থীও করতে হবে। 
তুমি ঘরে ফিরে যাও। এর দায়িত্ব আমার ।” 


সজল নয়নে গুরুর কাছে বিদায় নিয়া বিঠঠলপন্ত দেশে ফিরিয়া 
আসিলেন। শ্বশুরালয় হইতে পত্বীকে নিয়! আসিয়। আবার ঘর বাঁধিলেন 
আঁপের্গাও-এ, তাহার পৈতৃক ভিটায়। 

নূতন করিয়া গড়! এই গার্হস্থ্য জীবনে পর পর তাহার তিন পুত্র ও 
এক কন্যা জন্মলাভ করে। 

ধর্্প্রাণ বিঠঠলপন্তের সব কয়টি পুক্রকন্যার জীবনই হইয়া উঠে 
আধ্যাত্মিক রসে রসায়িত। আর ইহাদের মধ্যে দ্বিতীয় পুক্র জ্ঞানদেবের 
মধ্যেই ঘটে আধ্যাত্মিকতার অসামান্য প্রকাশ। ভক্তিরসের এক অপূর্ব 
প্লাবন তিনি বহাইয়। দিয়া যান। 


€৭ 


ভর০৩র পাধ্ক 


১২৭১ খুষ্টাব্ের এক শুভলগ্নে পিতার দ্বিতীয় পুক্ররূপে জ্ঞানদেব 
ভূমিষ্ঠ হন। জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নিবৃত্তিনাথ অপেক্ষা তিনি প্রায় তিন বৎসরের 
ছোট । কনিষ্ঠ ভ্রাতা সোপান ও ভগিনী মুক্তাবাঈ-এর জন্মশ্হয় প্রায় এই 
রকম সময়েরই ব্যবধানে । 

বালককাল হইতেই জ্ঞানদেবের মধ্যে দেখা যায় বিস্ময়কর মেধা ও 
প্রতিভার বিকাশ । একবার যাহ কিছু শোনেন ব। দেখেন, আর কখনে। 
তাহা বিস্বৃত হইবার উপায় নাই। বিঠঠলপন্ত নিজে ছিলেন বিষ্ঠোৎসাহী, 
তাই জ্ঞানদেবের এই অসাধারণ ধীশক্তি দেখিয়া তাহার আনন্দের সীমা 
থাকে না। শুধু প্রতিভাধর দ্বিতীয় পুক্রেরই নয়, সব কয়টি সন্তানেরই 
শিক্ষার স্ুবন্দোবস্ত তিনি করিয়া দিলেন। 

ঘরে সাধুসম্ত ও পণ্তিতজনের আনাগোনা প্রায়ই লাগিয়া আছে। 
নিবৃত্তিনাথ ও জ্ঞানদেব উভয়েই তাহাদের সেবাযত্র করেন, উন্মুখ হইয়া 
শোনেন তাহাদের মুখের নান। ধর্মপ্রসঙ্গ | 

শ্রঘতিধর জ্ঞানদেবকে নিয়া সকলের কৌতুহলের অন্ত নাই। প্রশ্ন 
করিলেই দেখ। যায়, বালক অবলীলায় সদ্ধশ্রুত বেদপুরাণের শ্লোকরাশি 
হুবহু আবৃত্তি করিতেছে। সাধু ও পণ্ডিতদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের একটি 
কথাও সে বিস্মৃত হয় নাই। শুধু এই অসামান্য মেধা ও প্রতিভাই নয়, 
জন্মজন্মান্তরের সান্তিক সংস্কার নিয়াও সে জন্মিয়াছে। 


পুজ্রেরা বড় হইয়া উঠিতেছে। এবার তাহাদের উপনয়নের ব্যবস্থা 
করা দরকার। বিঠঠলপস্ত মহা ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। 

কিন্তু শুভ কাজে এক বাধা পড়িয়া গেল। গ্রামের একদল গোঁড়। 
পণ্ডিত বাঁকিয়া চাড়াইয়াছেন, জ্ঞানদেব ও তাহার ভ্রাতাদের উপনয়নে 
তাহারা যোগ দিবেন না। বিঠঠলপস্ত তাহাদের চোখে ধশ্মচ্যুত। কারণ, 
সন্ন্যাসধন্ম ত্যাগ করিয়া! আবার গার্স্থ্য জীবনে তিনি প্রবেশ করিয়াছেন। 
তাই এ কাজে তাহারা যোগ দিতে পারেন না। - 

স্পষ্টই বুঝা গেল, আড়ন্দি গ্রামে বসিয়া! উপনয়ন দেওয়। চলিবে না!। 


৮ 


অগত্যা জ্ঞনদেবের পিতা সপরিবারে নাসিক-এ চলিয়া! গেলেন। শাস্ত্রীয় 
অনুষ্ঠান সেখানে নিরুপদ্রবে সম্পন্ন হইয়া গেল। 

নিকটেই পুণ্যতীর্থ ত্র্ম্বকেশ্বর ও ব্রহ্মগিরি পাহাড়। বিঠঠলপত্ত 
সঙ্কল্প করিলেন _ষে কয়দিন এ অঞ্চলে থাকিবেন, ভক্তিভরে ব্রহ্মগিরির 
পরিক্রমণ হইবে তাহার নিত্যকার কন্ম। 

সেদিন গিরি-প্রদক্ষিণ করিতেছেন । সঙ্গে রহিয়াছে পুক্রকন্তা ৷ নানা! 
কারণে পথে বড় দেরী হইয়া গিয়াছে । 

এদিকে রাত্রিও প্রায় সমাগত। অরণ্যের বৃক্ষশিরে, ঝোপে-ঝাড়ে 
অন্ধকার ক্রমেই জমাট বাঁধিয়। উঠিতেছে। 

বিঠঠলপন্ত শুনিয়াছেন, এই জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে মাঝে মাঝে নাকি 
বাঘের উপদ্রব ঘটে। পথঘাট একেবারে নিজ্ন, জনমানবের চিহনও 
কোথাও এ সময়ে নাই। এক অজানা আশঙ্কায় তাহার বুক কাপিয়া 
উঠিল । ইষ্টনাম স্মরণ করিয়া পুভ্রকন্াদের কহিলেন, *শুন্ছো ! জায়গাটা 
কিন্তু তেমন স্থবিধের নয়। তোমরা জোরে পা চালিয়ে এসে” 

সবাই দ্রতপদে আগাইয়৷ চলিয়াছেন। সন্মুখেই এক প্রকাণ্ড বাক। 
জ্ঞানদেব হঠাৎ পিতার হাতটি চাপিয়া ধরেন। সভয়ে মৃছুকণ্ঠে কহেন, 
“বাবা, এ শোন। ওকি বাঘের ডাক বলে মনে হচ্ছে না ?” 

পিতা উৎকর্ণ হইয়া শুনিলেন। সত্যিই তো। এ যে স্পষ্টই বাঘের 
গোঙ্রানি। কিন্তু কোন্‌ দিক হইতে শবটা আসিতেছে তাহ তো! ঠিক 
ধর! যাইতেছে না । : 

সবাইকে সাহস দিয়া বিঠঠলপন্ত কহিলেন, “ভয় পেয়ো না। 
ভগবানের নাম নিয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে চলো 1” 

পাহাড়ের মোড়ট ঘুরিতেই এক ভয়ঙ্কর কাণ্ড ঘটিয়া৷ গেল। তুমুল 
গর্জনে বনভূমি কম্পিত করিয়া দেখ! দিল এক প্রকাণ্ড বাঘ। অনতিদূরে 
নির্জন পথে আগাইয়! চলিয়াছে একটা মহিষ, সবেমাত্র সে দলছাড়া! 
হইয়াছে। হিংশ্র বাঘ তখনি উহার উপর ঝাঁপাইয়া পড়িল। 

পুভ্রকন্াদের নিয়া বিঠঠলপত্ত প্রাণভয়ে ঢুকিয়া পড়িলেন পাশের 


৫৪ 


এক নিবিড় অরণ্যে । তারপর ঘুরপথ দিয়। নিজেদের গন্তব্য স্থলের দিকে 
ধাবিত হইলেন। 

জঙ্গলময় পার্বত্য পথের মধ্য দিয়া সকলে অনেকটা” আগাইয়৷ 
আসিয়াছেন। অনতিদূরে দেখা যাইতেছে লোকালয়ের আলে! । যাক্‌ 
তবে তাহাদের বাসস্থান আর বেশী দূরে নয়। 

হঠাৎ জ্ঞানদেবের হু'স্‌ হইল। তাইতো, তাহার দাদ! কোথায় গেল? 
দৌড়ঝঁণপের পথে নিবৃত্তিনাথকে অনেকক্ষণ দোঁখতে পান নাই । তখনি 
ব্যাকুল হইয়! পিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন। 

বিঠঠলপস্ত আর এক মহা ছুর্ভাবনায় পড়িলেন। জ্ঞোষ্ঠপুজর তবে 
কোন্‌ দিকে গেল? বাঘের মুখে সে পড়ে নাই, ভীহাদের সঙ্গেই তো! 
অনেকটা বনপথ উদ্ধশ্বাসে ছুটিয়া আসিয়াছে ! তবেকি আগে দৌড়াইয়া 
গিয়৷ ইতিমধ্যে গৃহে পৌছিল ? 

দ্রুতপদে সকলে গৃহে উপস্থিত হইলেন। কিন্তু নিবৃত্তিনাথ কই? 
সে তো প্রত্যাবর্তন করে নাই! 

সেখানে মহ! হুলস্থুল পড়িয়া গেল, খোঁজাখুজিও অনেক হইল । 
কিন্ত নিবৃত্তিনাথকে আর পাওয়া গেল না। 


জ্যেষ্ঠের বিহনে জ্ঞানদেব যেন ম্বৃতকল্প হইয়া আছেন। নিবৃত্তিনাথ 
তাহার বড় প্রিয়, একদণ্ডও তিনি তাহাকে ছাড়িয়। থাকিতে পারেন না। 
শুধু প্রিয়ই নয়, দাদাকে তিনি শ্রদ্ধাও করেন যথেষ্ট। বয়সে মাত্র 
তিন বৎসরের বড় হইলে কি হয়--ধীর গম্ভীর, পরম ধান্মিক নিবৃত্তি- 
নাথের পরামর্শ ন৷ নিয়া জ্ঞানদেব কোন কাজই করিতে পারেন না। আজ 
তাহাকে হারাইয়৷ শুন্য হৃদয় কেবলই খী-খা করিতেছে। 

প্রায় সপ্তাহখানেক পরে হঠাৎ একদিন নিবৃত্তিনাথ গৃহে ফিরিয়। 
আমিলেন। পিতা মাত। ভ্রাতা ভগ্নীদের আনন্দের অবধি রহিল না। 
কলরব তুলিয়া সকলে তাহাকে ঘিরিয়া ঈাড়াইলেন। 

এবার দাদাকে সন্সেহে জড়াইয়। ধরিয়া শুরু হইল জ্ঞানদেবের . প্রশ্ন 


৪19০৭ 


বর্ষণ__“কখন তুমি আমাদের সঙ্গ থেকে ছিটকে পড়লে ? কোথায় পেলে 
আশ্রয়? এ কয়দিন কি ক'রে কাটিয়েছে!? সব কথা আমাদের এবার 
খুলে বলো ।” 

নিবৃত্তিনাথ শাস্তস্বরে বলিয়া চলিলেন, “সেদিন ছুটতে ছুটতে 
তোমাদের সঙ্গ হারিয়ে ফেললাম। চারদিকে একেবারে ঘুরঘুট্টি অন্ধকার, 
চোখে কিছু :দেখতে:পাচ্ছিনে । সাহসে ভর ক'রে সামনের দিকে এগিয়ে 
চলেছি, হঠাৎ দূরে দেখতে পেলাম প্রদীপের আলো । এগিয়ে গিয়ে 
দেখি, পাহাড়ের এক ছুর্গম স্থানে, গুহার ভেতর আসন ক'রে বসে আছেন 
এক বৃদ্ধ যোশী। ইঙ্গিতে আমায় বিশ্রাম করতে বললেন। তারপরে 
ন্মেছভরে সামনে রাখলেন কিছু ফলমুল। শ্রান্তদেহে সেদিন আর কোন 
কথ! হয়নি, একটু পরেই আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। পরের দিন প্রত্যুষে 
প্রকাশিত হলো৷ যোগীবরের এক করুণাঘন মুত্তি। গুহার এক কোণে 
আমায় ডেকে নিয়ে গেলেন । দিলেন যোগ সাধনার দীক্ষা |” 

গৎসুক্যভরে জ্ঞীনদেব প্রশ্ন করেন,সে কি! বল! নেই, কওয়া নেই» 
হঠাৎ তোমায় তিনি দীক্ষা দিয়ে বসলেন ? তারপর, তারপর আর কি 
ঘটলো, বলো 

«সব কথ! বলতে পারছিনে, বারণ আছে। তবে এটুকু তোমাদের 
বলতে পারি যে,সেই দীক্ষাবীজ পাবার পরক্ষণ থেকেই আমার ভেতরকার 
সব কিছু যেন ওলট-পালোট হয়ে গেছে । জেগে উঠেছে এক নতুন 
জীবনের জোয়ার। তারপর মহাত্মা কৃপা ক'রে বহু নিগুঢ় সাধনক্রিয়া, 
আমায় দেখিয়ে দিয়েছেন। নিতান্ত স্বাভাবিকভাবেই সে সব আমার 
ভেতর আজ ঘটে যাচ্ছে” 

“কিন্ত দাদা, তোমার এই গুরুজীর নাম কি, তা তো! বললে না!” 

“যোগী গহিনীনাথ ।” 

পিতা বিঠঠলপন্ত বিস্ময়ে ও আনন্দে অভিভূত হইয়। গিয়াছেন। 
এবার ধীর স্বরে কহিলেন, “বাবাঃ তুমি মহা! ভাগ্যবান, তুমি ধন্য । আর 
ধন্য তোমার কুল। গহিনীনাথজী এক মহাশক্তিধর যোগী । তীর ছর্লভ 


৬৯ 


ভারতের পাধক 


কুপা তুমি পেয়েছে। ৷ আশীর্বাদ করি, তুমি এই গুরুকৃপাঁর উপযুক্ত হও” 

“বাবা, শুনে সুখী হবে, গুরু মহারাজ জ্ঞানদেবের ওপরও কৃপাদৃষ্ট 
রেখেছেন । বলেছেন” তাকে দিয়ে মানবের অশেষ কল্যাণ সাধিত 
হবে, তার দিকে দৃষ্টি রেখো, তার দীক্ষার ভার রইলো তোমার ওপর, 
উপযুক্ত সময় এলে নিজেই তুমি পাবে নির্দেশ ।” 

পিতা বিঠঠলপন্তের চোখে মুখে তখন ছড়াইয়! পড়িয়াছে তৃপ্তি ও 
গৌরবের হাসি। অধ্যাত্মজীবনের যে পরম সার্থকতা খুঁজিতে গিয়া 
নিজে সেদিন ব্যর্থমনোরথ হইয়াছেন, এঁশী কৃপ। আজ তাহাই পৌছাইয়া 
দিতেছে তাহার দ্বারে, তাহারই আত্মজদের জীবনে । মনে পড়িল তাহার 
গুরুজী রামানন্দ স্বামীর পূর্বেকার সেই উক্তি, সেই ভবিষ্যদ্বাণী_- 
তাহার পুক্রকন্যাদের অধ্যাত্জীবনের আলে! সার! মহারাষ্ট্রে একদিন 
চমক লাগাইয়া দিবে। কৃপালু গুরুজীর উদ্দেশে শ্রদ্ধাভরে তিনি মস্তক 
অবনত করিলেন ।” 

জ্জানদেবের পিত। অতঃপর আর বেশী দিন জীবিত থাকেন নাই। 
শান্ত চিত্তে গ্রীভগবানের নাম করিতে করিতে এক পুণ্য লগ্নে তিনি 


লোকাস্তরে চলিয়। গেলেন । 


পিতার তিরোধানের কিছুদিন পরে, এক শুভ লগ্ন দেখিয়া নিবৃত্তিনাথ 
জ্ঞানদেবকে দীক্ষা দান করেন। মতস্যেন্দ্রনাথ ও গোরক্ষনাথের নিগৃঢ় 
সাধনার বীজ যোগী গহিনীনাথের অধ্য।আ্বজীবনে একদিন রূপায়িত হইয়। 
উঠিয়াছিল। নিবৃত্তিনাথের মাধ্যমে তাহাই আজ রোৌপিত হইল জ্ঞীনদেবের 
মধ্যে। সঙ্গে সঙ্গে এই কিশোর সাধকের জীবনে উদ্গত হইতে লাগিল 
পূর্ধবজন্মের সাস্তিক সংস্কাররাশি। সাধনা ও সিদ্ধির স্তরগুলি দিনের পর 
দিন অবলীলায় তিনি অতিক্রম করিয়। যাইতে লাগিলেন। 

সাধক নিবৃত্িনাথ ও জ্ৰানদেবকে এবার কঠোর পরীক্ষার সম্মুখীন 
হইতে হয়। গ্রামের রক্ষণনীল ব্রাহ্মণের! আগে হইতেই ক্রুদ্ধ হইয়া 
আছেন। এবার তাহারা ষড়যন্ত্র পাকাইয়। বসেন, শুরু হয় নান! সামাজিক 


৬ 


নির্যযাতন। বিঠঠলপন্ভের পুক্রদের তাহারা সহজে ছাড়িবেন না। 

মাত৷ রথুমাবাঈর অন্তরে একটুও শান্তি নাই । ছুষ্টদের এইসব সামাজিক 
উৎগীড়ন আর কত কাল সহা করিতে হইবে কে জানে ? সব চাইতে 
বড় প্রশ্ন, কন্তা। যুক্তাবাঈর বিবাহ। সমাজে একঘরে হইয়। থাকিলে ষে 
তাহার বিবাহ দেওয়াই আর ঘটিয়৷ উঠিবে না। 

মায়ের দীর্ঘশ্বাস ও চোখের জল আর সহা কর! যায় না । জ্ঞানদেব 
সেদিন আশ্বাস দিলেন, “মা, তুমি এমন ক'রে ভেঙে পড়ে! না। গায়ের 
দুষ্টদের যাতে দমন হয়, সে ব্যবস্থাই এবার করছি ।” 

“সে কি বাবা, ওদের ঘটিয়েআবার কোন্‌ নতুন বিপদ তোরা ডেকে 
আনতে যাচ্ছিস্‌ ?” 

“তুমি ভেবোনা। দাদা আর আমি ছুজনায় মিলে এবার পৈঠণায় 
যাচ্ছি। সেখানে রয়েছেন হেমাড়পন্ত আর বোপদেবের মত দিকৃপাঁল 
পণ্তিত। আমরা তদের বোঝাতে পারবো, বাঁব। তার গুরুর আঁদেশ 
পালন ক'রে এমন কিছু নীচ কাজ করেন নি যেজন্য সমাজ আমাদের 
নির্যাতন করবে। বড় পণ্ডিতদের পাতি আমর। নিয়ে আস্ছি।” 

ছুই ভ্রাতা পৈঠণায় গিয়া প্রধান পণ্ডিতদের দ্বারস্থ হইলেন। অপূর্ব্ব 
প্রতিভাধর এই ছুই তরুণ। যেমন গভীর ইহাদের শান্ত্রত্ঞান, তেমনি 
আবার সাধনার দিক দিয়াও অধিষ্ঠিত রহিয়াছে অতি উচ্চ স্তরে। 
স্থৃতিশাস্ত্রের প্রবীণ ও প্রসিদ্ধ পণ্ডিতের! প্রাথিত পাঁতি দিয় দিলেন। 
অতঃপর আভড়ন্দি গ্রামের ব্রাহ্মণের! জ্ঞানদেবের পরিবারকে আর ঘাটাইতে 
সাহস করেন নাই। 

জননী রখুমাবাঈ আর বেশী দিন ইহলোকে অবস্থান করেন নাই । 
পুক্রকন্যাদের শিরে একদিন কল্যাণহস্তটি বুলাইয়া' সাধবী নারী তাহার 
শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিলেন । 


সে-বার পৈঠণ! হইতে জ্ঞানদেব সবাইকে নিয়া গ্রামে ফিরিতেছেন। 
পথে নেভাসে নামক স্থানে তাহার] বিশ্রাম করার জন্য থামিলেন। স্থির 


৬৩ 


ভারতের লাধক 


করিলেন, আজ রাত্রিটা এখানেই কোথাও কাটানো যাকৃ। তারপর কাল 
ভোর বেলায় আবার যাত্র। শুরু করা যাইবে। 

পথের পাশেই দগ্ডায়মান এক ক্ষুদ্র মঠ। ভ্রাতা ও ভগ্লীদের নিয়া 
জ্ঞানদেব সেখানেই আশ্রয় গ্রহণ করিলেন । 

এই মঠের মোহান্ত হইতেছেন প্রবীণ পণ্ডিত ও সাধক সচ্চিদানন্দ- 
বাবা । এক ছঃসাধ্য প্রাণাস্তকর রোগে তিনি তখন ভুগিতেছেন। ভক্ত ও 
সেবকের। নানা চিকিৎসাই করাইয়াছেন কিন্তু কোন কিছুতেই ফল হয় 
নাই। রোগী এ সময়ে এক সঙ্কটের মুখে আসিয়। দীড়াইয়াছে। 

কক্ষের একপ্রান্তে মুমুরূণ বৃদ্ধ সীধক শায়িত। অক্ষিতারকা ছুটি স্থির, 
ক দিয়। কোন স্বর নির্গত হইতেছে না। অসহায়ভাবে শয্যার পাশে 
াড়াইয়া সেবকেরা অস্তিম মুতূর্তটির জন্য অপেক্ষা করিতেছেন। এ দৃশ্য 
দেখিয়া হঠাৎ জ্ঞানদেবের প্রাণ কীদিয়া উঠিল। ছুটিয়া। গিয়া তিনি 
রোগীর শিয়রে দীড়াইলেন। 

কিছুক্ষণ তাহার মস্তকটি স্পর্শ করিয়া থাকার পর জ্ঞীনদেব অস্ফুট 
স্বরে শুরু করিলেন মন্ত্রপাঠ। রোগীর সঙ্কট সে রাত্রিতে কাটিয়া গেল। 
পরদিন সকলে সবিষ্ময়ে দেখিলেন সচ্চিদানন্দ-বাবা! সুস্থ হইয়া 
উঠিয়াছেন, রোগের কোন চিহ্ই তাহার দেহে আর নাই। 


নিবৃত্তিনাথ বুঝিলেন, এবার হইতে তাহাকে সতর্ক হইতে হইবে। 
যোগসাধনার ফলে শিষ্য জ্ঞানদেবের জীবনে ধীরে ধীরে ঘটিতেছে শক্তির 
বিকাশ। কিন্তু এ শক্তি তো এভাবে ক্ষয় করার জন্য নয় ! 

নারালায় তাহাকে ডাকিয়া কহিলেন, “তোমার ভেতর শক্তির স্ফুরণ 
দেখা যাচ্ছে। কিন্ত ভাই, যোগী গহিনীনাথের সাধনার এই্বর্য্যকে কি 
এমনি ভাবেই তুমি অপচয় করতে থাকবে ?” 

জ্ঞানদেব সবিনয়ে উত্তর দিলেন, *আর্তের সেবায়, মানবের কল্যাণে 
তা হলে কি এগিয়ে আসা যাবে না ?” 

“ছু'দশটা৷ রোগীর রোগ সারিয়ে, প্রাণ ভিক্ষ। দিয়ে মানুষের কল্যাণ 


৩৪ 


আ্ঞালজ্লেন্ব 


করবে তুমি ? একি ভ্রান্ত বুদ্ধি! লোকমঙ্গলের জন্য চাই ঈশ্বরের আদেশ, 
চাই আদিষ্ট পস্থা ৷ তোমার জন্য আগে থেকেই তা দেওয়া রয়েছে । আর 
শোন। যে শক্তি তোমার মধ্যে আজ অমিতবেগে স্ুরিত হয়ে উঠছে, 
তাকে নিয়োজিত কর ব্যাপকতর ঈশ্বর নির্দিষ্ট কর্মে। তোমার স্পর্শে, 
তোমার বাণীতে জেগে উঠুক হাজার হাজার মুক্তিকামী সাধক, লাভ করুক 
অমবতের আস্বাদ। তাছাড়া, আমার ইচ্ছে, একটা বিশেষ কাজের দায়িত্ব 
তুমি গ্রহণ কর, ভক্তিরসে রসায়িত ক'রে রচনা কর ভগবদ্গীতার এক 
প্রাণবস্ত ভাষ্য । মহারাষ্ট্রের জীবনের স্তরে স্তরে ছড়িয়ে দাও সর্ধবজনের 
প্রাণমনগলানে। এই অধ্যাত্মসাহিত্য । জ্ঞানদেব ! ঈশ্বরদত্ত মহাপ্রতিভা 
তোমাতে রয়েছে, তার উপর পেয়েছ সদ্গুর-পরম্পরার সাধনার বীজ। 
আশীর্বাদ করি, একাজে তুমি সফল হবে, অগণিত লোক তোমা দ্বারা 
উপকৃত হবে | 

গুরু নিবৃত্তিনাথের এ আদেশ জ্ঞীনদেব তখনি শিরোধার্য্য করিলেন । 
ঘোষণা করিলেন তাহার নৃতন দায়িত্বভারের কথা । 


নেভাসে-গ্রামে থাক। কালেই জ্ঞীনদেবের মধ্যে দেখা দিল রচন। 
শক্তির এক অলৌকিক প্রকাশ । অন্তরের অস্তস্তল হইতে কে যেন 
কেবলি ঠেলিয়া দিতেছে রাশি রাশি অধ্যাআ-সাহিত্যের উপকরণ । 
রে ভাষ্য, উপম। তাত্বিক বর্ণন। ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের ধার! বন্যার মত 
হু- করিয়া এবার ছুটিয়া আসিতেছে। 
নৃতন পরিকল্পনা ও কর্মপ্রয়াসের কথা সচ্চিদানন্দবাবার কাণেও 
পৌছিয়াছে। জ্ঞানদেবের কাছে তিনি নিবেদন করিলেন, “বাবা, নিজগুণে 
তুমি আমার জীবন রক্ষা করেছ। এর প্রতিদানে দেবার আমার কিছুই 
নেই। তবে আমার একাস্ত ইচ্ছে, জ্ঞানেশ্বরী” রচনার পবিত্র কাজে 
আমার এ ক্ষুদ্র শক্তি নিয়ে কিছু সেবা করতে দাও। তুমি এই মহাভাত্তয 
মুখে বলে যাবে, আর আমি করবে! তার শ্রুতিলিখন ।” 
সোৎসাহে জ্ঞানদেব এ প্রস্তাব অনুমোদন করিলেন। 


৬৫ 


নেভাসেতে থাকিয়াই ১২৯০ খৃষ্টাব্দে জ্ঞানদেব তাহার এই মহাগ্রন্থ 
সমাপ্ত করেন। মনীষী, সাধনপরায়ণ রচয়িতার বয়স তখন মাত্র উনিশ 
বংসর। এই গৌরবময় রচনার মধ্য দিয়া সারা মারাঠায় তিনি 
প্রাতঃস্মরণীয় হইয়া উঠেন। 

ইহার পর গুরু নিবৃত্তিনাথের আদেশে জ্ঞানদেব সমাপ্ত করেন তাহার 
অবিস্মরণীয় গ্রন্থ 'অমুতানুভব* পর পর রচন! করেন বহুতর ভক্তিরসসমুদ্ধ 
অভঙপদ। 


'জ্ঞানেশ্বরী' তাহার এমন এক মহান রচনা যাহা, শুধু ভারতেরই 
নয়, বিশ্বের অধ্যাত্মসাহিত্যেও চিরঞ্জীব হইয়া থাকিবে । ভগবদ্গীতার 
তত্ব আশ্রয় করিয়া এই তাস্থগ্রস্থ রচিত, তাই জ্ঞানমিশ্রা ভক্তিই ইহার 
প্রধান উপজীব্য। বিরল দার্শনিকতা, নিপুণ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, মনোরম 
উপমা এবং ভাব ও ভাষার অতুলনীয় বৈচিত্র্য 'জ্ঞানেশ্বরী? সমৃদ্ধ । অদৈত- 
জ্ঞানের সহিত ভক্তিবাদের অপরূপ সমন্বয় ইহাতে সাধিত হইয়াছে । 

“অমৃতানুভব' জ্ঞানদেবের এক মৌলিক দার্শনিক গ্রন্থ । শিবসুত্রের 
প্রতিপাদিত দার্শনিকতাই হইতেছে ইহার ভিত্তি। জ্ঞানদেৰের উপর 
নাথযোগীদের সাধনা কতট। প্রভাব ৰিিস্তার করিয়াছিল তাহ! তাহার এই 
রচনা হইতে অনুমান করা যায়। 

অভও. ব৷ ভক্তিরসাশ্রিত মনোরম পদাবলীর মধ্য দিয়াই উত্তরকালে 
ফুটিয়া উঠে তাহার সাধন! এবং ভক্তিবাদের পরিণত ও রসময় রূপ । 
জ্বানদেবের জীবন, আঁধনতত্ব ও অধ্যাত্মসাহিত্যের গবেষকগণ এই 
অভঙ-এর মধ্যেই তাহার ব্যক্তিসত্তা ও অন্তজ্জীবিনের 'সত্যকার রূপ 
দেখিতে পাইয়াছেন। , 

শ্রী আর, ডি, রাণাডে লিখিতেছেন। «এই অভঙত্পদে জ্ঞানদেবের 
হৃদয়-বাণী স্কুরিত হইতে দেখা যায়। তাহার ভক্তিরসাশ্রিত আবেগধন্মিতা 
ইহাতে রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে, আর '্ানেশ্বরী' ধরিয়াছে তাহার 
মননধন্মী জীবনের রূপ। তাই দেখি, 'জ্ঞানেশ্বরী” অপেক্ষা অভঙ.. 


৬৬ 


জ্ঞালদেব 


পদগুলির মাধ্যমেই জ্ঞানদেবের হৃদয় অধিকতররূপে উদঘাটিত হয়, 
তাহার অন্তরের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং বহির্জগৎ সম্পক্িত প্রতিক্রিয়াও 
ইহাতে অনেক বেশী প্রতিফলিত হুইয়। উঠে।” 


সদ। প্রশান্ত, অন্তন্ম্খীন, নিবৃত্বিনাথ এবার ধীরে ধীরে নিমজ্জিত 
হইতে থাকেন যোগসাধনার গভীরতর স্তরে । সাধারণ মানুষের সহিত 
চলাফের! করা ও যোগাযোগ রাখ! অতঃপর আর বেশী দিন তাহার পক্ষে 
সম্ভবপর হয় নাই। 

অপর দিকে শিগ্ঠ জ্ঞানদেবের উপর পতিত হয় জীবহিতৈষণার গুরু 
দায়িত্রভার। তাই এবার হইতে জনজীৰনের পুরোভাগে আসিয়! তিনি 
াড়ান__জীবন সাধনা, সিদ্ধি ও অধ্যাত্মরচনার মধ্য দিয়! ঈশ্বরমুখীন 
মানুষের সম্মুখে আনিয়া দেন নিগৃ সাধনার সঙ্কেত, তুলিয়া ধরেন 
জাঁলোক বন্তিকা। তাহার অভঙ. পদাবলী ও কীর্তনের মধ্য দিয়া 
জনগণের হদয়ে ভক্তিরসের প্রবাহ ছড়াইয়া পড়ে । 

জ্ঞানদেবের সাধনা ও অধ্যাত্ব-সাহিত্যের স্বরূপ বুঝিতে হইলে 
মহারাষ্ট্রের এঁতিহা, তাহার সমকালীন পরিবেশ ও ধন্ম আন্দোলনের 
গতি প্রকৃতি অনুধাবন করা গ্রয়োজন। 

প্রাচীন তামিল জাড়বারদের ভক্তি-সাধনার ঢেউ বারবার মারাঠা- 
দেশের বুকে আসিয়া লাগিয়াছে। তারপর উত্তরভভারতের নাথঘোগীদের 
সাধনার প্রভাৰও এখানে কম বিস্তারিত হয় নাই। 

একাদশ শতকের মধ্যভাগে এই অঞ্চলে আবিভূর্তি হন মারাঠী 
সাধক ও অধ্যাত্মসাহিত্যের নিপুণ ভাষ্যকার মুকুন্দরাজ। তাহার রচিত 
গ্রন্থ পপরমামৃত' ও “বিবেকসিন্ু' সেদিনকার সমাজের সম্মুখে অধ্যাত্ব- 
জীৰনের নৃতন আদর্শ তুলিয়া ধরে । পরবস্তা যুগে মারাঠী ভাষার মহান্ুভব 
প্রস্থগুলিও আত্মিক জীবন সম্পর্কে প্রবল গস্থক্য জাগ্রত করিয়াছে। 
এই এঁতিহ্যের ধারা বাহিয়াই ত্রয়োদশ শতকে মহাভক্ত জ্ঞানদেবের 


'আবি9াষ ঘটে । 


৬৭ 


ভারতের সাধক 


জ্ঞানদেবের সময় তাহার জন্মভূমি ছিল স্বাধীন। রাজ। রামদেব 
রাও তখন প্রবল প্রতাপে মহারাষ্ট্রের দেবগিরিতে রাজত্ব করিতেছেন । 
আলাউদ্দীন খিলিজির দেবগিরি আক্রমণের আগে পর্য্যন্ত, তাহার এই 
প্রতাপ কখনো ক্ষুপ্ন হয় নাই। 

সৎ ও ধন্মপ্রাণ নরপতি বলিয়া! রামদেবরাওএর খ্যাতি ছিল, 
পংধরপুরের বিখ্যাত ধর্মসম্প্রদায় তাহার পৃষ্ঠপোষকতা প্রাপ্ত হইত। 
দেশের সর্বত্র তখন সুখ সমৃদ্ধি বিরাজিত, রাজ্যশাসনের উদার নীতিও 
ছিল ধন্দীজীবনের অনুকূল। রাষ্ট্র ও সমাজের এই পরিবেশে জ্ঞানদেব 
আত্মপ্রকাশ করেন। 

জ্ঞানদেবের সাধনজীবনে শক্তি, ভক্তি ও জ্ঞান এই ত্রিধারার মিলন 
দেখা গিয়াছিল। এই বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করিতে গিয়া “মিষ্টিসিজম্-ইন্‌ 
মহারাষ্ট্র গ্রন্থে শ্রীরাণাডে লিখিয়াছেন”_ 

“মহারাষ্ট্রের ভক্তি আন্দোলনের প্রকৃত প্রবর্তকরপে জ্ঞানদেব 
আবিভূর্তি হন। অনুমিত হয় যে, তাহার পিতার গুরু ছিলেন বারাণসীর 
ক্রীপাদ রামানন্দ ; হয়তো তিনিই হইবেন আসল বৈষ্ণবগুরু রামানন্দ । 
যদি তাহাই হয়, তবে দেখা যায় যে, রামানন্দের উৎস হইতে শুধু 
কবীর ও তুলসীদাসের আধ্যাত্মিক ধারাই উৎসারিত হয় নাই, মারাঠী 
ভক্তি-সাধকদের উদ্ভবও সেখান হইতে ঘটিয়াছে। আর যাহাই হোক্‌, 
ইহ! নিশ্চিত যে, নিবৃত্তিনাথ ও জ্ঞানদেব মহাযষোগী গহিনীনাথের সাধন- 
ধারা হইতেই আসিয়াছেন। তাহাদের নিজেদের রচনা হইতেই এ তথ্য 
গ্রমাঁণত হয়। 

“একথা বোধহয় নৃতন করিয়া! না বলিলেও চলে যে, নিবৃত্তিনাথ 
যোগী গহিনীনাথের নিকট হইতে সাধনপ্রাপ্ত হন, আর গহিনীনাথ তাহার 
অধ্যাত্বসম্পদ লাভ করেন গোরক্ষনাথ হইতে__ আর এই গোরক্ষনাথজীর 
গুরু ছিলেন মংস্তেন্্রনাথ। এই সাধকের সবাই ছিলেন নাথযোগী 
সম্প্রদায়ের অন্তভূক্তি। কখন এবং কিভাবে মংস্তেন্দ্রনাথ এবং গোরক্ষনাথ 
আবির্ভূত হইয়াছেন, কি ভাবে জীবন যাঁপন কাঁরিয়াছেন আজ আর 


৬৮ 


জ্ঞানদেব 


তাহ! সঠিকভাবে নির্ণয় করার উপায় নাই। কিস্তু একথ। স্পষ্টরূপেই 
বুঝ। যায় ষে, তাহাদের নাম অনৈতিহাঁসিক নয়। অবশ্য মহস্যেন্্রনাথের 
পূর্ববর্তী কালের কথা জানিতে হইলে পৌরাণিক কাহিনীর সাহায্য 
না নিয়! উপায় নাই। কিন্তু মতস্তেন্্নাথের পরবর্তী যুগের ইতিহাস 
রহিয়াছে। আর ইহাও প্রমাণিত হইয়াছে যে, জ্ঞানেশ্বর সেই নাথ- 
সম্প্রদায়েরই অন্তভূ্ত ধাহারা তামিল দেশের আড়বার এবং লিঙ্গায়েৎ 
সম্প্রদায়ের সিদ্ধদের মত মহারাষ্ট্রে ভক্তি আন্দোলনের এক নৃতনতর 
' ভিত্তি স্থাপন করিয়াছেন, আর তাহাদের আরন্ধ এই মহাঁন্‌ কম সম্পন্ন 
হইয়াছে জ্ঞানদেবেরই মাধ্যমে । এই কারণেই পরবস্তীকালের মারাঠী 
ভক্তি-সাধকদের অনেকে বলিয়াছেন _ভক্তি-ধন্মের যে ভিত্তি জ্গানদেব 
রচন। করেন, তাহার উপর দেউল নিম্মীণ করেন নামদেব ও অন্যান্য ভক্ত 
সাধ্কেরা, আর উত্তরকালে স্বনামধন্য তুকারাম আবিভূর্তি হন এই 
দেবদেউলের নয়নমনোহর চূড়ারূপে ॥” 

নিজের সমস্ত কিছু সাধন ও সিদ্ধির গৌরব সাধক জ্ঞানদেব অর্গণ 
করিয়াছেন তাহার গুরুদেৰের চরণতলে | জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা নিবৃত্তিনাথকে তিনি 
বরণ করিয়াছেন গুরুরূপে, আর এই গুরুই হইয়াছেন তাহার কাণ্ারী, 
পৌছাইয়। দিয়াছেন তাহাকে তরঙ্গ-ক্ষুধ সাঁধন-সাঁগরের পরপারে । 
জ্ঞানদেবের বনু রচনায় এই গুরুপ্রশস্তি উচ্ছল হইয়! উঠিয়াছে। 

তিনি বলিতেছেন “আমার প্রত, নিবৃত্তিনাথ এমনিতেই পরম কৃপালগুং 
তন্রপরি নিজের অধ্যাত্মজীবনের আলোক-দিশারীদের কাজ থেকে তিনি 
নিয়েছেন জ্বানালোক বিতরণের দায়িত্ব, তাই তো এগিয়ে এসেছিলেন 
তিনি বর্ষার জলভর। মেঘের মত, ত্রিতাপ তাপিত মানবের হদয়জ্বাল! 
নিবারণের জন্য ঢেলেছিলেন শীতল বারি। জ্ঞানেশ্বর তুষিত চাতকের 
মত সেই কুপাঘন রস-বর্ষণের কয়েক ফোঁটা! করেছিলে পান; তারই 
নিদর্শন রয়েছে আমার রচিত এই ভাষ্যগ্রন্থে ।”-_জ্ঞানেশ্বরী ১৮ (১৭৫১) 

জ্জানদেবের সাধনার ইতিহাস, আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার নানা তথ্য, 
তাহার মনোরম অভঙ, এবং গ্রন্থসমূহে ছড়ানো রহিয়াছে। : 


৬ 


ভারতের সাধক 


প্রাণপ্রিয় ঈশ্বরের বিরহে সাধক সেদিন কাতর। তাহ তাহার বরহ 
অঙ্গের এক অভঙএএ বলিতেছেন, “মেঘে মেঘে আকাশ গেছে ছেয়ে, 
অবিরত শুন্ছি তাদের গঞ্জন আর হাওয়ার শন্‌ শন্‌ শব্দ? টাদ আর 
চম্পক হারিয়েছে তাদের ক্সি্ধতার আমেজ, কারণ, আমার প্রভূকে আমি 
যে আর খুঁজে পাচ্ছিনে! চন্দনের প্রলেপ আজ শুধু আমার দেহে 
এনে দেয় দহন-জ্বালা। লোকে ৰলে_ ফুলের শষ্য। বড় স্সি্ধ কোল, 
কিন্ত আমার কাছে তা৷ হয়ে উঠেছে জলস্ত কয়লার মতন । ভূবনভোলানো 
গানের জন্য চিরকালই রয়েছে কোকিলের খ্যাতি, কিন্তু জ্ঞানদেব 

তার বেলায় এই মধুর গান বাড়িয়ে তুলছে কেবল বিরহের 
বেদনা । দর্পণের দিকে নিজের মুখ দেখতে চাই, কিস্তু সে মুখের দিকে 
আজ আর আমি তাকাতেও পারিনে। এমনি ছূর্দশায় প্রভূ আমায় ঠেলে 
ফেলেছেন ।” __অভঙ. ₹৪০। 
প্রিয়বিরহের এই জ্বাল! অচিরে নিভিয়া গিয়াছিল। জ্ঞানদেবের 
একনিষ্ঠ সাধনার সহিত যুক্ত হইয়াছিল শক্তিধর ষোগীগুরু নিবৃত্তিনাথের 
কপা। এই অভিজ্ঞতার বর্ণন। তিনি নিজেই দিয়াছেন,__ 

“আমি ছিলাম অন্ধ, ছিলাম খঞ্জ। চারদিক থেকে আমায় ঘিরে 
ধরেছিল বিভ্রান্তি । আমার হাত-পা কর্মে হয়েছিল একেবারে অশক্ত। 
এমন সময়ে ভাগ্যবলে পেলাম প্রভু নিবৃত্তিনাথকে। তরু-্ছায়া তলে 
আমায় বসিয়ে অধ্যাত্ম-জ্ঞানের আলে৷ তিনি ঢেলে দিলেন আমার এই 
আধারে, দূর হলে! আমার অজ্ঞানের পু্জীভূত অন্ধকার। জয় হোক্‌ 
মহাযোগী নিবৃত্তিনাথের অধ্যাত্মজ্ঞানের ৷ জয় হোক্‌ শ্রীভগবানের নামের । 
কণ্ম আমার আজ হয়েছে ক্ষয়, নিরসন হয়েছে আমার সব্ব সংশয়ের__ 
অভীষ্ট হয়েছে পূর্ণ ।” ্ 

“এখন থেকে আর আমায় চলতে হবেনা পঞ্চেক্দিয়ের পথরেখা 
ধরে। আমি কেবল গেয়ে চলবে। জীবন-প্রভুর গান। আমার সর্ব্ব 
অভিলাষের হয়েছে অবসান। কারণ, আমি যে বাস করছি কল্প-বৃক্ষেরই 
সূলে। আমার সকল চিন্ত! গিয়েছে দুরে, কারণ, আমি ষে পান করেছি 


শু, 


জালদেব 


অমৃতধারা। এঁশী আনন্দে মন আমার হয়েছে নিমজ্জিত- সব্ধ্ধ হুঃখ, 
সর্ধব পাপ হয়েছে নিশ্চিহ্ন । 

“*"*আত্মজ্ঞান হয়েছে আজ উদ্ভাসিত। বেদের নিগৃঢ় তত্ব প্রকাশিত 
হয়েছে আমার প্রাণে । ভাণ্ডের বহিরাবরণ আজ ভেঙেছে- সব্ধ বন্ধন 
গিয়েছে ছুটে । গুরুর প্রসাদে অহং ভাবনা আমীর আর নেই। বুদ্ধি আর 
বোধ হয়ে গিয়েছে একাকার !.*'নয়নের ভেতর গজিয়েছে নয়ন, এই 
জীবদেহ হয়ে উঠেছে স্বগঁয়। আজ যেদিকে তাকাই, সে দিকেই 
অধ্যাত্বজীবনের পরম প্রশাস্তি। সর্ধ্ব বস্ত আমার দু্িতে হয়ে উঠেছে 
ব্রহ্মময়। আমার গুরু নিবৃত্তিনাথের কৃপায় মোচন হয়েছে নয়নের অন্ধত্ব, 
করেছেন তিনি দৃষ্টিদান। ভাগবত-অঞ্জন পরিয়ে দিয়েছেন আমার নয়নে, 
জ্ঞানগঙ্গার ধারায় দিয়েছেন ডুবিয়ে 1” __অভঙ্‌ ৪৩। 

উপলব্ধির এক চরম স্তরে পৌছিয়া সাধকপ্রবর জ্ঞানদেব বলিতেছেন, 
“ঈশ্বর দর্শনের জন্য এগিয়ে গিয়ে হলে! এক অপূর্ব্ব অভিজ্ঞতা । আমার 
সমস্ত বুদ্ধি, সমস্ত ধী-্শক্তি হয়ে গেল নিক্রিয়, তাকে দর্শন করলাম 
আর সঙ্গে সঙ্গে আমি হয়ে গেলাম “তিনি । মুক যেমন পারে না প্রকাশ 
করতে অমৃতের আস্বাদ, তেমনি আমি পারিনে যুখ ফুটে বলতে আমার 
আত্মিক আনন্দ ও অনুভূতির কথা ।” _-অভঙও ৭৯। 

জ্ৰানদেবের দার্শনিক মতের নিজস্ব বোশিষ্ট্য ছিল। তাহার রচিত 
“অমৃতান্ুভব' গ্রন্থ হইতে এই মতবাদের কিছুটা পরিচয় পাওয়া যায়। 
ঈশ্বর ও তাহার স্ৃষ্টি-লীলার তত্ব প্রসঙ্গে তিনি উপস্থাপিত করিয়াছেন 
তাহার ক্ষুপ্তিবাদ। এই দৃশ্যমান স্থ্টিকে তিনি অদ্বিতীয় সত্বা হইতে পৃথক 
বলিয়া মনে করেন না । এই স্থষ্টি যে পরম সত্তারই এক প্রকাশ ! জ্ঞানময় 
পরমাত্মীরই ইহ এক লীলা ! এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্ম ছাড়া আর কোন 
বস্তুর অস্তিত্ব নাই, একমাত্র এই ব্রহ্মই রহিয়াছেন জগং-রূপে উদ্ভাসিত। 
জ্বানদেব বলেন,__নিজেকে দর্শনের জন্য পরমাত্মার যখন ইচ্ছা জাগে, 
তিনি নিজেই তখন রূপ পরিগ্রহ করেন এই বিশ্বজগতের, দর্শন করেন 
নিজেকে | ( অম্ৃতান্থভব, ১২৯ ১৩১, ১৫৬ ) 


৭১ 


ভারতের সাধক 


এই দীর্শনিকতার জের টানিয়া আর একস্থানে তিনি বলিতেছেন,__ 

“যদিও ব্রহ্ম নিজে এই দৃশ্যমান জগতে হন রূপান্তরিত, নিজেকে 
করেন দর্শন ও উপভোগ, তবুও তাহার একত্ব বা! অদ্ভিতীয়ত্ব কখনো 
নষ্ট হয় না, এ যেন ঠিক নিজেকে আয়নার ভেতরে দেখার মত--বাস্তব 
মুখমগ্ডলটি থাকে একেবারে অপরিবন্তিত। ঘুমন্ত বা জাগ্রত যাহাই 
থাকুক না কেন, অশ্বের দণ্ডায়মান ভঙ্গীর যেমন কোন পার্থক্য হয় না, 
এও ঠিক তেমনই । জল যেমন তরঙ্গ হইয়! আপনাতে আপনি খেলা 
করে, তেমনি অদ্বিতীয় সত্তা নিজের সঙ্গেই খেলা করিতেছেন নিজে 
এই জগৎরূপ ধারণ করিয়া। আগুন কি কোন পৃথক বস্তু হইয়া 
্াড়ায় যখন উহা! শিখার মালা পরিধান করে? সূর্য্য যখন কিরণ 
মালায় পরিবেষ্টিত থাকে, তখন স্্য্য আর সূর্য্য কিরণে দ্বৈতসত্তা কিছু 
থাকে না। চাদের একত্বের কি হানি হয় যখন সে থাকে চন্দ্রকরে 
পরিবেষ্টিত? সহস্র দলে বিকশিত হইয়া উঠিলেও কমলের একত্ব তে 
কখনো হয় না খণ্ডিত।” -__অমৃতান্ুভব, ৭, ( ১৩২--১৪৯ )। 


ঈশ্বরপ্রের্িত এক শক্তিধর মহাপুরুষ এই জ্ঞানদেব। লোকমঙ্গল ও 
জীবহিতৈষণার মহান ভূমিক1 নিয়া তাহার আগমন, মহারাষ্ট্রের অধ্যাত্ম- 
জীবনের এক চিহিচত নায়ক তিনি। ভক্তি আন্দোলনের প্রথম ও 
প্রধান উৎসরূপে তাহাকে কাজ করিতে হইবে, জন জীবনের সর্ধ্ব 
স্তরে বিস্তারিত করিতে হইবে ভক্তির উজ্জীবনকারী প্রাণ-রসধারা । 
তাই এশী বিধানে তাহার জীবনে এযাবৎ প্রস্তরতি-পর্ধব কম চলে নাই। 
প্রথম জীবনে পিতার বৈষ্ণব জীবনের প্রভাব তাহার উপর পতিত 
হইয়াছে। তারপর শুরু হইয়াছে তাহার নিগৃঢ় ফোগসাধন1। জ্ঞানময় 
উপলব্ধির মধ্য দিয়া সে সাধনা ক্রমে সার্থক হইয়া উঠিয়াছে। সর্বশেষে 
এই শক্তিমান, জ্ঞানবান মহাসাধকের আধারে পরমপ্রভু ঢালিয়৷ দিলেন 
জ্ঞানমিশ্রা ভক্তির অমৃতরস। এ রসধারায় অবগাহন করিয়া লক্ষ লক্ষ 
ঈশ্বরমুখীন মানুষ তৃপ্ত হইল । 


ণৎ 


জ্ঞানদেব 


উত্তরজীবনে তাহার এই জ্ঞানমিশ্রা ভক্তি পরিণত হয় শুদ্ধ। ভক্তির 
সাধনায়। মহাসাধক ধীরে ধীরে লীলাবাদ, শরণাগতি ও একৈকনিষ্ঠার 
পথে ঝুঁকিয়। পড়িলেন। জ্ঞানদেবের অভঙ.-এ ইহার প্রমাণ আছে-_ 

«কে পারে পরম প্রভুকে উপলব্ধি করতে? এক টুক্রা কাপড়ে 
নিংড়ে নিলে কি স্নিগ্ধ শীতল দাখণা সমীর কখনো ফৌট। ফোট। ক'রে 
গড়িয়ে পড়ে? ফুলের স্থবাসকে কখনো! তো বাঁধা যায় ন। রড্ভু দিয়ে। 
সর্ধ্বেশ্বর কি মহান্‌ ন! ক্ষুদ্র ? কে জানতে পারে তার প্রকৃত স্বরূপ ? 
ওগো” মুক্তার ছ্যতি দিয়ে কি জলের কলসী পুর্ণ করা যায়? নিঃসীম 
আকাশকে আবৃত করা যে অসম্তভব। চোখের মণি থেকে তার আলোক- 
বিচ্ছুরক বন্ধনীকে কি ক'রে করবে বিচ্ছিন্ন ?.. প্রভু ও তার দয়িতার 
প্রেমকলহের তো কখনে। ঘটেন। সমাপ্তি। তাই নিরুপায় হয়ে জ্ঞানদেব 


নিজেকে লুটিয়ে দিচ্ছে প্রভুর ইচ্ছার সামনে 1” -_অভঙ ৯৩। 
আত্মনিবেদন ও একৈকনিষ্ঠার যে সুর এখানে ধ্বনিত হয়, তাহাই 
পংধরপুরে গিয়। পুর্ণতর পরিণতি লাভ করে। 


জ্ঞানদেবের ভক্তিগ্রন্থ ও তাঁহার সাধনার খ্যাতি তখন মারাঠার 
সর্বত্র বিস্তারিত হইয়াছে । এই সময়ে একদিন ভক্তি-আপ্লুত হৃদয়ে 
তিনি পংধরপুরে শ্রীবিঠোবার চরণতলে আসিয়া! উপস্থিত হইলেন। 
ভক্তিসিদ্ধ এই তরুণ মহাপুরুষকে পাইয়া ভক্তসমাজ উদ্বেলিত হইয়া 
উঠিল। জাগিয়া উঠিল এক নূতন প্রাণচাঞ্চল্য। 

পংধরপুরের প্রাচীন বিঠঠল সম্প্রদায় সেদিন সোংসাহে জ্ঞানদেবকে 
নেতারূপে বরণ করিয়া নেয় নাম গান ও কীর্তনের মধ্য দিয়া তিনি 
উৎসারিত করেন এক অভূতপূর্ব ভাব-তরঙগ | 


শা ৮ পি স্পা ৮ পাপ শা পাপী আপ 


« পপংধরপুরের বিঠ্ঠল সম্প্রদায় জ্ঞানদেব ও নামদেবের পূর্ব হইতেই 
বর্তমান ছিল। এই সম্প্রদায়ের নেতা ও শ্রেষ্ঠ সাধক ছিলেন আচার্য 
পুংদলিক, তাহার পরবর্তাকালে নেতৃত্ব করেন জ্ঞানদেব ও নামদ্েব। গুজরাট, 
কর্ণাট, তেলেগু ও তামিপভাষী অঞ্চল এবং মারাঠার নানাস্থান হইতে এ সময়ে 
দলে দলে তীর্ঘযাক্রীরা সমবেত হুইত পংধরপুরে । এই ভক্ত যাত্রীদের কাছে 


৭৩ 


ভারতের সাধক 


ভক্তবীর গোর! ছিলেন 'জাতিতে কুস্তকার, কৃষ্ণভক্তির রসায়নে 
সমগ্র জীবন তাহার রসায়িত হইয়। উঠিয়াছিল। বিঠোবাজীর অঙ্গনে 
এই গোর! কুম্হারের নৃত্য ছিল এক দর্শনীয় বস্তু । প্রভুর নাম কীর্তন 
একবার শুরু হইলেই আর তাহার বাহাজ্ঞান থাকিত না৷ । ভাবপ্রমত্ত 
হইয়! প্রহরের পর প্রহর তিনি নৃত্য করিতেন, সমবেত জনগণের মধ্যে 
ভক্তি ও দিব্য আনন্দের ধারা উচ্ছুলিত হইয়া! উঠিত। এ সময়ে বিঠোবা- 
ভক্তদের মধ্যে গোর। কুম্হারের সম্মান ও প্রতিপত্তি ছিল অসাধারণ । 

স্বগ্রাম তেরাধোকি হইতে গোর! সেদিন বিঠোবার চরণ দর্শন 
করিতে আসিয়াছেন। ভক্ত-চুড়ামণি জ্ঞানদেবের খ্যাতি ইতিপূর্রেই 
তাহার কাণে পোৌছিয়াছে, তাই মন্রিরের দর্শন প্রণাম সারিয়া নবাগত 
সাধককে দেখিতে আসিয়াছেন। জ্ঞানদেবের মধ্যে গোরা কুম্হার কি 
দেখিলেন তাহা তিনিই জানেন। সেদিন হইতেই তিনি বাঁধ পড়িলেন 
এক অচ্ছেছ্ প্রেমের বন্ধনে । বয়সে গোর। ছিলেন ত্তানদেব ও অন্যান্য 
সাধকদের অপেক্ষা বড়, তাই সকলে এই প্রবীণ ভক্ত-সাধককে গোরা- 
চাঁচা বলিয়! ডাকিতেন। 


চাংগদেব এক প্রবীণ হঠযোগী। দীর্ঘদিন একনিষ্ঠার সহিত আপন 
সাধনা নিয়া তিনি পড়িয়া আছেন, যোগবিভূতিও কিছু কিছু অভিসভত 
হইয়াছে । কিন্তু জীবনে আজিও তাহার মিলে নাই শাস্তি, হয় নাই 
অধ্যাত্মজীবনের স্থিতি । 

নানা তীর্থ ঘুরিতে ঘুরিতে সেদিন তিনি পংধরপুরে পৌছিয়াছেন। 
বিঠোবাজীর মন্দির চত্বরে লোকের মহ] ভীড়। ভক্ত এবং শিষ্যগণসহ 


এখানকার ভক্ত সাধকদের বাণী তুলিয়া! ধর প্রয়োজন, সর্বজনবোধ্যভাবে 
ইহার পরিবেশন প্রয়োজন, তাই এ কাজে সাহায্য নেওয়া হইতে থাকে 
কীর্তন গানের। অন্মিত হয় যে, কীর্তন রচনা! ও কীর্তন গানের প্রাথমিক 
গৌরব অনেকাংশে জ্ঞানদেব ও নামদেবেরই প্রাপ্য ৮ [মিল্টিসিজম্‌ ইন্‌ 
মহারাষ্ট্র ঃ এস, কে বেলওয়ালকর 7; আর, ডি, রাণাঁডে |] 

এ৪ 


ক 


এ. 


জ্ঞানদেব 


জ্ঞানদেব কীর্ভন করিতেছেন। মৃদঙ্গ করতালের ধ্বনি, সুমধুর সঙ্গীত 
আর নৃত্যের তালে তালে জাগিয়া উঠিয়াছে দিব্য ভাবতরঙ্গ, আর এই 
ভাবতরঙ্ষে উদ্বেল হইয়া ভক্তের কেহ হাসিতেছে, কেহ কাদিতেছে। সে 


এক বিচিত্র দৃশ্য ! 
চাংগদেব কৌতুহলী হইয়া এ কীর্তনবাসরে উকি দিলেন। কিছুক্ষণ 


পরে নৃত্যগীত থামিয়। গেল, ভাবোচ্ছাসও হইল প্রশমিত । হঠযোগী 
এবার ধীরে ধীরে জ্ঞানদেবের দিকে আগাইয়া গেলেন। সম্মুখে তাহার 
উপবিষ্ট অনিন্দ্যকান্তি বিংশতি বৎসরের তরুণ মহাপুরুষ ! চোখে মুখে 
তাহার দিব্য ভাবের অপরূপ ব্যঞ্জনা। প্রভুর স্তুতি কীর্তনের শেষে 
আত্মসমপিত সাধক এক মহাশান্তির পারাবারে নিমজ্জিত । 

চাগদেব আপনহারা হইয়া গেলেন। মুহুর্তমধ্যে তাহার উপলব্কি 
হইল, হঠযোগের যে সমস্ত সিদ্ধি এ যাবং তিনি অর্জন করিয়াছেন, এই 
সর্বনিবেদিত মহাঁসাধকের অপার আনন্দধারা ও শাস্তির তুলনায় তাহ 
একেবারে তুচ্ছ । 

সেইদিনই তিনি জ্ঞানদেবের শরণ নিলেন। ভক্তিবাদী মহাপুরুষের 
সান্নিধ্যে থাকিয়া নুতন করিয়া শুরু হইল তাহার সাধন! । 

উত্তরকালে জ্ঞানদেবের তিরোধানের পর তাহার কনিষ্ঠ ভগ্ী 
ভক্তিসিদ্ধা সাধিক! মুক্তাবাঈ র শিষ্যত্ব চাংগদেব গ্রহণ করেন। 


জ্ঞানী সাধক বলিয়া বিশোয়ার তখন চারিদিকে খ্যাতি রটিয়াছে। 
নিকটেই বাঞ্জি-গ্রামে থাকিয়া! তিনি সাধন ভজন করেন। দীর্ঘদিন 
শিবের আরাধনা করিয়া খদ্ধি সিদ্ধিও কিছু কিছু অঞ্জিত হইয়াছিল । 
এবার বিশোয়া অদ্বৈত জ্ঞানের দিকে ঝুঁকিয়াছেন। দেব বিগ্রহ তিনি 
মানিতেই চাহেন না। পুজা, অর্চনা, সেবা! সব কিছুই তাহার চোখে 
মূল্যহীন। বৈষ্বদের ভাবাবেশ, নর্ততন কীর্তনের কথা উঠিলেই করেন 
তাচ্ছিল্য আর উপহাস। 

পংধরপুরের এই নুতন ভক্তি আন্দোলন বিশোয়া মোটেই সুচক্ষে 


৭৫ 


ভারতের সাধক 


দেখিতে পারেন নাই। তাই স্থযোগ পাইলেই জ্ঞানদেবের উদ্দেশে 
তিনি গ্লেষ ও ব্যঙ্গোক্তি বর্ষণ করেন। বলেন, “যোগমার্গের সাধন! ছেড়ে 
জ্ঞানদেব হয়েছে প্রেমিক, ভাবের ফান্ুস। জ্ঞানের রাজপথ ছেড়ে ধরেছে 
প্যান্পেনে কান্নার গলিপথ |” 

মারাঠী ভক্তি-সাধকদের মধ্যে এ সময়ে জ্ঞানদেবের ভগ্নী মুক্তাবাঈ-এর 
খ্যাতিও যথেষ্ট। তাহার রচিত সুমধুর অভঙ, পদাবলী আজকাল গীত 
হয় মন্দিরে মন্দিরে, ঘরে ঘরে । জ্ঞানপন্থী বিশোয়া কিন্ত মুক্তাবাঈকেও 
নিন্দা! করিতে ছাড়েন না। 

ভক্তদের অনেকে এজন্য বিশোয়ার উপর ভারী বিরক্ত । কেউ কেউ 
বক্রোক্তি করিয়া তাহার নামকরণ করেন, বিশোয়া-খেচরা । 

পরম ভাগবত জ্ঞানদেব কিন্তু সাধক বিশোয়ার সান্িধ্যের জন্া, 
তাহার সহিত ভগবৎ প্রসঙ্গ আলোচনার জন্য ব্যাকুল। বারবার লোক 
পাঠাইয়া তাহাকে আহ্বান করেন, পংধরপুরে আসিয়। অবস্থান করার 
জন্য সাদর আমন্ত্রণ জানান । 

সেবার জ্ঞানদেব শুনিতে পাইলেন, বিশোয়া শুধু বিঠঠল সম্প্রদায় 
সম্পর্কেই কটুক্তি করেন নাই, প্রভু শ্রীবিঠোবার উদ্দেশেও নাকি নান 
ক্লেষোক্তি করিয়াছেন । 

সবিস্ময়ে ভক্তদের তিনি কহিলেন, “সে কি! জ্ঞানী সাধক হয়ে 
বিশোয়ার একি মতিভ্রম ? শ্রীবিঠোবাকে সে কি শুধু বিগ্রহ বলেই 
দেখেছে? তার চৈতন্যময় রূপ চোখে পড়েনি? তাহলে এবার দেখছি, 
একটা ব্যবস্থা করাই দরকার । আজই তৌমরা কেউ বাঁসিতে চলে ষাও। 
বিশোয়ার হাতে আমার এই সগ্ঠ রচিত অভঙ.টি দিয়ে এসে11৮ 

তাহার এই অভঙ-এ জ্ঞানদেব সেদিন লিখিলেন, “দেখেছি. আমি সেই 
মহালিঙ্গ, ধার আধার হচ্ছে অসীম আকাশ, জলরেখা হচ্ছে মহাসাগর 
০ স্পা 
শেষনাগের মত যা বহন ক'রে আছে সারা | বিশ্বজগৎ,; মেঘলোক থেকে 


(এস কথা উরীকা- * 
০০ 


এঁর এরি হচ্ছে কারিরাশিং আকাশের নক্ষত্ররাজী হচ্ছে পুস্পদল, 


যা দিয়ে ক্চ্ছে এঁর অর্চনা, ফলরূপে এর কাছে নিবেদিত হচ্ছে চন্দ্রম 


এ এ এ... পক 09 গো ১টি 
৭৬7 . 


্রদীপ্ত নূর্য্য করছে এর আরতি, এরই কাছে সাধকের ব্যক্তিসত্তাকে 
নিবেদন করতে হ করতে হবে অর্ধারপে। আমি এই মহালিঙ্গকে ; আরাধনা 
করেছি আমার মহাভাবময় ২ আনন্দ, দরিয়ে আমার, হৃদয়াসনে ধ্যেয়ুরূপে 
স্থাপন করেছি এই জ্যোতিত্ময় পরমবস্তকে।” __ অভ, ৬৬। 
_অভঙ্খানি নকল করিয়! তখনি পাঠানো হইল। 

সেই দিনই রাত্রে বিশোয়া এক আশ্চর্য্য স্বপ্র দেখিলেন। ইষ্টদেব 
মহেশ্বর তাহাকে রুষ্টন্বরে বলিতেছেন, “ওরে, সাধন ক'রে ক'রে বৃদ্ধ হয়ে 
পড়লি, এখনে যে আত্মাভিমান তোর গেলে৷ না । ঘট না! ভাঙলে কি 
আকাশের সাথে কখনো মিশতে পারে? নিজেই যে তুই নিজের 
চারদিকে রচন। ক'রে রেখেছিস্‌ ব্যবধান। তুই নগণ্য মৃত্তিকার এক ঘট, 
তবুও সেই মুত্তিকাঁর আবরণ ভেঙে ফেলতেই তোর মন সরছে না। 
আর এ গ্ভাখ$ সোনার ঘট হয়েও জ্ঞানদেব নিজেকে অবলীলায় ফেলেছে 
গুঁড়িয়ে, নিজেকে সে করেছে একেবারে অবলুপ্ত, তাইতো! পেয়েছে তার 
পরম পাওয়া । জ্ঞানদেবেরই আশ্রয় গ্রহণ কর্‌ অভীষ্ট তোর সিদ্ধ হবে। 
যাঁ_যা, আর দেরী করিস্নে ।' 

সেই রাত্রেই পায়ে হাটিয়া বিশোয়া পংধরপুরে আসিয়া উপস্থিত। 
ভোর হইতে ন! হইতেই জ্ঞানদেবের চরণতলে গিয়৷ লুটাইয়।৷ পড়িলেন। 
ছুই চোখে নামিল তাহার অশ্রুর বন্যা । 

এই প্রত্যুষকালে কে এই বৃদ্ধ সাধক এমন করিয়া ভূমিতে গড়াগড়ি 
দিতেছে? জ্ঞানদেব কোমলন্বরে প্রশ্ন করিলেন, “ভাই কে তুমি? 
কোথায় তোমার বাস? কেনই বা! তোমার এমন আন্তি ?” 

“প্রভূ, আমি বিশোয়া-খেচরা 1 

«সে কি ভাই, তুমি “খেচরা? হতে যাবে কেন? তুমি যে সর্বজনমান্ 
সাধক বিশোয়া 1 

প্রভূ, আজ ুটি প্রার্থন৷ নিয়ে আমি ছুটে এসেছি। কৃপা ক'রে 
আমায় আপনার পরমাশ্রয় দিন, টেনে তুলুন আপনার কোলে । আর 
আজ থেকে বিশোয়া খেচরা' বলেই আমায় অভিহিত করুন। এই 


৭৭ 


৩৫৬৬৭ ৮11৭ 


“খেচরা” নামের কলঙ্কই থাকুক আমার সাথে চির-জড়িত হয়ে । আপনাকে 
আর ভগিনী মুক্তাবাঈকে উপহাস ও তাচ্ছিল্য আমি এযাঁবং কম করিনি, 
একদল ভক্ত চটে গিয়ে তাই আমার নাম দিয়েছিল ঘেচরা। সেই 
নামই থাক আমার চিরদিনের শিরোভূষণ হয়ে__আত্মাভিমান তাতে 
কিছুটা! চাপা পড়বে ।” 

বিশোয়া-খেচরা অতঃপর জ্ঞানদেবের নিকট হইতে সাধন প্রাপ্ত হন। 
উত্তরকালে তিনি পরিচিত হইয়া উঠেন এক ভক্তি-সিদ্ধ মহাপুরুষরূপে । 
মহারাষ্ট্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ: সাধক নামদেব এই বিশোয়া-খেচরারই শিশ্যত্ব 
গ্রহণ করিয়া ধন্য হন। 


জ্ঞানদেবের অনুগামী বিঠঠল সম্প্রদায় প্রসার লাভ করিতে 
থাকে, তাহার ভক্ত-সংখ্যাও ক্রমে আরো বাড়িয়া যায়। এই ভক্তঙ্গের 
মধ্যে বিশিষ্টতম হইতেছেন শক্তিধর সাধক-_নামদেব। অন্ান্য ভক্তদের 
মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্বৎ মালী, নরহরি স্বর্ণকার ও চোখা নামক এক 
অস্পৃশ্য । ভক্তিখন্ম্নের এ আন্দোলন যে সেদিন মারাঠার জনজীবনের 
নিয়ন্তম স্তরেও বিপুল প্রাণচাঞ্চল্য জাগাইয়া তুলিয়াছিল তাহ! এই 
ভক্তপ্রধানদের আবির্ভাব হইতেই বুঝ! যায়। সমাজে নগণ্য ও অস্পৃষ্ঠ 
হইয়াও জ্বানদেবের অনুগামী এই সাধকদল লাভ করিয়াছিলেন 
অসামান্য মর্য্যাদা। 

প্রাক্তন দস্থ্য, নামদেবের জীবনে একদিন জাঁগিয়! উঠে অন্ুশোচনার 
তীব্রবেদনা। উন্মাদের মত সে ছুটিয়া আসে বিঠোবাজীর চরণতলে__ 
জ্বানদেবের সঙ্গে এ সময়ে তাহার মিলন ঘটে। 

নামদেবের জীবনে তখন চলিয়াছে তীব্র আণ্তি আর কৃচ্ছুসাধনার 
পাল! বিঠোবাজীর জন্য কাদিয়! কাদিয়। নয়ন অন্ধকার হইতে চলিয়াছে, 
কিন্ত তবুও তো মিলিতেছেনা প্রতুর কৃপা, দৃষ্টির সম্মুখে খুলিতেছেন। 
চিন্ময় লোকের ছুয়ার। 

জ্ঞানদেবের চরণ ধরিয়া একদিন তিনি মিনতি জান ইতে থাকেন, 


শা 


“প্রভু, আপনি আমার উদ্ধারের পথ বলে দিন, নইলে স্থির করোছ-_ 
এ পাপ জীবনের ভার আর বয়ে বেড়াবো! না 1% 

আশ্বাস দিয়! জ্ঞানদেব কহিলেন, “ভাই, শুধু কেঁদে কেঁদে চোখ অন্ধ 
করলে কি হবে? চোখে আগে লাগাও কৃষ্ণকুপার অঞ্জন। চক্ষুম্মান 
হয়ে ওঠো। তবে তো পাবে বিঠোবার চিন্ময়রূপের দর্শন। তাড়াতাড়ি 
তুমি গুরুকরণ করো, মন্ত্রদীক্ষা। নাও। মন্ত্রের সাধন ক'রে যাও, আর 
ক'রে তোল এই মন্ত্রকে চৈতন্যময় । তবে তো৷ ফুৃক্তর দ্বার খুলবে । মন্ত্র 
হচ্ছে মুক্তি-ভাণ্ডারের চাবিকাটি। গুরুর কাছেই যে তা রয়েছে” 

“তাইতো আমি আপনার চরণতলে ছুটে এসেছি 1” 

“না গো, আমি তোমার গুরু নই। তোমার চিহিিত গুরু রয়েছেন 
অন্যখানে |? 

“কোথায় তিনি, প্রভু ? আপনিই কৃপা ক'রে তা বলে দিন।” 

“আজই, তুমি বাঙ্সিতে ছুটে যাও। সেখানে রয়েছেন পরম ভাগবত 
বিশোয়া-খেচর!। জ্ঞানী সাধক এবার প্রেম-ভক্তির সাধনায় বুঁদ হয়ে 
পড়ে রয়েছেন । তার কাছ থেকে শীগগীর মন্ত্রদীক্ষা নাও। আমি বল্ছি 
শ্রীবিঠোবার দর্শন তুমি পাবে |” 

জ্ঞনদেবের কৃপাপ্রাপ্ত সাধক বিশোয়া খেচরাই নামদেবকে অধ্যাত্- 
জীবনের নির্দেশ দান করেন, ঘটান তাহার বিন্ময়কর রূপান্তর । 
উত্তরকালে এই নামদেবের অভ্যুদয় ঘটে মহারাষ্ট্রের ভক্তি-সাধনার এক 
বিশিষ্ট সংবাহকরূপে। জ্ঞানদেৰের লোকান্তরের পরে নামদেবই হন 
তাহার প্রবন্তিত ভক্তি আন্দেলনের প্রেরণাদাতা, এ আন্দোলনের 
প্রধান পরিচালক। অর্ধশতাব্দী কালেরও উপর এই গুরুদায়িত্ব তিনি 
গৌরবের সহিত বহন করিয়া! যান। 


, কিছুদিন পর জ্ঞানদেৰের ইচ্ছা জাগে, ভারতের কয়েকটি বিশিষ্ট 
পুণ্যতীর্ঘ তিনি দর্শন করিয়া আসিবেন। ইতিমধ্যে মহারাষ্ট্রের বাহিরেও 
তাহার সাধনৈশ্বর্ষ্ের খ্যাতি প্রচারিত হইয়া গিয়াছে । নানা অঞ্চল 


শি 


খনি খন" প্রান্ত কু 


হইতে ভক্ত-সমাজের আহ্বান রারবার তাহার কাছে পৌছিতেছে। এবার 
তীর্ঘদর্শনের পথে সে আমন্ত্রণও রক্ষা কর! যাইবে । জ্ঞানদেব তাই 
পরিব্রাজনে বাহির হইলেন- সঙ্গে চলিলেন নামদেব, গোৌরা। বিশোয়া 
প্রভৃতি সাধকের দল। তীর্থাদি দর্শন ও কিছুসংখ্যক চিহিন্ত ভক্তকে 
কৃপা প্রদর্শনের পর তাহার এই পরিব্রাজন সমাপ্ত হয়। 

পংধরপুরকে কেন্দ্র করিয়া ভক্তির যে প্লাবন জ্ঞানদেব বহাইয়া 
দিয় যান, ধীরে ধীরে তাহা মহারাষ্ট্রের জন-জীবনের সর্ব স্তরে ছড়াইয়া 
পড়ে। তাহার জ্ঞানেশ্বরী' ও “অমৃতান্ুভব” আজ সাধক ও অধ্যাত্বরস- 
পিপাস্থু ব্যক্তিমাত্রেরই অবশ্থপাঠ্য । মননশীল, শিক্ষিত মারাঠীমাত্রেরই' 
তাহা গৌরবের বস্ত। তাহার প্রেমভক্তি রসাশ্রিত অভঙ.ও তাহার 
কীর্তনানন্দ আপামর জনসাধারণের প্রাণে আনিয়াছে ভক্তির জোয়ার। 
আর এ জোয়ারের উৎসরূপে বিরাঞ্রিত রহিয়াছেন স্বয়ং জ্ঞানদেব। বয়স 
মাত্র বিংশতি বৎসর হইলে কি হয়, ভক্তিসিদ্ধ দিব্যকাস্তি এই মহাপুরুষের 
ভাষণ, ব্যক্তিত্, ও রসাবিষ্ট মৃক্তি নিব বারারারিনিিনি 
তোলে শুদ্ধাভক্তির প্রেরণ! । 


জ্বানদেবের অন্তর এবার অমৃত রসে ভরপুর। ঈশ্বর নির্দিষ্ট 'যে 
আনিয়াছেন। এখন কম্মজাল গুটানোর পালা। 

+১২৯৬ খুষ্টাব্ের এক শান্ত মধুর প্রভাত। অন্তরঙ্গ ভক্ত ও শিষ্যগণসহ 
আড়ন্দির পৈত্রিক ভিটায় জ্ঞানদেব আসিয়। পৌছিয়াছেন। নিত্যলীলায় 
, প্রবেশের আর দেরী নাই। আঁপ্তকাম মহাসাধকের আননখানি সেদিন 
দেখা গেল বড় প্রসম্নোজ্জল। স্মিতহাস্তে গুরু নিবৃত্তিনাথের চর্ণধূজি 
শিরে ধারণ করিয়া চিরতরে তিনি নয়ন .নিমীলিত করিলেন । 

দাক্ষিণাত্যের অধ্যাত্মআকাশ হইতে এক উজ্জল জ্যোতিফ সেদিন 
খসিয়া পড়িল ! | 


৮৩ 


তক্থাচার্্য পর্ধানন 
,  মেহারের প্রতাপান্বিত ভূম্যধিকারী, জটাধর সেদিন সাড়ম্বরে সভা 
জাকাইয়া বসিয়া আছেন। কাজকন্মী শেষ হইবার পর পারিষদবর্গসহ 
নানা প্রসঙ্গ ও কৌতুকালাপ চলিতেছে। 

হঠাৎ দ্বারপত্তিত আগমানন্দের দিকে তাহার দৃষ্টি পড়িল। লক্ষ্য 
করিলেন, আচার্য্ের পাশেই চুপচাপ দীড়াইয়া আছেন তাহার দ্বিতীয় 
ভ্রাতা সর্ববানন্দ। বয়সে তরুণ দেখিতে একেবারে কন্দর্পকান্তি। কিন্তু 
মেহার অঞ্চলের সবাই জানে, এ একটি মাকাল ফল। প্রতিভাধর 
ব্রাক্মণবংশের সন্তান হইলে কি হয়, একেবারে অকাট মূর্খ । শুধু তাহাই 
“যন, সব্বানন্দ জড়-ভরতের মত সদাই থাকে নিক্ষিয়, বুদ্ধিবৃত্তি তাহার 
'কছু আছে বলিয়া মনে হয়না! । 

জটাধর সহাস্তে কহিলেন, “কি ব্যাপার আচার্য ? আজ আমাদের 
স্বর্বানন্দ যে স্বয়ং সভায় উপস্থিত !” 

“মহারাজ তো৷ সবই জানেন । নিজের খেয়াল খুশী মতই সে চলাফেরা 
করে। আজ হঠাৎ কৌতৃহলী হয়ে এখানে এসেছে । ০০০০৪ 
বালকপুত্র শ্থিবনাথকেও।” 

জমিদার মহাশয় হঠাৎ বড় কৌতুকী হইয়া উঠিয়াছেন। সহাস্তে 
সবর্বানন্দের দিকে তাকাইয়া কহিলেন, “কি হে পণ্ডিত, মা সরস্বতীর 
টট তো এ জন্মের মত উঠিয়েই দিয়েছ। কিন্ত ব্রাহ্মণের ছেলে- বলি, 
নি থি-নক্ষত্রের জ্ঞান-ট্যান কিছু আছে তো? না তাও ভুলে বসেছে।। 
চ্ছা, বলতো, আজ কি তিথি ?” 

সন্ভ সুপ্তোথিতের মত, আচম্কা সর্ববানন্দ কি জানি কেন নন বলিয়া 

ঈিলেন, “আজ পুণিম! |» 


৬ ৮১ 





দত৩ 


সভায় তুমুল হাসির রোল পড়িয়৷ গেল। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সকলেই 
জানে, আজ পৌষ সংক্রান্তি এবং অমীবস্তা। তিথি। 

রাজার ক্রোধ এক মুহুর্তে দপ, করিয়া জ্বলিয়া উঠিল !. 

শক্তিধর সাধক, তন্ত্রশান্ত্রবিদ্‌, বাসুদেব ভট্টাচার্য্যের গৃহে এ কোন্‌ 

কুলাঙ্গার জন্িয়াছে! বংশের মানসন্ত্রম নষ্ট না করিয়া সে ছাঁড়িবে না। 
তীক্ষ কণ্ঠে কহিলেন, “আচার্য্য-বংশের নাম ডুবিয়েছ তুমি, অপদার্থ 
কোথাকার ! ব্রাহ্মণের ছেলে, রাজসভায় আস্তে হলে বিদ্যা-বুদ্ধি কিছু 
থাকা দরকার-__তাও কি জানো না। সাবধান! আর কখনো আমার 
সভায় তোমায় যেন না দেখি 1” 

শুধু তাহাই নয়, রোষকযায়িত নেত্রে সব্ধবানন্দের পুক্র শিবানাথকেও 
সতর্ক করিয়া দিলেন, “তোমার বাবার তো কাগ্াকাণ্ড জ্ঞান নেই, 
তাকে কিছু বলা বৃথা । কিন্তু তুমি লক্ষ্য রাখবে, সে যেন আমার সভার 
এদিকে কখনো! পা ন! বাড়ায় । তা হলে কিন্তু কঠোর শাস্তি পেতে হবে 
তোমাদের ৷? 

সব্বানন্দ ও শিবনাথ নীরবে সভাকক্ষ ত্যাগ করিলেন । 


বাড়ীতে ফিরিয়। আসিয়া শিবনাথ ক্ষোভে ছুঃখে কাদিয়া ফেলিলেন। 
মায়ের কাছে বিবৃত করিলেন আঁজিকার চরম অপমানের কথা । 

এই স্বামীকে নিয়া পত্রী বল্লভা এ জীবনে কোনদিনই শাস্তি পান নাই। 
আজিকার ঘটনায় তাহার ধের্য্যের বাঁধ ভাঙ্গিয়। গেল। চীৎকার, কটুক্তি ও 
কান্নায় স্বামীকে অতিষ্ঠ করিয়! তুলিলেন। তত্ুপরি শুরু হইল বাড়ীর 
সবাইর গঞ্জনা ও তিরস্কার । 

সর্ববানন্দের অন্তরে আজিকার আঘাত বড় মন্াস্তিক হইয়া বাজি! 
সদা বেহাশ, নিক্রিয় মানুষটির অন্তরে এক তীব্র নাড়া পড়িয়া গিয়াছে 
তমসার ঘোর হইতে নৃতন করিয়৷ যেন তিনি জাগিতে চাহিতেছেনঠ 
সত্যিই তে।| ব্যর্থ, বন্ধ্যা" এই জীবনট। এতদিন কি করিয়া তিনি র্‌ 
কাটাইলেন? স্ত্রীপুজ পরিবারের কোন কাজেই আজ পর্য্যন্ত লাগিলেন 


৮২ 








স্তজজজাচাবালব্বালন্দা 


. না। নিজের জন্যই বা কি করিয়াছেন ? নিরক্ষর, নির্রবোধিনে। সঃ 
ভার স্বরূপই এতকাল রহিয়াছেন। এমন জীবন টানিয়! বেড়ানোর 
ষে মৃত্যুও অনেক ভাল। 

অনুশোচনা ও আন্তিতে সব্ব্ধানন্দের হৃদয় মুষড়িয়া পড়িয়াছে। 
ধীরে ধীরে লোকালয় ছাড়িয়া বাহির হইলেন। তারপর ডাকাতিয়া নদীর 
তীর ধরিয়৷ প্রবেশ করিলেন গ্রামের প্রাস্তস্থিত নিবিড় অরণ্যে । 


সারাট। দিন তাহার কোন খোঁজ খবর নাই। বাড়ীর লোক বড় 
ঘাবড়াইয়া গেল। এমন তো কখনো! হয় না। এই মূর্খ, কাগুজ্ঞানহীন 
যুবকের অদৃষ্টে এরূপ অপমান, লাঞ্ছনা আরো! অনেকদিনই জুটিয়াছে, 
কিন্ত কোন দিনই কেহ তাহাকে চঞ্চল বা! বিক্ষুব্ধ হইতে দেখেন নাই। 
ভালো! মন্দের কোন বোধই যাহার নাই, তাহার পক্ষে স্তুতি-নিন্দা, 
অনুগ্রহ-নিগ্রহ সবই যে সমান । 

সবার চাইতে কিন্তু বেশী ব্যাকুল হইয়! উঠে বাড়ীর নমঃশুদ্র ভৃত্য 
পূর্ণীনন্দ। সর্ধববানন্দের শিশুকাল হইতেই সে তাহাকে ভালবাসিয়া 
ফেলিয়াছে। মনের অজ্ঞাতে কি এক রহস্তময় আকর্ষণ তাহার প্রতি 
সেযষেন বোধ করে। তাহার চোখে সবর্ধানন্দ যেন এক ঘুমন্ত মানুষ 
--একাস্ত অসহায় ! সকলের উপেক্ষিত, এই যুবা-শিশুটিকে আগলাইতে 
গিয়া দিনরাত পূর্ণানন্দকে হিম্সিম্‌ খাইতে হয়। , 

আজ সারাদিন তাহাকে না দেখিয়া! পূর্ণানন্দ অধীর হইয়া পড়ে। 
বাড়ীর লোকেরও দুশ্চিন্তা কম হয় নাই। 

এদিকে সকলের দৃষ্টি এড়াইয়া সব্ববানন্দ জঙ্গলের মধ্যে চুপচাপ 
বসিয়া আছেন। বারবারই মনে আলোড়িত হইতেছে ছঃসহঅপমানের 
কথা। সত্যিই তো, বিছ্যাবুদ্ধি-প্রতিষ্ঠাহীন এই জীবন রাখিয়া কি লাভ ? 
এক একবার সঙ্কন্প জাগে, নদীতে ডুবিয়াই আত্মহত্যা করিবেন। কিন্তু 
আত্মহত্যা যে মহাপাপ! এ পাপ ষে করে, মৃত্যুর পরে তাহার তে৷ 
মুক্তি নাই। তবে? . 


৮৩ 


ভারতেগ সাধক 


অবশেষে ধীরে ধীরে মনে জাগিয়! উঠিল এক দৃঢ় সঙ্ল্প। বিদ্যা 
তাহাকে অঞ্জন করিতেই হইবে। দাশবংশের কায়স্থ জমিদার এই 
পরগণার অধিকারী-_রাজার মত তাহার দোর্দগ প্রতাপ; রাজ! বলিয়াই 
সকলে অভিহিত করে, ভয় ভক্তিও করে । এই রাজা-জটাধরকে সর্ববানন্দ 
পদানত করিবেন। এমনি শাস্ত্রবিদ তিনি হইবেন যে, দাম্ভিক জটাধরের 
শির লুটাইয়! পড়িবে তাহার চরণতলে। কিন্তু এতদিন পরে, এ বয়সে 
কি এই বিদ্তা আহরণ করা যাইবে? সর্বশাস্ত্রবেত্তা হওয়া কি আর 
তাহার পক্ষে সম্ভব? কিন্তু কেনই বা নয়? কালিদাসের মত মূর্খও যদি 
পণ্ডিত হইতে পারেন, তিনি কেন পারিবেন না? 

ই, আজই, এখনি শুরু করিবেন তাহার এই সঙ্থল্প-সাধন। 

বিদ্ভাবিক্ষার জন্য তালপাতার আবশ্ঠক । একথা মনে হইতেই সবর্ধানন্দ 
নিকটস্থ তালগাছটিতে উঠিয়া পড়িলেন। 


শীতের পড়ন্ত বেলা । তাড়াতাড়ি কাজ না! সারিলে এখনই অন্ধকার 
হইয়া যাইবে । কিন্তু একাজে তেমন অভ্যাস নাই, অতিকষ্টে ধীরে ধীরে 
তাহাকে উঠিতে হইতেছে । বন্ুক্ষণ পরে, গাছের শীর্দেশে সবেমাত্র 
পৌছিয়াছেন, এমন সময় দেখা দিল এক ভীষণ বিপদ । হাত দিয়া 
পাতা ছি'ড়িতে যাইবেন, হঠাৎ গর্ত হইতে ফেস করিয়া উঠিল এক ছূদ্র্য 
গোখরা সাপ! 

তাইতো, এ মহাসঙ্কটে কি করা যায় ? বৃক্ষ হইতে এখন অবতরণের 
চেষ্টা বৃথা, হিংআ্র সাপের ছোবল খাইয়া মরিতে হইবে । বরং সাহসে ভর 
করিয়া এটাকে হত্যা করাই ভাল। 

তখনি হুরস্ত সাহসে ভর করিয়া, ক্ষিপ্রবেগে সর্বানন্দ সাপের ফণ! 
আকড়াইয়া ধরিলেন। তারপর তালের শাখার ধারালে৷ প্রান্তে ফেলিয়! 
সজোরে এটিকে ঘর্ষণ করিতে:লাগিলেন। ক্ষণপরে দ্বিখগ্ডিত সাপটি ঝপ 
করিয়া নীচে পড়িয়৷ গেল। 

সঙ্গে সঙ্গে শোন! গেল নীচ হইতে এক গুরগন্ভীর কণ্ঠের আহ্বাম__ 


৮৪ 


তম্ত্রাচাধ্য সববানন্দ 

“তালবৃক্ষের ওপর বসে, কে তুমি বাবা, সাপের সঙ্গে যুঝ ছে! এতক্ষণ ? 
ধন্য সাহস, ধন্য শক্তি তোমার । এবার নীচে নেমে এসো 1৮ 

বহুক্ষণ আগে সর্রবানন্দ তালগাছে আরোহণ শুরু করিয়াছেন। এতক্ষণ 
নীচের দিকে দৃষ্টি দিবার অবসর হয় নাই। এবার তাকাইয়৷ দেখিলেন, 
ইতিমধ্যে এক সন্ন্যাসী বুক্ষতলে আসিয়। বসিয়াছেন। 

তাড়াতাড়ি কিছুটা তালপত্র সংগ্রহ করার পর তিনি নীচে নামিয়া 
আসিলেন। 


ব্যাপ্চ্্ম বিছাইয়! বৃক্ষতলে বসিয়া আছেন এক মহাকায় অবধৃত 
সন্ন্যাসী। শিরে তাহার দীর্ঘ জটাজাল, পরণে রক্তবর্ণ ক্ষৌম বসন। 
গলদেশে থাকে-থাকে রুদ্রাক্ষ ও হাড়ের মালা বিলম্বিত। কপালে জ্বল্‌ 
বল্‌ করিতেছে বড় রক্ত চন্দনের ফোটা। আয়ত নয়ন দুইটি স্ুরাপানে 
রক্তিম হইয়া আছে। 

ভয়ে ভক্তিতে অভিভূত সব্বানন্দ তাহাকে প্রণাম করিয়া উঠিয়। 
ঈাঁড়াইলেন। 

প্রশ্ন হইল, “কে তুমি বাবা? এই ভর সন্ধ্যেবেলায় তালগাছে উঠে 
কি করছিলে ?” 

“তালপাতা পাঁড়ছিলাম, লেখাপড়া শুরু করবো বলে ।” 

“তুমি নিভ'কি ! এমন যে পরমপ্রিয় প্রাণ, তার প্রতি দেখছি কোন 
মমত্ববোধই তোমার নেই। সাধনার প্রকৃত অধিকারী তুমি। তোমার 
ওপর আমি অত্যন্ত প্রসন্ন হয়েছি, বংস। বল, কি তোমার প্রার্থন। ৷” 

সর্ব্বানন্দ করজোড়ে নিবেদন করিলেন, সেদিনকার ছঃসহ অপমানের 
কথা । তিনি বিদ্ধ! চান, হইতে চান সব্র্বজনমান্য শান্্রবিদ। হ্যা, ইহাই 
আজ তাহার জীবনের একমাত্র আকাক্ষা ৷ জমিদার জটাধারীর অপমান 
তাহার দেহে বিষাক্ত কাটার মত বিধিতেছে। তাহার অপমানের 
প্রতিশোধ তিনি নিতে চান, তাহার সভায় সব্ধ্ধানন্দ যেন পূর্ণ মর্যাদায় 
অধিষ্ঠিত হইতে পারেন। 


৮৫ 


ভারতের সাধক 

গম্ভীরানন অবধূতের ওষ্টপ্রান্তে এবার দেখ। দিল স্মিত হাস্তের রেখা । 
কহিলেন, “বাব। পুর্ীনন্দ, যে বিদ্যা ভূমি চাচ্ছো, তা হলে! নিষ্ফল! বিদ্যা । 
তোমায় আমি সর্ব্ববিদ্যামন্ত্র দেব। সাধনায় তুমি তৎপর "হও । দেবী 
তাতে প্রসন্ন হবেন। সর্ববসিদ্ধি হবে তোমার করতলগত। তুচ্ছ জটাধরের 
সভার মর্ধ্যাদা ভেবে তুমি মরছে! কেন ?” 

সর্বানন্দের মন এ কথায় সায় দেয় না। সাধন ভজনের কথা 
বলিয় সন্ন্যাসী কি তাহাকে আজিকার সঙ্কল্প হইতে বিচ্যুত করিতে চান ? 
মন্ত্রের সাধন নিয়া তাহার কি হইবে? তিনি চাহেন বিদ্যা ! 

মুহুর্তে ফুটিয়া উঠিল অবধূতের রুদ্র রূপ । গজ্জিয়৷ উঠিলেন, “চুপ 
ক'রে কেন? বুঝেছি, প্রত্যয় এখনো আসছে নাঃ না? আচ্ছা, তাহলে 
মন্ত্রবল একটু প্রত্যক্ষ ক'রে নাও ।” 

খণ্ডিত সর্পের অংশ ছুইটি নিকটেই ভূতলে পড়িয়া আছে। সন্ন্যাসী 
চিম্টা দিয়া তাহ! টানিয়া আনিলেন তারপর অক্ফুটস্বরে মন্ত্র পড়িয়া 
ছিটাইয়া দিলেন কমগুলুর পবিত্র বারি। 

ক্ষণকাল মধ্যে সেখানে ঘটিয়া গেল এক মহা অলৌকিক কাণ্ড । 
স্ধ্ধানন্দের বিন্ময় বিস্ফারিত নেত্রের সম্মুখে সর্পটি ধীরে ধীরে সঙ্জীবিত 
হইয়! উঠিল, তারপর নতশিরে প্রস্থান করিল গহন অরণ্যে । 

অবধূত কহিলেন, “সব্র্বানন্দঃ এবার তো নিজ চোখে দেখলে মন্ত্রের 
সঙ্লীবনী ক্রিয়া! এবার তা হলে বিশ্বাস হয়তে। হচ্ছে। হ্যা, জত্যিই 
আমারমন্ত্র তোমার ভেতরকার ঘুমন্ত মানুষটিকে জাগিয়ে তুলতে পারে, 
পুরণ করতে পারে সর্ব্ব অভীষ্ট” 

সবর্বানন্দ একেবারে হতবাক্‌। 

আগন্তক মহাঁসাধকের কণ্ঠে এবার শোন! গেল ভিন্ন স্থুর। দৃঢ়, বঙ্জ- 
গন্ভতীর কঠে কহিলেন, “শোন, সর্ধ্বানন্দ! নিতান্ত আকম্মিকভাবে আজ 
আমি এখানে এসে পড়েছি, তা ভেবো না। পূর্র্ব থেকেই এটা হয়ে রয়েছে 
বিধিনিন্দিষ্ট। বৎস, আজ তোমার জন্যই যে. পূর্ধববঙ্গস্থিত এই স্থুতূর 
মেহার-এ আমার আগমন। শুভ লগ্ন সমুপস্থিত। আজই, এখনই আমি 


৮৬ 


91 ৮। 7 সাবিত 


তোমায় দীক্ষা দেবে ৷ তুমি নিকটস্থ নদী থেকে অবগাহন ক'রে এসো ।” 
সান সমাপনাস্তে সর্ববানন্দ যন্ত্রচালিতবৎ মহাপুরুষের সম্মুখে আসিয়া 
উপবেশন করিলেন. দীক্ষা যথারীতি সম্পন্ন হইয়া গেল। 

মুহ্র্তমধ্যে সব্ধানন্দের স্ব শরীরে ছড়াইয়া৷ পড়িল চৈতম্যময় এই 
মন্ত্রের ক্রিয়া। কে যেন উন্মুক্ত করিয়৷ দিল দীর্ঘদিনের আবদ্ধ শক্তির 
প্রচণ্ড নির্ঝর । জড়বুদ্ধি, মহামূর্খ সে সর্ববানন্দ আর নাই। সুপ্ত সিংহ 
এবার জাগ্রত হইয়। উঠিয়াছে। 

অবধৃত কহিলেন, “বৎস, এখন বোধহয় বুঝতে পারছো, এই অরণ্যে 
তোমার আসার পেছনে রয়েছে এঁশী ইচ্ছা । তোমার নিজের ইচ্ছেয় 
এ যোগাযোগ ঘটেনি । আরও কথা আছে, শোন। এই বনভূমি পরম 
পবিত্র, পরম জাগ্রত। পৌরাণিক যুগের মহাতাপস মাতঙ্গমুনির এটি 
অন্যতম তপন্তাপুত স্থান। অদূরে এ জীনবৃক্ষমূলে প্রোথিত রয়েছে 
মুনিবরের স্থাপিত মাতঙ্গেশ শিব-বিগ্রহ । আমার প্রদত্ত মহামন্ত্রের সাহায্যে 
তোমায় সেখানে শক্তিসাধন। শুরু করতে হবে। এ পবিত্র, চিহিত 
ভূমিতে উপবেশন ক'রে সম্পন্ন করতে হবে শবসাধনা। জন্মাস্তরের 
সঞ্চিত সাধনফল তোমার রয়েছে । মহাভাগ্যবান তুমি । পাবে জগন্মাতার 
ছুলতি দর্শন।” 

যুক্তকরে সবর্ধানন্দ নিবেদন করেন, “প্রভু, আপনার আজ্ঞা শিরো- 
ধার্য! নির্দেশ দিন, কবে এ কাজে ব্রতী হতে হবে আমায় ?” 

“কবে নয়, বংস, আজই । রজনীর দ্বিতীয় যামে শুরু কর তোমার 
এই পরম গুহা তত্ত্রসাধন1।” 

“সে কি প্রভু, আজই কি ক'রে তা সম্ভব হবে? এ সাধনার প্রধান 
উপকরণ-_ চগ্ডালের শব। তা কোথায় পাবে ? আর সব উপচারই বা! 
কোথায়? কে-ই বা আমায্র সাহায্য করতে আজ এগোবে ?” 

“নির্বোধ ! এখনো! গুরুর বাক্যে নির্ভরতা আসেনি ! তোমায় যিনি 
এখানে টেনে এনেছেন, সেই মহামায়াই কৃপা ক'রে করবেন সব কিছুর 
ব্যবস্থা । বৎস, তুমি সত্যই ভাগ্যবান, তাই আজ নাটকীয়ভাবে ঘটেছে 


৮৭ 


আসত তক শাখিন্ত' 


তোমার পরমপ্রাপ্তির এমন বিস্ময়কর যোগাযোগ । আর এক কথা । 
আজকের এসব কথ। একান্তভাবে রাখবে গোপন । শুধু পুর্ণীনন্দ ছাড়? 
আর কাউকে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। সে তোমায় প্রয়োজনীয় 
সাহায্য দিতে পারবে। যাও, এবার ঘরে গিয়ে তার সঙ্গে পরামর্শ কর, 
কার্যে অগ্রসর হও ।৮ 

ব্যান্রচম্মের আসন গুটাইয়া, কমগুলু হস্তে সন্ন্যাসী বনমধ্যে অদৃশ্য 
হইয়া গেলেন। 

সর্ব্বানন্দের আর দেরী সহে না, তখনি ব্যাকুল হইয়া ছুটিলেন 
তাহার পুণাদাদার সন্ধানে । 


বাড়ী অবধি যাইতে হইল না পথেই পূর্ণানন্দের সহিত তাহার দেখ।। 
সোৎসাহে তখনি সকল কথ! খুলিয়া বলিলেন। 

সমস্ত বিবরণ শুনিয়। পূর্ণানন্দ আনন্দে অধীর। সার! জীবন ধরিয়। 
এতদিন যে স্বপ্ন দেখিয়াছেন, আজ বুঝি তাহা! সফল হইতে চলিয়াছে। 
অভীষ্ট সাধনের প্রতীক্ষায়ই যে এতগুলি বংসর তিনি কাটাইয়াছেন, 
এজন্যই মেহারের এই ভট্টাচার্ধ্য-গৃহের ভূৃত্যরূপে তিনি বুদ্ধকাল অবধি 
বাস করিয়। আসিতেছেন। 
__ সগ্ত কৃপাপ্রাপ্ত সব্ধানন্দের দিকে তাকাইয়া৷ তাকাইয়া তাহার আঁশ 
আর মিটেনা। বড় অদ্ভুত এই রূপান্তর! এতদিনকার মুর্খ, নিবেবাধ, 
জড়ভরত-প্রায় সেই যুবককে আজ আর খু'জিয়া পাইবার উপায় নাই। 
চোখে মুখে তাহার ফুটিয়। উঠিয়াছে অপরপ প্রতিভার দীন্তি। সন্ন্যাসী 
মহামন্ত্র ঘটা ইয়াছে নূতন জীবনের উন্মেষ ! 

সর্ধবানন্দ কহিলেন, “পুণাদাদা, আমার গুরুদেব বলে গিয়েছেন-_ 
তোমার সঙ্গে পরামর্শ ক'রে সব.কিছু করতে । তুমি আমায় প্রাণাপেক্ষা 
ভালোবাস। আর ছোটবেল! থেকে আমিও তোমার: ওপরই নির্ভর 
ক'রে থাকৃতে শিখেছি। তাই বুঝি গুরুদেব তোমাকেই আমার সাহাব্য- 
কারীরূপে দেখিয়ে দিয়ে গেলেন। কিন্তু শৃন্্ হয়ে এ কাজে তুমি 'জীমায় 


৮ 


তন্ত্রাচাধা সব্বানন্দ 


সাহায্য করবে কি ক'রে? এ বড় আশ্চর্য্য কথা । আমি কিন্ত এর কিছুই 
বুঝে উঠতে পারছিনে ॥ 

“শোন্‌ সর্ব ।- সংক্ষেপে তোকে আজ তোদের ঘরের পুরাণো৷ কথা 
একটু বলি। এ শুনলে আর এতট। আশ্চর্ধ্য হবিনে। তোর ঠাকুরদা, 
বাসুদেব ঠাকুরমশাইর সাধনার কথাই তোকে কিছুটা বলছি” 

শুনেছি, ঠাকুর্দীমশাই ছিলেন এক শক্তিমান তান্ত্রিক সাধক। আর 
তুমি ছিলে তার চিরসহচর, একনিষ্ঠ সেবক । তার অনেক কথা শুধু তুমিই 
জানো । দয়া করে আমায় বলো।” 

নিকটস্থ এক বাগানে গিয়া উভয়ে বসিলেন। পুর্ণানন্দ কহিতে 
লাগিলেন পুরাতন দিনের কথা ।--- 

সব্বানন্দের পিতামহ বাসুদেব ভট্টাচার্য্য ছিলেন শক্তিমন্ত্রে দীক্ষিত 
এক নৈষ্টিক ব্রাহ্মণ । বাস করিতেন বর্ধমানের পূর্ববস্থলী গ্রামে । 

প্রতি নিশীথে এই তান্ত্রিক ব্রাহ্মণ জগন্মাতার আরাধনায় উপবিষ্ট 
হন। ধ্যান জপে প্রহরের পর প্রহর কাটিয়া যায়। অবশেষে একদিন 
দেবীর প্রত্যাদেশ মিলিল৮__“বৎস তূমি এতো অধীর হয়োন!। পূর্্ববঙ্গে 
নিচের রাতানার সারদা রসি ররর বালির যারা 
কর, তোমার সাধন সমাপ্ত কর।” 

অর্ুুর বান্থদেব আর বিলম্ব করেন নাই। স্ত্রী, পুক্র এবং প্রিয় 
ভূত্য সীন্দসহ তিনি মেহার-এ আসিয়া উপস্থিত হন। 

তেজন্ী, সাধননিষ্ঠ বাস্থুদেবকে দেখিলে লোকের মনে স্বতঃই সন্ত্রম 
জাগিয়। উঠে। মেহারের তৎকালীন ভূম্যধিকারী অল্পকাল মধ্যেই তাহার 
প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়েন। ঘর বাড়ী ও জমি জম! দান করিয়। এখানেই 
তাহার স্থায়ী বসবাসের ব্যবস্থা তিনি করিয়া দেন। কিছুদিন পরে 
তন্ত্রাচাধ্য বাস্থদেবকে তিনি গুরুদত্বে বরণ করেন । 

দীর্ঘদিন মেহার-এ থাকিয়! বাসুদেব সাধন ভজন ও তান্ত্রিক ক্রিয়াদি 
করিয়াছেন। কিছু কিছু সিদ্ধাই লাভও তাহার হইয়াছে। কিন্তু শ্যামা 
মায়ের দর্শন লাভ এখন অবধি ভাগ্যে ঘটিয়। উঠে নাই । অবশেষে একদিন 


৮৪ 


ভারতের সাধক 


কামাক্ষ্যাতীর্থ অভিমুখে তিনি যাত্র! করিলেন। সঙ্গে রহিল তাহার 
সাধনার অন্যতম সঙ্গী, প্রিয় শুদ্রভৃত্য পূর্ণানন্ন। 

বাস্থদেব ভট্টাচার্যের সঙ্কল্প- তন্ত্রসাধনার মহাপীঠ, কীমাক্ষ্যাধামে 
ছুশ্চর তপস্তায় ব্রতী হইবেন। এবার অভীষ্ট সিদ্ধ ন! হওয়া! আবধি গৃহে 
ফিরিয়া আসিবেন না। . 

মাসের পর মাস ধরিয়া বাস্থদেব কুচ্ছুসাধন ও দেবীর 'আরাধনা 
চালাইয়া যাইতেছেন। তারপর শেষটায় অন্জলও প্রায় তাগ করিলেন। 
কিন্ত দেবীর দর্শন লাভ হইল না। হঠাৎ একদিন প্রত্যাদেশ মিলিল, 
“বৎস বাসুদেব, এই জন্মে আর আমার দর্শন তুমি পাবে না। তোমার 
নিজের পৌন্ররূপেই আবার জন্ম হবে তোমার । সেই জন্মে হবে সর্ব্ব 
অভীষ্ট পুর্ণ। মাতঙ্গমুনির স্থাপিত মহাদেব-শিল! যে বেদীর নীচে প্রচ্ছন্ন 
রয়েছেন, সেখানে বসে আগামী জন্মে তন্ত্ৰোক্ত সাধন! সম্পন্ন করবে, 
তারপর প্রাপ্ত হবে পরম! সিদ্ধি” 

মন্ত্র ও সাধনবিধিও দেবী জানাইয়া দিয়। গেলেন। 

সাধক বাস্থদেবের ছুই নয়নে তখন কান্নার অশ্রু ঝরিয়া পড়িতেছে । 
কিছুক্ষণ পরে প্রকৃতিস্থ হইয়া! নিকটে অপেক্ষমান পুর্ণীনন্দকে ডাকিয়া 
সব কথা তাহাকে জানাইলেন। 

অতঃপর দেবীর স্বপ্ন প্রদত্ত নির্দেশাদি এক তাম্রফলকে উৎকীর্ণ 
করিয়। রাখ হইল। 

বাসুদেব ভট্টাচার্য্য মেহারে আর প্রত্যাবর্তন করেন নাই। কামাক্ষ্যা 
পাহাড়েই দেবীর পাদপন্প ধ্যান করিতে করিতে তিনি দেহরক্ষা করেন। 
পবিত্র তাত্র ফলকটি সযতনে বহন করিয় ভূতা পূর্ণানন্দ দেশে ফিরিয়া 
আসিলেন। 


পুরাতন স্মৃতিকথ। বলিতে বলিতে বৃদ্ধ পুর্ণানন্দ উনদ্দীপিত হইয়া 
উঠিয়াছেন। সব্ধানন্দকে সেখানে বসাইয়া রাখিয়া তখনি তিনি গৃহে 
চলিয়া গেলেন। ফিরিয়া আসিলে দেখা গেল, তাহার হস্তে. রহিয়াছে 


তস্ত্রাচাধ্য সর্বানন্দ 


বাস্থদেবের রক্ষিত সেই তাম্রফলক। আজিকার সন্ধ্যায় তান্ত্রিক সন্ন্যাসী 
যে মন্ত্র ও সাধননির্দেশ সর্ববানন্দকে দিয়া গিয়াছেন, স্ুত্রাকারে তাহাই 
যে এখানে লিখিত রহিয়াছে । 

আত্মপ্রত্যয়ের স্থুরে পূর্ণীনন্দ কহিলেন, “শোন্‌ সর্ব্ধ, দীর্ঘদিন বাস্থদেব 
ঠাকুরের তল্লী বয়ে এসে যা! বুঝেছি, তাতে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আজকের 
নিশায় তোর সাধন! নিশ্চয়ই সিদ্ধ হবে। শ্যামা মায়ের দর্শন তুই লাভ 
করবি। রাত্রি ক্রমে গভীর হয়ে আস্ছে। চল্‌্। এবার অবধূত ঠাকুরের 
চিহ্নিত জায়গায় তোকে বসিয়ে দি। মায়ের পুজোর উপচার আমি সব 
সংগ্রহ ক'রে আন্ছি।” 

কিভাবে যে এই নিগৃঢ় তস্ত্োস্ত সাধনার ক্রিয়া সফল হইয়! উঠিবে, 
সব্ব্বানন্দ তাহা ভাবিয়। পান না। ব্যগ্র স্বরে প্রশ্ন করেন, “কিন্ত পুণাদাদা, 
শবের যোগাড় কি ক'রে হবে? গুরুদেব যে বলে গিয়েছেন*শবের ওপর 
আরোহণ ক'রে এই চরম সাধনা সমাপ্ত করতে হবে ।” 

পূর্ণীনন্দ সংক্ষেপে কহিলেন, “সেজন্য তোর ভাবনা নেই। মায়ের 
কৃপায় কোন উপচারেরই আজ অভাব ঘটবে না। তুই আমার সঙ্গে 
চলে আয়।” 


রাত্রি গভীর হইয়া আসিয়াছে। অবধৃতের চিহ্নিত জাধন ভূমিতে 
উভয়ে আসিয়া দাড়াইয়াছেন। অমানিশীর সুচিভেগ্ত অন্ধকারে সারা 
ভুবন সমাচ্ছন্ন । আকাশ বাতাস এক ছর্জেয় রহস্তে থম্থম্‌ করিতেছে। 
অরণ্যের নিস্তব্ধতা ভেদ করিয়! শুধু মাঝে মাঝে উত্থিত হইতেছে পেঁচক- 
বাছুড়ের ডানা ঝাপটানি আর সারমেয়-শিবার উৎকট চীৎকার । 

পূর্ণীনন্দ কহিলেন, «সবর, এবার তুই তোর গুরুর নির্দেশ অনুসারে 
সাধনায় বসে যা। যাতিনি বলে দিয়েছেন, অক্ষরে অক্ষরে পালন 
ক'রে যাবি। আর শোন্‌্, আজ রাতে তোর এই শবসাধনার শব হবো 
আমি। শ্বাস রোধ ক'রে এক্ষুণি আমি স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করবো৷। আমার 
দেহের ওপর বসে তুই শুরু করবি তোর সাধন! আর মন্ত্রজপ |” 


ভারতের সাধক 


সর্ব্বানন্দ ভয়ে শিহরিয়! উঠিলেন। কহিলেন, “একি অসম্ভব কথা৷ 
তুমি বলছো পুণাদাদা। তোমার মৃত্যু ঘটিয়ে অর্জন করবে সিদ্ধি? সে 
সিদ্ধিতে আমার কাজ নেই । এ আমি কক্ষনো পারবো না।” 

“শোন্, পাগলামি করিসনে। আমি বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি। আমার এই 
জরাজীর্ণ দেহট! দিয়ে কার কি কাজ হবে, বলতো।? নিজে ঘর সংসার 
কখনো করিনি, তোদের সংসারে থেকে পরপর তিন পুরুষের সেবা 
করলাম। সংসারের সাধ আমার কিছু নেই। আমি শুধু দিন গুন্ছি 
মা-জগদন্বার কপার আশায়। আর ভাবছি,_আমার গুরু বাস্থুদেব 
ভট্টাচার্যের সাধন! মিথ্যে হবার নয়, যে প্রত্যাদেশ তিনি কামাক্ষ্যাধামে 
পেয়েছিলেন, আজ তা৷ সফল হতে যাচ্ছে । এ কাজে আমার এই নগণ্য, 
জরাজীর্ণ দেহটাকে উৎসর্গ করতে পারবো_এ যে আমার মহাভাগ্য রে।” 

এত কথার পরেও সর্ববানন্দের মন সরেনা। নীরবে, নত মস্তকে 
ঈীড়াইয়া ভাবিতে থাকেন, একি অন্তত প্রস্তাব ! কোন্‌ প্রাণে পরম প্রিয় 
পুণাদাদার মৃত্যু ঘটাইবেন? বাল্যাবধি ধাহাকে সখা, সুহৃদ ও 
আশ্রয়রূপে দেখিয়া আসিতেছেন, কি করিয়া তাহার জীবন নাশের কারণ 
তিনি আজ হইবেন ? 

দৃঢন্বরে পূর্ণানন্দ কহিলেন, “যে অভা্ট সাধনের জন্য বান্ুদেব ঠাকুর 
প্রাণপাত ক'রে গেলেন, একবার তা ভেবে গ্যাখ.। স্মরণ কর্‌ তোর 
গুরুর আদেশের কথা । আমার কথাটাও একটু ভাব্‌বি। ওরে, আমার 
শেষ আশা! সফল করার দায়িত্ব ষে রয়েছে তোরই হাতে ।. এটাও জেনে 
রাখিস্। এ দেহ যদি মায়ের আবাহনের কাজে না লাগে, তবে আজ 
রাতেই ডাকাতে-নদীর জলে আমি তা বিসর্জন দেবো 1” 

এ ব্যবস্থা মানিয়া না! নিয়া সর্ধবানন্দের আর গত্যন্তর রহিল না। 
স্বপ্নাবিষ্টের মত তিনি সাধনভূমির দিকে অগ্রসর হইলেন। 

কাজ শুর করার আগেপুর্ণানন্দ সতর্কবাণী উচ্চারণ করিলেন, দ্যাখ, 
জন্মজন্মাম্তরের তপস্তায় এ স্থুযোগ তোর এসেছে। খুব সাবধান! 
'মনে ভয়, ভ্রান্তি, লোভ একটু ঢুকলেই কিন্ত আর রক্ষে নেই.। বীরাচারী 


দন 





সাধনার পথে সুঙ্গমুলোকচারী শক্তির৷ দেখাবে ভয় আর প্রলোভন । 
একটুও টল্বিনে। অভীষ্ট সিদ্ধ না হওয়া অবধি একান্ত নিষ্ঠায় চালিয়ে 
যাবি ধ্যান জপ। আর একটা কথা'। মা আবির্ভতা হয়ে বদি কোন বর 
চাইতে বলেন, বলবি,__সে সব পুণাদাদা জানে ।” 


গভীর নিশীথে বিগতপ্রাণ চগ্ডাল দেহের উপর সর্বানন্দ আসন 
করিয়! বসেন, জপে নিবিষ্ট হন। ধীরে ধীরে শুরু হয় গুরুদত্ত মন্ত্রের 
চৈতন্যময় ক্রিয়া । ধ্যান ক্রমে গাঢ়তর হইতে থাকে । একে একে 
শক্তিসাধনার উচ্চতর স্তর্গুলি তিনি ভেদ করিয়। চলেন । 

রাত্রি আরো! গভীর হয় । মাতৃধ্যানে সর্ববানন্দ একেবারে বিভোর ! 
কোন বাহাজ্ঞানই তাহার নাই। সহসা নৈশ স্তব্ধতার বুক চিরিয়া বাহির 
হয় কাহাদের এ মন্মরভেদী আর্তনাদ? এ আর্তনাদের রেশ মিলাইতে না 
মিলাইতেই সাধনক্ষেত্রটি ঘিরিয়৷ তাহার চারিদিকে শুরু হয় পৈশাচিক 
তাণ্ডব । বিকট চীকারে কর্ণপটাহ ছি'ড়িয়৷ যাইতে চায়। মড়, মড় শবে 
কাহারা ভাঙিতে থাকে বৃক্ষশাখ!? লগ্ভণ্ড করে সার! অরণ্য ? ভূত; 
প্রেত, পিশাচ আর ডাকিনী দলের, একি বীভৎস দাপাদাপি, উল্লাস, 
আর অট্রহাসি- হি-হি-হি ! 
_ পুণাদাদার সতর্কবাণী মনে আছে সব্র্বানন্দের। একৈকনিষ্ঠায় তিনি 
মহামন্ত্র জপ করিয়। চলিয়াছেন। মাঝে মাঝে বীর সাধকের কণ্ঠ হইতে 
নির্গত হয় "মা মা" আরাব ! পৈশাচিক ন্ৃত্যুতাপ্তব ও হট্টগোল 
ছাপাইয়া এ আরাব চারিদিক প্রকম্পিত করিয়া তোলে । 

একি ! আবার কাহার ইন্দ্রজালবলে মুহুর্তে এ দৃশ্য হয় পরিবন্তিত ? 
মুনিজনমোহিনীরূপে অন্তরীক্ষ হইতে নামিয়। আসে অপ্নর! কিন্নরীর দল । 
হাস্ত লাস্ত কৌতুকে তাহার! বারবার প্রলুব্ধ করিতে চায়। কিন্তু বীর 
সাধক সর্ব্বানন্দকে তাহারা টলাইতে পারে কই? ভোজবাজীর মত 
আবার সব কোথায় অদৃশ্য হইয়া যাঁয়। 

এক একবার শোন! যায় আকা শজোড়া মেঘের বজ্গর্জন । মাথার 


চি৩ 


উপরে কড়-কড়াং শব্দে ফাটিয়! পড়ে অশনি! সারা প্রকৃতি আজ কি 
খণ্ড প্রলয়ের মারণ-মহোৎসবে মত্ত হইয়। উঠিয়াছে ? সর্বধানন্দের কিন্তু 
কোন কিছুর দিকেই দৃষ্টি নাই। তিনি নিবিবকার ! 

নিবিড় আধারে সমাবৃত নৈশ আকাশে হঠাৎ কখন আবার ফুটিয়া 
উঠে প্রত্যুষের আলোকচ্ছট।। কাণে আসে পাখীর কাকলী, জেলেডিঙির 
ছপাৎ ছপাৎ শব্দ। অদূরে ডাকাতিয়া নদীতে ধীবরের৷ রাত্রিশেষে মাছ 
ধরিতে যাইতেছে । সেকি ! ইহারই মধ্যে প্রভাত আসিয়। গেল ? তবে কি 
সাধন! তাহার আজ ব্যর্থতায় পধ্যবসিত? তবে কি তাহার ছূর্বল 
সাধন-আধারে গুরুশক্তি কার্য্যকরী হয় নাই? 

সঙ্গে সঙ্গেই মন্ত্রজপের মধ্য দিয়া আসে সত্যের ঝিলিক। উপলঙ্ধি 
করেন-__ এ সবই মায়ার কুহকজাল। নিশাবসানের এখনো অনেক দেরী 
আছে। অন্তরের অন্তস্তল হইতে কে যেন অক্ফুটস্বরে, দ্ার্থহীন ভাষায় 
বলিয়। দেয়, “ওরে ভয় নেই ! রাখিস্নে কোন সংশয়। মায়ের আসন 
নড়ে উঠেছে তোর সাধনার বলে। নিশাবসানের আগেই যে তাকে 
আবিভূর্তি হতে হবে, দিতে হবে কৃপা-প্রসাদ । 

প্রাণহীন চগ্ডালদেহের আসন হঠাৎ কখন চঞ্চল হইয়া ওঠে। দত্ত 
কিড়মিড়, করিয়া ম্বৃত সবলে উখ্িত হইতে চায়। অকুতোভয় সর্ব্বানন্দ 
সজোরে চাপিয়৷ বসিয়া! থাকেন, জগন্মাতার দর্শন না পাওয়া অবধি 
প্রাণ গেলেও তিনি এ ধ্যানাসন ছাড়িবেন না। 

নিজের সর্ধ্বশক্তি কেন্দ্রীভূত করিয়া মায়ের উদ্দেশে তাহা করিতেছেন 
নিবেদন। ধ্যানের ধারা বহিয়। চলিয়াছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। 

একটির পর একটি উপস্থিত হইতে থাকে দৈবী পরীক্ষা । তীব্রবেগে 
ছুটিয়া আসে মায়াশক্তির এক একটি তরঙ্গাভিঘাত। আর বীর সাধকের 
সাধন-প্রাকারে প্রতিহত হইয়া বারবারই তাহা ফিরিয়া যায়। 

সর্ব্বানন্দের শক্তিসাধন। এবার সিদ্ধির দুয়ারে আসিয়া ঈাড়াইয়াছে। 
সমগ্র সত্তায় উপচিয়া উঠিয়াছে চরম উল্লাস। এ যে, মায়ের পদধবনি 
তিনি শুনিতে পাইতেছেন ! 


56 


সরস দিব্য জ্যোতির ছটায় বনভূমি উদ্ভাসিত হইয়৷ উঠিল। আর 
এই জ্যোতিঃরাশি ঘনীভূত হইয়া রূপ পরিগ্রহ করিল সর্ববানন্দের ধ্যেয় 
ইষ্টমূঙ্তিতে। ষোড়শী মহাবিগ্ভারপে জগভ্জননী এবার তাহার সম্মুখে 
দণ্ডায়মানা। সিদ্ধকাম সাধক আসন হইতে ব্যুখিত হইয়! মায়ের চরণ- 
তলে লুটাইয়া পড়িলেন। 

প্রণাম নিবেদনের পরক্ষণেই দেখ দেয় তাহার অত্যাশ্চর্য্য রূপান্তর ! 
নিরক্ষর সাধনভজনহীন সব্ধ্বানন্দের মুখ দিয়া অনর্গলভাবে উদগীত হইতে 
থাকে অনুপম স্তবগাথা, দরদরধারে ঝরিয়া পড়ে প্রেমাশ্রুর ধার! । 

স্বধামাখা কে মা কহিলেন, “বৎস সব্ধ্বানন্দ, তোমার ওপর আমি 
প্রসন্ন হয়েছি। তোমার অভিলষিত বর প্রার্থনা কর।” 

সব্বানন্দ আনন্দে আত্মহারা হইয়া গিয়াছেন। করজোড়ে গদগদ 
ভাষে কহিলেন, “জননী, আজ আমি তোমার দেব-বাঞ্ছিত চরণকমল দর্শন 
করেছি। সব্ধ অভীষ্ট আমার পুর্ণ হয়েছে । জীবনে আর তো কোন 
কামনাই আমার নেই ।” 

“বৎস, আজ তুমি আমার কাছে কিছু চেয়ে নাও ।” 

“মা, বর যদি দিতেই হয়, তবে আমার পুণাদাদাকে ডেকে জিজ্ঞেস 
কর, তার প্রাধিত বর প্রদান কর। এ দ্যাখো» শব হয়ে সে তোমার সম্মুখে 
ভূতলে লোটাচ্ছে।” 

দেবীর নয়নসম্পাতে তখনি পুর্ণানন্দের দেহে প্রাণ সঞ্চারিত হইল । 
নুপ্তোথিতের মত তিনি উঠিয়া বসিলেন। বহু স্তব-স্তুতির পর প্রার্থন। 
করিলেন, “মাগো, করুণা ক'রে যদি আবিভূ্তিই হয়েছো, তবে এ ছুই 
দাসানুদ।(সকে তোমার দশমহাবিগ্ভারূপ প্রদর্শন কর।” 

ভক্তদ্বয়ের নয়ন সমক্ষে একের পর এক প্রকাশিত হইল মহাদেবীর 
এই লীলাময়ীরপ । 

জগজ্জননী এবার কহিলেন, “বৎস, পূর্ণানন্দ, আর কি মনোবাঞ্ 


তোমার রয়েছে, আমায় বল ।” 
“মা, এই আশীর্বাদ কর, আমার এই প্রভুবংশে, তোমার কীর-পুক্র 


সর্বধানন্দের বংশে তোমার পাদপন্পে ভক্তি ষেন অচল! থাকে । আর, 
আজকের এই সাধনগীঠ কখনে! যেন দূষিত না হয়। আরো একটা 
নিবেদন আছে আমার। জমিদার জটাধরের সভায় সবর্ধানন্দ ঘূর্খের মত 
বলে ফেলেছে, আজ পূণিমা তিথি। তোমার ভক্তের মর্ধ্যাদা তোমাকেই 
রক্ষা! করতে হবে মা । অমাবস্তা নিশির এখন শেষ যাম। আমার একান্ত 
প্রার্থনা, মেহারের অন্ধকারময় আকাশকে আজ তুমি পূর্ণচন্দ্রের প্রভায় 
আলোকিত ক'রে তোল ।” 

ভক্তবৎসল দেবী প্রসন্নমধুর কণ্ঠে কহিলেন, “তথান্ত। 

কথিত আছে, সেদিনকার অমানিশায় পুিমার আলোক-উদ্ভাসন 
দেখিয়৷ মেহার-এ চাঞ্চল্য পড়িয়া যায়। এই অলৌকিক ঘটন৷ সম্বন্ধে 
অনুসন্ধান করিতে. গিয়া জমিদার জটাধর সব্ববানন্দের সাধনা ও সিদ্ধির 
কথ, সর্ধ্ববিষ্ঠায় তাহার পারঙ্গম হওয়ার কথ জানিতে পারেন । অনুতপ্ত 
হৃদয়ে বারবার তিনি তাহার মার্জন৷ ভিক্ষা করেন। : 


সর্ধবানন্দের স্থুপপ্ডিত পুত্র, শিবনাথ তাহার রচিত গ্রন্থ “সর্ববানন্দ 
তরঙ্গিনী'তে পিতার সাধনা ও সিদ্ধির তথ্যাদি পরিরেশন করিয়াছেন। 
তিনি লিখিয়াছেন, পৌষ সংক্রান্তির অমাবস্তা। রাত্রে দেবীর দর্শন ও কৃপ। 
সর্ববানন্দ লাভ করেন। আর এই দর্শনের মধ্য দিয়া তাহার সাত 
জন্মের তপস্থা৷ সার্থক হইয়া! উঠে ।%১ 

.সব্র্বানন্দ কোন্‌ বৎসরে সিদ্ধ হন তাহা! একটি বহ-আলোচিত প্রশ্ন । 
তন্ত্রতত্বের প্রসিদ্ধ গবেষক, মনীষী স্যর জন উড্‌রফ. এ সম্পর্কে যাহা 
লিখিয়াছেন তাহার মন্্ার্থ নিয়রূপ £ 


*১ «সর্বানন্দ তরজিনী'-র রচয়িতা শিবনাথ তাহার গ্রন্থে সর্ববানন্দের 
ভাগিনেয় ও অনুগামী সাধক ষড়ানন্দের এক উক্তির উল্লেখ করিয়াছেন । 
ইহাতে বল! হইয়াছে, সর্ববানন্দ পূর্বেকার সাত জন্মে সিদ্ধির জন্ত কঠোর তপস্যা 
করেন এবং ব্রহ্ষময়ীর দর্শনলাভের জন্য নীলাচল, বিদ্ধ্যগিরি, সিদ্ধুশৈল, 
বদরিকা শ্রম, গঙ্জানাগর, বারাণসী ও কামাক্ষ্যায় কুষ্্সাধনে দেহপাত 'করেন। 


টি 


তত্ত্রাচাব্য সব্বানন্ন 


_তন্ত্রসাধক সর্ববানন্দের সিদ্ধিদিবস নির্ণয়ে সাহায্য করার জন্য 
শ্রীদীনেশচন্দ্ ভট্টাচার্য্য আমাকে এক হিসাব দিয়াছেন । এই হিসাবমতে, 
তাহার সিদ্ধিদিবসটি ছিল কোন এক বৎসরের পৌষ সংক্রান্তি, শুক্রবার, 
চতুর্দশী বা অমাবস্তা! তিথি। পুরাতন পঞ্জিকা অনুসন্ধানে দেখা যায়, 
বারে! শত হইতে সতের শত খুষ্টাব্দের মধ্যে পূর্ব্বোক্ত বার ও তিথির 
মিলন ঘটিয়াছিল মাত্র তিনটি পৌষ সংক্রান্তিতে। এই সংক্রান্তিগুলি 
পড়িয়াছে ১৩৪২, ১৪২৬ এবং ১৫৪৮ সালে। 

সব্্বানন্দের বংশাবলীর কালের যে হিসাব রহিয়াছে, তাহার সহিত 
প্রথমোক্ত সালটি একেবারেই মিলে না । শেযোক্তটিও গ্রহণযোগ্য নয়, 
কারণ, কুলপঞ্ী অনুসারে প্রমাণিত হয়_সর্ধবানন্দের অধস্তন পঞ্চম 
পুরুষ, জানকীবল্লভ গুরবাচার্য্য ছিলেন বারভূইয়ার সমকালীন। কাজেই 
আমর! ১৪২৬ খুষ্টাব্দকেই সব্বানন্দের সিদ্ধির তারিখ বলিয়া ধরিয়া! নিতে 
পারি এবং এই সিদ্ধান্তই সমীচীন 1%১ 

অধ্যাপক শ্রীদীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য নানা প্রমাণপঞ্জী আলোচনা করিয়া 
স্থির করিয়াছেন, সর্ববানন্দ ১৪২৬ অথবা ১৪৩৭ খৃষ্টাব্দে তাহার তপস্তায় 
সিদ্ধকাম হন। তাহার মতে, মেহাঁর-এর এই বনুখ্যাত তান্ত্রিক সাধক 
চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে 
জীবিত ছিলেন 1২ 


সিদ্ধপুরুষ বলিয়। সর্ববানন্দের খ্যাতি এবার চারিদিকে বিস্তারিত 
হইতে থাকে । সর্ব্ববিষ্ভাবিশারদ এবং মনীষীরূপেও পণ্ডিত সমাজে তিনি 
প্রতিষ্ঠালাভ করেন। মেহারের জমিদার ভবনে এখন তাহার সম্ভ্রম ও 
প্রতিপত্তির সীম! নাই । 

সাংসারিক ক্ষেত্রের এই যশ, মান ও এশ্বর্য্যের বিস্তার কিন্তু 

*১ স্যর জন উডরফ-এর 'শক্তি আও শাক”, তৃতীয় খণ্ড। 

*২ সর্বানন্দের “সর্বোজ্াস তন্ত্র (ভূমিকা অধ্যাপক শ্রাদীনেশচজ্দ্ 
ভট্টাচার্য্য ) 


৭ ৯৭ 


মহাসাধকের মনে কোন ভাবাস্তর আনতে পারে নাই। এখন হইতে 
নিষ্পৃহ ও নিধিবকার জীবনই তিনি যাঁপন করিতে থাকেন। 

কিছুদিন পরের কথা৷ শীতকাল প্রায় আসিয়। পড়িয়াছে। মেহার- 
এর জমিদার সে-বাঁর পশ্চিম অঞ্চল হইতে কয়েকখানা বুযুল্য শাল 
আনাইয়াছেন। ইহা! হইতে সর্বোৎকৃষ্ট শালখানি বাছিয়া নিয়া তিনি 
শ্রদ্ধাভরে সর্বানন্দকে দান করিলেন । 

জমিদার ভবন হইতে সর্ববানন্দ সেদিন নিজের গৃহে ফিরিতেছেন। 
কাধের উপর মনোরম শালখানি বিলম্বিত রহিয়াছে । বাজারের পথে 
মোড় ঘুরিতেই সম্মুখে পড়িল এক বারাঙ্গনা। 

সব্বানন্দকে এ অঞ্চলের সবাই চিনে, শ্রদ্ধা ও সন্ত্রমও যথেষ্ট করে। 
মেয়েটি আবদারের সুরে কহিল, “বাঃ বাবাঠাকুরের শালটি দেখ ছি 
বড় চমতকার। তা শীত তো আমাদেরও করছে। কিন্তু এমন শাল আর 
ভাগ্যে জুটছে কই ?” 

সব্বানন্দ থমকিয়া দীড়াইলেন। কহিলেন, “বেশতো, মা। ইচ্ছে 
যখন হয়েছে, নিয়ে নে তুই এটা” 

শালখানি তখনি অবলীলায় তাহার গায়ে ছু'ড়িয়া দিয়া তিনি গৃহে 
চলিয়া আসিলেন। 

এ সংবাদ প্রচারিত হইতে দেরী হইল না। সেই দিনই নানা ভাবে 
পল্লবিত হইয়া ইহা জমিদারের কাণে গেল। ক্রোধে তিনি জবলিয়৷ 
উঠিলেন। কি! এতদূর স্পর্দঘা পণ্ডিত সর্ধ্বানন্দের ! তাহার উপহার 
দেওয়। শাল কি না বাজারের এক বারবনিতাকে তিনি দিয়াছেন ! হোন্‌ 
না তিনি বড় সাধক, তাই বলিয়া! জটাধর এ অপমান সহা করিবেন ন! 
__কিছুতেই না। এ অঞ্চলের ভূম্যধিকারী তিনি, তাহার নিজের একটা 
মান সম্ভ্রম আছে। 

সবর্বানন্দ ঠাকুরকে তখনি ডাকাইয়া আনা হইল । জমিদার কুন্ধন্বরে 
কহিলেন, “ঠাকুর, দেখছি আপনার স্পর্ধা একেবারে সীমা ছাড়িয়ে 
গেছে। কত সমাদর ক'রে দামী শালখানি আমি আপনাকে দিয়েছিলাম, 


তা কোথায় রেখেছেন ব! কাকে দিয়েছেন, শ্লীগগির বলুন।” 
কোন কিছু ভাবিয়া চিন্তিয়া উত্তর দিবার আগেই সর্ববানন্দের মুখ 
দিয়া সহস! বাহির হইল, প্ঘরেই তা রয়েছে । আছে গৃহিণীর কাছে।” 
জটাধর ক্রোধে এবার ক্ষিগুপ্রায় । এই বুঝি সিদ্ধ সাধকের সত্যনিষ্ঠা ! 
উত্তেজিত স্বরে কহিলেন, «খুব ভাল কথা। এক্ষুনি সে শালখানা 
আনিয়ে দিন তো। আমার প্রয়োজন আছে 1” 
জগন্মাতার দর্শন লাভের পর হইতেই সব্বানন্দ যেন তাহার কোলের 
সন্তানটি হইয়। গিয়াছেন ! মায়ের উপর সব কিছু ছাড়িয়! দিয়া সিদ্ধ 
সাধক একান্তভাবে হইয়াছেন মাতৃনির্ভওর | নিজে তিনি যন্ত্র, আর তাহার 
যন্ত্রী হইতেছেন মা ! 
কেন যে হঠাৎ তিনি বলিলেন- শালখানা স্ত্রীর কাছে রহিয়াছে, 
তাহ! তাহার নিজেরই বোধগম্য হইতেছে না। ভিতর হইতে কে যেন 
এ সন্কট সময়ে তীহার মুখ দিয়া একথা বলাইয়া দিল। 
ইষ্টদেবীই এ বিপদে ভরসা । তাহারই নাম স্মরণ করিয়। সর্র্ধানন্দ 
ভাগিনেয় ষড়ানন্দকে নিকটে ডাকাইলেন। কহিলেন, “ওরে এক্ষুনি 
একবার বাড়ীতে যা । তোর মামীমার কাছ থেকে আমার নৃতন শালখানা 
চেয়ে আন্‌ 1” 
ষড়ানন্দকে তাড়াতাড়ি মাতুল ভবনে ছুটিতে হইল। সব্র্বানন্দের 
শয়নকক্ষের কাছে দাড়াইয়। মাতুলানী বল্লভা দেবীকে কহিলেন, “মামার 
নৃতন শীলখানা এখনি চাই, দিন্‌। বড় তাড়াতাড়ি ।” 
_বল্পভা দেবী কিন্ত তখন ঘরে নাই, নিকটেই প্রতিবেশীর বাড়ীতে 
গিয়াছেন। এদিকে ষড়ানন্দ শীলের জন্য টেঁচাইতেছেন। 
হঠাৎ ঘরের দ্বার উন্মুক্ত হইয়া! গেল। বাহির হইল একখানি সুডৌল 
চম্পকবরণ হাত, দিব্য জ্যোতি তাহা হইতে ঠিক্রাইয়া পড়িতেছে। 
মৃহ্র্তমধ্যে কারুশিল্পখচিত মূল্যবান শালটি ষড়ানন্দের দিকে নিক্ষেপ 
করিয়াই হাতখানি অদৃশ্য হইয়া গেল। 
ষড়ানন্দ চমকিয়। উঠিলেন। তাইতো । এ কি! এ হাত তে৷ তাহার 


৪৪ 


মামীমার নয়। “মামীমা মামীমা” বলিয়া চীৎকার করিয়া তিনি শয্যা 
গৃহে ঢুকিয়া পড়িলেন। কিন্তু কই, কোথাও তো৷ কেহ নাই। 

ইতিমধ্যে বল্পভ1 দেবী বাড়ীতে ফিরিয়া আসিয়াছেন। তিনিও 
তেমনি অবাক । শীলের খবর কিছুই জানেন না। তাছাড়া, ভিনি এতক্ষণ 
এখানেই ছিলেন না। 

ষড়ানন্দ বুঝিলেন, এ কাণ্ড লীলাময়ী মা মহামায়ার। প্রিয় পুক্র 
সর্ব্বানন্দের মান সম্ভ্রম রক্ষা করার জন্যই তাহার এই অলৌকিক 
আবির্ভাব ! মায়ের অপার করুণার কথা ভাবিতে ভাবিতে ষড়ানন্দের ছুই 
নয়ন অশ্রদতে ভরিয়া উঠিল। 

শাল নিয়া মাতুল সর্ধবানন্দের কাছে তিনি ফিরিয়া আসিলেন। 
এদিকে জমিদার জটাধরও পাইক্‌ পাঠাইয়া বারবনিতার গৃহ হইতে সেই 
শালখানি উদ্ধার করিয়া আনিয়াছেন। ৰ 

কিন্ত একি আশ্চর্য্য ব্যাপার ! ছুইখানি শালই যে হুবহু এক রকম। 
কোন্টি যে তিনি সর্ব্বানন্দকে দান করিয়াছিলেন তাহা তো কিছুতেই 
নির্ণয় করিতে পারিতেছেন না ! 

এতক্ষণে জমিদার মহাশয়ের চৈতন্যোদয় হইল। বুঝিলেন, প্রিয় 
পুলের মর্যাদা রাখিতে জগজ্জননী নিজেই আজ আসিয়াছিলেন। 

অন্থুশোচনায় জটাধরের সারা'অন্তর ভরিয়া উঠিল । শক্তিধর সাধকের 
কাছে বারবার তিনি ক্ষমা! প্রার্থন! করিতে লাগিলেন। 


মেহার-জীবনের পরিবেশ কিছুদিন হইতেই সর্ববানন্দের তেমন 
ভালো লাগিতেছিল না! । এই ঘটনার পর বিরক্তি তাহার আরো বাড়িয়৷ 
গেল। স্থির করিলেন, এখানে আর নয়, দেশ ছাড়িয়া এবার কাশীবাসী 
হইবেন। নীরব সাধনার মধ্য দিয়া বাকী জীবনটা সেখানেই কাটাইয়! 
দিবেন। কিন্ত একি অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত! আত্মপরিজন ও ভক্তদের 
মাথায় আকাশ ভাঙিয়। পড়িল। যুক্তিতর্ক, আবেদন, ক্রন্দন সব কিছুই 
হইয়। গেল ব্যর্থ। স্ধ্ধানন্দ অবিচল রহিলেন। 


১৩০ 


তন্ত্রাচার্য্য সর্বানন্দ 


পত্রী বল্পভা দেবীর নয়ন ছু'টি অশ্রুসজল হইয়া উঠিয়াছে। সব্ধর্বানন্দ 
প্রশান্ত কণ্টে তাহাকে কহিলেন, “ওগো, তুমি এমন উতলা হয়ো না । ভয় 
নেই। শীগগরই তুমি মুক্তিলাভ করবে । আজ আর কান্নাকাটি ক'রে 
অমঙ্গল ডেকে এনো না।” 

পুর শিবনাথ মন্দাহত হইয়! নীরবে বসিয়া আছেন। সবর্বানন্দ 
সন্পেহে তাহাকে কাছে ডাকিয়া! আনিয়! আশ্বাস দিলেন। তারপর কর্ণে 
দিলেন শক্তি সাধনার সিদ্ধমন্ত্র ৷ 

ভক্ত, অনুরাগী ও দর্শনার্থীদের একে একে আশীর্বাদ জানাইয়া 
চিরতরে মেহার ছাড়িয়। তিনি রওনা হইলেন। সঙ্গে চলিল বিশ্বস্ত, বৃদ্ধ 
ভৃত্য পূর্ণানন্দ আর প্রিয় ভাগিনেয় ষড়ানন্দ। এ সময় সর্ববানন্দের বয়স 
প্রায় পঞ্চাশ বৎসর । 


বারাণসীর দিকে চলিতে চলিতে সেদিন তাহারা বশোহরের অন্তর্গত 
সেনহাটিতে আসিয়। পেঁবছিয়াছেন। যশোহর-রাজের দ্বারপপ্ডিত, প্রবীণ 
তন্্রাচার্য্য চন্দ্রুড় আগমবাগীশের বাসস্থান এইখানে । সব্র্বানন্দ ইতিপূর্বে 
শুনিয়াছেন, আগমবাগীশ মহাশয়ের গৃহে তন্ত্রশাস্ত্রের ছশ্প্রাপ্য গ্রন্থের 
এক মূল্যবান সঞ্চয় রহিয়াছে । ভাবিলেন, কাশীধামে যাওয়ার আগে 
আগমশাস্ত্রের ই একখান গ্রন্থ রচন। করিয়া নিলে মন্দ কি? কিন্তু 
দশ বিশ দিনে একাজ সম্পন্ন হইবে না। এজন্য অন্ততঃ কয়েকমাস 
সেনহাটিতে তাহার থাক। প্রয়োজন। এই উদ্দেশ সাধনের জন্য 
আগমবাগীশের গৃহেই তিনি আশ্রয় নিলেন। 

আত্মপরিচয় দিলে অসুবিধা অনেক। কারণ, মেহারের সিদ্ধপুরুষ 
সর্ববানন্দের নাম তখন চারিদিকে ছডুইয়া পড়িয়াছে। সেনহাটিতে 
তিনি রহিয়াছেন জানিলে, লোকে অনর্থক ভীড় বাড়াইবে। কাজেই 
নিজের পরিচয় তাহাকে এসময়ে গোপন করিতে হইল । সকলে জানিল, 
আগম শাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য পূর্বাঞ্চলের এক শিক্ষার্থী রাজপণ্ডিতের 
কাছে আসিয়। বাস করিতেছে । 


১৬১ 


ভারতের সাধক 


ইতিমধ্যে বেশ কিছুদিন কাটিয়া গিয়াছে । হঠাৎ সেদিন যশোহর 
রাজসভায় এক দিঘ্বিজয়ী পণ্ডিত আসিয়া উপস্থিত। তাল ঠকিয়া৷ এই 
পণ্ডিত চন্দ্রচুড় আগমবাগীশকে তর্কযুদ্ধে আহবান জানাইলেন। নির্দিষ্ট 
দিনটি যতই আঁগাইয়া আসিতেছে রাজ-পণ্ডিত ততই ভীত হইয়৷ 
পড়িতেছেন। এ বুদ্ধ বয়সে আজকাল মাঝে মাঝে তাহার স্মতি বিভ্রম 
দেখা দেয়। পরাজিত হইয়। কি শেষটায় লোক হাসাইবেন ? এ বিপদ 
হইতে উদ্ধারের কোন উপায়ই তিনি ভাবিয়া পানন]। 

আগমবাগীশের উদ্বেগ ও বিষণ্নতা সবর্বানন্দ লক্ষ্য করিয়াছেন। মন 
তাহার সমবেদনায় ভরিয়া উঠিল। তাইতো, আশ্রয়দাতা! বৃদ্ধ পণ্ডতকে 
এবার রক্ষা না করিলে তো আর চলেন । 

সবিনয়ে তাহাকে কহিলেন, “আপনি এই তর্কযুদ্ধ নিয়ে কোনই 
দুশ্চিন্তা করবেন না । এ সম্পর্কে যা কিছু কর্বার আমিই কর্ছি। আমিই 
দিথিজয়ীর সম্মুখীন হবো।” 

“সে কি বাবা ! সে যে এক দিকৃপাল পণ্ডিত। তীকে তুমি কি ক'রে 
পরাস্ত করবে ? এযে অসম্ভব কথা ।” 

“আমার কথায় বিশ্বাস করুন, সত্যিই এ নিয়ে আপনার ভাবন। 
করার কিছু নেই। জগজ্জননীর প্রসাদে এ অসম্ভব সম্ভব হবে। আপনি 
রাঁজসভায় আজই জানিয়ে দিন, দগ্বজয়ী পণ্তিত আগে আপনার ছাত্র 
সব্বানন্দের সঙ্গে বিচারে জয়ী হোন, তারপর প্রয়োজন হলে আপনি 
সভায় অবতীর্ণ হবেন ।” 

রাজসভায় এই প্রস্তাব জানাইয়া দেওয়া হইল। সেইদিনই রাত্রে 
দিথ্বিজয়ী পণ্ডিত এক স্বপ্র দেখিলেন, _জগন্মাতা তাহাকে উদ্দেশ করিয়। 
বলিতেছেন, “ওরে, তোর সাহস তো! দেখছি কম নয়! আগমবাগীশের 
ছাত্র, মেহার-এর সর্ববানন্দের সঙ্গে তর্কযুদ্ধ করতে এগিয়েছিস্‌! সেষে 
সিদ্ধপুরুষ, আমার কৃপাপ্রসাদ পেয়ে হয়েছে সর্বববিগ্ঠাবিশারদ। তাকে 
পরাস্ত করার আশ! ত্যাগ কর্‌।” 

পরদিন প্রত্যুষেই দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত সেই স্থান ত্যাগ করিলেন। 


১৪০৭ 


তত্ত্রাচারধয সর্বানন্দ 


যাইবার আগে বলিয়। গেলেন” দেবীর বলে বলীয়ান প্রতিছন্দীর সঙ্গে 
যুঝিবার মত শক্তি তাহার নাই। 

চন্দ্রূড় আগমবাগীশ ইফ ছাড়িয়া বাচিলেন। সব্বানন্দের প্রতি 
কৃতজ্ঞতায় মন তাহার ভরিয়া উঠিল। 

দিখ্িজয়ীর স্বপ্রের কথ। তাহার কাণেও গিয়াছে । তবে তো, মেহার- 
এর বহুখ্যাত সিদ্ধপুরুষ সর্ববানন্দই আত্মগোপন করিয়া আছেন তাহার 
গৃহে । এ যে তাহার মহাভাগ্য ! 

সঙ্গে সঙ্গে পণ্ডিতের মনে এক আশার ভালে উকি দিতে থাকে। 
সর্ববানন্দকে কি স্থায়ীভাবে তাহার গৃহে রাখা! বায় না? নিজের এক 
বিবাহযোগ্যা কন্যা রহিয়াছে, যেমন করিয়াই হোক, এ কন্যাকে তিনি 
সব্ধানন্দের হাতে সম্প্রদান করিবেন। 

সর্ববানন্দকে ডাকিয়া কহিলেন, “বাবা, তুমি আঁজ আমার মানসম্ত্রম 
রক্ষা করেছে৷ । আশীব্বাদ করি, দীর্ঘজীবী হও, সর্বত্র জয়ী হও ।” 

পরিচয় প্রকাশ পাইয়া গিয়াছে, এবার আর।এখানে থাকা যায় না । 
সর্ব্বানন্দ উত্তরে কহিলেন, “আপনার আশীষ পেয়ে কৃতার্থ হলাম । আজ 
আমার একটা নিবেদন আছে । এতদিন আপনার গৃহে থেকে আগম- 
শাস্ত্রের ছশ্প্রাপ্য গ্রন্থসমূহ আলোচনা করেছি, তাতে যথেষ্ট লাভবানও 
হয়েছি । এবার আমায় বিদায় দিন, আমি কাশীধামের দিকে যাবো । 
সেখানে যাবার সঙ্কল্প নিয়েই ঘর ছেড়ে বেরিয়েছি 1” 

“কাবা, আমায় তুমি শিক্ষক বলে এতদিন মেনে নিয়েছিলে। কিন্তু 
গুরুদক্ষিণ। দিলে কই ?” 

“বেশতো । আজ্ঞা করুন, কি দক্ষিণা আমি দেব ।” 

“আমার কন্যা! স্বয়ংপ্রভ। বর্তমানে বিবাহযোগ্যা হয়েছে । সর্ববাংশে 
সে তোমার উপযুক্ত। তাকে তুমি গ্রহণ কর। এখানে আমার গৃহে 
নৃতন ক'রে গাহস্থ্যধন্ম পালন করতে থাক। তুমি এতে রাজী হও, তবেই 
আমার গুরুদক্ষিণ পাওয়া হবে 1” 

সর্ধধানন্দ নীরবে নতমস্তকে দীড়াইয়। রহিয়াছেন। 'একি পরীক্ষায় 


৬৬৩ 


ভারতও পাধক 


মহামায়। আজ তাহাকে ফেলিলেন ! গুরুদক্ষিণা দানের প্রতিশ্রুতি 
নিজেই দিয়! বসিয়াছেন, তাহা পালন না করিলে ধন্মে পতিত হইবেন। 
আবার কাশীতে না গেলেও, নিভৃত সাধনার যে সঙ্কল্প নিয়াছেন তাহা! 
সিদ্ধ হইবে না। তন্বশাস্্ প্রচারের জন্য যে গ্রন্থাদি রচনার পরিকল্পন। 
রহিয়াছে, এবার তাহাও বুঝি বান্চাল হইয়া যায় । 

সর্ববানন্দের সমস্তার কথা বুঝিয়া নিতে চন্দ্ুড় আগমবাগীশের দেরী 
হয় নাই। তাহাকে আশ্বাস দিয়া কহিলেন, “বাবা, এখাঁচন থাকলে 
তোমার সাধনার কোন বিদ্ব হবে বলে আমি মনে করিনে। আমাদের 
বংশ প্রসিদ্ধ তান্ত্রিকের বংশ। আমার কন্যাকে তুমি শক্তিরূপে গ্রহণ 
কর। আরও একটা কথা। তন্ত্রশাস্ত্রের নিগৃঢ় ক্রিয়া ও সাধন পদ্ধতির 
কথাই শুধু লোকে জানে, দূর থেকে ভয় পেয়ে সরে থাকে । তুমি এ 
সম্বন্ধে গ্রস্থাদি রচনা ক'রে লোকের কল্যাণ সাধন কর। এখানে থাকৃলে 
তোমার এ কাজের সাহাষ্যই হবে 1 

সর্ববানন্দকে আগমবাগীশের কন্যার পাণিগ্রহণ করিতেই হইল। 
অতঃপর এখানে থাকিয়া নিজেকে তিনি সাধন ভজন ও গ্রন্থুরচনার কাজে 
ঢালিয়া দিলেন। এই সময়েই তাহার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ “সব্বোল্লাস তন্ত্র'-এর 
রচনা সমাপ্ত হয়। বিবিধ তন্ত্রশান্ত্ত হইতে সঙ্কলন করিয়া মূল্যবান 
তথ্যাদি ইহাতে তিনি সন্নিবেশিত করেন । 

“নবার্ণৰ পুজা পদ্ধতি' ও “ত্রিপুরার্চন দীপিকা? নামক ছুইটি তন্্গ্রন্থও 
তাহার রচিত বলিয়া অনেকে মনে করেন। কিন্তু এ সম্পকে প্রকৃত 
তথ্য এখনো নির্ণীতি হয় নাই। প্রথম 'গ্রস্থ্টির হস্তলিখিত পাগুলিপি 
কাশ্মীরের রঘুনাথ মঠে রক্ষিত আছে। দ্বিতীয়টি মধ্যভারত হইতে সংগৃহীত 
হইয়াছিল। 

সেনহাটিতে কয়েক বৎসর বাস করার পর সর্ধবানন্দের একটি 
পুক্রসম্তান জন্মে।* তাহার নামকরণ কর! হয় শিবানন্দ। এবার আর 

* সর্ধবানন্দের পুত্রদ্বয় শিবনাথ ও শিবানন্দের সন্তান সম্ভতিগণ উত্তর- 


কালে বহু শাখ প্রশাখায় বিভক্ত হইয়া পড়েন। ইহার! সর্ববিদ্যার বংশ 
১০৪ ঠ 


তন্ত্রাচাব্য সব্বানন্দ 


সর্ব্বানন্দকে সেনহাটিতে ধরিয়া! রাখা সম্ভব হইল না । অনুচর পূর্ণানন্দ ও 
ভাগিনেয় ষড়ানন্দকে সঙ্গে নিয়া পদত্রজে তিনি কাশীধামে আসিয়া 
উপস্থিত হইলেন। 


তখনকার দিনে কাশীর গণেশ মহল্লার সারদা মঠ-এর খ্যাতি শুন। 
যাইত।* অনেকের মতে আচাধ্য শঙ্কর ছিলেন ইহার স্থাপয়িতা। এই 
মঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভদ্রকালীর বিগ্রহ দর্শন করিয়। সব্্বানন্দ আনন্দে 
উৎফুল্ল হইয়া উঠেন। এই জাগ্রত বিগ্রহের সানিধ্যে, এই মন্দিরেই তিনি 
অবস্থান করিতে থাকেন । 

মতস্ত, মাংস, মগ্য প্রভৃতি সহযোগে সব্বানন্দ মায়ের আরাধনা 
করেন, চক্রানুষ্ঠান করেন। কাশীর শৈব ও দণ্তী সন্ন্যাসীরা সেদিন ইহা 
মোটেই স্ুুচক্ষে দেখেন নাই । এই নবাগত তান্ত্রিক সাধককে বিতারণের 
জন্য তাহারা তৎপর হইয়া উঠেন। 

কাশীতে বরাবরই তন্ত্রসাধকের সংখ্য। বড় অল্প, শৈব ও বৈদাস্তিক 
সন্গ্যাসীদের প্রতাপ ও প্রতিষ্ঠাই এখানে বেশী। উহাদের বিরুদ্ধে 
একাকী দগ্তায়মান হইয়া সর্ববানন্দ কি করিতে পারেন? তাছাড়া, এই 


বলিয়া বিখ্যাত। ত্রিপুরা, নোয়াখালি, যশোহর, খুলনা, বরিশাল প্রভৃতি 
অঞ্চলে এই বংশধারা বিস্তৃতি লাভ করে, বাংলার বহু অভিজাত পরিবারের 
দীক্ষাগুরুদ্ূপে ইহারা সম্মানিত হইয়া উঠেন। এই বংশে বহু শক্তিমান 
সাধক ও খ্যাতনামা গ্রনস্থকারেরও আবির্ভাব হইয়াছে। 

সর্বানন্দের অধশ্তন পঞ্চমপুরুষে, এই বংশে তন্ত্রসিদ্ধ সাধক জানকীবল্পভ 
গুর্বাচার্যের জন্ম হয় । বিক্রমপুরের রাজা কেদার রায় ইহাকে গুরুত্বে বরণ 
করিয়াছিলেন। সাধক গুর্বাচার্য্যের অলৌকিক শক্তি বিভূতি সম্বন্ধে আজো 
নানা কাহিনী প্রচলিত রহিয়াছে । কথিত আছে, একবার তাহার ভক্ত ও 
শিয়াদের মনে প্রত্যয় জাগাইয়া তোলার জন্ত এই শক্তিধর সাধক মৃত্তিকা! 
নিশ্মিত শ্টামা-বিগ্রহের চরণে কুশের আঘাত দ্বারা রক্ত নিঃস্থত করাইয়াছিলেন। 

* পরবর্তীকালে ইহা রাজগুরু-মঠ নামে পরিচিত ইইয়া উঠে। 


১৩৫ 


ভারতের সাধক 


শহরে তিনি নুতন আসিয়াছেন, কোন সহায়সম্পদও তাহার নাই। 

দণ্তীদের ষড়যন্ত্র ও নির্ধ্যাতন কিন্তু বাঁড়িয়াই চলিল। শেষকালে 
আর কোন উপায় না দেখিয়া! সর্ববানন্দ তাহার শক্তি বিভ্ুতি প্রয়োগ 
করিলেন। কথিত আছে, উগ্রপন্থী দণ্তীরা এই সময়ে যখনি আহারে 
বসিতেন তখনি দেখা যাইত, কোন্‌ এক অদৃশ্য শক্তির ইঙ্গিতে তাহাদের 
ভোজনপাত্রের উপর নিক্ষিপ্ত হইতেছে মস্ত মাংস ইত্যাদি বামাচারী 
আহাধ্য। একাধিকবার এভাবে নিগৃহীত হওয়ার পর বিরুদ্ধবাদী 
সন্গ্যাসীরা সব্বানন্দের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করিতে বাধ্য হন । 


এ ঘটনার পর হইতে যোগৈশ্বধ্যসম্পন্ন মহাপুরুষ বলিয়! সব্বানন্দের 
খ্যাতি কাশী অঞ্চলে প্রচারিত হইতে থাকে । ত্রিতাপদগ্ধ বু নরনারী এ 
সময়ে তাহার আশ্রয় গ্রহণ করিতে থাকেন। সর্বত্র তিনি পরিচিত হইয়া 
উঠেন অবধৃত-মহারাজ নামে। 

সর্ধ্ধানন্দ কতদিন কাশীধামে অবস্থান করেন সে সম্বন্ধে নিশ্চয় করিয়া 
কিছু জানা যায় না। তাহার উত্তরসাধক পুর্ণীনন্দ এবং ষড়ানন্দের জীবন- 
তথ্যও সাধারণের কাছে অজানা রহিয়াছে। 

দীর্ঘকাল লোকালয়ে বসবাস করার পর প্রবীণ সাধক সব্বানন্দ 
বাহির হইয়া পড়েন হিমালয়ের পথে । কাশীর ভক্ত ও শিষ্যদের কাছে 
বিদায় নিয়া বদরিকাশ্রম অভিমুখে তিনি অগ্রসর হন। 

পরবর্তী পর্য্যায়ে এই সিদ্ধ মহাপুরুষের জীবনে নামিয়া৷ আসে 
রহস্তঘন কুহেলিকার আবরণ। তস্ত্রোক্ত শক্তিসাধনার নিগৃঢ়তম ক্রিয়া 
সমূহ উদ্যাপনের জন্য গুরুর নির্দেশে তিনি আত্মগোপন করেন। শ্রেষ্ঠতম 
সিদ্ধি ও যোগৈশ্রর্্য হয় তাহার করতলগত। 

শক্তিসাধনার বিশিষ্ট তথ্যানুসন্ধানী স্তর উডরফ, কিন্তু তাহার পূর্ব 
উল্লেখিত গ্রন্থে মহাসাধক সর্ধবানন্দের শেষ জীবনের কথাপ্রসঙ্গে এক 
চমকপ্রদ সংবাদ পরিবেশন করিয়াছেন-_ 

“জনশ্রুতি রহিয়াছে যে, সব্বানন্দ এখনও-_এই কয়েকশত বৎসরের 


১৯০৬ 


তন্ত্রাচার্্য সর্বানন্দ 


ব্যবধানেও, কায়ব্যুহ যোগাভ্যাসের সাহায্যে জীবিত আছেন, আর সিদ্ধ 
সাধকদের অধ্যুষিত কোন পবিত্র ও গুপ্ত সাধনগীঠই এখন হইয়াছে 
তাহার আশ্রয়স্থল । ইতিপুবের্বে আমার কোন বিশ্বস্ত সংবাদদাতার সহিত 
এক বিশিষ্ট সিদ্ধপুরুষের সাক্ষাৎ ঘটে । এই সিদ্ধপুরুষটি তাহাকে জানান 
যে, কিছুকাল পৃবে্রে চম্পকারণ্যে ক্রমাগত কয়েকমাস ধরিয়া মহাতান্ত্িক 
সব্ববানন্দের সহিত তাহার দেখাশুনা! হইয়াছিল। ইহার পর পূর্বোক্ত 
সিদ্ধপুরুষ স্থানাস্তরে চলিয়! যান, কাজেই সর্ববানন্দের আর কোন সংবাদ 
তাহার পক্ষে রাখা জন্ভব হয় নাই |” 

শক্তিসাধনার চরম স্তরে পৌছিয়।৷ মহাতান্ত্রিক সবর্বানন্দ তাহার 
জীবনের চারিদিকে ষে রহস্তঘন যবনিকা টানিয়া দেন, আজিও তাহা 


অন্ুদ্ঘাটিত রহিয়া গিয়াছে। 


নালন্ডি 


নানককে নিয়া কালু বেদী এক মহা! দুশ্চিন্তায় পড়িয়াছেন। বংশের 
একমাত্র পুক্র সে, সকলেরই আশা-ভরসা'। কিন্ত ঘরসংসারে তাহার 
একটুকও মন নাই, নাই লেখাপড়ায় কোন মনোযোগ । ক্ষেত খামার 
সামান্য কিছু আছে, কিন্ত তাহাতে কুলাইয়! উঠে কই? কালু -বেদীকে 
তাই নিতে হইয়াছে জমিদার সেরেস্তায় হিসাব নবীশের কাজ। 

এখানকার মুসলমান জমিদার, রায় বুলার বড় সভ্জন, ধন্মপরায়ণ। 
কালুকে স্রেহের চোখে তিনি দেখেন। গ্রামে তাই আজকাল কালুর 
প্রতিপত্তি বাঁড়িতেছে। কঠোর পরিশ্রমের ফলে সংসারে আসিতেছে 
স্বচ্ছলতা । কিন্ত নানক মানুষ না হইলে সবই যে পণুশ্রম। 

ছেলেকে গ্রামের পাঠশালায় দেওয়া হইয়াছিল, কোন লাভ হয় 
নাই। পুথিপত্র নিয়৷ এক দণ্ডও সে বসিতে চাঁয় না। পথে প্রান্তরে, 
বনে জঙ্গলে আপন খেয়াল খুশীমত ঘুরিয়! বেড়ায়। 

পাঠের জন্য পণ্ডিত তাড় দিলে বিজ্ঞের মত উত্তর দেয়, “এসব ছা ইভন্ম 
পড়ে কি হবে? তার চেয়ে ঈশ্বরের নাম নিয়ে থাকাই তো৷ অনেক ভালো, 
সংসার থেকে তরে যাওয়া যায়।; 

বালক পুজ্রের মুখে একি সব বড় বড় কথ! ! শুনিয়া কালু বেদীর 
গ! জলিয়া যায়। তিরস্কার করিয় কহেন, “এতটুকু ছেলে, সংসার কাকে 
বলে তা জানিস্নে, সংসার থেকে উদ্ধার পাবার কথা নিয়ে তোর এত 
মাথা ঘামানে। কেন রে বাপু % 

নৃতন পয়সা-কড়ি হইয়াছে, কালু বেদী সেদিন তাই ঘটা করিয়াই 
পুত্রের উপনয়ন দিলেন। সারা গাঁয়ের লোককে আকষ্ঠ পুরিয়! খাওয়ানো 


১৬৮ 


হইল। কিন্তু সেই উৎসব অনুষ্ঠানেই কি নানককে নিয়া কম ঝামেলা ? 
পুরোহিতের সাথে কি কুতর্কই না যে জুড়িয়া দিল।_ শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান 
দিয়ে কি লাভ? যজ্জসত্র গলায় ঝুলিয়ে কোথায় কোন্‌ অমর লোকে 
পৌছানো যাবে? সুতোর মালার চাইতে ঈশ্বরের নামের মালাই কি 
অনেক বেশী ভালে নয়? তাতেই কি প্রকৃত কল্যাণ আসে না ?__ 
এই সব মন্তব্য আর প্রশ্নবাণে বালক উপস্থিত সবাইকে ব্যতিব্যস্ত 
করিয়া তোলে । পুজ্রের সেদিনকার এ ওঁদ্ধত্যে কালু বেদীর মাথা হেট 
হইয়া গিয়াছে । 

জননী তৃতপ্তার উৎকণ্ঠাও বড় কম নয়। সুযোগ পাইলেই পুক্রকে 
বোঝান, “ওরে, মন দিয়ে লেখাপড়া কর। আর পাঁচজনের মত চলতে 
চেষ্টা কর। দেখছিস্‌ তে! বুড়ো! বাপ খেটে খেটে সার! হয়ে যাচ্ছে। 
এখনে তৃই যদি বুঝে-স্থজে না চলিস্‌, তবে যে এই গেরস্তির সব কিছুই 
তলিয়ে যাবে” 

মায়ের মিনতি আর পিতার তিরস্কার সবই' হয় ব্যর্থতায় পর্য্যবসিত। 
সংসার-বিরাগী বালক চোখে মাখিয়াছে কোন্‌ অজানার অন্ুরাগ-অঞ্জন, 
তাই আপন ভাবতন্ময়তা নিয়া দিনের পর দিন মনের আনন্দে সে ঘুরিয়া 
ব্ড়োয় পথে প্রান্তরে, বনে-জঙ্গলে। মুখে সদাই লাগিয়! থাকে তাহার 
নিজের রচিত ভজন্গানের স্থুর। 

দায়িত্ববৌধহীন এই ছেলেকে নিয়াকি করা যায়? কালু বেদী 
একদিন ক্রোধে অগ্নিশন্মী হইয়া উঠিলেন। লক্ষীছাড়া ছেলেকে তিনি 
সায়েস্তা না করিয়। ছাঁড়িবেন না । এবার হইতে শুরু হইল পুত্রের উপর 
তাহার কঠোর নির্যাতন । 


জমিদার রায় বুলার বড় ভালবাসেন কালুর এ পুক্রটিকে। কি যেন 
এক অদ্ভুত আকর্ষণ রহিয়াছে এই বালকের ভাববিহবল চোখ ছুইটিতে। 
বনের পাঁধীর মত সার! দিন সে গান গাহিয়া বেড়ায়। সহজ সত্যের 
কথা, ধর্দের মূল কথা৷ অবলীলায় এক একদিন এই নিরক্ষর, অনভিজ্ঞ 


১৩৯ 


81 


বালকের মুখ দিয়। স্বতঃক্ষুর্তভাবে বাহির হয়। রায় বুলার বিস্ময়ে হতবাক 
হইয়া যান। 

নানকের এই নির্ধ্যাতনের কথা শুনিয়া এবার তিনি আগাইয়া 
আসিলেন। সেদিন সেরেন্তায় কাজ করিতে বসিয়াই হিসাবনবীশ কালু 
বেদীকে দিলেন জরুরী তলব। 

্যগ্রকষ্ঠে কহিলেন, “কালু এসব কি শুন্ছি বলতে! ? নাঁনকের 
ওপর হঠাৎ এমন খড়গহস্ত হলে কেন ?” 

“আর বলবেন না, হুজুর। এ অবাধ্য ছেলেকে নিয়ে আমি হিম্সিম্‌ 
খাচ্ছি। লেখাপড়ার পাট সে প্রায় উঠিয়েই দিয়েছে, সংসারের কোন 
কাজও সে দেখবে না। দিনরাত ঘুরে বেড়াবে ছন্নছাড়ার মত। এবার 
গালাগাল আর মারধোর ছাড়া ওকে শোধ রাবার আর কোন উপায় তো 
আমি দেখ ছিনে |” 

“শোন কালু। তুমি এক মস্ত ভূল করছো৷। তোমার ছেলে নানক 
কিন্ত আর পাঁচটা ছেলের মত মোটেই নয়। তার চোখে মুখে আমি 
দেখেছি এক পরমভক্ত সাধুর ছায়া । মনে হয়, জন্মগত ধন্মবোধ নিয়েই 


এতোমার এ ছেলে জন্মেছে ।” 


«কি জানি হুজুর, আমরা! তো! ওকে ধরে নিয়েছি দায়িত্ববোধহীন, 
পাগলাটে ধরণের ছেলে ব'লে ।” 

“না_না। বহুবার আমি লক্ষ্য করেছি, বালক নানক যখন ঈশ্বরের 
নামগান করে বা! ধন্মকথা বলে- কি জানি কেন আমার সার! অন্তরে নাড়। 
পড়ে যায়। আমি মুসলমান, ভিন্নধন্ম্__কিন্ত তার ভজনগান শুনে আমার 
অন্তরাত্মা ব্যাকুল হয়ে উঠে। অন্তরে মুক্তির কথা ভেবে ভেবে আমি অধীর 
হয়েপড়ি। না, তোমার ছেলে সাধারণ পাগল নয়, ঈশ্বরের জন্য সে পাগল 
হয়ে উঠেছে । ক'টা লোকের এমন ভাগ্য হয়, বলতো? আমি বল্ছি কালু, 
তোমার এ ছেলে সামান্য নয়, সাধারণ নয়। একদিন তাঁর ভেতরকার বস্তু 
ফুটে বেরুবেই ।"নিশ্চয়ই সে হবে এক সর্রবজনমান্য ধর্মনেত11% 

বিশ্বাস করুন বা না করুন, মনিবের এসব কথ শুনিয়া কালু বেদী 


১১৩ 


থম্কিয়া যান। নৃতন করিয়া ভাবিতে শুরু করেন। ছেলের গঁদাসীন্য 
আর ভাবুকতাকে মানিয়া নিতে চাহেন সহজভাবে । 

রায় বুলারের সেদিনকার এই ভবিষ্যদ্বাণী উত্তরকালে সফল 
হইয়া উঠে। ভারতের এক শক্তিমান মহাপুরুষ ও ধর্মপ্রবর্তকরূপে 
গুরু নানকের অভ্যুদয় দেয়ে, 

এক উদার ও-সকধীন ধন্ীবোধের ভিত্তিতে নানক প্রবর্তন করেন 
তীহার শিখধন্ম। আপন ভাগবত জীবনের সাধনা ও সিদ্ধির মধ্য দিয়া 
ভগবদ্ভক্তির এক নৃতন ভাবতরঙ্গ তিনি উদ্বেলিত করিয়া তোলেন, 
আর এই তরঙ্গ ছড়াইয়া পড়ে সার! পাঞ্জাবে ও উত্তর ভারতের বিভিন্ন 
অঞ্চলসমূহে । 


লাহোর হইতে প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে, গুজরানওয়াল! জেলার এক 
প্রান্তে তালওয়ান্দি গ্রাম ।% চারিদিক সবুজ তরুলতায় বেষ্টিত। প্রকৃতির 
নহস্পর্শে এখানকার ভূমি হইয়াছে সরস এবং স্িপ্ধ শ্টামল। অদৃরে 
প্রসারিত অরণ্যময় বার্-মালভূমি। তাহার ওপাশেই বিস্তীর্ণ মরু-অঞ্চল। 
বৈশাখের উন্মত্ত হাওয়ার দাপটে মাঝে মাঝে এখানে দেখ! দেয় বালুকা- 
ঝড়ের রুদ্রমূত্তি-সবুজ বনানীর উপর তখন ছড়াইয়া পড়ে শুর 
আস্তরণ। ঝড়তাগুবের শেষে আবার তালওয়ান্দির বনভূমিতে জাগিয়া 
উঠে হরিৎ শোভার অপরূপ মাধুষ্য । বনে-জঙ্গলে ঝোপে-ঝাঁড়ে উকি 
মারিতে থাকে হরিণ, খরগোস- নাচিয়া বেড়ায় শালিখ, টিয়৷ আর তিতির 
পাখীর দল। 

প্রকৃতির লীলানিকেতন, এই মনোরম তালওয়ান্দি গ্রামই শিখগুরু 
নানকের জন্মভূমি। এখানকার এক সাধারণ ক্ষত্রিয় পরিবারে ১৪৬৯ 
ৃষ্টাব্দের বৈশাখ মাসে তাহার আবির্ভাব ঘটে। 
* শিখগুরুর অধ্যুষিত এই তালওয়ান্দি গ্রাম উত্তরকালে এক তীর্থ-শহরে 
পরিণত হয়। নানকের স্ত্বতি বুকে ধরিয়া! আছে-_শিখেরা তাই ইহার নৃতন 


নামকরণ করেন, নান্কানা। শিখশক্তির অভ্যুদয় যুগে নানকের জন্মস্থানে এক 
৯১১ 








তস্তস লাবিব 


মধ্যযুগের জড়ত। ও সুপ্তি ভায়া সাধারণ মানুষের মনে এ সময়ে 
জাগিয়া উঠিয়াছে নৃতন জীবন-জিজ্ঞাসা, নৃতন প্রাণচাঞ্চল্য। রামানন্দ, 
কবীর প্রভৃতি সাধকদের ভক্তি আন্দোলন জনজীবনের নয়ন সমক্ষে 
তুলিয়া ধরিয়াছে নূতন আশার আলো! । 
সম্রাট বহলুল্‌ লোদীর তখন রাজত্বকাল। এ সময়ে উত্তরপশ্চিম 
ভারতের বড় ছুর্দিন চলিয়াছে। ধনশ্মান্ধতা আর দ্বন্ব-সংঘাতের ফলে 
মানুষের জীবন হইয়! উঠিয়াছে বিপর্যস্ত । কাহারো মনে কোন স্বস্তি বা 
শাস্তি নাই__নাই কোন আশ! ভরস।। লোদী সম্রাট ও তাহার পাঠান 
আমীর ওমরাহদের ধন্মীয় গৌড়ামি আর শাসনগত দুর্বলতা এই 
পরিস্থিতিকে ক্রমে আরো! জটিল করিয়া! তুলিয়াছে। 
এ সময়কার অনাচার ও ভেদ বিসন্বাদের ছুঃসহ অবস্থাটি গুরু নানকের 
রচিত এক পদে বধিত হইয়াছে _- 
__-এই যুগ যেন এক শাণিত ছুরিকা, 
আর রাজারা সব নিম্মম কসাই। 
ম্যায়নীতি আজ কোথায় উড়ে পালিয়েছে 
তার পাখা মেলে । 
দেখছি মিথ্যার ছূর্ভেছ্চ যবনিকা, 
আর দেখছি এই নিরন্তর আধার-রাতি 
কোথায় আলোক দিশারী চাদ? 
_খুঁজে খুঁজে আমি যে হয়েছি ক্লান্ত । 
ওগো, তমসার পারে কোথায় রয়েছে আলোকচ্ছটা ? 
কেঁদে কেঁদে মরছি আমি 
আত্মনঅভিমানের বোঝা বয়ে। 
মন্দির গড়িয়া উঠে, আর এই মন্দিরে স্থাপিত হয় শিখদের পবিত্র ও আরাধ্য 
_-গ্রন্থসাহেব' | পূর্বে নান্কানা-সাহেব নানকপর্থী ভক্তদের স্থুললিত ভজন ও 
স্তোত্রপাঠে সর্ববদ| বঙ্কত থাকিত। পাকিস্থানের অন্তভূক্তি হওয়ার পর হইতে 


নান্কানার সে গৌরব আর নাই। 
১১৭ পু 





পাণক 


কে বলে দেবে আমায় কোথায় রয়েছে, 
উদ্ধারের পরম পথ ? 


সমকালীন পাঞ্জাব প্রদেশ ছিল লোদী সাম্রাজ্যের অন্তর্গত, আর 
এই সুবার বিভিন্ন অঞ্চল প্রধানতঃ মুসলমান সামন্ত ও ভূম্যধিকারীদের 
দ্বারাই শাসিত হইত। তালওয়ান্দির রায়ভোই ছিলেন এমনি এক 
মুসলমান ভূম্যধিকারী । বংশের দিক দিয়! তিনি ছিলেন রাজপুত । রায়- 
বলার ইহারই পুক্র। 

রাষ্ট্রবিপ্লব ও ছন্দ সংঘর্ষের মধ্যে হঠাৎ একদিন রাজপুত সামন্ত, 
রায়-ভোই কল্মা পড়িয়া মুসলমান হইয়া যান। কিন্তু বেশী বয়সের 
এই ধন্মীন্তরিত জীবনে মুসলমান ধন্ধের তত্ব ও উপদেশ রূপায়িত করার 
স্থযোগ তাহার কমই মিলিয়াছে। পুভ্র রায়-বুলারের কাছেও মুসলমান 
ধন্ন তেমন ঘনিষ্ঠ হইয়া উঠে নাই। তাছাড়া, ধম্ঠূবোধের দিক দিয়া 
তিনি ছিলেন পরম উদার । হিন্দুধন্ম্নের প্রতি, হিন্দু প্রজাদের প্রতি যে 
বাবার তিনি করিতেন, সন্ীর্ণতার ঠীই সেখানে ছিল না। 

তালওয়ান্দির এক উঁচু টিলার উপর রায়-বুলারের কেল্লা ও প্রাসাদ 
বিরাজিত। চারিদিকে ঘিরিয়া আছে তাহার জমিদারী ও ক্ষেতখামার | 
প্রাচরধ্য, শাস্তি ও শৃঙ্খলার মধ্য দিয়া তিনি এই জমিদারী শাসন করেন। 
বাহিরের রাজনৈতিক ঝড়-ঝাপটা তাহার এই শান্তিময় নীড়ে আসিয়। 
বড় একটা ধাক। দেয় না। 

এমনিতেই রায়-বুলার সঙ্জন ও ধন্মনিষ্ট ব্যক্তি। তহপরি, আজকাল 
বয়সও যথেষ্ট হইয়াছে । তাই সাধু ফকীর দেখিলে বা কোন ধর্্মপ্রস্গ 
পাইলে তাহার উৎসাহের অস্ত থাকে না। 

কি জানি কেন, নানকের ভগবতমুখীন জীবনের প্রতি রায়-বুলার 
গোড়া হইতেই বোধ করেন এক অহেতুক আকর্ষণ। সেহমমতা! দিয়া 
সদাই এ বালককে তিনি ঘিরিয়। রাখিতে চাহেন। 

তালওয়ান্দি অঞ্চলে মুসলমানদের কোন অত্যাচার বা উপদ্রব নাই। 


৮ ১১৩) 


ভারতের সাধক 


গ্রামের নিকটেই শুরু হইয়াছে এক নিবিড় বন। স্থানটি তপস্তার পক্ষে 
বড় অনুকূল। তাই প্রায়ই এখানে দেখা যায় উচ্চস্তরের সাধু মহাত্মাদের 
আনাগোনা । ইহাদের খোজে নানক অনেক সময় বনেন্বনে ঘুরিয়। 
বেড়ান, সাক্ষাৎ পাইলেই নিকটে গিয়া বসেন ৷ কত দীর্ঘ পরিব্রাজন ও 
সাধনার অভিজ্ঞতা এই সব সাধুদের | অধ্যাত্মশীস্ত্রের উপর দখলও কম 
নয়। উহাদের কাছে বসিয়া নানক নানা কাহিনী ও তক্বোপদেশ শ্রবণ 
করেন। আগন্তক সাধুসন্তেরা ভারতের দূর দূরান্তে ঘুরিয়৷ বেড়ান, তাই 
সমকালীন ধন্ম আন্দোলনের সংবাদও উহাদের কাছে অনেক সময় 
পাওয়া যায়। 

ভক্তিবাদী সাধকদের সাথেই নানকের ঘনিষ্ঠত। হয় বেশী, ঈশ্বরের 
লীলাকাহিনী ও নাম-মাহা ত্য শুনিয়া! তাহার যেন আর আশ মিটে না। 
হৃদয়মধ্যে দিনরাত বহিয়! চলে নামের ধারাক্রোত। এই নাম কীর্তন 
আর ভজন নিয়াই তিনি মত্ত হইয়া উঠেন । 


সরকারী রাজস্ব বিভাগের তরুণ আমীন জয়রাম সেদিন সদর হইতে 
তালওয়ান্দিতে আসিয়। উপস্থিত। তখনকার দিনে ক্ষেতের শস্য দিয়! 
রাজস্ব দিতে হইত, জয়রাম সেবার এখানকার জরীপ ও শস্তের হিসাব- 
নিকাশ করিতে আসিয়াছেন। 

ক্ষেতের ধারে দীড়াইয়া কাজ করিতেছেন, এমন সময় নানকের 
বড় বোন নান্কীর উপর হঠাৎ তাহার চোখ পড়িল ৷ রূপ লাবণ্যবতী কে 
এই তরুনী? খোঁজ নিয়া জানিলেন, সে স্থানীয় জমিদারের হিসাব- 
নবীশ কালু বেদীর কন্যা । জাতে ইহার! ক্ষত্রিয়, জয়রামেরই স্বঘর। 
নবাবের আমীনের এখানে মন পড়িয়াছে দেখিয়া জমিদার রায়- 
ঘটকালিতে উৎসাহী হইয়া পড়িলেন। অল্পদিনের মধ্যে জয়রামের সহিত 
নান্কীর বিবাহ হইয়া গেল। 

মেয়ে এতদিন ঘাঁড়ের বোঝা হইয়া ছিল, নানকের জননী তৃপ্তা 
এবার তাই হাফ ছাড়িয়। বাঁচিলেন। 


১১৪ 


নানক 


অতঃপর চাপিয়া ধরা হইল নানককে। ভগ্নীর বিবাহ হইয়া! গিয়াছে, 
এখন ঘরে একটি বধু না আসিলে কি করিয়া চলে? জননীর এখন বয়স 
হইয়াছে, খাটিতে খাঁটিতে দেহ কালি হইয়া গেল, তাহার দিকেও তো 
একটু চাহিতে হয়। বিবাহের জন্য সকলে হৈ-চৈ তুলিয়া দিলেন। 

এই সোরগোলের মধ্যে নানকের কণ্ঠস্বর চাপা পড়িয়া যায়। চৌদ্দ 
বৎসরের বালক, সে আবার নিজের ভাল-মন্দ কি বুঝিবে ? বাপ মায়ের 
মুখ চাহিয়া বিবাহ তাহাকে করিতেই হইবে । 

গুরুদাসপুর জেলার বাতালা' গ্রাম হইতে এক সম্বন্ধের প্রস্তাব আসে । 
পাত্রী সুন্দরী ও সংস্বভাবা। নাম তাহার স্থুলখনী। এক শুভ লগ্নে 
সমারোহের সহিত নানকের বিবাহ অনুষ্ঠিত হইয়া যায়। তখন তাহার 
বয়স মাত্র চৌদ্দ বংসর ।* 

জননীর মুখে ফুঠিয়া উঠে প্রসন্নতার হাসি। উদাসী ছেলেকে তো 
কোঁন রকমে সংসার বন্ধনে আবদ্ধ কর! গেল, এবার নিশ্চয়ই তাহার মন 
ফিরিবে, গৃহস্থীতে মন দিবে । 

বিবাহের পরেও কিন্তু নাঁনকের মতিগতির কোন রকম পরিবর্তন 
দেখা! গেল না। আগের মতই তিনি স্বেচ্ছাবিহারী। পথে প্রান্তরে বনে 
বনে ঘুরিয়া বেড়ান। মাঝে মাঝে ভক্তিরসে আবিষ্ট হইয়। রচনা করেন 
চমতকার সব ভজন জঙ্গীত। সংসারের প্রতি আকর্ষণ আসা দুরে 
থাকুক, দিন দিন তিনি যেন আরে! উদাসীন হইয়া উঠেন। মায়ের মনে 
অস্বস্তির অন্ত নাই । এ ছেলেকে নিয়া তিনি কি করিবেন ? 


* শিখধন্ম ও উপদেশাবলীর আদি লেখক, ভাই-গুরুদাসের এক সংক্ষিপ্ত 
রচনার ভিত্তিতে মণি সিং গুরু-নানকের বিস্তৃত জীবনী লিখেন, ইহার নাম 
__জ্ঞানরতনাবলী। এই গ্রন্থে বলা হইয়াছে ষে, চব্বিশ বৎসর বয়সে নানকের 
বিবাহ হয়। অপর লেখকদের মতে, এই বিবাহ হয় আরো অনেক পরে, যখন 
তিনি স্থলতানপুরে সরকারী কাধ্য করিতে থাকেন। কিন্ত নানকের জীবনে 
অধ্যাত্থরসের জোয়ার আসার অনেক আগে এবং প্রধানতঃ পিতামাতার চাপে 
পড়িয়া! তিনি বিবাহ করিতে বাধ্য হন__ইহাই বেশী যুক্তিযুক্ত । 


১৯১৫ 


ভারতের সাধক 


রায়-বুলার নানকের সব খবরই রাখেন। মনে মনে চিস্তিত হইয়া 
উঠেন, তাইতো, এই ধশ্ম-পাগল ছেলেকে নিয়া কি করা যায়? একদিন 
কালু বেদীকে ভাকাইয়। কহিলেন__“শোন কালু হতাশ হবার কিছু নেই। 
আমার মনে হয়, নানককে ফার্সী পড়ানোই ভাল । সামান্য কিছু শিখলেই 
চাকুরীর সুবিধ। হবে । আমার যা! কিছু প্রভাব প্রতিপত্তি আছে তা আমি 
প্রয়োগ করবে৷ ওর জন্য । তাছাড়া» তোমার জামাই জয়রাম সদরে রয়েছে । 
দক্ষ কম্মচারী বলে স্ুলতানপুরের নবাবের কাছে.তার আজকাল খুব 
খাতির। চাকুরি জুটিয়ে দিতে সেও পারবে ।” 

ফাসঁ শিক্ষক, মৌলবী রুকন্-উল্‌্-উন্দীনের কাছে নানককে পাঠাইয়া 
দেওয়া হয়। অল্পদিনে সে ফাসাঁ অনেকটা আয়ত্ত করিয়াও ফেলে । 
মৌলবী তাহার মেধা ও প্রতিভা দেখিয়া বিশ্মিত হইয়া! যান, আবার এই 
খামখেয়ালী ছাত্রটিকে নিয়। ঝঞ্চাটও তাহাকে কম পোহাইতে হয় না। 
প্রায়ই দেখ! যায়, ব্যাকরণ ও সাহিত্যের প্রাশ্নের উত্তরে নানক মুখে 
মুখে রচনা! করিয়া দেন ঈশ্বরের প্রশস্তিমূলক বয়েৎ। যেমন অপুবব 
এসব রচনার ভাব, তেমনি তার ভাষা । 

রুকন্-উল্‌-উদ্দীন খুশী হন ঠিকই, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে চিন্তিতও কম হন ন1। 
ফার্সা শিক্ষার যে রীতি ও পন্থা প্রচলিত, নানক তাহ এড়াইয়া চলেন। 
তরুণ ছাত্রের প্রতিভা যতই থাকুক না কেন, এভাবে চলিতে থাকিলে 
কোন দিনই প্রকৃত শিক্ষা লাভ করিতে পারিবে না। 

নানক কিন্ত হঠাৎ একদিন তাহার ফাসঁ শেখা ছাড়িয়া দিলেন। 
বিদ্ভায়তনের ছাচে তৈরী হইয়া উঠিবার পাত্র তিনি নন, ছক্‌ বাঁধা 
পাঠক্রম অনুসরণ করাও তাহার পক্ষে অসহ্য । তাই এবার হইতে ঘরেই 
স্বেচ্ছামত পাঠ-কাধ্য চলিতে থাকে । 

নানকের উত্তরকালীন রচনায় গভীর শাস্্জ্ঞান ও পরিণত শিক্ষার 
নিদর্শন দেখা .যায়। ফার্সী ভাষায়ও যে তাহার ব্যুৎপত্তি যথেষ্ট ছিল, 
তাহার বহু প্রমাণও রহিয়াছে ।* 

শিখ ধশ্মের প্রবীণ গবেষক, ম্যাকৃস আর্থার মেকলিফং লিখিয়াছেন, 
১১৬ 


নানক 


ফার্সী শিক্ষালয় ছাড়িবার কথ শুনিয়া পিতা খুব উত্তেজিত হইয়া 
উঠিলেন। নানককে ডাকিয়া কহিলেন,“বুঝতে পেরেছি, লেখাপড়া শিখে 
ভদ্রলোক হওয়া, চাকৃরি-বাকরি করা, এসব তোকে দিয়ে হবে না। থাকৃবি 
অকাট মুকৃখু হয়ে, ঘুরে বেড়াবি বনে-বাদাড়ে। যা! তার চেয়ে এবার 
ক্ষেতে গিয়ে মোষগুলো চরাতে থাক্‌। খামারের কাজ দেখাশুন। কর্‌। 
তবু সংসারের কিছু সাহায্য হতে পারবে ।” 

অসীম আকাশের নীচে উনুক্ত প্রান্তর, আর শস্ত-শ্যামল ক্ষেত। প্রকৃতির 
সহজ আনন্দের ধারা সেখানে সদ বিস্তারিত | মহিষের দল নিয়া এ 
নিসর্গ-শোভার মধ্যে গুন্যা বেড়ীইতে নানকের আপত্তি নাই, বরং 
উৎসাহই আছে। তখনি এ প্রস্তাবে রাজী হইয়। গেলেন । 

মহিষ চরাইতে গিয়া সেদিন ভানেক বেল৷ হইয়া গিয়াছে । পরিশ্রমও 
এতক্ষণ নিতান্ত কম হয় নাই । ক্ষেতের ধারের বটগাছটির নীচে নানক 
বিশ্রামের জন্য বসিলেন। কিছুক্ষণ পরে কখন যে নিদ্রায় অভিভূত হইয়া 
পড়িয়াছেন, জু'স নাই। 

বেশীক্ষণ কিন্তু এই নিদ্রীন্ুখ উপভোগ কর! ঘটিয়। উঠে নাই । গ্রামের 
অন্যতম গৃহস্থ, ভষ্টির চীৎকারে হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। চোখ মেলিয়া 
দেখিলেন, তীহাঁকে লক্ষ্য করিয়া সে উচ্চকণ্ঠে অজত্র গালিবর্ষণ 
করিতেছে । মহিষের দল ইতিমধ্যে তাহার ক্ষেতের অনেকটা শস্য 
খাইয়া ফেলিয়াছে। এ অত্যাচার ভষ্রি সহ্য করিবে না। 

নানক জোড় হস্তে দোষ স্বীকার করিলেন, অনেক কাকুতি মিনতিও 
করিলেন। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক কিছুতেই কর্ণপাত করিতে রাজী নয়। 

ইতিমধ্যে গ্রামের আর পাঁচজন সেখানে জড়ো হইয়া পড়িয়াছে। 


নানকের রচিত গ্রস্থসাহিবের অংশে' যে সব ফাসাঁ শব ও কাব্যপদ পাওয়া যায় 
তাহাতে প্রমাণিত হয়, তিনি ফারসী ভাষায় পাণ্ডিতায অঞ্জন করিয়াছিলেন । 
সম্ভবতঃ তাহার নিজের স্বাধীন চিস্তাধার] এবং উদার ও পরমতসহিষুতার মূলে 
অনেকাংশে ছিল পারস্তের সাহিত্যের প্রভাব । দি শিখ. রিলিজিয়ন, 


অধ্যায় ১। 
১১৭ 


" ভারিতের সাধক 
ক্রোধোদ্দীপ্ত ভট্ট তখনই কয়েকজন সাক্ষী নিয়া জমিদারের কাছে ছুটিয়া 
যায়, নানকের বিরুদ্ধে জানায় তাহার অভিযোগ । 
কাঁদিয়া কাটিয়া লোকটি মহা অনর্থ বাধাইয়া! তুলিয়াছে। রায়-বুলারকে 
তাই স্বয়ং এ তদন্তে আসিতে হইল । 
ক্ষেতের দিকে তাকাইয়া তিনি দেখেন, মহিষের অত্যাচারের কোন 
চিহুই নাই। এক ছড়া শস্তও নষ্ট নাই। ক্ষেতের মালিক, অভিযোগকারী 
তো মহা অপ্রস্তত। যেসব গ্রামবাসী সঙ্গে ছিল তাহারাও এ দৃশ্য দেখিয়া 
একেবারে অবাক হইয়া গিয়াছে । একি অলৌকিক রহন্ত ! তাহার! যে 
কিছুক্ষণ আগেই ক্ষেতের চরম ছুরবস্থা৷ দেখিয়া গিয়াছে । শস্যের ক্ষতির 
পরিমাণও তে। নিতান্ত কম ছিল না। 
নানক যে এক উঁচুদরের ধর্মপ্রাণ যুবক সে সম্পর্কে রায়-বুলারের 
কোনদিনই সন্দেহ ছিল না। এবার তাহার দৃঢ় প্রতীতি হইল, সে শুধু 
ঈশ্বরভক্তই নয়, ঈশ্বরাশ্রিতও বটে। নতুব! প্রকাশ্য দিবালোকে এমন 
কাণ্ড কখনে। সম্ভব হইতে পারে না ।* 


নানকের উদাসীনতা ও ভাবোন্ত্ত অবস্থা দিন দিনই কেবল বাড়িয়া 
চলিয়াছে। এক সময়ে কয়েকদিন তিনি মৌন হইয়া, নিভৃতে গৃহকোণে 
বসিয়া দিন কাটাইতে থাকেন। জননী বড় ভীত হইয়। পড়িলেন, 
শেষটায় পুজ্ের মাথ। খারাপ ন! হইয়! পড়ে। 

নরম স্থরে তিনি ছেলেকে বুঝান, “ওরে, শুধু মোষ চরিয়ে বেড়ালে 
কি ক'রে চল্বে? সংসারের ব্যয় যে এরপর কেবল বাড়তেই থাকবে 1” 
উত্তরে নানক গাহিতে থাকেন তাহার ভক্তিমধুর ভজন । 

পিতা কঠোর হইয়া তিরস্কার করেন, “এসব ভজন-টজন ছেড়ে দিয়ে 
রুষির কাজে লেগে যা দেখি । এতকাল খেটেখুটে কিছু জমি করেছি। 
___* নান্কানার প্রান্তস্থিত যে শত্তক্ষেত্রে এই অলৌকিক ঘটনাটি ঘটিয়াছিল 
আজে! তাহা শিখদের কাছে এক পরম পবিভ্রস্থান ক্ষপে গণ্য হইয়া আছে। 
এই স্থানটি “কিয়ারা সাহেব' নামে অভিহিত হয়। 


১১৮ 


স্লালকা, 


তুই তার দেখাশুনা কর্‌। আর কতকাল আমি তোদের বোঝা বইবে! ?” 
ভাবতন্ময় নানক সঙ্গীতের মধ্য দিয়া বলেন-_ 
এন তনু ধরতি বীজ কম্মীকরো, 
সলিল আপউ সারিংপাণী। 
মন কিরষান্ু হরিহৃদে জমাইলে, 
উপাব সিফদ নিরবাণী। 
অর্থাৎ/মামার এই তন্ন হচ্ছে ধরিত্রী__ক্ষেত্র, সৎকন্ম বীজন্বরূপ, আর 
ধনূর্ধরী শ্রীরাম করেন তাতে জলসেচন। হে মনরূপ কৃষাণ, হৃদয়ে তুমি 
হরিরূপ বৃক্ষ রোপণ কর, তাতে প্রাপ্ত হবে নিব্বাণ।) 
“বাজে কথ। এখন রাখ. । আচ্ছা, বেশ তো, ক্ষেতখামারের কাজ ভালো। 
নালাগে, কোন কারবারে লেগে যা।” 
“কারবার নিয়েই তো হয়েছি পাগল । মালিক দিয়েছেন তার নামের 
মূলধন। দিবানিশি ভাবছি-_কি দেব তার হিসেব ।” 
কালু বেদী হাল ছাড়িয়া দেন। নাঃ। এ ছেলেকে দিয়া কোন অর্থকরী 
কাজই আর হইবে বলিয়া মনে হয় না। মায়ের নয়নজল ও মিনতি 
দিনের পর দিন ব্যর্থ হইয়া যায়। 
ভাগিনী নান্কীর বড়,প্রিয়পাত্র নানক। স্বামীগৃহ হইতে নান্কী 
মাঝে মাঝে তালওয়ান্দিতে আসে, সুযোগ পাইলেই হাতে ধরিয়া 
ভ্রাতাকে কত বুঝায়। কিন্তু কে তাহার কথায় কর্ণপাত করে? 
ভাবোন্মত্ত অবস্থায় নানক এসময়ে কিছুদিনের জন্য খাওয়া দাওয়া 
একেবারে ত্যাগ করিলেন । 
বাড়ীর সকলের আতঙ্কের সীম। রহিল না। তাড়াতাড়ি জমিদার 
বাড়ীর চিকিৎসককে ডাকিয়া আন। হইল । 
প্রবীণ চিকিৎসক পুঙ্থানুপুঙ্খভাবে সেদিন তাহার রোগীকে পরীক্ষা 
করিতেছেন। রোগ নির্ণয়ের জন্য চলিতেছে নানা জিজ্ঞাসাবাদ । রোগী 
হঠাৎ গুন্‌ গুন্‌ সুরে নামগান শুরু করিয়া দেয়। এই গান শেষ হইলে 


চিকিৎসককে বলে, “ওগো, সত্যকার বধের নাম যদি করতে হয়, তা 
/ * ও ৬ 


স্ভাবতেরস্সাঘক 


হচ্ছে--ভগবৎনাম। যে ব্যাধি এই নামে নিরাময় হয়, তাকি তোমার 
ব্যবস্থাপত্র দিয়ে সারাতে পারো তুমি ?” 

দীর্ঘ পরীক্ষা, ও পর্য্যবেক্ষণের পর চিকিৎসক সবাইকে কহিলেন, 
“না-গো» তোমরা যা সন্দেহ করেছো তা নয়, এ ছেলের উন্মাদরোগ হয়নি 
_ হয়েছে ঈশ্বর প্রেমের ব্যাকুলতা। কোন ভয় নেই। সময়মত এই 
অস্থিরতা কমে যাবে 

জননী তৃপ্তার হৃদয় হইতে এক পাষাণভার নামিয়৷ গেল। যাক্‌, 
ছেলের তবে সত্য সত্যই কোন গুরুতর পীড়া হয় নাই। বাছা এবার ' 
ভগবানের কৃপায় সুস্থ হইয়া উঠিলেই বাঁচা যায়। 


এই ভাবমত্ততার পর্য্যায় কিছুদিনের মধ্যে চলিয়া গেল। নানক 
ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়া আসিলেন। 

পুজের ভবিষ্যতের কথ! ভাবিয়া কালুবেদী অস্থির হইয়! উঠিয়াছেন। 
সেদিন ক্রুদ্ধ কঠে কহিলেন, “হতভাগা, তোর হল কি বল্‌ তো। এই 
শেষবারের মত বল্ছি, যা হয় কিছু রোজগার কর্‌। বেশ তো, ব্যবসাই 
শুরু ক'রে দে না। মূলধন আমি দিচ্ছি । এতো রয়েছে চুহারকানার মস্ত 
বাজার। নূন, তেল, হলুদ কত কিছু জিনিসের কেনা-বেচা সেখানে হয়। 
যাতে তোর খুশী তাতেই টাকা লাগিয়ে দে। এখনকার মত, এই নে-_ 
গোটাকুড়ি টাকা। আজ থেকেই কাজে লেগে পড়.।৮ 

নানক এতক্ষণ নীরবে টাড়াইয়া পিতার কথ! শুনিতেছিলেন। এবার 
যন্ত্রচালিতের মত টাক। গ্রহণ করিলেন, রওন| হইলেন বাজারের দিকে । 
সঙ্গে চলিল বাড়ীর বিশ্বাসী ভূত্য, বাল।। 

পদত্রজে উভয়ে চলিয়াছেন। কয়েক মাইল পথ অতিক্রম করার 
পর কয়েকজন নাগ! সন্ন্যাসীর সাথে তাহাদের দেখা | উলঙ্গ, চিম্টাধারী 
সন্ন্যাসীরা৷ সেদিনকার মত এক বটবৃক্ষতলে বিশ্রাম নিয়াছে। নানক 
তাহাদের চরণে . প্রণাম নিবেদন করিলেন, দলের নেতার কাছে বসিয়! 
কহিতে লাগিলেন নান৷ প্রসঙ্গকথা। 


৯২৩ 


নানক 


সর্ধ্বত্যাগী এই সাধুর দল চিরদিনই নানকের কাছে সম্ভ্রম ও বিস্ময়ের 
বন্ত। খুঁটিয়। খুঁটিয়৷ তিনি প্রশ্ন করিতে থাকেন, “মহারাজ, আপনারা 
উলঙ্গ থাকেন কেন? পরিচ্ছদ কি আপনাদের জোটে না? আচ্ছা 
ভোজনের ব্যবস্থাই বা কে ক'রে দেয় ?” 

সাধুজী উত্তর দেন, “বেটা, সংসারের সব কিছু মায় মমতা! ছেড়ে যে 
আমরা পথে বেরিয়ে পড়েছি । তবে পরিচ্ছদের মোহ আর রাখতে যাবে৷ 
কেন? আর আহারের কথ! বল্ছে। ? তা৷ চলে আকাশবৃত্তিতে । পরমাত্মা 
যে দিন যা ব্যবস্থা! করেন, তাতেই ক্ষুধা! মেটাতে হয়।” 

“মহারাজ, আমার বড় ইচ্ছে হয়েছে, আজ আমি আপনাদের এই 
ক'মুন্তির সেবা করবে! । কিছু টাকাও আমার কাছে রয়েছে, এখনি গ্রামের 
বাজার থেকে আমি ঘি-আটা! এ সব কিনে আন্ছি।” 

ভূত্য বাল! নিকটেই বসিয়া আছে । নানকের প্রস্তাব শুনিয়া তাহার 
তো চক্ষু স্থির। একান্তে তাহাকে ডাকিয়া নিয়া কহিল, “আরে, এ তুমি 
কি পাগালামো করতে যাচ্ছো । জানো তো, তোমার বাবা এমনিতেই 
উগ্র স্বভাবের লোক । টাক যদি এভাবে নষ্ট কর, তিনি কিন্ত আর রক্ষে 
রাখবেন না। কারবারে লাভ করবার জন্য টাক। দিয়েছেন, কিন্তু লাভ 
করাতো দূরের কথা, এখন আসলই মারা যাচ্ছে !” 

_ভৃত্যের কথ। নানক গ্রাহ্ের মধ্যেই আনিলেন ন1। হাসিয়া! বলিলেন, 
“আচ্ছা বালা, আমায় বল্তে পারো, আর কোন্‌ কাজে টাকা খাটালে 
এর চাইতে বেশী লাভ হতে পারে ? সাধুদের আশীব্বাদই কি সব চাইতে 
ভাল অওদা নয়? দেখছে। না, ভগবানের কপায় এক মস্ত ব্যবসার 
সুযোগ আজ আমাদের সামনে উপস্থিত।” 

ব্যবসায় সম্পর্কে এমনতর মৌলিক ব্যাখ্যা বালা তাহার জীবনে 
আর শোনে নাই। হতাশ হইয়া সে চুপ করিয়। রহিল ! 

পরিতোষ সহকারে সাধুদের ভোজন করাইয়া নানক গৃহে ফিরিয়া! 
আসিলেন কপর্দকহীন অবস্থায় । 

ক্রোধান্ধ কালুবেদী পুজ্রকে ধরিয়া এবার শুরু করেন প্রচণ্ড প্রহার । 

| ১২? 


রিতের সাধক 


নানকের বড় বোন নান্কী তখন পিত্রালয়ে রহিয়াছে । নান্কী এবং 
জননী তৃতপ্তা দেবীর কান্নীকাটি ও মিনতির ফলে শেষটায় কালুবেদীকে 
সেদিনের মত নিরস্ত হইতে হয়। 


এ ঘটনার কথ রায়-বুলারের কাণে পৌছিতে দেরী হয় নাই। সারা 
অন্তর তাহার ব্যথায় ভরিয়া উঠিয়াছে, লোক পাঠাইয়া পিতা পুক্রকে 
ডাকাইয়৷ আনিলেন। 

নানককে দেখ। মাত্র রায়-বুলারের চোখ ছি প্রেমাশ্রুদতে ভরিয়া 
উঠিল, সাগ্রহে তিনি তাহাকে আলিঙ্গন দিলেন। 

এবার কালুবেদীর দিকে ফিরিয়া কহিলেন, “সাধূদের ভোজন করিয়ে 
নানক তো! অন্যায় কিছু করে নি, সংকাঁজই করেছে, কালু । তোমাদের 
হিন্দ্রশান্ত্রে দান মাহাত্ব্যের কথা অনেক আছে। আমাদের ধন্মেও 
'জাকাৎ-এর স্থান দেওয়া হয়েছে কত উঁচুতে । ধন্দন জীবনের এ এক মস্ত 
বড় কর্তব্য। তুমি আর আমি যে কর্তব্য, ষে ধশ্মাচরণের কথা ভাবতে 
পারিনি, এই অল্প বয়সে নানক তা করেছে অনায়াসে এবং স্বাভাবিক- 
ভাবে। না_কালুঃ তুমি ওর উপর এত কঠোর হয়ো না। হ্যা, আর 
একটা কথা। তোমার যে কুঁড়ি টাক! নানক অপব্যয় করেছে বলে 
তুমি মনে করেছাঃ এই নাও, আমি ত৷ দিয়ে দিচ্ছি” 

বারবার অনিচ্ছ! জ্ঞাপন করা সত্বেও কালুবেদী এ টাকা নিতে বাধ্য 
হইলেন। 

নানক সেম্থান ত্যাগ করার পর রায়-বুলার আবার কহিলেন, “কালু: 
সত্য কথ! বলতে কি, তোমার ছেলে নানকের কাছে আমি খণী। তাকে 
দেখলেই আমার ভেতরকার ঘুমস্ত মানুষটা জেগে উঠতে চায়-_ধর্মোর 
কথা, ঈশ্বরের কথা বারবার মনে পড়ে । নানকের থেকে আরও উপকার 
আমি পেয়েছি । সে সত্যই বড় পয়মন্ত। তার জন্মকালের পর.থেকে 
আমার এ জমিদারীতে কোন অশীস্তি, কোন উপদ্রব হয় নি। যথেষ্ট 
প্রীবৃদ্ধিই হয়েছে। অবশ্ঠ, এ আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস।” 


২২ 


নানক 


গভীরভাবে খানিকক্ষণ চিন্তা করিয়া রায়-বুলার আবার কহিলেন, 
“কিছুদিন যাব আমার কেবলই মনে হচ্ছে; নানককে অন্য কোথাও 
পাঠান দরকার। তাতে তার ভাল হবে, তোমার বাড়ীর অশান্তিও 
কম্বে। এ সম্পর্কে নান্কীর স্বামী জয়রামের সাথেও আমার পরামর্শ 
হয়েছে। জয়রামকে বলেছি, স্থযোগমত নানককে সে যেন সদরে, 
নবাবের কোন কাজে ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা করে। আর কিছুট। দিন তুমি 
ধৈর্য্য ধরে থাকো 1৮ 


বেশী দিন গত হয় নাই, ইহারই মধ্যে নানককে নিয়া আবার এক 
গণ্ডগোল বাধিয়া গেল। গ্রামের উপকণ্ঠে সেদিন সাধুর বেশে এক 
ভবঘুরে আসিয়া উপস্থিত। কৌতুহলী হইয়া অনেকের সাথে নানকও 
তাহাকে দেখিতে গেলেন । লোকটি কিছু সাহায্য চাওয়! মাত্র তিনি তাহার 
বিবাহের সোনার অন্গুরীয় ও হস্তস্থিত পিতলের লোটা'টি অবলীলায় 
দিয়া দিলেন । 

এইদিন কালুবেদীর পক্ষে আর ধের্য্য ধারণ কর! সম্ভব হইল না। 
পরিস্কার ভাষায় পুক্রকে বলিয়া দিলেন, ৫তোমার এখন যথেষ্ট বয়স 
হয়েছে, রোজ রোজ আর. কত মার-ধর করা যায়। তুমি বাপু: বাড়ী ছেড়ে 
অন্য কোথাও গিয়ে বাস কর।” 

এ সঙ্কটেও রায়-বুলার আগাইয়া আসিলেন। স্থির হইল, নানক 
এবার স্থলতানপুরে গিয়া কিছুদিন থাকিবে । নান্কীর স্বামী জয়রামকে 
আগে হইতেই বলা আছে, শ্তালকের জন্য না হোক একট! সরকারী 
চাকুরী অবশ্যই সে জুটাইয়। দিতে পারিবে । 

বিদায় ক্ষণের আর বেশী দেরী নাই। পত্বী সলখনীর অন্তরে উত্তাল 
হইয়া উঠিয়াছে ব্যথার পাথার। ছুই নয়নে অশ্রু ঝরিতেছে । 

আশ্বাস দিয়। নানক কহিলেন,“ছিঃ স্ুলখনী, যাবার সময় এমন ক'রে 
কাদতে নেই। আমি তো-শুধু অল্প কিছুদিনের জন্যই তোমাদের ছেড়ে 
যাচ্ছি। তা ছাড়া, সুলতানপুর তো বেশী দূরে নয়।” 


১২৩. 


ভারতের পাধক 


স্বলখনী পতিব্রতা নারী, পতির সংসারের কাজে নীরবে, নিরিবচারে 
নিজেকে তিনি একেবারে বিলাইয় দিয়াছেন। পতিকে তিনি অপরের 
চাইতে অনেক বেশী বুঝিতে পারেন। ভগবৎ-প্রেমে পাগল এই মানুষটির 
উপর আর সকলেই জোর জবরদস্তি করিতে চায়, ভার চাপাইতে চায়। 
কিন্তু সুলখনী তাহ! কখনো পারেন নাই। পতির সংসারে থাকিয়া শুধু 
তাহার দিকে চাহিয়াই নিঃশেষে নিজেকে তিনি এতদিন বিলাইয়া দিয়া 
আসিতেছেন। বিচ্ছেদের প্রাক্কালে এবার তাহার হৃদয় আর প্রবোধ 
মানিতে চায় না। 

মুখ ফুটিয়৷ কহিলেন, পরপ্রয়, এখানে সব সময়ে চোখের সামনে 
থেকেই তুমি আমায় ভালবাসতে পারলে না। বিদেশে গেলে কি 
তোমার মনের কোণে এতটুকু স্থানও আমার থাকবে ? তাছাড়া, তুমি কি 
আর ফিরে আসবে আমার কাছে £” 

“ম্লখনী,তুমি এমন অবুঝ হয়ো না। ভেবে দ্যাখো, এখানে থেকেই বা 
আমি কি করছি? তোমার কি কল্যাণ করতে পারছি ।” 

“তবু তো, তুমি এখানে, এ বাড়ীতে থাকলে আমি নিজের মনে কত 
জোর পেতাম। জানতাম, বেদী-পরিবারের বধু আমি-_ আমি এই ঘর 
সংসারের কত্র$ আমার রাজত্বে আমি রাণী। এবার যে আমার মনের বল 
একেবারে ভেঙে যাবে ।” 

“না গে” তুমি এতো উতলা হয়ো না । আমি বল্ছি, রাণীর পদ তোমার 
চিরদিনই বজায় থাকবে ।” 

“ওগো, দোহাই তোমার । তুমি আমায় সাথে নিয়ে চল। যেখানে 
তুমি থাকবে, সেখানেই রয়েছে আমার স্থান ।” 

“শান্ত হও, স্থলখনী। স্থির হয়ে শোনো। আমায় বিদেশে এবার বেরুতে 
হবেই। যদি রোজগার করতে পারি, তোমায় সেখানে নিয়ে যাবো । ভয় 
পেয়ো না! ঘর সংসার ছেড়ে আমি যাচ্ছিনে। তুমি আপাতত; 
এখানেই থাকো । আমার আদেশ মেনে চলো ।” 
সেই দিনই রায়-বুলারের প্রাসাদে এক ভোজ খাইয়া নানক রওন! 


১২৪ 


নানক 
হন সুলতানপুরের পথে । তাহার সঙ্গীরূপে চলে প্রিয় ভৃত্য, বালা । 


কনিষ্ঠ ভ্রাতাকে এবার কাছে পাইয়া! নান্কীর আনন্দ আর ধরে না । 
নানককে বরাবরই তিনি বড় স্েহ করেন। তাছাড়া, ধন্মপরায়ণ বলিয়াও, 
তাহাকে সম্ভ্রম কম করেন না। 

হ্যালকের চাকুরীর জন্য জয়রাম উঠিয়! পড়িয়া লাগয়াছেন। সুদক্ষ 
কম্মচারী হিসাবে নবাব সরকারে তাহার খ্যাতি প্রতিপত্তি আজকাল 
যথেষ্ট । নিজেই তিনি একদিন নানককে নবাব দৌলতখানের কাছে নিয়। 
উপস্থিত করিলেন। নানক ফাসঁ কিছুটা জানেন, কাজেই আবেদনের 
সঙ্গে সঙ্গে চাকুরী জুটিয়া গেল। 

সরকারী সরবরাহ বিভাগের গুদামে কাজ নিয়াছেন, অনেক কিছু 
দায়িত্ব নানকের উপর বর্তিয়াছে। একাজে সততা, নিষ্ঠা ও নিপুণতার 
প্রয়োজন সর্বসময়ে। তিনি কিন্তু মিষ্ট স্বভাব ও কর্শক্তির গুণে 
অল্পদিনেই উপরওয়ালাদের প্রিয় হইয়া উঠিলেন। 

এই ব্যবহারিক জীবন ও বহিরঙ্গ কাজের অন্তরালে অবিরত বহিয়৷ 
চলিয়াছে নানকের নাম-সাধনা আর ভক্তিরসের ধারা । পণ্যের হিসাব, 
মাপজোক ও পরিমাপ অনবরত চলে, আর কন্দরত এই তরুণকে 
সদাই তাহার কাজের ফাঁকে ফাকে অস্ফুট স্বরে বলিতে শোন! যায়__ 
তেরা, তেরা» অর্থাৎ প্রভু, আমি তোমারই, শুধু তোমারই । 

ভগ্নী নান্কীর সংসার খুবই স্বচ্ছল, তাই নানককে তাহার উপাজ্জিত 
টাক। একটিও ব্যয় করিতে হয় না। ইহার প্রায় সবটাই তিনি লাগান 
সাধুসেবা, দীনধ্যান ও অন্যান্য সৎকন্মে। 

'সাধুসেবার এই উৎসাহ এ সময়ে ছুই ছুইবার নানকের বিপদ 
টানিয়। আনে। কয়েকটি কশ্মীচারী ঈর্ষাবশে নবাবের কাছে অভিযোগ 
করে-__-নানক বেদী অসাধুঃ সরকারী গুদামের জিনিষপত্র সব লোপাট 
করিয়া কেবলই সে টাকা লুটিতেছে। নইলে এত ঘন ঘন সাধুদের ভাগ্ার! 
কি করিয়! সে দেয়? | 


১২৫ 


ভারতের সাধক 


সন্দিহান হইয়া নবাব তখনি তদন্তের আদেশ দিলেন। হিসাব পরীক্ষা 
করিয়! দেখা গেল, মালপত্র সব ঠিকমতই রহিয়াছে । আরও একবার 
ঘটে একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি। সে-বারও নানকের কোন ক্রি 
বিচ্যুতি পাওয়া গেল না। নবীন কণ্মমচারীর সাম্ূতা প্রমানিত হওয়ায় 
নবাব বরং খুশী হইয়া তাহাকে পুরস্কৃত করিলেন। 

অতঃপর নানক তাহার পত্বীকে কন্মস্থলে নিয়া আসেন। কয়েক 
বৎসরের মধ্যে দুইটি পুক্রও জন্মলাভ করে। প্রথম পুজ্রের নাম শ্রীটাদ, 
আর দ্বিতীয় লক্ষ্মী টাদ। সরকারী কর্মের দায়িত্ব ও গুহস্থী এই ছুয়ের 
মধ্যে অবস্থান করিয়াও ভক্ত সাধক নানকের জীবন সদ! উন্মুখ হইয়া 
রহিল ভজন সাধন ও সাধুসঙ্গের মধ্যে । 

গ্রাম হইতে স্ত্রীকে যেমন নানক সুলতানপুরে আনিয়াছেন, তেমনি 
নিজের চারিপাশে জড়ো করিয়াছেন তালওয়ান্দির একদল ভক্তিপ্রবণ 
তরুণকে । ভূত্য বালা বালক কাল হইতেই তাহাদের গৃহে বাস করে, 
নানককে সে আন্তরিকভাবে ভালবাসে-_তীহার কন্মজীবনের গোড়। 
হইতেই বাল স্থলতানপুরে রহিয়াছে । ইতিমধ্যে নানক মুসলমান ভক্ত 
মর্দানাকেও আনয়ন করিয়াছেন। সরকারী কাজে তাহার এখন একটু 
প্রভাব পতিপত্তি হইয়াছে_-তাই মর্দানা ও আরো! জনকয়েক ধর্ন- 
পরায়ণ হিন্দু ও মুসলমান বন্ধুকে এখানে চাকুরী যোগাড় করিয়া দিতে 
, তাহার বেগ পাইতে হয় নাই। 


ক্ষুদ্র একটি ভক্তগোষ্ঠী ইতিমধ্যে নানককে ঘিরিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে। 
কাজকন্মের শেষে- রোজই ইহাদের নিয়া তিনি নামগানে মত্ত হইয়া 
পড়েন। তাহার স্বরচিত ভজন গানের সাথে বঝঙ্কৃত হয় মর্ধানার রবাঁব- 
যন্ত্রের মধুর নিকন! নানকের গৃহের এই ভক্তিময় পরিবেশের মধ্য 
দিয়! দিব্য আনন্দের ধার! দিনের পর দিন উচ্ছুলিত হইয়া উঠে। 

ইষ্টভাবনায় সদ। উন্মুখ, এই ভাগবত জীবনের প্রান্তে এবার আসিয়া 
ঈাড়ান নানকের নির্দিই গুরুবিধি। নিগুঢ় সাধনার সঙ্কেত দানে শিল্পকে 
, ১২৬ 


ল।লক, 


করেন তিনি কৃতকৃতার্থ। এই সদ্গুরুর নাম ও পরিচয় নানক চিরদিন 
গোপন রাখিয়। গিয়াছেন। কিন্তু তাহার প্রসিদ্ধ পৌড়ীগুলিতে যে 
সব অপূর্ব নিদর্শন ছড়াইয়া আছে, তাহা তাহার অসামান্য গুরুভক্তি ও 
রু-পরম্পরাবাদকে সপ্রমাণ করে। 

নানক গাবী এ গুণী নিধানু 

গাবী এ স্বনীএ মনি রথী এ ভাউ 

ছুখু পরহরি স্খু ঘরি লৈ জাই ॥ 

গুরমুখি নাদং গুরমুখি বেদং গুরমুখি রহিআ সমাঈ 

গুর ঈসরু গুরু গোরখু বরম! গুরু পারবতী মাঈ 

জে হউ জান! আখা নাহী কহিনা কথন্ু ন জাঈ ॥ 

গুরা ইক দেহি বুঝাই। 

সভন! জী আ! কা ইকু দাতা সো মৈ বিশরি ন জাঈ ॥ 

অর্থাৎ নানক কহে, সেই গুণনিধান পরম প্রভুর স্তুতিগান কর। তার 
গুণ কর গান, তার গুণ কর শ্রবণ, হৃদয়ে সঞ্চিত রাখ তার প্রেম । তবেই 
নব্ধ ছুখ করতে পারবে পরিহার -স্ুুখ নিয়ে যেতে পারবে ঘরে । গুরুর 
মুখেই শ্রবণ করা যায় নাদ বা ওঁকার, বেদের তত্ব যায় জান1। গুরুর 
উপদেশেই উপলব্ধি হয় যে, অকাল পুরুষ সর্ধবত্র রয়েছেন সমাহিত, 
রয়েছেন ওতপ্রোত। গুরু মহেশ্বর, গুরু বিষু, গুরুই ব্রহ্মা, গুরুই 
পার্বতী । গুরুর যে মহিমা জানি তাহ। মুখে যায় না বলা__তিনি যে 
বাক্যের অতীত। আমার গুরু এই কথাই আমাকে উপলব্ধি করিয়ে 
দিয়েছেন যে, _সর্ধ্ব জীবের দাত। একজনই, একথ। যেন আমার ন৷ হয় 
কখনো বিস্মরণ। 

উত্তরকালে, সিদ্ধ হওয়ার পর নানক প্রচার রী পরার নিত 
আশ্রয়লাভ ও গুরু-উপদিষ্ট পন্থায় নাম সাধন করাই ভগবৎ প্রাপ্তির 
মুখ্য উপায়। স্থুলতানপুরের এই ধন্মকম্মময় জীবনে ভাগ্যবান নানকের 
সম্মুখে এই সদ্গুরুর আবির্ভাব দেখা গিয়াছিল। স্বীয় গুরুর পরিচয় 
উদ্ঘাটন না! করিলেও বারবার কৃতজ্ঞচিত্তে তিনি তাহার দানের কথ! 


১২৭ 


ভাকতেরস্লাঘন্ষ 


স্বীকার করিয়। গিয়াছেন, স্বরচিত পদে করিয়াছেন স্ততিগান। 
স্থলতানপুরের কাছেই রোহ্‌রী নামক এক ঢূরবিস্তারী গহন অরণ্য । 
নানক আজকাল মাঝে মাঝে সেখানে গিয়া উপস্থিত হন। ধ্যানজপে 
এক একদিন সার! রাত কাটাইয়া গৃহে ফিরিয়া আসেন । 
সে-বার ক্রমাগত তিন দিন তাহার দেখা নাই । সিদ্ধির সঙ্কল্প নিয়া 
গহন অরণ্যে সাধক প্রবেশ করিয়াছেন, এ সঙ্কল্প সাধিত ন৷ হওয়া অবধি 
ধ্যানাসন হইতে উখিত হইবেন না। গুরু কৃপায় এবার অভীষ্ট তাহার 
পূর্ণ হইল, সর্ব্ব সত্তায় জাগিয়া উঠিল পরম প্রভুর উপলন্ধি। 
হৃদ্পদ্ম বিকশিত হইয়া উঠিয়াছে, নয়ন সমক্ষে উদ্ভাসিত হইয়া 
উঠিয়াছে দিব্য জ্যোতির পারাবার ! তাই আন্তকাম সাধক নানকের কণ্ঠ 
হইতে সেদিন নিঃস্যত হইল বন্দনা গান__ 
সভ মহি জ্যোতি জ্যোতি হৈ সোই 
তিসদৈ চানণিসভ মহি চানণু হোই। 
গুরসাথী জোতি পরগটু হোই । 
জে। তিস্থ ভাবৈ স্থু আরতী হোই। 
অর্থাৎ, সব্ধ্ব বস্তর মধ্যে যে জ্যোতি ওতপ্রোত হে প্রভু, তা তোমারই 
জ্যোতি। সেই জ্যোতিরই প্রকাশে সব কিছু হয় প্রকাশিত, চন্দ্রন্ূ্ধা 
গ্রহ তারাদল হয় আলোকিত। গুরু সাক্ষী হয়েছেন, গুরুর চরণতলে বসে 
শিক্ষা নিয়ে অন্তরে সেই জ্যোতির হয়েছে প্রকাশ । হে প্রভূ,আমি বুঝেছি, 
য। তোমার প্রীতি সম্পাদন করে, তাই তোমার শ্রেষ্ঠ আরতি। 
অতঃপর নানক লাভ করিলেন ঈশ্বরের প্রত্যাদেশ__নানক, আমি 
সদা তোমাতেই রয়েছি। এবার থেকে তুমি নিলিপ, মুক্তপুরুষ হয়ে জীবের. 
উদ্ধারে ব্রতী-হও ? 
তিনদিন অজ্ঞাতবাস যাপনের পর নানক স্থুলতানপুরে ফিরিয়া 
আসিয়াছেন। এ যেন এক নূতন মানুষ । চোখে মুখে ফুটিয়। উঠিয়াছে 
সদ্ধ পুরুষের দিব্য লাবণ্যশ্ী। সহজ স্বচ্ছন্দ আত্মপ্রত্যয়ের সুর তাহার 
কথায় ও চাল চলনে। যে উদার ধশ্মবোধের উপর তাহার উপলব্ধি 
১২৮ 


নানক 


প্রতিষ্ঠিত, পরমানন্দে এবার তাহাই তিনি প্রচার শুরু করিলেন। 
এ অবস্থায় চাকুরী করা আর সম্ভব নয়, অচিরে নবাব সরকারের 
কাজ তিনি ছাড়িয়। দিলেন । 


: এবার গৃহত্যাগের পাল । পত্রী স্থলখনীর জীবনে আবার ঘনাইয়৷ 
আসিয়াছে এক সঙ্কট । স্বামী তাহার চির উদাসীন, ভজন সাধন নিয়াই 
এতকাল ছিলেন মন্ত। তবুও তো স্থুলখনী মনকে প্রবোধ দিতে 
পারিতেন, স্বামী তাহার কাছেই রহিয়াছেন। স্বামীকে চোখে দেখিয়া, 
সেব। যত্র করিয়াও কিছুটা তৃপ্তি তাহার হইত। এবার যে তাহাতেও 
বঞ্চিত হইলেন ! ইতিমধ্যে শ্রীাদ ও লক্ষমীর্টাদ এই ছুই পুজ্রের জন্ম 
হইয়াছে । ইহাদের মানুষ করিয়া তোলা সহজ নয়, একলা তিনি কি 
করিয়া এসব করিবেন ? সারা অন্তর তাই হাহাকার করিয়া উঠে, ছুই 
চোখে নামে অশ্রুধারা ! 

শান্ত গম্ভীর কে নানক স্ত্রীকে কহিতে থাকেন, “কেঁদোন। স্ুলখনী । 
দেখছে। তো, চারদিক ছেয়ে গেছে হিংসা, দ্বন্দ, লোভে-__অহঙ্কার আর 
নীচতায়। মান্থুষের পাপের ভরা পুর্ণ হয়েছে, ঘরে ঘরে শোন! যাচ্ছে 
দীর্ঘশ্বাস ও ক্রন্দন ধ্বনি। আমাকে যে এবার যেতেই হবে। ঘুরে 
বেড়াবো দেশে দেশে, প্রভুর নাম গেয়ে । চেষ্টা করবে! মানুষের জীবনে 
এনে দিতে শাস্তির প্রলেপ | তুমি ভয় পেয়োনা, আবার আমি ফিরে 
আসবো, সংসারের ভেতরে থেকেই সংসারের প্রভুর সেবা তাই যে 
আমার ব্রত |” 

পত্রীর ক্রন্দন, বালক পুক্রদ্ধয়ের করুণ চাহনি ও প্রিয় ভগ্নী নান্কীর 
মিনতি তাহার গতি রোধ করিতে পারিল ন|। 


পথে প্রান্তরে, শ্বাশানে, উপবনে নানক ঘুরিয়া বেড়ান। প্রচার করেন 
উপলব্ধ সত্যের বাণী। সঙ্গে চলে মুসলমান ভক্ত মর্দানা। নানকের 
স্বরচিত ভজন ও মর্ধীনার রবাবের স্ুরঝঙ্কারে দলে দলে লোক ছুটিয়! 


নি ১৪) 


আসে। নবীন সাধকের উপদেশ বাণী শুনিয়া মুগ্ধ হয়। 

জিজ্ঞাসুর! প্রশ্ন করে, “আপনি কোন্‌ মঠের? কোন্‌ সম্প্রদায়ের 
তান্তভূক্তি ?” 

উত্তর হয়, “আমি নাঁনক নিরংকারী, যে নিরাকার নিয়েছেন সারা 
বিশ্বস্থষ্টির এই আকার, তার ধ্যানই আমি করি, তারই মহিমা গেয়ে 
বেড়াই দিকে দিকে। আমার কাছে নেই কোন সম্প্রদায়ের প্রশ্ন, নেই 
উঁচ্‌-নীচুর পার্থক্য। হিন্দু মুসলমানের ভেদও নেই আমার দৃষ্টিতে । 
আমি যে দেখছি হিন্দু আজ দেশে একটিও নেই, তেমনি নেই কোন 
মুসলমান 1” 

নানকের কথ! পল্লপবিত হইয়া নবাবের কাজীর কাণে যায়। তিনি 
গঞ্জিয়। উঠেন, “সে কি কথা? নানক হিন্দুর ছেলে । হিন্দুদের নিয়ে 
যাঁ কিছু বলাবলি করুক, তাতে বলবার কিছু নেই। কিন্তু মুসলমানদের 
সম্পর্কে হাল্ক। ধরণের কথ বল্‌্লে তো! তা সহ্য কর! হবে না।” 

নবাব দৌলতখানের কাছে অভিযোগ উঠে, নানককে অধিলম্বে 
দরবারে হাজির কর! হয়। নবাব রুক্ষম্বরে কহেন, “নানক, আমি 
তোমার উপর অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছি । তুমি নাকি বলে বেড়াচ্ছো! হিন্দু 
নেই, যুসলমানও কেউ নেই। তবে কি বলতে চাও__এই কাজী সাহেব বা 
আমি, এই হুজনেই অ-মুসলমীন ?” 

নানক জহান্তে উত্তর দিলেন, “নবাব সাহেব, প্রকৃত মুসলমান আমি 
তাকেই বলবো, সত্যকার বিশ্বাস জেগেছে ধার মনে, পয়গন্থরের 
উপদেশবাণী রূপাম়িত হয়েছে ধার জীবনে । অভিমান, লোভ আর 
কাম ক্রোধ যিনি করেছেন নিম্মলঃ জীবন আর মৃত্যু ধার চোখে হয়ে 
গেছে সমান--তাকেই বলবে! প্রকৃত মুসলমান । ঈশ্বরের ইচ্ছার সঙ্গে 
বার ইচ্ছার হয়েছে মিলন, পুরোপুরি সত্যের উপলব্ধি নিয়ে যিনি 
সর্বত্র দেখেছেন তার আল্ল-তালাহ কে তাকে ছাড়। আর কাকে বলবো 
মুসলমান? এমন লোক কোথায়? আমায় বলে দিন ।” 

সভাকক্ষে চাপা গুঞ্জন ধ্বনি উঠিল। এ ব্যাখ্যার উপর সহসা মুখ 


১৩০ 


ফুটিয়া কেহ কিছু বলিতে পারিতেছেন না । যে উদার ধঙ্ীবোধ হইতে 
নানক তাহার বক্তব্য বলিতেছেন, নবাব তাহা বুঝিয়াছেন। ভিতরে ভিতরে 
খুশী হইয়াও উঠিয়াছেন। 

কাজী কিন্তু ছাড়িবার পাত্র নহেন। কহিলেন, “আচ্ছা, তোমার 
বক্তৃতা তো অনেক শুনলুম। কিন্তু এবার ঠিক ক'রে বলতো, তুমি কোন্‌ 
ধল্মীয় ?” 

“কোন ধন্ম বা সম্প্রদায়ের গণ্তীর মধ্যে তো আমি নেই ।” 

“কেন? এ আবার কি রকম অদ্ভুত কথা ?” 

“সম্প্রদায় চালিত হয় 'প্রবর্তকের উপদেশবাণীর মধ্য দিয়ে আর 
মামি পথ চলি সেই অনাদি, অনন্ত, পরম পুরুষের প্রদগিত আলোতে। 
আমার চোখে তাই ধন্মের ভেদরেখা হয়ে গেছে বিলুপ্ত ।” 

সন্ধ্যাকালীন নামাজের সময় হইয়া আসিয়াছে, সভা ভঙ্গ হইল | 
নবাব সহাস্তে কহিলেন, “নানক, প্রার্থনার জন্য আমর! মস্জেদে যাচ্ছি। 
তুমি তো বললে, ধন্মের ভেদ তোমার চোখে কিছু নেই । আমাদের সাথে 
মসজেদে গিয়ে নামাজ পড়তে তোমার আপত্তি আছে ?” 

“কিছু মাত্র নয়। ঈশ্বরের যেকোন স্ততিই যে আমার শ্রদ্ধার বস্তু” 
__-এ কথা বলিয়া নানকও তাহাদের সঙ্গী হইলেন ! 

নামাজ শেষ হইয়া গেল । প্রার্থনাগৃহের এক প্রান্তে নানক চুপচাঁপ 
ঠাড়াইয়া আছেন। 

কাজী আসিয়া চাপিয়া ধরিলেন, “কই, তুমিতো! আমাদের সঙ্গে 
যোগ দাওনি। এই বুঝি তোমার সত্যবাদিতা ?” 

“কাজী সাহেব, আপনাকে অনুসরণ ক'রে নামাজ পড়বো» ভগবানের 
কাছে প্রাণের প্রার্থনা জানাবো, এই আশা নিয়েই তো এখানে 
এসেছিলাম। কিন্তু অনুসরণ করবে! কাকে? আপনি তো সত্য সত্যিই 
আজ এখানে নামাজ পড়েন নি।” 

“মুখ সামলে কথা৷ বল্‌, বেয়াদপ।” অভিমানাহত কাজী রোষে 


গঞ্জিয়া উঠিলেন । 


১৩১ 


নবাবও কম উত্তেজিত হন নাই । কহিলেন, “নানক, এর জবাবদিহি 
তোমায় করতে হবে, নইন্ে পাবে কঠোর দণ্ড ।৮ 

জব, সভ্যি-বজছি, আমি যে এতক্ষণ চড়িয়ে দাড়িয়ে দেখলাম _ 
কাজীসাহেব নামাজ পড়েন নি, আর যদি অভয় দেন তো৷ বলি--নামাজ 
আপনিও পড়েন নি” 

৪8 “তবে আমরা এতক্ষণ এখানে কি করেছি ?” 

“তা হ'লে শুন্ুন। কাজী সাহেবের ঘোটকীর এক বাচ্চা হয়েছে 
কিছুদিন আগে। বাড়ীর অঙ্গনে এই বাচ্চাটা ঘুরে বেড়ায়। পাশেই 
রয়েছে এক কৃয়ো, তাতে ওটা যাতে পড়ে না যায় এই দৃশ্চিন্তাই তিনি 
করছিলেন নামাজের সময় !” 

কাজী ভয়ে বিস্ময়ে নিরুত্তর হইয়া আছেন । সত্যই তাই। এই 
তরুণ সাধক কি তবে অন্তর্য্যামী ? 

_ নানক বলিয়া! চলিলেন, “নবাব সাহেবের মনও নামাজ ছেড়ে বিচরণ 
ক'রছিলো কান্দাহার অঞ্চলে। একরাশ টাকা দিয়ে আপনি সেখানে 
কন্মচারীদের পাঠিয়েছেন ঘোড়া কেন্বার জন্য । আপনি সেই কথাই 
বারবার ভাবছিলেন |” 

সব কথ। বর্ণে বর্ণে সত্য-_নবাবের অস্বীকার করার উপায় নাট । 
কাজীর আত্মাভিমানও ইতিমধ্যে চূর্ণ হইয়। গিয়াছে । উভয়ে ইতিমধ্যে 
বুঝিয়া নিয়াছেন, নানক আজ এক শক্তিধর মহাপুরুষে পরিণত। 
অতঃপর যথোপযুক্ত সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধ! প্রদর্শন করিয়া নানককে তাঁভারা 
বিদায় দিলেন। 


এবার শুরু হয়'নানকের পরিব্রাজক-জীবন, আর পরিব্রীজনের পথে 
পথে ধু নরনারীর জীবনে করুণার ধারা তিনি ঢালিয়। দেন, প্রকাশিত 
হইতে থাকে যোগবিভূতির নান। এষ্বর্য্য। 

পদধাত্রার পথে সেদিন তিনি সঈদপুরে আসিয়! পৌছিয়াছেন। 
হঠাৎ শহরের এক প্রান্তে লালু নামক ছুতোর মিস্্রীর সঙ্গে তাহার 


১৩২ 


নানক 


দেখা। আধিক স্বচ্ছলতা লালুর কোন দ্রিনই নাই, দিনরাত পরিশ্রম 
করিয়া তাহাকে সংসার চালাইতে হয়। কিন্তু সে বড় ভক্তিমান। সাধু- 
সন্ত ও ফকীরদের দর্শন পাওয়ামাত্র যুক্তকরে আমন্ত্রণ জানায়, গৃহে 
আনিয়া সাধ্যমত সেবাযত্র করে। 

পরম সমাদরে সেদিন নানককে সে আপন গৃহে নিয়া আসিল। 
হল্দে রং-এর আলখাল্প পরা" প্রিয়দর্শন এই নৃতন সাধুকে দর্শনের জন্য 
দলে দলে লোক লালুর কুটিরে আসিতে থাকে, তাহার ধন্দ-উপদেশ 
শুনিয়া সকলের মনে জাগ্রত হয় আশা ও উৎসাহ । ধীরে ধীরে সব্বত্র 
সাধু নানকের খ্যাতি ছড়াইয়া পড়ে। 

পাঠান স্থুবাদারের দেওয়ান, মালিক ভগে। এই শহরে অবস্থান করেন। 
পুণ্য অজ্জনের জন্য এ সময়ে তিনি পীর, ফকীর ও গরীব নরনারীদের 
কয়েকদিন ধরিয়। ভোজন করাইতেছেন। হিন্দ্র সাধু সন্াসীদের জন্যও 
পুথক ভাগ্ডারার বন্দোবস্ত রহিয়াছে । 

কথাপ্রসঙ্গে মালিক ভগে। শুনিলেন, কিছুদিন যাবৎ লালু ছুতোরের 
বাড়ীতে এক হিন্দু সাধু আসিয়াছেন। কিন্ত তাহ!র ভাগ্তারায় এ সাধু 
আজ অবধি উপস্থিত হন নাই । 

দেওয়ান সাহেবের আত্মীভিমানে ঘ। লাগিয়। গেল। এখানকার সব 
সাধু ফকীরেরাই তো তাহার নিমন্ত্রণে যোগ দিয়াছেন, পরিতোষপূর্ব্বক 
ভোজনও করিয়াছেন। লালুর অতিথিটি কি তবে অবজ্ঞা করিয়াই 
তাহার গৃহে উপস্থিত হন নাই? সেই দিনই লোক পাঠাই নানককে 
ডাকাইয়া আনিলেন। লালুও ভয়ে ভয়ে সঙ্গে আসিয়াছে । কি জানি, 
তাহার অতিথিটির অদৃষ্টে আজ পাঠান দেওয়ানের কাছে কোন্‌ লাঞ্থন। 
আছে তাহা কে জানে? 

মালিক ভগো! প্রশ্ন করিলেন, “আপনি তে। শুন্ছি, উদার স্বভাবের 
সাধুঃ জাতিও মানেন ন1। তবে আমার ভাগ্ারায় ভোজন করতে 
আসেন নি কেন? স্থানীয় সব সাধুদেরই তো! সমাদর ক'রে আহ্বান 
জানানো! হয়েছে ।” 


১৩৩ 


ভারতের সাধক 


নানক কোন উত্তর ন! দিয়। মিটিমিটি হাসিতেছেন। মালিক ভগো 
উত্তেজিত হইয়। উঠিলেন। কহিলেন, “আমার কথার উত্তর দিন্‌। 
সম্তেষজনক উত্তর না পেলে আপনাকে ছাড়া হবে না। দেখছি, 
দেওয়ান মালিক ভগোকে এখনো আপনি চেনেননি ।” 

“দেওয়ান সাহেব, চিনেছি বলেই তো, আপনার পুরী মালপোয়া 
খেতে আসতে পারিনি ।” 

“তার মানে ?-_ মালিক ভগে ক্রোধে একেবারে ফাটিয়।৷ পড়িবার 
উপক্রম। 

“মানে আমি এখনি পরিষ্কার ক'রে বুঝিয়ে দিচ্ছি, দেওয়ান সাহেব। 
আপনি আপনার ভাণগ্ডারার ঘর থেকে আমার জন্য কিছু খাবার আনিয়ে 
দিন। আর লালুও এখনি চলে যাক্‌ তার ঘরে, আমার জন্য সেখানে 
যে আহার্য্য তৈরী হচ্ছে, তা নিয়ে আস্মুক। তারপর আমি আমার 
বক্তব্য বল্ছি।” 

নানকের কথামত কাজ কর। হইল । মালিক ভগোর গৃহে প্রস্তুত-করা 
পুরী-মালপোয়া-মিষ্টির পাত্র স্থাপন করা হইল তাহার সম্মুখে । লালুর 
বাড়ীর ছুই টুকৃরা শুক রুটিও পাশে রহিয়াছে । 

আত্মস্তরী দেওয়ানকে উচিত শিক্ষা দিবার জন্য নানক এ সময়ে 
প্রকটিত করিলেন এক বিস্ময়কর যোগবিভূতি। শিখপ্রস্থ 'জনমসাধী'তে 
এ ঘটনাটির উল্লেখ রহিয়াছে । 

মালিক ভগোর খাগ্গুলি হাতে নিয়া নানক নিঙড়াইতে লাগিলেন। 
সমবেত সকলের বিম্ময়বিমূঢ় দৃষ্টির সমক্ষে এ খা্চ হইতে বাহির হইয়! 
আসিতে থাকে টাটকা রক্তধারা। আবার লালুর খাছ্ধকে পেষণ করার 
ফলে নিঃল্যত হয় শুভ্র স্থপেয় গো-ছুদ্ধ। 

এ অদ্ভুত, অমান্ুুষী কাণ্ড প্রত্যক্ষ করার সঙ্গে সঙ্গে মালিক ভগোর 
সকল দন্ত ধূলিসাৎ হইয়া গিয়াছে। নানকের চরণে পতিত হইয়া 
বারবার তিনি কৃপা ভিক্ষা করিতে লাগিলেন। 

নানক নিরংকারীর প্রশস্তিতে সারা শহর সেদিন মুখরিত হইয়া উঠে, 


১০৪ 


লানক 


লালুর গৃহ লোকে লোকারণ্য হইয়া যায়। নানক প্রমাদ গণিলেন। 
বালা এবং মর্দানাকে সঙ্গে নিয়া পরদিনই তিনি সঈদপুর ত্যাগ 
করিতে বাধ্য হন। 


পথ চলিতে চলিতে সন্ধ্যা হইয়া আসিয়াছে । রাত্রির জন্য নানক ও 
তাহার সঙ্গী ভক্তদ্ধয় সেদিন স্বজন নামক এক বিশিষ্ট ব্যক্তির জতিথ্য 
গ্রহণ করিলেন। লোকটি দেখিতে পরম ধান্মিক। কপালে লম্বা ত্রিপুণ্ড ক, 
গলায় বিলম্বিত স্কটিকের মালা । সুখে সদাই যেন মধু ঝরিতেছে। 
অতিথি সেবাই নাকি তাহার জীবনের প্রধান ব্রত। এজন্য আয়োজনের 
কোন ক্রটিও নাই। বাড়ীর সদর দরজার পাশেই স্বজন তাহার 
হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধন্মের অতিথিদের জন্য ছুইটি পৃথক বিশ্রামভবন 
নিন্মীণ করিয়াছে । রাস্তার ধারেই সে বসিয়া থাকে, গার বিদেশী পথিক 
দেখিলে সাদরে ব্বগৃহে আহ্বান জানায় । 

এই সুজন আসলে এক ছদ্মবেশী দস্থ্য । ধাম্মিক ও অতিথিবংসল 
ভদ্রলোকের বেশ ধরিয়া নিরীহ পথচারীদের প্রায়ই ভুলাইয়া৷ সে নিজের 
কবলে টানিয়া আনে । তারপর গভীর রাতে, শ্রান্ত অতিথিরা যখন 
নিদ্রায় অভিদ্ভুত হয়, সে তাহাদের নিবিবচারে হত্য। করে -টকাকড়ি 
করে আত্মসাৎ। 

নানকের তান্তর্ভেদী দৃষ্টি সাধুবেশধারী এই দস্থ্যকে চিনিয়া নিতে 
একটুও ভুল করে নাই। 

রাত্রি ক্রমে গভীর হইয়া আসিয়াছে, স্বজন তাহার শিকারের আশায় 
প্রতীক্ষারত । এমন সময় নানক মর্দীনাকে রবাব বাজানোর আদেশ দিলেন, 
নিজে ধরিলেন সুমধুর ভজন। এ ভক্তি-সঙ্গীতের আবেগ ও সংবেদন 
ধীরে ধীরে দস্থ্যর হৃদয় গলাইয়। দেয়। 

পাশের কক্ষ হইতে আকুল হইয়া সে ছুটিয়া আসে, কীাদিতে 
কাদিতে নানকের চরণতলে পতিত হয়। 

হুদয়ে তাহার এবার জ্বলিয়। উঠিয়াছে অনুতাপের জাগুন ৷ কাতরম্বরে 


১৩৫ 


ভরিতের সাধিক 


বলিতে থাকে “মহারাজ, আমি ঠিকই বুঝেছি, অতিথির বেশে আপনি 
এসেছেন আমায় উদ্ধার করতে । আমি মহাপাপী! এমন কোন দৃণ্য 
অপরাধ নেই যা আজ অবধি আমি করিনি। আমায় আপনি দুয়া করুন, 
আর বলে দিন, কি ক'রে আমার পাপের স্বালন হবে ।” 

অপার প্রসন্নতায় নানকের আনন উজ্জ্বল হইয়। উঠিয়াছে। দস্থ্য 
স্বজনকে বক্ষে ধারণ করিয়া আশ্বাস দিলেন, “ভাই, কোন ভয় নেই 
তোমার ! “অকাল পুরুষ নিশ্চয় করবেন তোমায় উদ্ধার । তিনি যে পরম 
কৃপালু। তার দৃষ্টি সর্বত্র রয়েছে প্রসারিত। তোমার এ অন্ুতাপের 
জ্বাল! তিনি টের পেয়েছেন। এবার তিনি এগিয়ে আসবেন |” 

“আপনার পরম আশ্রয় পেয়েছি, আর আমার কোন ভয় নেই । এবার 
কি আমায় করতে হবে আদেশ করুন ।” 

“স্থজন, এবার থেকে তোমার সাধন শুরু হোক্‌ অনুতাপ আর পাপ- 
'খালনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু শুধু মুখের কথাতেই তো! অনুতাপ কর 
হয় নাঃ ভাই । সারা জীবনে যত কিছু অপকন্মী করেছ, তা এবার স্মরণ 
কর। যারা তোমার দ্বার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের ছ্ারে বারে গিয়ে, 
যতট। পার সে ক্ষতি পূরণ করার চেষ্টা কর। তবেই ধীরে ধীরে এগিয়ে 
আসবে মুক্তি” 

ভক্ত ও মুমুক্ষুদের জন্য নানক এ সময় তাহার “জপজী'" গ্রন্থ রচন। 
শুরু করিয়াছেন । স্থজনের স্মরণ ও মননের জন্য তাহা হইতে ছুই একটি 
পৌঁড়ী শুনাইয়া দ্িলেন। আর দিলেন তাহাকে 'সৎ-নাম?। 

দস্থ্য সুজনের জীবনে এক অদ্ভুত রূপাস্তর আসিয়া গেল। এখন 
হইতে তাহার জীবনের প্রধান কাজ__পুর্ববকৃত অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত 
করা। এজন্য দিনের পর দিন কত অপমান লাঞ্থন। যে তাহাকে সহ্য 
করিতে হইয়াছে তাহার ইয়ত্তা নাই। কিন্তু ভক্ত স্রজন প্রাণপণে 
গুরুজীর উপদেশ পালন করিয়! গিয়াছেন, ধন্শ ও নামপ্রেম হইতে 
একদিনের তরেও বিচ্যুত হন নাই। এক নিষ্ঠাবান শিখ হিসাবে সর্বত্র 
তিনি পরিচিত হইয়া উঠেন। 


১৩৩৬ 


শানক 


আর্ত মানুষের সেবা ও সাধকদের ধন্মচর্চার সুবিধার জন্য সুজন 
নিজের সর্বস্ব ব্যয় করিয়া! উত্তরকালে এক ধন্মশালা স্থাপন করেন । ইহাই 
প্রথম শিখ-ধন্মশালা । 


ঘুরিতে ঘুরিতে নানক পাঞ্জাবের বাতাল। নামক স্থানে আসিয়াছেন। 
রাবী নদীর তীরে, বটবৃক্ষতলে বসিয়া মনের আনন্দে গাহিতেছেন ভজন 
গান। যে তাহার এই মধুর স্তুতি-সঙ্গীত শুনে, সে-ই মুগ্ধ হইয়া যায়। 
দিকে দিকে এই নবাগত সাধু পুরুষের কথা ছড়াইয়া পড়ে। হিন্দু 
মুসলমান, উচ্চ নীচ, পণ্ডিত মূর্খ সকলেই দলে দলে আসিয়া সেদিন 
সেখানে ভীড় করিতে থাকে । 

কড়োরিয়া এই অঞ্চলের প্রতাপশালী জমিদার। নানকের এমন 
জনপ্রিয়তা দেখিয়া! তিনি মহ! রুষ্ট হইয়া উঠিলেন। এক অখ্যাতনাম! 
হিন্দু সাধুকে নিয়া কেন শুধু শুধু এতহৈ চৈ? এ তাহার একেবারে 
অসঙ্য। স্থির করিলেন, আর কাল বিলম্ব না করিয়া এই সাধুকে দমন 
করিবেন। এ অঞ্চল হইতে তাহাকে দূর করিবেনই। 

কোমরবন্ধে তরবারি ঝুলাইয়া, ঘোড়ার পিঠে চাপিয়া কড়োরিয়। 
নদীতীরের দিকে অগ্রসর হইলেন । সঙ্গে চলিল তাহার একদল রক্ষী ও 
কৌতুহলী মোসাহেব। 

কিছুদূর যাওয়ার পরই ঘটে এক আকম্মিক ছূর্ঘটনা। পথ চলিতে 
গিয়া কড়োরিয়ার অশ্বটির পা! ফস্কিয়। যায় এবং মনিবকে নিয়া উহা! 
ভূতলে পতিত হয়। আঘাত গুরুতর হয় নাই, কিন্তু কড়োরিয়া ছুই 
দিন গৃহে বসিয়া বিশ্রাম নিতে বাধ্য হন। 

একটু সুস্থ হইয়াই নানকের আস্তানার দিকে তিনি রওনা হইলেন। 
কিন্ত বাড়ীর সীমান। পাঁর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা দিল আর এক 
ছুর্দেব। নিজের দৃষ্টিশক্তিকে হঠাৎ তিনি হারাইয়া ফেলিলেন। শত 
চেষ্টা করিয়াও চারিদিকের কোন বন্তুই আর দেখিতে পাইতেছেন ন|। 
অথচ গৃহে ফিরিয়। আসার পরই দেখ। গেল, পূর্বেকার দৃষ্টি শক্তি তিনি 


১৩৭ 


ভারতের সাধক 


আবার ফিরিয়! পাইয়াছেন। তাহার কাছে এ এক অদ্ভুত রহস্য ! 

জমিদার কড়োরিয়। স্বভাবত;ই বড় দাস্তিক। তাছাড়া, এই সামান্ছ 
কাজে এমনতর বাঁধা পাইয়া জেদ তাহার আরো বাড়িয়া গেল। আবার 
অশ্বপৃষ্ঠে তিনি চড়িয়া বসিলেন। 

এবারকার অভিজ্ঞতাও পুরর্ববং। একটু আগাইয়া যাইতেই তুই 
চোখ তাহার একেবারে অন্ধ হইয়া গেল। 

এবার কড়োরিয়ার অন্তরে বড় ভয় ঢুকিয়া গিয়াছে। অন্ুচরদের প্রশ্ন 
করিলেন, “ব্যাপার কি বলতো।? বাড়ীর বার হলেই এ রকমটা হচ্ছে 
কেন?” 

সঙ্গীরা কহিল, “হুজুর, দেখে শুনে মনে হচ্ছে, নানক এক সত্যিকার 
বড় সাধক, ঈশ্বরের প্রিয় জন। আপনি শুধু শুধু তার ওপর চটে 
গিয়েছেন, তাকে এই গাঁ থেকে বার ক'রে দিতে যাচ্ছেন। বোধ হচ্ছে, 
আপনার এ কাজটায় ঈশ্বরের তেমন সমর্থন নেই, তাই এতো। ছুর্ঘটন। 
বার বার ঘটছে ।” 

কড়োরিয়ার মন এবার পরিবস্তিত হইয়াছে । নরম স্থুরে কহিলেন. 
“তা হলে চল, তাকে আমাদের সেলাম জানিয়ে আঁসি।৮ 

অশ্বচালনা করার সঙ্গে সঙ্গে এ আবার কি কাণ্ড? দৃষ্টিশক্তি 
তাহার কোথায় হারাইয়া গেল ? 

হতাশভাবে সঙ্গীদের তিনি কহিলেন, “এবার তবে তোমরা আমায় 
কি করতে বলে? গ্াাখ্যোঃ নানককে সেলাম জানাতে যাবো, তাতেও 
পড়ছে এই বাধা ॥” 

“ন্ছজুর, আপনি একটা মস্ত ভুল করছেন। ঘোড়ার পিঠে সওয়ার 
হয়ে কি সাধু ফকিরদের কাছে কখনো যেতে আছে? সাধুর দোয়া 
মাগতে যাচ্ছেন-_-আপনার উচিত হবে, পায়ে হেঁটে নম্র হয়ে তার 
কাছে যাওয়া |” 

এবার কড়োরিয়ার চৈতন্যোদয় হইল । দৈন্যতরে নানকের কাছে 
গিয়া পতিত হইলেন তাহার চরণে । প্রেমভরে বারবার আলিঙ্গন দিয়া 


১৩৮ 


নানক 


কপালু নানক তাহাকে সেদিন নানা সহ্ুপদেশ দান করিলেন। 

কড়োরিয়। যুক্ত করে কহিলেন, “মাপনি দয়া ক'রে আজ আমায় 
শিক্ষা দিয়েছেন, আমার মহা কল্যাণ করেছেন। আপনার দর্শন পেয়ে 
হয়েছি কৃতার্থ। আমার কিন্ত একটা! নিবেদন আছে । এখানকার বিস্তীর্ণ 
অঞ্চল আমারই জমিদারীর অন্তর্গত। আমারি একান্ত ইচ্ছে, এখানকার 
উবর্বর ভূমিগুলি আপনার কাজে আমি দান করি। দয়া ক'রে আমায় 
অনুমতি দিন। আপনার মত মহাপুরুষকে কেন্দ্র ক'রে এখানে এক নূতন 
গ্রাম নূতন সমাজ গড়ে উঠক, তাই আমি চাই ।” 

নানক সহাস্তে কহিলেন, “এ সংসারের সব ভূমির মালিকই হচ্জেন 
কেরতার'- যিনি দৃষ্ঠমান সব কিছু করেছেন সৃষ্টি। তুমি ধন্য ফে, তার 
নাম ক'রে এই জমি তার কাজে বিলিয়ে দিচ্চ । তোমায় আমি অনুমতি 
দিলাম । আজ হতে এ নূতন উপনিবেশের নাম হবে করতারপুর 1” 

অল্প দিনের মধোই করতারপুরে জনবসতি শুরু হইয়া যায়। উত্তর- 
কালে এক বদ্ধিষু জনপদরূপে এস্থান পরিচিত হইয়া উঠে। অতঃপর 
নানকের পরিবারবর্গকেও এখানে আনয়ন করা হয় এবং তখন হইতে 
করতারপুর হইয়া উঠে নানকের অধিষ্ঠানের স্থান আর নানক-পন্থ্ীদের 
প্রধান কেন্দ্র । 


গ্রাম হইতে গ্রামান্তরে চলিয়াছে নানকের পদযাত্রা, আর ইহারই 
মধ্য দিয়া দিনের পর দিন দুঃস্থ, তুর্গত ও পতিত জনের সান্নিধ্যে তিনি 
আদিতেছেন। যেখানেই যান, তীহাঁর অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্বের স্পর্শে 
জাগিয়া উঠে আশা ও আনন্দের আলো, ধ্বনিত হইতে থাকে পরম 
প্রভুর জয়গান । 

হঠাৎ একদিন বালা ও মর্দানাকে তিনি কহিলেন, “এবার একবার 
তালওয়ান্দিতে আমায় ফিরতে হবে। আমার আত্মার আত্মীয় পরম 
স্থহৃদ রায়-বুলারের কাছে এসে গিয়েছে পরপারের ডাক। চির বিদায় 
নেবার আগে একবার তাকে দেখে আসতে হয়” 


১৩৪৯ 


ভারতের সাধক 


তালওয়ান্দির গড়ে বৃন রায়-বুলার অন্তিম সময়ের জন্য অপেক্ষা 
করিতেছেন । নানক ধীরপদে তাহার শয্যার পাশে আসিয়া দাড়াইলেন। 
ললাটে রাখিলেন স্সেহস্সিগ্ধ হস্তের স্পর্শ । তারপর কহিলেন, পক্মায়-বুলার, 
তোমার অন্তরের আহবান পৌচেছে আমার কাছে। এই গ্যাখো, আমি 
আজ এসেছি ।” 

তালওয়ান্দির সেদিনকার সেই আপনভোল! ক্ষুদ্র বালক আজ 
অগণিত মানুষের মুক্তির দিশারী । রায়-বুলারের বহুদিনের অন্তরের 
আকাজ্ষা আজ পুর্ণ । নানকের ষে আধ্যাত্মিক সম্ভাবনার কথা তিনি 
এতকাল ভাবিয়া আসিতেছিলেন তাহ! এবার সার্থক হইয়া! উঠিয়াছে। 
এই বৃদ্ধ, ধন্মপ্রাণ মুসলমানেঞ্ধ মনে অভিলাষ ছিল, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ 
করার আগে নানকের যেন দেখা পান। শয্যাপার্থ্ে তাহাকে উপস্থিত 
দেখিয়। তাহার আনন্দের অবধি রহিল না। রোগ পাগডুর কপোল বাহিয়া 
ফৌটা ফৌটা অশ্রু গড়াইয়। পড়িল। 

নানকের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখিয়া, নিজগৃহের শান্তিময় পরিবেশে 
রায়-বুলার দেহত্যাগ করিলেন। 

জনক জননী ও তালওয়ান্দির অন্যন্য বন্ধুবান্ধবদের সাথে সাক্ষাতের 
পর নানক ফিরিয়া যান করতারপুরে । 

পথে এক বুক্ষতলে বসিয়া মর্দানা ও বালার সহিত নানক বিশ্রাম 
করিতেছেন। মর্দানা সঙ্কোচভরে কহিলেন, “গুরুজী, একটা কথা 
আপনাকে জিজ্ঞাস করতে চাই, অভয় দেন তো নিবেদন করি ।” 

“খুলে বল মর্দীনাঃ কি তোমার প্রশ্ন” 

“গুরুজী, আমি দেখেছি রায়-বুলারকে দেখবার জন্য আপনি কিতীব্র 
ব্যাকুলত৷ নিয়ে সেদিন তালওয়ান্রিতে ছুটে এলেন। পথে আসতে 
আসতে বার বার বলেছেন, রায়-বুলারের মত পরম সুহৃদ আপনার খুব 
কমই আছে। কিন্ত আমার বড় আশ্চধ্য লাগছে, সেই পরম স্ুহদের 
মৃত্যুর সময়ে আপনার চোখ দিয়ে ছ' ফোটা জলও আজ গড়িয়ে পড়ল না, 
হলো না কোনই ভাবান্তর। আপনি তার আত্মপরিজনের ক্রন্দন ও 


১৪৩ 


শোকোচ্ছাসের মধ্যে নিধিবকার হয়ে ঈাড়িয়ে রইলেন। এটা সে সময়ে 
মামার বড় অদ্ভুত বলে মনে হয়েছে । 

“তবে শোন মর্দানা। রায়-বুলার সং ও ধন্মানিষ্ঠ লোক, মৃত্যুর পর 
তার সদ্গতি হয়ে গিয়েছে । তাই তীর জন্য শোক করবার কিছু নেই। 
তাছাড়া, আমি যে জেনেছি, মৃত্যু হচ্ছে জীবনেরই সিহদ্বার - মানবাত্বার 
আর এক নূতন অভিযাত্রা এর ভেতর দিয়ে শুরু হয়। মর্দীনা, জেনে 
রেখো» যা কিছুরই অস্তিত্ব রয়েছে, তা কখনো বিনষ্ট হয় না। বার বার 
ঘটে শুধু তার রূপাস্তর। ভেতরকার আত্মা থাকে বিকারহীন, পরিণতি- 
হীন, বদ্লে যায় শুধু বাইরের দেহের আবরণ। সে আবরণ টুটে গেলে 
ছুঃখ করবার কিছুই নেই। দেখছো! তো, যে গাছটার তলায় আজ 
ভুমি বসে রয়েছে, শীতের আক্রমণে তা হয়ে পড়েছে বিশীর্ণ ঝরে 
পড়েছে তার পত্র পুষ্পদল। আবার আসবে এর দেহে নুতন প্রাণের 
জোয়ার, সবুজ পাতায় আর রডীন ফুলে হয়ে উঠবে অপরূপ । তেমনি 
মানুষের দেহট। যখন জীর্ণ হয়, তা খসে পড়ে অনিবার্যরূপে, আবার 
গ্রহণ করে নৃতনতর দ্েহ। শুরু হয় নৃতনতর জীবন-লীলা। এমনি 
করেই তো৷ পরমপ্রভূ অনাদি অনন্তকাল ধরে জামাদের নিয়ে খেলছেন 
তার অবিশ্রান্ত খেল।।” 


ভক্তদ্ধয়সহ নানক আর একবার পরিব্রাজনে বাহির হইয়াছেন। 
পথের ধারেই দেখা গেল এক প্রকাণ্ড মেলা । হাজার হাজার নরনারীর 
ভীড় সেখানে । হাসি আনন্দ আলো গানে বিস্তীর্ণ অঞ্চল মুখরিত হইয়া 
উঠিয়াছে। 

প্রশ্ন করিয়া জানা গেল, এখানকার বিখ্যাত ফকির সাহেবের 
জন্মদিনে এই পবিত্র মেল। প্রতি বৎসর অনুষ্ঠিত হয়। এই বিশেষ দিনে 
জনসাধারণ তাহাকে ঘিরিয়া আনন্দ উৎসব করে, তাহার চরণে শ্রদ্ধা ও 
নতি জানায়। 

ফকীর সাহেবের নাম সদা-নুহাগন্। এ নাম তাহার নিজেরই 


১৪১ 


দেওয়া । সদা-ম্হাগন্‌ কথাটির অর্থ --চির সোহাগিনী। প্রেমময় 
ভগবানের প্রেমিকারপে ফকিরের সাধনা, মার এসাধনায় সিদ্ধ হইয়াছেন 
বলিয়া তিনি ও তাহার ভক্তের! সর্বত্র প্রচার করিয়৷ বেড়ান । 

কথাগুলি শোনার সঙ্গে সঙ্গে নানকের চোখে মুখে ফুদ্রিয়া উঠিল 
স্মিত হাস্য ৷ 

ফকীরের আবাসস্থলে গিয়া তিনি তাহার দর্শনপ্রার্থী হইলেন" 
ভিতরকার এক প্রকোন্ঠে ফকীর নিভৃতে বসিয়া আছেন। ভক্তের! 
জানাইলেন, “এখন তো ফকীর সাহেবের সঙ্গে দেখ! হবে না। এ 
সময়ে তার একটুও অবসর নেই। নিরালায় বসে তার পরম প্রিয় 
খোদার সঙ্গে তিনি প্রেমালাপ করছেন। দেখছেন না, ছুয়ারের পাশে 
শত শত লোক তার দর্শনের আশায় কখন থেকে বসে আছে? এখন 
অবধি কারুরই অনুমতি মেলে নি।” 

নানক গম্ভীর হইয়া কহিলেন, “তাহ'লে দেখছি, এবার রহস্তের পর্দা 
সরাতেই হোল ।” 

দর্শনার্থী আরো বু লোক দ্বারে সমবেত রহিয়াছে । তাহারা 
কৌতৃহলী হইয়া উঠে, ব্যগ্র কণ্ঠে প্রশ্ন করে-“রহস্তের পর্দা সরানো ? 
সে আবার কি কথা ?” 

“তাহ'লে কক্ষের ভেতরে গিয়ে ছ্াাখো, ফকীর কার সঙ্গে বসে 
নিভৃতে আলাপ করছেন ।৮”_-দৃ স্বরে কথা কয়টি বলিয়া নানক নিকটস্থ 
আম্রবনে গিয়৷ উপবেশন করিলেন । 

এতক্ষণ ফকীরের দর্শনের জন্য প্রতীক্ষা করিতে করিতে একদল 
লোক অধীর হইয়া উঠিয়াছে। এবার নানকের দৃঢ় কণ্ঠের মন্তব্য 
শুনিয়া তাহার! সাহসী হইয়। উঠে, ফকীরের গুপ্ত প্রকোষ্ঠের অভ্যন্তরে 
সকলে : একযোগে ঢুকিয়া পড়ে । 

জনতার সমক্ষে উদ্ঘাটিত হয় এক বিসদৃশ দৃশ্য ! নিভৃত সাধন ভজন 
কিছু নয়, ফকীর সাহেব সেখানে কয়েকটি সুন্দরী তরুণী নিয়া রঙ্গরসে 
মত্ত রহিয়াছেন। 


৯১৭২ 


দর্শনার্থীরা এবার কপটী ফকীরের উপর মারমুখী হইয়া উঠিয়াছে। 
বেগতিক দেখিয়া ফকার তখনি উদ্ধশ্ব!সে পলায়ন করিলেন । উত্তেজিত. 
জনতার আক্রমণে লণ্ডভণ্ড হইয়া গেল তাহার স্থুসজ্ভিত বস্তাবাস, 
বাড়লন, আর মেলা-অঙ্গনের বাগ্ঘভাগ্। 

এদিকে নানক আত্রকাননে বসিয়া তাহার ভক্তিরসাত্মক গীত শুরু 
করিয়াছেন । লোকে তাহার দিব্যকান্তি দেখিয়।৷ আকৃষ্ট হইতেছে, ভজন ও 
উপদেশ শুনিয়া লাভ করিতেছে অপার শাস্তি । এই সিদ্ধপুরুষের নাম 
এতদিন অনেকেই কাণে শুনিয়াছেন, এবার তাহার দর্শনে সকলে কৃতার্থ 
হইলেন । 

নানকের পরিচয়, তাহার যোগৈশ্বধ্যের খ্যাতির কথা সদা-সুহগন্ 
ককারও আগে শুনিয়াছেন। এবার অনুতপ্ত হৃদয়ে তিনি নানকের চরণে 
আশ্রয় নিতে আসিলেন। 

জনতা এখনে! ফকীরের উপর চটিয়৷ রহিয়াছে, নানকের কাছে 
সস! নাত্র উত্তেজিতভাবে তাহাকে ঘিরিয়। ঈডাইল। 

নানক দৃঢন্বরে আদেশ দিলেন, “তোমরা সবাই এখান শান্ত হয়ে 
বস, ভগবানের রাজ্যে সব পাপেরই ক্ষমা আছে, সব পাপেরই আছে 
পরিত্রণ। ফকীরের কি বলবার আছে শুনতে দাও 1” 

ফকীর করজোড়ে মিনতিপূর্ণ কণ্ঠে কহিলেন, “আপনি পরম কৃপালু। 
কপট জীবনের মোহ থেকে, ভ্ষ্টাচার থেকে আমায় রক্ষা করেছেন। 
এবার একাস্তভাবে আপনার শরণ নিলাম, বলে দিন আমায় সতাকারের 
উদ্ধারের পথ ।” 

গহ্যা ভাই, সত্যপথ দেখাবে! বলেই তো৷ তোমার কপটতার মুখোস 
এমন ক'রে ভেঙে দিলাম । এবার মুক্তির সাধনায় এগিয়ে পড়ে! ।” 

“সাধনার ইঙ্গিত আমায় কিছু দিন।” 

“যে প্রিয়তম, ষে প্রাণপ্রভুকে আমর! খুঁজবো তিনি যে প্রাণেরই 
গোপনপুরে বসে আছেন। বাইরে তাকে খুজলে তো চলবে না। 
বেশতো তুমি তোমার প্রেমসধনার পথেই এগিয়ে যাও, লাভ কর সেই 


১9৩ 


প্রেমময়কে । কিন্তু কখনে! যেন ভূলে যেয়ে। না, স্ুল জগতের প্রেমিকের 
মত সীমাবদ্ধ নয় তার দৃষ্টি-_তিনি সর্বজ্ঞ, সর্ববশক্তিমান। আদি-অন্ত- 
জন্স-মৃত্যুহীন তিনি। এমনিতর প্রেমিকের সঙ্গে এবার থেকে তোমায় 
করতে হবে প্রেম ।” 

“উর পন্থা কি বলে দিন ।” 

শুধু বাইরেকার প্রেম দেখালে, আন্তি আর অশ্রুবর্ষণ করলে এ 
মহাপ্রেমিককে পাওয়া যায় না, ভাই। এজন্য চাই কায়-মন-বাকোর 
পবিত্রতা, চাই ত্যাগ বৈরাগ্য, চাই সত্যের ধৃতি। মিথ্যাচার, মায়া আর 
আসক্তির চিহ্ন মাত্র থাকলে যে তাকে লাভ করা যায় না।” 

“সত্যকার ঈশ্বর প্রেম কি,কি করেই বা তা আসবে, তা কৃপা কালে 
আমায় বলে দিন ।” 

«এ প্রেম তো ব্যাখ্যা ক'রে বোঝান যায় না, এ হচ্ছে উপলব্ধির 
বস্ত। আর এ উপলব্ধি পেতে হলে তোমায় ঢেলে দিতে হবে সর্বস্ব, 
তার চরণে করতে হবে আত্ম-সমর্পণ। এই আত্ম-সমর্পণের পথ ধরেই 
হয়ে ওঠো সেই প্রেমিক পুরুষের “মনোরমা"। তিনি তোমায় দেখে মুগ্ধ 
হবেন, তবে তো৷ সফল হবে তোমার প্রেম |” 

সমবেত দর্শনাাঁদের দিকে চাহিয়। নানক ধরিলেন সগ্ভরচিত এক 
সুমধুর ভজন | মর্ণানার রবাব ধ্বনিত হইয়া উঠিল তাহার সাথে। 

__এই দেহ রয়েছে মায়া মোহে আচ্ছন হয়ে, 
আসক্তির জট পাঁকানে৷ চারিদিকে । 
কি ক'রে হবে তবে প্রিয় মিলন ? 
ওগো! কনে! শুধু র্ভীন ওড়না আর ঘাঘর! দিয়ে 
কি ক'রে করবে তোমার বরের মন হরণ ? 
ঢেলে দাও তোমার অনাবিল প্রেম 
এ প্রেমের রঙ. জৌলুষের কখনো যে নেই বিনাশ । 
এ প্রেম পেয়েছে যারাঃ তারাই ধন্য, 

চির নমস্তয তার নানকের। 


১৪৪ 


নানক 


যার! প্রভুর প্রিয় নাম সদাই করে গান, 
তাদের দিকেই যে প্রভূ আমার করেন নয়নপাত, 
--চিরতরে করেন তাদের অঙ্গীকার । 
এবার একান্তে বসিয়া নানক ফকীরকে ভক্তি-সাধনার নিগুঢ তন্বাদি 
শিখাইয়া দেন। তারপর স্থানত্যাগ করেন। এই সদা-নুহাগন ফকীর 
উত্তরকালে এক খ্যাতনামা প্রেমিকভক্তে পরিণত হন । রি 


পরিব্রাজন ও প্রচারের জন্য নানক কয়েকবার করতারপুর ছাড়িয়া 
বাহির হইয়াছেন, দূর দুরান্তে ঘুরিয়া বেড়াইয়াছেন। মুসলমান সুফী 
সাধকদের অনেকেরই সঙ্গে তাহার অস্তুরঙ্গতা ছিল । ই'চাঁদের মূল ধর্মস্থান 
মক্কা মদিন। দেখার ইচ্ছা! একবার তাহার মনে জাগিয়া উঠে। তাঈ ভক্ত 
মর্টানাকে সঙ্গে করিয়া একবার তিনি পদত্রজে সারা মধ্য-প্রাচ্য ভ্রমণ 
করিয়া আসেন। এই সময়ে তত্রত্য অঞ্চলের সাধকেরা তাহার যোগ 
বিভূতির নান। পরিচয় প্রাপ্ত হন। 
সেবার তিনি কিছুদিনের জন্য মন্কীয় অবস্থান করিতেছেন । মুসলমান 
ভক্তদের তখন নামাজের সময়। নানক ভাবতন্ময় হইয়া আপন মনে 
শাষায় শুইয়া আছেন, কাবা-শরীফের দিকে তাহার পদছয় রহিয়াছে 
প্রসারিত। কাবার মাতোয়ালীর দৃষ্টি তাহার দিকে পড়িল, তিনি গঞ্জিয়া 
উঠিলেন, “ওরে দরবেশ, তোর এত বড় সাহস! খোদার পবিত্রস্থান 
বলে যে কাবা সবার কাছে সম্মান পায়, সেদিকে তুই তোর প৷ 
রেখেছিস্‌! ভালো চাস্‌ তো এই মুহুর্তে পা সরিয়ে নে !” 
 মানক শায়িত অবস্থায় উত্তর দিলেন, “ভাই, সেই দিকেই এ পা 
কি সরিয়ে দাও, যেখানে ঈশ্বর অবস্থান করেন না, আর যেখানে নেই 
তমার কাবা-শরীফ ।” 
গকথিত আছে, নানকের পা! ছুইটি এ সময়ে টানিয়া সরাইতে গিয়া 
এই মাতোয়ালী বিল্ময়ে অভিভূত হইয়া যায়__ষে দিকেই তাহার পদছয় 
স্বাপিত করা হয়, দেখ যায়, সেই দিকেই কাবা-মসজেদ স্থান পরিবর্তন 


১৩ ১৪৫ 


ভারতের সধিক 


করিয়। ঘুরিয়া দাড়াইতেছে। এ অলৌকিক দৃশ্ঠ দেখিয়া সকলে হতবাক্‌ 
হইয়! যায়। নানক যে একজন যোগবিভূতিসম্পন্ন উচ্চস্তরের সাধক এ 
বিষয়ে তাহাদের কোন সন্দেহ থাকে না । | 

মন্ক। হইতে নানক মদিনা, বাগদাদ ও অন্যান্য অঞ্চল ঘুরয়া ভারতে 
প্রত্যাবর্তন করেন। 


দিল্লীতে তখন লোদী বংশীয়দের রাজত্ব চলিতেছে । বহুল লোদী 
ত্ব্ধল হস্তে তাহার রাজদণ্ড ধারণ করিয়া! আছেন। এই সময়ে ছুদ্ধর্য 
মুঘলবাহিনী নিয়! বাবর শাহ পশ্চিম ভারতের উপর ঝাঁপাইয়া পড়িলেন। 
পাঞ্জাবের এক একটি অঞ্চলে তিনি আগাইয়া চলিযাছেন, আর পাঠানদের 
প্রতিরোধ ব্যবস্থা! ধবসিয়া! পড়িতেছে। 

বহুল লোদীর আত্মীয়, দৌলতখান তখন পাঞ্জাবের এক বৃহৎ 
ভূভাগের শাসনকর্তা । সুলতানপুরে থাকিয়। তিনি শাসন পরিচালন! 
করেন। বাবরের আক্রমণের মুখে তাহার সেনাদল ছিন্নভিন্ন হইয়া গেল। 

আজিকার দিনের গুজরানওয়ালা-জেলার আমিনাবাদ পূর্বে সঈদপুর 
বলিয়। পরিচিত ছিল । এই সঈদপুর সেবার মুঘলদের হাতে পড়িয়াছে। 
হত্যা, অগ্নিদাহ আর লুষঠনের বিভীষিকাময় রাজস্ব তখন চারিদিকে । যুদ্ধ 
ক্ষেত্রে বু লোক হতাহত হইয়! পড়িয়া আছে। বন্দীদের সংখ্যাও হইবে 
কয়েক হাজার । বাবরের অন্যতম সেনাধ্যক্ষ মীরখার উপর পড়িয়াছে 


এই বন্দীদের ভার। 
নানক ও মর্ণীনা এই অঞ্চলে ভ্রমণ করিতেছিলেন। মুঘল সৈন্যের 


ছাউনীর কাছে যাওয়া মাত্র হুইজনকে তাহারা ধরিয়া ফেলিল । নানকেও 
পরিধানে গীতবর্ণের আলখাল্লা, মাথায় পাগড়ী, গলায় স্ষটিকের মাল 7 
সাধুর বেশ দেখিয়া সৈন্যের প্রণে মারিল না টানিতে টানিতে তীহাবে ৮. 
মর্দানাকে সেনাধ্যক্ষ মীর খার নিকট হাজির করিল। 

মীর খা আদেশ দিলেন, “এ ছুটোকে এখনই ব্ীনিবাসে পায়ে 
দাও। সেখানে গিয়ে গম পেবাই করুক, আমার সেনাদের রসদ সংগ্রহের, 


১৪৬ 


কাজ এগোবে।” 

সেনা-ছাউনী হইতে বন্দীনিবাস প্রায় ছুই ক্রোশ দূরে। নানকের 
নাথায় চাপানো হইয়াছে একটি বড় বোঝা, আর মর্দানাকে দেওয়া 
হইয়াছে ঘোড়ার সহিসের কর্ম । 

নানক কিন্তু পরমানন্দে বোঝা মাথায় নিয়াই আগাইয়। চলিয়াছেন। 
কিছুদূরে গিয়। কহিলেন, “মর্দানা, অনেকক্ষণ প্রভুর নাম গান কর! হয়নি। 
ভুমি এমন চুপচাপ কেন? রবাব বাজাও, আমি গাইছি।” 

“গুরুজী, আমার হাত যে আটক] রয়েছে । ঘোড়ার লাগাম হাত 
থেকে ছেড়ে দিলে ঘোড়া! পালাবে, তাহলে কি এরা আর আমাদের 
কাউকে আস্ত রাখবে ?” 

“মর্দানা, দেখছি, এখনো তুমি অলখ. পুরুষের কাছে আত্মসমর্পণ 
করতে পারোনি। তোমার কোন চিন্তা নেই । ওয়াহ গুরু? বলে হাত 
থেকে ঘোড়ার লাগাম মাটিতে ফেলে দাও যিনি সব কিছু চালাবার 
মালিক, তিনি ঘোড়া ঠিকমত চালিয়ে নেবেন” 

লাগাম ফেলিয়া! দিয়া ভক্ত মর্দান! কাধে-ঝুলানো রবাব যন্ত্রটি টানিয়। 
নিলেন। এ যন্ত্রের মধুর নিক্ষণের সাথে নানক ধরিলেন তীহার প্রাণ- 
প্রতুর স্তৃতি-সঙ্গীত। 

শিখ-গুরুর জীবনী 'জনমসাথী' এ সময়কার অলৌকিক ঘটনার এক 
বিবরণ দিয়াছেন _সেনাদল পরিবৃত হইয়া বন্দী নরনারী সারিবদ্ধ হইয়! 
চলিয়াছে। কিছুক্ষণ মধ্যে সকলে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করে, নানকের 
মাথার বোঝা আর বোঝ! হইয়া নাই--মাথা হইতে খানিকটা উপরে 
উঠিয়া গিয়াছে। তীহার চলার সঙ্গে সঙ্গে এই বোঝাও আগাইয়। 
চলিয়াছে। আর মার্দীনা যে অশ্থের ভার পাইয়াছে তাহাও এই ভজন 
গানের তালে তালে কদম ফেলিয়া আপন মনে চলিয়াছে। লাগাম বা 
সহিসের চালনার প্রয়োজন উহার নাই। এই অলৌকিক দৃশ্ঠটি 
সেনাধ্যক্ষেরাও দেখিয়াছেন। সুযোগমত বাবর শাহকে তাহার! এ কথা 
জানাইতে ভুলিলেন না। 


১৪৭ 


ান্র্ততস্লানকস 


সমস্ত কথ শুনিয়া বাবরের বিস্ময়ের অবধি রহিল না। খানিকক্ষণ 
চুপ করিয়া! থাকিয়া! কহিলেন, “এমন শক্তিমান হিন্দু-পীর সঈদপুরে 
রয়েছেন, আগে এ কথা জানলে এত হত্যাকাণ্ড এখানে, আমি হতে 
দিতাম না। তিনি তার নাম কি বলেছেন ?” 

“নানক নিরংকারী”। 

“এই অদ্ভুতকন্্নাী সাধকের সঙ্গে আমার দেখা করা দরকার । এখনি 
আমায় নিয়ে চল তার কাছে ।” 

অন্যান্য বন্দীদের পাশে বসিয়। নানক একমনে গম পিষিতেছেন । 
বাবর দেখিলেন, ভাবতন্ময় সাধক, নানক গুন্গুন্‌ করিয়! ঈশ্বরের স্ত্তি 
গাহিয়া চলিয়াছেন। আর পরম বিস্ময়ের কথা, এ গম পেষণের যন্ত্রকে 
হাত দিয়া ঘোরানোর কোন প্রয়োজন হইতেছেন। জাতা স্বয়ংক্রিয়, 
আপনিই তাহা ঘুরিয়া চলিয়াছে। নানক শুধু মাঝে মাঝে উহার মধ্যে গম 
ঢালিয়৷ দিতেছেন। 

নিকটে গিয়া বাবর শাহ সেলাম জানাইলেন। সবিনয়ে জানিতে 
চাহিলেন, তাহার কি উপকারে তিনি লাগিতে পারেন ? 

নানকের সে দিকে লক্ষ্যই নাই। আপন ভাবরসে বিভোর হইয়া 
গাহিতেছেন হৃদয় গলানে। সঙ্গীত। 

ভাবোচ্ছুল সাধুর আননে দেখা দিয়াছে দিব্য জ্যোতির ছটাঃ ভগবানের 
স্্রতিগান তুলিয়াছে এক অপুর্ব্ধ স্পন্দন । বাবর শাহ নিনিমেষে এই 
মহাপুরুষের দিকে তাকাইয়া আছেন । 

গান থামিলে সেনাধ্যক্ষেরা নানকের কাছে বাবরের পরিচয় দিলেন। 
সম্রাট আসন গ্রহণ করিলে নানক প্রশান্ত কণ্টে কহিতে লাগিলেন, 
“সম্রাট, আপনি খোরাশান শাসন ক'রে এসেছেন, এবার হিন্দুস্থানের 
উপর ছড়িয়ে দিয়েছেন বিভীষিকা । হত্যার রক্ত, আর মম্মন্তদ কান্সা 
আপনার হৃদয়ে দয়া জাগিয়ে তোলেনি। কিন্তু সম্রাট, এই শক্তির 
দস্ত আপনার কতকাল থাকবে, রলুন তো? আপন শক্তিবলে লোদী 
শাসকদের হাত থেকে আপনি রাজত্ব কেড়ে নিচ্ছেন, কিন্ত আপনার 


১৪৮ 


নানক 


এ শক্তিও তো৷ একদিন হয়ে পড়বে ক্ষীণ, দেহ ও মনে আপনি হবেন 
জীর্ণ, হতবল। তথখন্বআবার এক নৃতন শক্তি এসে কেড়ে নেবে আপনার 
ব। আপনার উত্তর পুরুষের এই প্রতাপ। এই ক্ষণস্থায়ী রাজ প্রতাপের 
অহঙ্কারে যেন আপনি ভূলে থাকবেন ন|। সব্র্বদা স্মরণ ক'রে চলুন সেই 
স্রষ্টা পরমেশ্বরকে, ধার কাছে আপনার মত বাদশ। হচ্ছেন কীটাণুকীট। 
মনে রাখবেন, সে-ই প্রকৃত বাঁচা বাঁচতে জানে, ঘে অনিবাধ্য মৃত্যুর কথা 
ভাবে--আর সদাই স্মরণ মনন করে পরম প্রভুকে 1 

না সত্যসন্ধ সাধকের রূঢ় সত্য কথায়, তাহার বাচনভঙ্গী ও ব্যক্তিত্বে 
নশ্দিক মুগ্ধ। বারবার জানাইতে থাকেন হিন্দুস্থানের এই মহাপুরুষকে 
তাহার সম্রদ্ধ অভিবাদন। 

বাবর শাহের বড় ইচ্ছা» নানককে সম্মনি দেখানোর জন্য বন্থমুল্য 
কোন উপঢৌকন দেন। তাই নিবেদন করিলেন, “আপনাকে একটা 
বিশেষ কিছু দান ক'রে আমি কৃতীর্থ হতে চাই,কোন্‌ বস্ত্র পেলে আপনি 
তুষ্ট হবেন, আমায় বলুন ।” 

“সস্রাট, সঈদপুরের এই হতভাগ্য বন্দী নরনারীর কল্যাণের কথাই 
সবচেয়ে আগে আমার মনে আস্ছে। আপনি দয়া ক'রে এদের মুক্ত 
ক'রে দিন।” 

মুক্তির আদেশ তৎক্ষণাৎ প্রচারিত হইয়া গেল। নানকও সঈদপুর 
ফিরিয়া গেলেন এই মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীদের সঙ্গে । যাওয়ার আগে বাদশাহকে 
প্রতিশ্রুতি দিয়।'গেলেন, আবার তিনি কয়েকদিন পরেই তাহার সহিত 
সাক্ষাৎ করিবেন, তখন উভয়ের বিস্তারিত আলাপ হইবে । 


বড় মন্মীস্তিক সেদিনকার রণবিধবস্ত সঈদপুরের অবস্থা। শত শত 
গলিত মৃতদেহে রাস্তা ঘাট পূর্ণ! ঘরে ঘরে জ্বলিতেছে আগুন। মৃত 
আত্মীয় স্বজনের শোকে চারিদিকে শুধু হাহাকার আর কান্ন। 

বড় বীভৎস, বড় করুণ এ দৃশ্য ! ভক্ত মার্ধান৷ আর ইহা সহ্য করিতে 
পায়িতেছেন না । নানককে শুধাইলেন, “গুরুজী, মুষ্টিমেয় পাঠান হয়তো 


১৪৪ 


ভারতের সাধক 


ভগবানের কাছে করেছে কোন অপরাধ, কিন্তু এজন্য হাজার হাজার 
নিরীহ নিরপরাধ লোকের উপর পড়বে নির্মম দণ্ডের আঘাত, ঈশ্বরের 
এ কেমন ধার! বিচার £” 

যে গৃহে উভয়ে আশ্রয় নিয়াছেন, তাহার পাশেই রহিয়াছে তরুলতা 
বেষ্টিত এক রম্য উপবন। সেদিকে তাকাইয়া নানক কহিলেন, “মর্দানা 
তোমার প্রশ্নের উত্তর আজ দেবো না। বাগানের কোণে দাড়ানো এ 
সুম্বাহ ফলের গাছটির দিকে লক্ষ্য কর। ফলগুলো! সব সুপ -রসে 
টইটন্বুর হয়ে রয়েছে । এ গাছের নীচে আজ রাতে তুমি শুয়ে থাকো। 
কাল ভোরে পাবে তোমার প্রশ্নের উত্তর” 

সে রাত্রিটা মার্দনা বৃক্ষতলেই যাপন করেন। পাখীর চঞ্চুর 
আঘাতে ফলের রস মাঝে মাঝে নিঃস্তত হয়, ঝরিয়া পড়ে তাহার দেহে। 
মিষ্টরসের গন্ধে পিপীলিকারা সারি বাঁধিয়া আসে । ছই চারিটি দংশনও 
অনুভূত হয়। ঘুমের ঘোরে মর্দানা হস্ত সথগলন করেন, ঘর্ষণের ফলে 
পিগীলিকার দল প্রায় নিশ্চিহ্ন হইয়া যায়। 

ভোর বেলায় ঘুম হইতে উঠিয়াই শিশ্য গুরুকে প্রণাম করিতে 
আসিয়াছেন। নানক সহাস্তে কহিলেন, “মর্দানা এসো দেখি, যেখানে 
তুমি রাত্রি যাপন করেছে। সে জায়গাটা একবার ঘুরে আসি ॥৮ 

বৃক্ষতলে ইতস্ততঃ পড়িয়া আসে অজশ্র মৃত পিপীলিকা | রাত্রে ঘুমস্ত 
অবস্থায় মর্দানা এগুলিকে নিম্পেষণ করিয়াছেন। নানক এদিকে অঙ্গুলি 
প্রসারিত করিয়া কহিলেন, দমর্দানা, চেয়ে গ্ভাখো, এখানেই রয়েছে 
তোমার কাল্‌কের প্রশ্নের জবাব । এমনি ক'রেই সঈদপুরের হাজার 
হাজার নিরীহ মানুষ সে দিন হয়েছে হতাহত। স্থ্টি আর ধ্বংসের 
টানাপোড়েনের মধ্যেই যে নিরস্তর চলছে অলখ, পুরুষের অনান্স্ত 
লীল1। মর্দানা, অখণ্ড সততায় যেখানে সব কিছু বিধৃত, 'করতার' 
নিজেই যেখানে সর্বত্র ওতপ্রোত, বিচার অবিচারের প্রশ্ন উঠে না । দণ্ড 
আর পুরস্কারের কথাও অবাস্তর ৷ 

প্রতিশ্রুতি অস্কুঘায়ী নানক পরদিন আবার বাবর শাহকে দর্শন 


১৫০ 


দিলেন। হিন্দৃস্থানের এই মহাভক্ত, মহাজ্ঞানী সাধককে দেখিয়া বাবর 
মুগ্ধ হইয়াছেন। তাহার পবিত্র সান্নিধ্য ও স্পর্শের প্রভাব সমরাটকে 
অভিভূত করিয়াছে । রক্তন্নাত তরবারি এখন কোষবদ্ধ, জয়ের লিগ্দা 
সাময়িকভাবে অস্তহিত হইয়াছে-_আপনহারা হইয়া তিনি নানকের মুখে 
ধর্ম প্রসঙ্গ শুনিতে লাগিলেন । সিদ্ধ মহাপুরুষের প্রাণটাল! ভজন গানের 
সুরতরঙ্গ স্থ্তি করিল এক ইন্দ্রজাল। 

ধর্মীকথ। ও স্তুতিগান শুনিয়। বাবর শাহের হৃদয় আনন্দে উচ্ছল হইয়। 
উঠিয়াছে। নানককে সম্ভ্রম দেখানোর জন্য নিজের প্রিয় নেশ।, ভাঙ-এর 
রত্ুখচিত কৌটাটি আগাইয়। দিলেন। 

নানক সহাস্তে কহিলেন, “জাহাপনা আপনার এই ভাঙ খেয়ে 
আমার কোন নেশাই হবে না। এর চেয়ে অনেক বড় নেশায় যে আমি 
বুদ হয়ে আছি।” 

“সত্যি নাকি? কোথায় আপনার সে নেশার বস্তুটি? 

“সআট, আমার সে নেশার বস্তুটি হচ্ছে-_আলখ, পুরুষের প্রেম । তা 
রক্ষিত রয়েছে জামার হুদয় পাত্রে। সেই নেশাতেই যে হয়ে আছি সদ! 
ভরপুর ।” 

বলিতে বলিতে নানক ভাবাবিষ্ট হইয়া পড়িলেন। নাসিকায় তাহার 
নিঃশ্বাস আর বহিতেছেন1। দৃষ্টি স্থির নিবদ্ধ, বাহ্জ্ঞান লোপ পাইয়া 
গিয়াছে । ঈশ্বর প্রেমের এক বিস্ময়কর প্রকাশ নানকের দেহে । বাবর 
নীরবে, নি্লিমেষে এ দৃশ্য দেখিতেছেন। 

মহাপুরুষের বাহৃজ্ঞান ফিরিয়া আসিলে বাবর তাহার নিকট কিছু 
কয়েকটি উপদেশ চাহিলেন। 

উত্তর হইল, “জাহাপনা, অগণিত নরনারীর শুভাশুভ নির্ভর করছে 
আপনার ওপর । সম্রাটের প্রকৃত কর্তব্য পালনে যেন আপনার কোনদিন 
ক্রুটি না হয়। ন্যায় বিচার ও সাধু ফকীরের 'মর্ধ্যাদা দান সম্বন্ধে 
আপনি সদ। সজাগ থাকুন। সছ্যপান ও দৃযতক্রীড়া৷ পরিহার করুন__ 
এ সম্পর্কে বিশেষ ক'রে আপনাকে সতর্ক ক'রে দিতে চাই । পরাজিত 


১৫১ 


শত্রর প্রতি কখনো নিষ্ঠুর হবেন না, ক্ষমাশীল থাকতেই চেষ্টা করবেন। 
সব্ব কাজে, সর্বত্র স্মরণ মনন করতে চেষ্টা করুন আপনার অষ্টাকে, পরম 
প্রভৃকে। এই ক'টি কথা পালন করলে আপনার কল্যাঁণ হবে ।” 
বিদায়ের আগে বাদশাহ কহিলেন, আপনার পবিত্র সঙ্গ ও উপদেশ- 
বাণী পেয়ে আমি পরম উপকৃত হল।ম। যাবার আগে আমার কৃতজ্ঞতার 
চিহুম্বরূপ সামান্য কিছু ভেট আপনাকে দিতে চাই। তা গ্রহণ ক'রে 
আমায় ধন্য করুন|” 
নানক এ কথার কোন উত্তর দিলেন না। তাহার ইঙ্গিত অন্থুযায়ী 
বাজিয়া উঠিল ভক্ত মর্দ(নার রবাব, গাহিলেন এক সগ্ভরচিত ভজন-__ 
ওগো সেই অদ্বিতীয় অলখ, পুরুষ 
আমায় ঢেলে দিয়েছেন তার সব কিছু। 
শুধু যে তারই দানের অপার এশ্বর্য্য 
আমর! হয়ে ওঠি ভরপুর । 
মানুষের কপার উপর যে করে নির্ভর 
বিনষ্ট হর তার ইহকাল আর পরকাল। 
বিরাজিত রয়েছেন এক মহামহিম প্রভু, 
রয়েছেন একমাত্র সেই কৃপালু দাতা, 
আর সারা বিশ্ব দাঁড়ানো তার সম্মুখে 
নতশিরে ভিখারীর মত। 
মহিমময় এই পরম প্রভুকে যে করে ত্যাগ, 
অপরের দিকে করে দৃষ্টিপাত, 
সকল মান মর্যাদায় দেয় সে জলাঞজলি। 
সম্রাট, রাজা, ওমরাহ 
সবই করেছেন তিনি স্হজন, 
দীনাতিদীন এই ক্ষুদ্র মানুষ 
কি ক'রে হবে তার সমান? ' 
নানক কহেন, শোন সম্রাট বাবর, 


১৫২. 


পানক 


তোমার মত অসহায় মানুষের কাছে 
চাইতে আমে যে ভিক্ষা 

নিব্বোধ সে-_কাগুজ্ঞান হবে ন। তার 
কোন কালে। 


পাঞ্জবের প্রাস্তদেশে নানক সেবার ভ্রমণ করিতেছেন। সঙ্গে 
হিয়াছেন ভক্তপ্রবর মর্দানা। হাসান-আ।ব দল নামক এক উধর স্থানে 
উহার। সেদিন উপস্থিত। কাছাকাছি কোথাও জল পাইবার উপায় নাই। 
নর্দানা এ সময়ে পিপাসায় বড় কাতর হইয়া পড়িয়াছেন। 

সম্মুখেই উঁচু টিলার উপরে এক ক্ষুদ্র কুটির । স্থানীয় লোকের! কহিল, 
“ফকীর ওয়ালি কোয়ান্দারী এক মহা সমর্থ সাধক-- অদ্ভূত তাহার 
“কেরামত । এ টিলার উপরে বাস করছেন বহুদিন। কাছাকাছি আর 
কোথাও কুয়ো! নেই, শুধু একটিই আছে ফকীর সাহেবের দরগাতে ।” 

নানক শিষ্যকে কহিলেন, “এখানে আর কোথায় জল পাবে ? একটু 
কট ক'রে এগিয়ে যাও। ফকীর সাহেবের কাছ থেকে চেয়ে জল পান 
ক'রে এসো1” 

মর্দান৷ উপরে উঠিয়। গেলেন। ফকীর সাহেবকে সেলাম জানাইয়া 
কহিলেন, “বাবা, আমি বড় তৃষ্ণার্ত । শুনলুম আপনার কুয়ো রয়েছে । 
দয়। ক'রে তাড়াতাড়ি এক লোটা জল আ'মায় দিয়ে দিন। আমার গুরু 
নানক-নিরংকারী নীচে দাড়িয়ে অপেক্ষা করছেন 1” 

ফকীর ক্রোধে গজ্জিয়া উঠিলেন, “কি! এতদূর স্পদ্ধা তোমার 
গুরুর! এ অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছে অথচ আমার সঙ্গে একটিবার দেখা 
করতে এলে। না। সেকি আমার নাম শোনেনি? তাছাড়া, সামান্য 
ভদ্রতা জ্ঞানও কি তার নেই? চলে যাও এক্ষুনি এখান থেকে। 
তোমার গুরুকে বলবে, কেরামৎ যদি কিছু অজ্জন ক'রেই থাকে তৃষ্ণার্ত 
শিষ্তের জন্য এখনি জলের যোগাড় ক'রে দিকৃ। আমার বিরান 
জল মিলবে না।” 


১৫৩ 


ভারতের সাঘক 


অভিমানাহত মর্দাীনা দরগ! হইতে ফিরিয়া আসিয়া সব কথা গুরুকে 
জানাইলেন। ্‌ 

নানকের ওট্প্রান্তে ফুটিয়া৷ উঠিল স্মিত হান্তের রেখা ।, কহিলেন, 
“মর্দীনা, ভক্তিভরে একবার “সৎ নাম-উচ্চারণ কর, তারপর যেখানে তুমি 
ঈাড়িয়ে আছে, সেখানকার মাটি একটু খুঁড়ে ফেল। তৃষ্ণা নিবারণের 
জল মুহুর্তেই পাবে--ফকীরের কুয়ো আসবে এখানে 1 

শিখ-গ্রন্থ 'জনমসাধী” এই অলৌকিক ঘটনা প্রসঙ্গে লিখিতেছেন £ 

মর্দীনা গুরুর আদেশ পালন করার সঙ্গে সঙ্গেই দেখা গেল, তাহার 
পদতল হইতে অজত্র ধারায় নির্গত হইতেছে জলকশ্োত। এই জল পান 
করিয়া এবার তাহার তৃষ্ণা দূর হইল । 

কিছুক্ষণ পরেই অদূরস্থিত টিলার উপর হইতে শোন! গেল ফকীরের 
ক্রুদ্ধ চীৎকার । তাহার কৃপ ইতিমধ্যে একেবারে জলশৃন্য হইয়া গিয়াছে । 
যোগবিভূতি বলে নানক উহার জল আকর্ষণ করিয়া! আনিতেছেন, আর 
উহ! নির্গত হইতেছে মর্দীনার খনন করা গর্ত দিয়া । 

ফকীর ক্রোধে ক্ষিপ্তপ্রায় হইয়া উঠিয়াছেন। এবার নানককে হতা। 
করার জন্য উপর হইতে এক বৃহৎ প্রস্তর নীচের দিকে ঠেলিয়। দিলেন। 
সবেগে উহা নীচের দিকে গড়াইয়া পড়িল । নানকের গায়ের উপর পড়িতে 
যাইবে, ঠিক সেই মুহুর্তে নানক হস্ত প্রসারণ করিলেন, বিশাল প্রস্তর 
খণ্ড যেন যাত্মন্ত্র বলে স্তম্ভিত হইল-__থামিয়া দাড়াইল। 

বড় অদ্ভুত, বড় বিম্ময়কর এই দৃশ্য । ফকীর ওয়ালি কোয়ান্দারীর 
সমস্ত তেজ বীর্ধ্য ক্পুরের মত কোথায় উবিয়া গেল। এবার ভীতভাবে 
নানকের কাছে তিনি নতি স্বীকার করিলেন, তাহার তত্বোপদেশ লাভ 
করিয়া হইলেন কৃতার্থ। | 

নানকের পাঞ্জা ব। হাতের ছাপ এ সময়ে এ প্রস্তরের উপর পতিত 
হইয়াছিল। আজিও এ ঘটনাস্থলে পাঞ্জ চিহণস্কিত বৃহৎ প্রস্তরটি বর্তমান 
আছে, আর তাহারই পাশে রহিয়াছে নানকের যৌগবলের নিদর্শন সেই 
ঝরণার জলধারা । হাসান-আব.দলের এই বিশেষ স্থানটির নাম দেওয়া 


১৫৪ 


নানক 


হইয়াছে পাঞ্জা সাহেব। আজও বহু ধর্দ্দপরায়ণ শিখ ইহাকে এক পুণ্য 
তীর্ঘ বলিয়া! গণ্য করেন। 


করতারপুরের কশ্মক্ষেত্র ছাড়িয়৷ নানক মাঝে মাঝে তাহার পদযাত্রায় 
বাহির হইয়! পড়িতেন, ঘুরিয়! বেড়াইতেন পথে প্রান্তরে, জনপদে আর 
তীর্থে তীর্ঘে। দীন দরিদ্র, নিপীড়িত মানুষের জন্য তাহার দরদ ছিল 
অপরিসীম । পরিব্রাজনের মধ্য দিয়া সদাই জনজীবনের সাথে ঘটিত 
ঘনিষ্ঠ পরিচয়, আর্ত ও মুযুক্ষুর উদ্ধারের সুযোগ তিনি পাইতেন । 
লৌকিক ও অলৌকিক, তাহার এই ছুই জীবনেরই স্পর্শ-প্রভাব ছড়াইয়া 
পড়িত তাহার যাত্রাপথের ছুই পাশে । 

সে-বার নান! স্থানে ঘুরিতে ঘুরিতে নানক পুরীধামে আসিয়াছেন। 
জগন্নাথ দর্শনের জন্য একদিন সন্ধ্যাকালে শ্্রীমন্দিরে উপস্থিত হইলেন । 
নাটমন্দিরে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই হইলেন ভাবাবিষ্ট । 

এদিকে মহ। সমারোহে আরতি শুরু হইয়। গেল। শ্রদ্ধাভরে উঠিয়া 
দাঁড়াইয়া! উঠিয়া মহাপ্রভূকে দর্শন করিতেছে, কিন্ত নানকের সেদিকে 
কোন ভ'সই নাই। পরমানন্দে তিনি নিজ আসনে বসিয়া আছেন, 
আর নয়ন বাহিয়! ঝরিতেছে প্ররেমাশ্রু | 

মন্দিরের একদল পাও ও পরিছ। কিন্ত নানকের উপর বড় চটিয়। 
গিয়াছে। এ আবার কিরূপ সাধু? শ্রীজগন্নাথের আরতির সময় উঠিয়া 
দাড়ায় না, কাগ্ডাকাণ্ড বোধ কি কিছুই নাই? 

আরতি থামিয়! গেলে নানককে তাহার] ঘিরিয়! দাড়ায় । তিরস্কারের 
স্থরে বলে, “শুধু এঁ হল্দে আলখাল্লায় সাজলে আর গলায় মাল৷ দিয়ে 
বেড়ালেই সাধু হওয়া যায় না। এজন্য চাই প্রকৃত ভক্তি আর শরণা- 
গতি। আপনি আরতির সময় মহাপ্রভূকে সম্মান দেখালেন না, এ 
কেমন কথা ?” 

নানক উত্তর দিলেন, “ভাই আমার জগন্নাথ কি শুধু এখানে, আর 
এই কাষ্ঠমুর্তিতেই বিরাজিত ? তিনি যে সারা বিশ্বস্থপ্টির মধ্যে আপন 


১৫৪৫ 


ভারতের সাধক 


মাহমায় রয়েছেন দেদীপ্যমান 1৮ 
একথা বলিতে বলিতে তিনি ভাবতম্ময় হইয়া উঠিলেন। কণ্ঠে 
উচ্চারিত হইল অপরূপ স্তব গান__ 


গগন মৈ থালু রবি চংছু দীপক বনে 
তারিকামংডল জনক মোতী । 
ধূপু মলআনলো৷ পবণু চবরো! করে 
সগল বনরাই ফলংত জ্যোতী । 
কৈসী আরতি হোই ভবখংডনা তেরী আরতী । 
অনহতা সবদ বাঁজংত ভেরী । 
. সোহিলা, মহলা-১ 


অর্থাৎ হে আমার প্রভু, গগন হয়েছে তোমার আরতির থালা, রবি 
চন্দ্র এই ছুই দীপ জ্বলছে সেথায় নিরন্তর । তারকামণ্ডল ভিত 
রয়েছে মুক্তাখচিত চাদোয়ার মত। মলয়জ চন্দন তোমার ধৃপ-_তারই 
সৌগন্ধ বয়ে নিয়ে পবন করছে তোমার চামর ব্যজন। হে জ্যোতিশ্ময় 
প্রভু, পুষ্পসম্ভার সাজিয়ে বনস্পতির! নিবেদন করছে তোমায় আরতির 
পুষ্পার্ধ্য । হে ভবখগ্ডন প্রভু, হে মুক্তিদাতা, অনিব্ষচনীয় তোমার 
আরতি, এ আরতি বেজে উঠেছে অনাহত ধ্বনির মধ্য দিয়ে। 

সমবেত সাধু সন্ত ও দর্শনার্থারা এ অপুর্ব স্তবগান শুনিয়। নির্বাক 
বিস্ময়ে দীড়াইয়া রহিলেন। অতঃপর জানা গেল, গীতবসনধারী এই 
ভক্তিসিদ্ধ সাধক আর কেহ নয়, ইনি উত্তরভারতের বন্ছবিশ্রত মহাপুরুষ 
_-নানক নিরংকারী | 


সে-বার নানক মথুরা অঞ্চলে ভ্রমণ করিতে গিয়াছেন। শ্রীকৃষ্ণের 
পবিত্র জন্মভূমি.এই মথুর!। লীলাময় প্রভুর বহু লীলার স্মৃতি এই পুণ্য- 
স্থানের আকাশে বাতাসে ছড়ানে৷ রহিয়াছে। এখানে পেৌঁছিয়। নানক 
আনন্দে নিমগ্ন হইলেন । বন 


১৫৬ ৮ 


একদিন যমুনায় স্নান সমাপন করিয়া তিনি গৃহে ফিরিতেছেন 
হঠাৎ অদূরে ছিন্নবাস পরিহিত এক অন্ধ ভিখারীর দিকে তাহার দৃষ্টি 
পড়িল। গৃহস্থেরা পথের ধারে ছাইপাশ ফেলিয়া গিয়াছে, তাহাই 
হাঁংড়াইয়া লোকটি ছুই এক কণা খানের সন্ধান করিতেছে । 

নানক থমকিয়া দীড়াইলেন, করুণায় তাহার হৃদয় বিগলিত হইল। 
ভিখারীর কাছে গিয়া কহিলেন, “বাবা, এ তুমি কি করছে1? ছাই-পাশ 
ন। ঘেঁটে ঠাকুরের নাম গেয়ে রাস্তায় ভিক্ষে মেগেও তো৷ খেতে পার” 

লোকটি কাতরম্বরে কহিল, “প্রভূ, সেই ক'রে তো! চলতো৷। আদৃষ্ট 
মন্দ, এবার কিছুদিন যাবৎ ছুই চোখ অন্ধ হয়েছে । বাইরে বেরুবাৰ 
যে৷ নেই । তাই ঘরের পাশেই আস্তাকু'ড় ঘেঁটে দেখছি । ছুদিন উপবাসী 
ছিল।ম, আর ঘরে থাকতে পারলাম না । পেটের জ্বাল! বড় জ্বালা ।” 

নানকের ছুই চোখ অশ্রুসজল হইয়া আসিয়াছে । করোয়া হইতে 
এক অঞ্জলি জল নিয়। অন্ধ ভিখারীর নয়নে ছিটাইয়া। দিলেন। 

ভিখারী তখনই বিস্ময়ে আনন্দে চিৎকার করিয়া উঠিল, “তবে কি 
স্বপ্ন আমার সত্যই সফল হোল। আমি যে ছুই চোখে পরিষ্কার সব 
দেখতে পারছি। আমি তো আর অন্ধ নই। আপনি কি তবে প্রভু 
নানকজী? আপনারই আশা পথ চেয়ে যে আমি দিন গুনছি।” 
নানকের চরণতলে সাষ্টাঙ্গে সে প্রণত হইল। 

“কি ব্যাপার বাবা, বলতো ?” 

“প্রভু, আমি যে কয়েকদিন আগেই ন্বপ্ধে এক প্রত্যাদেশ পেয়েছি ।, 
গৌবিন্দজী আমায় ডেকে বলেছেন, “ওরে ছুঃখ করিসনে। শিগগীরই 
মথুরায় উপস্থিত হবেন নানক নিরংকারী, তিনি করবেন তোর অন্ধত্ব 
মোচন। আমার পরম ভাগ্য, আপনার দর্শন লাভ করলাম 1৮ 

ভিখারীটিকে আশীর্বাদ জানাইয়। নানক রওনা হইবেন, এমন সময় 
সে তাহার পথ আগলাইয়৷ দীড়াইল। কাতরম্বরে কহিল, “প্রভূ, ছুটি 
চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে এনে দিলেন, সে ভালো! কথ! । কিন্তু আমার এ দেহ 
জীর্ণ হয়ে এসেছে, শেষের দিন আস্ছে ঘনিয়ে। এই ছুটো চোখও 


১৫৭ 


1 সতত "নন ব্ত 


তো এবার এ দেহের সঙ্গেই ভন্মীভূত হবে চিতানলে। কৃপা যখন 
করেছেনই, ভেতরকার চোখও এবার ফুটিয়ে দিন- পরম প্রভুর দর্শন 
যাতে লাভ করি সে সাধন দিন, সে শক্তি দিন।” 

মথুরার জনগণের মধ্যে এই ভিখারীটিই নানকের নিকট হইতে সর্ব্ব 
প্রথম সাধন প্রাপ্ত হয়। উত্তরকালে এক সার্থক শিখ সাধক রূপে 


পরিচিত হইয়া উঠে। 


নানকের ভগবততত্ব ও সাধনার মূলকথ। তাহার রচিত জপজীর প্রথম 
শ্লোকে নিহিত রহিয়াছে__ 
এক ও সতি নামু করতা 
পুরখু নিরভউ নিরবৈরু 
অকাল মূরতি অজুন 
সৈভং গুর প্রসাদি 
__জপজী 
অর্থাৎ এক ও'কার; এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রূপে তিনি 
বিরাজিত। সং তাহার নাম, তিনি স্থপতি কর্তা, তিনিই অনাগ্ভন্ত পুরুষ । 
তিনি ভয় রহিত, বৈররহিত। মৃণ্তি তাহার কালের দ্বার নয় পরিচ্ছিন় | 
তিনি অযোনিসম্ভব-_স্বয়স্তু। গুরুর প্রসাদে তাঁকে কর জপ। 
তত্বোপলব্ধির প্রধান উপায়রূপে নানক নির্দেশ করিয়াছেন নামজপ । 
গুরুমুখী হইয়! গুরুর কৃপার উপর নির্ভর.করিয়৷ এই জপ সাধন করিতে 
হইবে, বার বার একথা তিনি বলিয়। গিয়াছেন-_ 
স্বনি এ জোগ জুগতি তানি ভেদ। 
স্ুনি এ সাসত সিম্বৃত বেদ। 
নানক ভগতা৷ সদ। বিগাস্ু। 
সনি এ ছখ পাপকা। নাস্ত। 
_সপোৌঁড়ী ৯ জপজী 
অর্থাৎ সৎ-নাম শ্রবণ করিলে অযোগ্য ব্যক্তিও হয় স্ততিষোগ্য, 


১৫৮ 


এ নাম শ্রবণে যোগোক্ত যট্‌চক্রভেদ হয় সম্ভব, জানা যায় বেদের 
নিহিতার্থ। নানক কহে, পরমেশ্বরের নাম শ্রবণে ভক্তের হৃদয়াকাশে 
আনন্দ থাকে সদ! বিরাজিত, ছুঃখ ও পাপের হয় বিনাশ। 

মানবের জীবনতপস্তার প্রকৃত স্বরূপ কি? এ প্রশ্নের উত্তরে বল! 
হইতেছে-__“ইন্দ্িয় সংযম ভাটি এবং ধৈর্ধা স্বর্ণকার-_মতি, শুভবুদ্ধি 
অথব! নিশ্চয়াত্মিক! বুদ্ধি নেহাই, বেদ অর্থাৎ শান্ত্রান্থশাসন হাতুড়ি, 
পরমেশ্বরের ভয় হইতেছে হীপর, তপস্ত। হইতেছে অগ্নির তাপ--এই 
সকলের সাহায্যে প্রেমভাণ্ডে অর্থাৎ প্রেমপূর্ণ হৃদয়ে গুরু-উপদেশরূপ 
অমুত ঢেলে সত্য টাঁকশালে শবদ, অর্থাৎ শবত্রহ্গ প্রস্তুত করে। 
যাদের উপর সদগুরুর কৃপাদৃষ্টি হয়, তারাই করতে পারে এই কার্ধ্য 
অর্থাৎ পূর্ব্বোক্ত তপস্ত। | নানক বলেন, কৃপাময় অকালপুরুষ কৃপাদৃষ্টি 
দ্বারা তাদের করেন কৃতকৃত্য ।৮- পৌঁড়ী ৩৮, শ্রীগুরুগ্রন্থ সাহিবজীঃ 
অন্বাদ, অধ্যাপক চাকলাদার । 

নানকের মতে এই তপস্তার আগের ও পরের কথা হইতেছে 
সাধকের আত্ম নিবেদন আর পরম প্রভুর কৃপা। 
নানক বলেন, “লক্ষ লক্ষ বার শৌচ করলেই পবিত্র হওয়। যায় না, 
মৌন অবলম্বন করলেই চিত্চাঞ্চল্যের হয় না বিকাশ, বিষয় বাসনা ও 
ক্ষুধার হয় না নিবৃত্তি সপ্তপুরীর এই্বর্য্য লাভ করেও । কোন রকমের 
চতুরতাই অন্তকালে জীবের সঙ্গে যায় না পরপারে (| একবার ভাবো! 
_-কি ক'রে ঈশ্বরের কাছে হওয়া যাঁয় সত্যনিষ্ঠ, কি ক'রে মায়ার মিথ্যা 
আবরণ কর! যায় ছিন্ন। নানক কহেন, সদ পরমেশ্বরের আদেশ মেনে 
চলো, সে আদেশ যে তিনি লিখে দিয়েছেন প্রতি জীবেরই অধুষ্ঠ 
ফলকে ।”__জপজী, পৌঁড়ী ১ 

কিন্তু অদৃষ্ট ফলকের এই লিখন, প্রারন্ধের এই ইঙ্গিত, বুঝিয়! নিবার 
শক্তি তো বদ্ধ জীবের নাই। তবে কি করিয়া ইহা সম্ভব হইবে ? নানকের 
উত্তর সুস্পষ্ট । তিনি বলেন, “সতনাম জপ করতে করতে মান্ুষের 
দৃষ্টি হয়ে আসে স্বচ্ছ, তার ফলে ভাতে হয় গুরুক্বপার আলোকসম্পাত । 


১৫৪8. 


স্তব্ধ ন্িশট 


তখন সর্ব মিথ্যার আবরণ আর মায়ামোহ মুহুর্তে যায় টুটে ৮ 

নানকপস্থী শিখদের গুরুগ্রন্থসাহিব জগতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধর্মগ্রন্থ । 
প্রভৃপাদ বিজয়কৃষ্ণ গোন্বামী এই মহান গ্রন্থ সম্বন্ধে বলিতেন, “যত 
ধন্ম্রস্থ পাঠ করেছি, তাদের ভেতর গ্রস্থসাহিবের মত সুন্দর ও মধুর 
আর একখানি আছে কিনা সন্দেহ । সবগুরু ব্রহ্ম, আবার মান্থুষের 
মো, পিতা মাতা, রাজা চিকিৎসক সমস্তই ব্রহ্ম, একথা গুরু নানকের 1” 
ভক্তদিরগকে এই গ্রন্থপ।ঠে গোস্বামীপ্রভূ সদাই উৎসাহিত করিতেন। 
কছিতেন, “বাংলাভাষায় শ্রী চৈতন্যচরিতামত, হিন্দী ভাষায় তুলসীদাসের 
রামায়ণ আর গুরুমুখী ভাষায় গুরু-নানকের গ্রন্থসাহেবের মত সব্বাঙ্- 
অন্দর ভক্তিগ্রন্থ আর দ্বিতীয় নেই ।” 

শিখদের পঞ্চমণ্ডরু শ্রীঅভ্ভনজী গ্রন্থসাহিব সঙ্কলন করেন এবং ইহাতে 
সনিবেশিত হয় পূর্বতন গুরুদের তমূল্য বাণীসমূহ। প্রবীণ গুরুভ্রাতা 
গুরুদাসজী দ্বারা এইগুলি অন্ুলিখিত হয়। এই গ্রন্থই “আদি গ্রস্থমাহেব” 
নামে পরিচিত। দশম গুরু গুরুগোবিন্দ সিংহের রচনাবলী সংগ্রহ 
করিয়। ভাই-ম।ণমিং আর একটি গ্রন্থসাহেব সঙ্কলন করেন। এটি হই 
পূর্বেকার সঙ্কলনকে পৃথক করিয়া বুঝ।নোর জন্য অর্ভুনজীর গ্রস্থকে 
“আদি” বলা হয়। অজ্ভুনজী তাহার গ্রন্থে পুর্বতন শিখ গুরুদের বাণী 
ছাড়া ভিন্নপন্থী ভক্ত সাধকদের বাণীও পরিবেশ করিয়াছেন। 

গ্রস্থসাহিবের বাণীগুলি শিখের! বিভিন্ন রাগের মধ্য দিয়া গান করেন। 
নিষ্ঠাবান ভক্তগণ 'রহিরাস' এবং 'সোহিলা” যথাক্রমে প্রত্যুষে ও শয়ন- 
কালে শ্রদ্ধাভরে পাঠ করিয়া থাকেন। 

ভাই-গুরুদাসের রচিত উঅর এবং কোবিৎ ভক্তিমান শিখদের পরম 
প্রিয়। অন্থান্ত বিশিষ্ট শিখ ধন্মসাহিত্যের মধ্যে রহিয়াছে সেওয়াদাসের 
'জনমসাথী” ভাই-সম্ভোখ, সিং-এর গুরুপ্রতাপ সৃরয ইত্যাদি । 


নানকের শিষ্যদের মধ্যে অগ্ভতম প্রধান ছিলেন ভাই-রুধা ( উত্তর- 
কালে নানক ইহার নামকরণ করেন রামদাস ), অঙ্গদ, নানকের পুক্র 


উদ 


প্রীর্ঠাদ প্রভৃতি । ত্যাগ তিতিক্ষা ও সাধন-সামর্থ্যের দিক দিয়া এই সব 
শিষ্য পশ্চিম ভাঁরতে প্রসিদ্ধি অর্জন করেন। ইহাদের জীবনে গুরুকুপার 
যে লীলা বিস্তারিত হইয়াছিল তাহার নান! বিস্ময়কর কাহিনী আজো 
শুনিতে পাওয়া ষায়। 

একনিষ্ঠ ভক্ত ভাই-বুধাকে সঙ্গে নিয়া নানক সে-বার পরিব্রাজনে 
বাহির হইয়াছেন। এক বিস্তীর্ণ মাঠের উপর দিয়া উভয়ে চলিয়াছেন। 
ই৷টিতে হাটিতে পরিশ্রান্তও কম হন নাই। ভাই-বুধার তো তৃষ্ণায় ছাতি 
ফাটিয়া যাইবার উপক্রম । তখন গ্রীষ্মকাল, চারিদিকের পুকুর ভোব৷ সব 
একেবারে শুকাইয়া উঠিয়াছে, কাছাকাছি কোথাও কোন গ্রামও দেখা 
যাইতেছে না। ভাই-বুধ! শঙ্কিত হইয়া পড়িলেন, তাইতো, এ সময়ে 
এখানে জল কোথায় পাওয়া যাইবে? 

নানক আশ্বাস দিয়! শান্তস্বরে কহিলেন, “ভয় পেয়ো নাঃ সামনে কিছুটা 
দূর চলে যাও, জল দেখতে পাবে ।? 

ভাই-বুধা আগাইয়া গেলেন, পুষ্করিণী একটি ঠিকই মিলিল কিন্তু 
জলের চিহ্নুমাত্র তাহাতে নাই। প্রচণ্ড গ্রীষ্মে একেবারে শুকাইয়া রহিয়াছে । 
ফিরিয়া আসিয়। গুরুকে একথা! নিবেদন করিলেন। 

নানক হাসিয়া কহিলেন, “দেখতে পাচ্ছি, তুমি গুরু আর সং-নামের 
উপর এখনে নির্ভর করতে শিখলে না। “ওয়াহ. গুরু" বলে আবার সেখানে 
যাও, নিবিষ্ট হয়ে জপ ক'রে চলো! সং-নাম। অবশ্যই পাবে তোমার তৃষ্ণা 
নিবারণের জল ।” 

গুরুদেবের নির্দ্দেশ মত ভাই-বুধা আবার সেখানে উপস্থিত হইলেন। 
এবার কিন্তু এ পুকুরের দিকে তাকাইয়া তাহার বিস্ময়ের অবধি রহিল 
না। দেখিলেন, উহার তলদেশ হইতে বেগে উৎসারিত হইতেছে ক্সিগ্ধ, 
স্রপেয় জলধারা । 

অতঃপর নিকটস্থ গ্রামাঞ্চলে নানকের এ অলৌকিক শক্তি প্রকাশের 
কথা ছড়াইয়! পড়ে । লোকে দলে দলে এই বিম্য়কর দৃশ্য দেখার জন্য 
ভীড় করিতে থাকে। 

১১ 


১৬১ 


এই পুন্রুজ্জীবিত পুক্ষরিণীর নাম দেওয়া হয়__অমৃত-সায়র। 

উত্তরকালে চতুর্থ শিখগুরু রামদাস এটিকে এক সুবৃহৎ জলাশয়ে 
পরিণত করেন, ইহার মধ্যস্থলে নিশ্মীণ করেন এক অপরূপ শিল্পকলাময় 
মন্দির এই মন্দিরই শিখদের চিরশ্রদ্ধার “দরবার সাহিব'” আর এই 
পুণ্যতীর্থ পরিচিত হইয়! উঠিয়াছে অমৃতসর নামে । 


শিশ্ুদের মধ্যে অঙ্গদ ছিলেন গুরু নানকের পরম প্রিয়। গুরুনিষ্ট। ও 
সাধন-সামর্্যের দিক দিয়া তাহার তুলন। ছিল'বিরল। নানকের বন্ছুতর 
কঠোর পরীক্ষায় তাহার এই বীর ভক্তকে বার বার সসম্মানে উত্তীর্ণ 
হইতে দেখা গিয়াছে । 

গুরু-নানক অঙ্গদকে ভক্তপ্রধান মনে করেন এবং তাহার অবর্তমানে 
অঙ্গদই হইবেন গুরুর গদির উত্তরাধিকারী, একথা কাহারো! অজান৷ 
নাই। কেহ কেহ এজন্য একটু ঈর্ষা বোধও করেন । নানক সেদিন ইহাদের 
জ্ঞানচন্ষু উদ্মীলনের ব্যবস্থা, করিলেন । 

নদীর ধারে বসিয়া সকলে ধণ্মপ্রসঙ্গে রত আছেন। দেখা গেল, দূরে 
জলআ্রোতে ভাসিয়৷ আসিতেছে এক মৃত মানুষের দেহ । 

নানক সহাস্তে কহিলেন, “আচ্ছা, বলতো, তোমাদের মধ্যে কে এমন 
আছে যে, আমার আদেশমত এ মৃতদেহকে সুস্বাহু আহাধ্য ভেবে নিয়ে 
ভক্ষণ করতে পারে ?” 

বড় অদ্ভুত গুরুর এই প্রশ্ন ! প্রস্তাবিত আহার্যের বীভৎসতার কথা 
ভাবিয়া শিষ্কেরা প্রায় সকলেই শিহরিয়া উঠিলেন। 

» সকলে মাথ! নীচু করিয়া বসিয়া আছেন। অঙ্গদ জোড়হস্তে নিবেদন 


ও কালে শিখদের পরাভূত করিয়া আমেদ শাহ এই পবিত্র মন্দিরের 
ধ্বংস সাধন করেন। অমুতসর পাঞ্জাৰবকেশরাী মহারাজ রণজিৎনিংহের অধিকারে 
আমিলে তিনি এই বিধ্বস্ত মন্দিরকে পুনর্গঠিত করেন, সোনার পাতে উহার 
গন্ুক্ধ মোড়াইয়। দেওয়। হয়। তখন হইতে শিখ-্বর্ণমন্দির নামে উহ। প্রসিদ্ধ 
হইয়া উঠে। ' 


১৬২. 


করিলেন, “গুরুজী, আপনার আদেশ এ দাস সব সময়েই পালন করতে 
প্রস্তত।” 

বিস্ময়ে ভয়ে সবাই তো৷ একেবারে অবাক ! নানকের ইঙ্গিতে অঙ্গদ 
নদীগর্ভে ঝাপ দিলেন, মৃতদেহ টানিয়। তুলিলেন ডাঙায়। 

গলিত দেহ হইতে উৎকট হুর্গন্ধ বাহির হইতেছে । সকলে তাড়াতাড়ি 
নাকে কাপড় দিতে বাধ্য হইলেন। 

নানক এবার গম্ভীর স্বরে কহিলেন, “এতক্ষণ তোমরা তোমাদের চোখ 
দিয়ে এ বস্তটি দেখেছো! । এবার গ্যাখে। _অঙ্গদের চোখ দিয়ে ।” 

মৃহুর্তমধ্যে এক ইন্দ্রজাল যেন সেখানে ঘটিয়া গেল। এ কি'কাণ্ড! 
সে পৃতিগন্ধময় মৃতদেহ আর নাই। এ যে এক পুরাতন কাণ্ঠখণ্ড, আর 
ইহা। হইতে নির্গত হইতেছে মনোরম চন্দনগন্ধ ! 

গুরুগতপ্রাণ, ভক্তিসিদ্ধ সাধক অঙ্গদকে ঘিরিয়া সকলে ধন্য ধন্য 
করিতে লাগিলেন। 


কিছুদিন পরের কথা । গুরু নানকের মহাঁজীবনে এবার ঘনাইয়। 
আসিয়াছে বিরতির পালা । শীত্রই এ মরদেহ ত্যাগ করিয়া যাইতে হইবে, 
এ কথ তিনি বুঝিয়াছেন। 

এক শুভলগ্নে, সকল শিষ্ঠকে নিয়! তিনি এক প্রকাশ্য “দেওয়ান'-এর 
অনুষ্ঠান করিলেন। প্রিয়তম শিষ্য অঙ্গদকে হাতে ধরিয়া বসাইয়া 
দিলেন নিজের আসনে, শিখসজ্বের নব নির্বাচিত গুরুরূপে সর্বাগ্রে 
তাহাকে নিজে করিলেন অভিবাদন । তারপর ধন্মসভা ত্যাগ করিয়া ধীরে 
ধীরে গিয়া বসিলেন নদীতীরের এক বৃক্ষমূলে। 

দিকে দিকে বার্তী রটিয়৷ গেল-_ভক্তদলের পরমাশ্রয়, গুরু নানক 
এবার মরদেহ ত্যাগ করিবেন। সহস্র সহস্র নরনারী তাহার সম্মুখে 
আসিয়া সমবেত হইল। 

গুরু ক্রাহার শেষ ধন্মোপদেশ এবার দান করিলেন, সমাপ্ত হইল 
তাহার প্রিয় ভজন। তারপর নয়ন ছুইটি নিমীলিত হইল চিরনিদ্রায় । 


১৬৩ 


শিখদের 'জনমসাধী' বলিয়াছেন, _যে বৃক্ষতলে নানক শেষ নিশ্বাস 
ত্যাগ করেন, ধীরে ধীরে তাহাতে নব পুষ্পপত্র মুগ্রিত হইয়! উঠে। 
এ অলৌকিক দৃশ্য দেখিয়। দর্শনার্থারা আনন্দে অভিভূত হয়। 

কথিত আছে, নানকের তিরোধানের পর তাহার মৃত দেহের সৎকার 
নিয়৷ সমবেত হিন্দু ও মুসলমান শিষ্যদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও কলহ 
দেখা দেয়। অতঃপর গুরুর শেষ দর্শনের জন্থা তাহার মুতদেহের বস্ত্রাবরণ 
অপসারিত হইলে জনতার চোখে মুখে ফুটিয়৷ উঠে অপার বিশ্ময়। কই, 
দেহের তো কোন চিহুই সেখানে নাই ! সমস্ত কলহ ও ছন্ৰ সংঘাতের 
সম্ভীবনা ঘুচাইয়া দিয়া একেবারে উহা! অদৃশ্য হইয়াছে। এবার এই 
বন্ত্রাবরণকে ছুইখণ্ডে বিভক্ত করা হয়। একখণ্ড নিয়া শিখগণ তাহাদের 
ইচ্ছা অনুযায়ী সৎকার করেন, অপর খগ্ডটিকে মুসলমান প্রথামত সমাহিত 
করা হয় ভূগর্ভে। 

রাবী নদীর তীরে ভক্তগণ নানকের তিরোধানের স্থানটিতে চমৎকার 
একটি মন্দির ও আর একটি “সমাধ+ নিন্মীণ করিয়া দেন। কিন্তু এই 
স্মারক মন্দির ছুইটিকে বেশীদিন ধরিয়া রাখা যায় নাই, ভাঙনের ফলে 
কবে একদিন নদীগর্ভে বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে । 

নিরাকার, পরম পুরুষের ভক্ত ছিলেন নানক-নিরংক'রী। তাই বুঝি 
নিজের অপ্রকটের সঙ্গে জঙ্গে সমাধি-মন্দিরের শেষ চিহটুকও মুছিয়া 
নিয়া তিনি হইলেন পরম নিশ্চিন্ত । 


১৬৪ 


বর্তমান বরিশাল জেলার খানিকটা এক সময়ে চন্ত্রদ্বীপ নামে পরিচিত 
ছিল। আর ইহারই একাংশ, বাক্‌লায় বিরাজমান ছিল কুমারদেবের 
পুরাতন অট্টালিকা। 

ষোড়শ শতকের প্রথম পাদ হইতেই চন্দ্রদ্বীপের জীবনস্রোতে ভাটা 
পড়িয়া যায়। সুবিশাল পুরীর পূর্বেকার সে গৌরব অস্তর্থিত হয়। 
একদিন এখানে ধন জন রাজৈশ্বর্ষের অবধি ছিল না _আত্ম-পরিজন ও 
দাসদাঁসীর কলগুঞ্গনে প্রাসাদটি সদাই থাকিত মুখরিত। অতীত দিনের 
সে সব কথা৷ এখন পরিণত হইয়াছে উপকথায়। ্‌ 

বাক্‌ল। প্রাসাদ ঘিরিয়া রোজই নামিরা৷ আসে রাত্রির ঘন অন্ধকার 
জনবিরল পুরীরু কক্ষকোণে, স্তিমিত দীপের আলোকে ব্ষীয়সী মহিলাটি 
পুরাশের পাতা খুলিয়৷ বসেন। আর স্সেহময়ী জননীর গ৷ ঘে ষিয়া বসিয়া 
প্রিয়দর্শন বালকটি রোজই শুনে শাস্ত্রের অমৃত কাহিনী। পাঠ শেষ 
হইলে বসিয়! বসিয়া ভাবে আপন বংশের পুণ্যোজ্জল গৌরব কথা । 
ভারত বিখ্যাত রূপ সনাতন তাহার ছুই জ্যেষ্ঠতাত। কাঙাল বৈষবের 
বেশে বৃন্দাবনধামে ইহার! ছুটিয়া যান। চৈতন্যপার্ধদ এই ছুই জাতাই 
হইয়া উঠেন গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের প্রধান পরিচালক । সর্ব্বজন 
শ্রদ্ধেয় মহাঁপুরুষদ্বয়ের কাহিনী বালক শুনে, আর হাদয় তাহার এক 
অজান! পুলকে বারবার শিহরিয়া উঠে। 

বিধবা মাতার নয়নমণি এই বালকের নাম জীব। আপন পরিবারের 
রাজবৈভব দে পায় নাই, পায় নাই কোন. সিংহাসনের উত্তরাধিকার । 
কিন্তু উত্তর জীবনে এই বালকেরই করতলগত হয় এক বিরাট 'ভক্তি- 


» ১৬৫ 


ভাবতেব সাধক 


সাম্রাজ্য । প্রায় চারিশত বৎসর আগে বুন্দাবনধামে ভক্তি-আন্দোলনের 
মম্মকেন্দ্রে তিনি হন অধিষ্ঠিত, পরিচিত হন গৌড়ীয় বৈষ্ণবনেতী। শ্্রীজীব 
গোস্বামীরপে । 

সমকালীন বৈষ্ণব সাধকদের পুরোধারূপে শ্রীজীব কীন্তিত হইয়া 
উঠেন। মনীষার দীপ্তিতে, ত্যাগ বৈবাগ্য ও সাধনার আলোকসম্পাতে 
সহত্র সহস্র সাধকের জীবনে জাগাইয়া তোলেন নৃতনতর প্রাণম্পন্দন। 
শুধু গৌড়ীয় বৈষুণবদেব জীবনেই নয়, সাবা বাংলাদেশের ধন্দ-সমাজ- 
সংস্কাতিময় জীবনে এক নূতন অধ্যায় তিনি বচনা কবেন। পিতৃব্য বপ ও 
সনাতন গোস্বামীর কাছেই তাহাব শিক্ষা, তাহাদেবই জাধনাব তিনি 
ধারক ও বাহক। কিন্তু ভারতীয় দর্শন ও সাধনার ক্ষেত্রে এই মহাসাধক 
তাহার নিজস্ব প্রতিভাবও এক অবিস্মরণীয় ভাপ বাখিয়া যান। 


শ্রীচৈতন্যের অভ্যুদয়-যুগের কথা । সনাতন ও রূপ ছুই ভ্রাতারঈ 
সাধন জীবনে,ভখন ঘটিতেছে রূপান্তর ৷ মহা প্রভুর চরণাশ্রয় গ্রহণ করিয়া 
উভয়ে ধন্য হইস্সাছেন। অন্তরে সদাই বহিতেছে ভক্তিধন্ম্ের রসজআোত 
ফঞ্কনাম ও কৃষ্ণপ্রেমে তাহারা একেবারে মাতোয়ারা । 

বল্লভদেব ছোট ভাই, তাহাকেও তাহার! নিজেদের এই সাধনপথে 
সঙ্গে নিতে চাহেন। কিন্তু সে কাজ বড় সহজ নয়। বল্লভ মনে প্রাণে 
শ্রীরামের ভক্ত, এই ইঞ্টকেই তিনি আকড়িয়া ধরিয়। বসিয়া আছেন। 
আধার মহাপ্রভুর আকর্ষণও কম নয়, তাহার পরম মনোহর মুহ্তি ও 
প্রেমের স্পর্শ বল্লভের শ্রীণ কাড়িয়। নিয়াছে। 

রূপ আর সনাতনের একান্ত ইচ্ছা, তিন ভাই একসঙ্গে একই ইন্টের 
উপাসফ হন। অগ্রজের! বল্লভকে প্রাণাপেক্ষা বেশী ভাল বাসেন, ভীহার 
কল্যাণ কামনাও চিরকাল করিয়া আসিতেছেন। তাহাদের আহ্বানেই 
বা কি করিয়া সাড়া না দেন? কিন্তু বল্পতের ইঞ্টনিষ্ঠাই শেষ পর্য্যস্ত 
জয়ী হয়ঞমহাশ্রতুর পরমাশ্রয়ের লোভকেও তিনি সন্নাইয়া রাখেন দুরে” 
জিপ নঈমে অগ্রজদের কাছে নিষেদন করেন__ 


শজাধ গোস্বামী 


রঘুনাথেব পাদপদ্মে বেচিয়াষটো। মাথা, 
কাড়িতে না পাবে? মাথা পাও বড় ব্যথা ॥ 
কৃপা করি মোবে আজ্ঞ। দেহ ছুইজন। 
জন্মে জন্মে সেবে৷ বুনাথেব চরণ ॥ 
অনুপম বল্পতদেবেব এই ইষ্টভক্তি আব একৈকনিষ্ঠ।। এই নিষ্ঠার 
পৰিচয় পাইয়া অস্তধ্যামী, 'প্রু শ্রীচৈতহ্য সেদিন এই ভক্তবীরের না 
বাখিলেন অনুপম । গ্রীলামচন্দ্রেব উপাসক, এই শক্তিমান সাধক 
পুকষই জীবগোস্বামীব পিত1। 
অপব ছুই ভ্রাতাব মত শন্ুপমও গৌডেব বাদশাহ হুসেন শাহের 
অধীনে কাজ করিতেন। সবকাবী টকশালেব দায়িত্বভার ছিল তাহার 
উপব, তিনি ছিলেন সেখানকাব অধাক্ষ । 
সংসাব ত্যাগ কবিয়া বপ যেবাব মহাপ্রভূব চরণে আশ্রয় মাগিতে 
যান, তখন অন্ুপমও হন তাহাব সঙ্গী | ছুই ভাই পরমানন্দে নানা তীর্থে 
ঘুবিয়। বেড়ান, তারপর উপস্থিত হন বুন্দাৰনে। এখান হইতে গৌড়ে 
ফিবিবাব পথে ঘটে এক মশ্ন্তদ ছুর্ঘটনা, অল্পকাল রোগে ভূগিয়া 
অনুপমেব প্রাণবিয়োগ হয়। 


জীবেব বয়স তখন প্রায় পাঁচ বংসর। এবাব এই শিশু পুন্রটিকে 
বুকে করিয়া জননী বাক্লাচন্দ্রদ্ধীপে গিয়া বাস করিতে থাকেন। 

'্ভক্তির্তবাকর' রচয়িতা, ঠাকুর নরহরি চক্রবর্তী শ্রীজীবের বালক 
কালেব বড় সুন্দর চিত্র করিয়াছেন। কৃষ্ণলীলার অন্গুকরগ কিয়! 
বালফ সঙ্গীর সাথে খেলা করে। মনের আনন্দে বসিয়া বিয়া. তৈরী 
করে কৃষ্ণ বলরামের যুগলমুণ্তি। তিলক-চন্দন, পুষ্প-আভরণে এঁ মুষ্তি 
সাজাইয়া তোরে, আনন্দে উচ্ছুল হইয়া পড়ে। জঙ্বান্তরের পুথ্থা আর ' 
কুলি তক্তিরসের ঘধিকারী হইয়াই ষেন সে জন্মিয়াছে। 

দিনের পর দিন তাহার পিতা ও পিতৃব্যদের ভঙ্কি নী বি. 





| তর নর ধিক 


বীজটি ধীরে ধীরে অস্থুরিত হইয়া উঠে। মায়ের মনে ভয়ের অন্ত নাই, 
বালক তাহার বৈরাগী মন নিয়া কখন কি করিয়া বসে কে জানে? 
কাস্থাকরঙ্গ সম্বল করিয়া শেষটায় বংশের ধারা অনুসরণ করিয়াণনা! বসে । 

জননীর মনে পড়ে, কৃপাময় মহাপ্রভু সেবার রামকেলীতে আসিয়া 
উপস্থিত হন, দর্শন ও স্পর্শনের মধ্য দিয়া রূপ সনাতনকে তিনি আত্মসাৎ 
করিয়া যান। জীব তখন ছুই বৎসরের শিশু । সকলের সঙ্গে জীবের 
-জননীও সেদিন মহাপ্রভুকে দর্শন করিতে গিয়াছেন। প্রণাম নিবেদনের 
প্লার নিজের শিশুটিকেও তাহার চরণতলে শৌয়াইয়া দিলেন। 
$ প্রসন্ন মধুর হাস্তে মহাপ্রভু এই শিশুর প্রতি করিলেন দৃষ্টিপাত। 
এই অমৃতনিম্তন্দী দৃষ্টি সেদিন পুজ্রের জীবনে কোন্‌ রূপান্তর ঘটাইয়া দিয়া 
গেল তাহ! কে জানে? 
- বালক কাল হইতেই দেখ যায়, জীব বড় স্বভাবভক্ত ও উদাসীন । 
পিতা পিতৃব্যদের মতই সংসারে তাহার বিরাগ । এই বয়সেই ডোর- 
কৌপীন ও সন্ন্যাস জীবনের উপর তাহার বড় টান। সুযোগ পাইলেই 
নিষ্ষিঞ্ন“বৈষুবের বেশে সাজিতে তাহার মহা উৎসাহ। ঘরে বসিয়া 
খেলার সাধীদের সাথে এই ভূমিকাই সে অভিনয় করে। 

কিন্ত এত কিছু ভাবিয়াই বা কি লাভ? ভবিতব্যকে কে কবে খণ্ডন 
করিতে পারিয়াছে ! উদগত নয়ন জল গোপন করিয়া জননী দীর্ঘশ্বাস 
ফেলিতে থাকেন। 
_ পাঠশালায় জীবের পড়াশুন। শুরু হয়। দিব্যকান্তি বালকের আয়ত 
নেত্রে রহিয়াছে ভাবময় উদ্দীপনা ; তী্ষ নাসিকা ও প্রশস্ত ললাটে 
তেজস্বিতা আর অসামান্য প্রতিভার ছাপ। পণ্ডিত ও পড়ুয়া সবার 
কাছেই সে সমান প্রিয় হইয়। উঠে। 

ম্ধো! ও বুদ্ধির এমন প্রথরতা৷ প্রায়ই দেখা যায় না। অল্লকাল মধ্যে 
ব্যাকরণ, অলঙ্কার, কাব্য ও স্মৃতি সে আয়ত্ত করিয়া ফেলে । কি করিয়া 
যে ইহা সম্ভব হয়, সকলে ভাবিয়া অবাক হন। 

বিশ বৎসর বয়সে ভ্রীজীবের স্থানীয় চতুষ্পাঠীর পড়া! শেষ হইল । 


১৬৮ 


বজাব গোশ্বামা 


তখনকার দিনে নবদ্ধীপ বাংলার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাকেন্্র বলিয়া খ্যার্তি অর্জন 
করিয়াছে। শ্্রীচৈতন্যের আদি লীলাভূমি এই স্থান, সে জন্যও এখানকার 
জনপ্রিয়তার সীমাঁনাই। 

এবার শ্ত্রীজীবের উচ্চতর শীস্তগ্রস্থাদি পাঠ করা দরকার । তাই অনেক 
ভাবিয়া চিন্তিয়া তিনি নবদ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করিলেন। ভক্ত তরুণ 
ইতিমধ্যেই স্থির করিয়া ফেলিয়াছেন, সংসারধশ্্ তিনি গ্রহণ করিবেন না 
ভক্তি সাধনায় দীক্ষা নিয়া থাকিবেন চিরকুমার । নিজে হইতেই এবার 
তাই কীধে তুলিয়া নিলেন ত্যাগব্রতের ভিক্ষাঝুলি, কটিদেশে জড়ানো! 
রহিল বৈষ্ণবীয় দৈন্তের চিহ্ন ডোর-কৌগীন ! গৃহ ত্যাগ করিয়া এই ষে' 
শ্রীজীব সেদিন পথে বাহির হইলেন, উত্তরজীবনে আর তিনি কখনো 
ফিরিয়া আসেন নাই । 


নবদীপে পৌছিয়া তাহার আনন্দের সীমা রহিল না। ভাগ্য সত্যই 
বড় স্ুপ্রসন্ন। খড়দহ হইতে নিত্যানন্দপ্রভূ দলবল নিয়। কয়েকদিন 
হয় সেখানে আসিয়াছেন। সদানন্দময় প্রভুকে ঘিরিয়া সেখানে গড়িয়। 
উঠিয়াছে আনন্দের এক মধুচক্র। শ্রীবাস পণ্ডিতের গৃহে তিনি এ সময়ে 
অবস্থান করিতেছেন,দর্শন পাওয়া মাত্র ছুটিয়। গিয়। শ্রীজীব তাহার চরণে 
লুটাইয়া' পড়িলেন। 

রূপ ও সনাতনের ভ্রাতুদ্পুত্র তাহার সম্মুখে _নিত্যানন্দের হৃদয়ে 
তাই আনন্দ সাগর উথলিয়া৷ উঠিল। শুরু হইল উদ্দগ্ড নৃত্য ও কীর্তন। 
শ্রীজীবের শিরে চরণ রাখিয়া করিতে লাগিলেন আশীর্বাদ । 

নবদীপে গৌরলীলার যতগুলি চিহিত স্থান রহিয়াছে জীবকে সমস্তই 
তিনি স্নেংসাহে নিজে সঙ্গে করিয়া দেখাইলেন। 

মহাপ্রভুর স্মৃতিভরা এক একটি তীর্ঘভূমি শ্রীজীব দর্শন করেন, মার 
তাহার সারা দেহ মন ভাবতরঙ্গে উদ্বেলিত হইয়া উঠে। | 
. পরের দিন করজোড়ে নিত্যানন্দকে তিনি নিবেদন করিলেন, “প্রত! 
তোমার)ঞুণ্যময় সঙ্গে থেকে মহাপ্রভুর আদি লীলার পবিত্র স্থান সবই 


১৬৪ 


ভারতের পাধক 


দেখলাম। এবার সারা অন্তর ব্যাকুল হয়ে উঠেছে অস্ত্যলীলাস্থল 
দেখবার জন্যে ৷ তুমি আমায় আজ্ঞা দাঁও নীলাচলে গিয়ে মহা প্রভুর পুণ্য- 
স্মৃতি বুকে ক'রে সাধন ভজনে আমি নিমজ্জিত হয়ে যাই । "আরো! একটা 
বাসনা আমার আছে,যদি কৃপা ক'রে তুমি তাপুরণ কর। আমায় তোমার 
সেবকরূপে তোমার কাছেই থ।কৃতে দাও। তোমার পরমাশ্রয়ে রেখে, 
দাও আমায় কঞ্ঃস্ুপা রস ।” 
আগামী দিনের বৈষ্ব আন্দোলনের এই চিহ্িত নায়ক, আর তাহার 
বিপুল সম্ভাবনার কথ! বুঝিয়! নিতে নিত্যানন্দপ্রভৃর সেদিন ভুল হয় 
নাই । তিনি বুঝিয়াছেন, এ তরুণের মধ্যে যে শক্তির উৎস রহিয়াছে 
তাহা একদিন সারা (বৈষ্ণব সমাজের বুকে ঢালিয়৷ দিবে প্রাণরস। রূপ- 
সনাতনের উত্তরসাধক- শ্রীরন্দাীবনের প্রেমরাজ্যের ভাবী নিয়ামক এই 
শ্রীজীব। 'অনাগত দিনের এক মহান ভূমিকা তাহার রহিয়াছে । 
প্রেমভরে তাহাকে আলিঙ্গন দিয়া নিত্যানন্দ কহিলেন, “না - না 
শ্রীজীব। নীলাচলে গিয়ে ভাবোম্মত্ত হয়ে বসে থাকলে তোমার চলবে 
না। গৌড় দেশে তো এখনো আমিই রয়েছি। তুমি যাও বৃন্দাবনে। 
জানতো, মহাপ্রভু তোমার বংশকেই এই বৃন্দীবনধাম দিয়ে গিয়েছেন। 
. সেখানে গিয়ে তোমার নির্দিষ্ট কন্ম সম্পন্ন কর, ভক্তিধন্্ম প্রচারে ব্রতী 
হও। আজকের দিনে সব চাইতে বড় কাজ হচ্ছে বৈব সমাজকে 
সুসংগঠিত ক'রে তোল1। বুন্দাবনে বসে মহাপ্রভুর পার্ধদ রূপ সনাতন 
তাই করছেন। তোমার স্থান আজ তাদেরই পাশে। এশ্বরীয় ক্টো 
রয়েছে তোমার এক বৃহৎ দায়িত্ব 1” | 
শ্রীজীব সবিনয়ে বলেন, “কিন্তু প্রভূ, আমি যে দীনাতিদীন। তেমন 
ভার গ্রহণের যোগ্যতা আমার কই ?” 
, ভেবো না বস, এ হচ্ছে মহাপ্রভুর কাজ, তিনি নিজেই সব করিয়ে 
নেধেন। তবে বুন্দাবনে গলিয়ে কঙ্মীভার গ্রহণের আগে তুমি কিছুদিন 
কার্দীধামে থেকে বেদ বেদাস্তশান্ত্র অধ্যয়ন কর.।: গোঁ বৈ 





শ্রজীব গোস্বামী 


এটাই আমি আন্তরিকভাবে চাই। রূপ সনাতনের পাণ্ডিত্যের উত্তরাধিকার 
নিয়েই তুমি শুধু আসোনি, তোমার অলোকসামান্ত প্রতিভা! নিয়েও তুমি 
এসেছে! । সে প্রতিভার স্ষুরণ আমি আজ তোমার চোখে মুখে ললাটে 
দেখতে পাচ্ছি। তুমি আর দেরী না ক'রে রওনা হও। কাশীতে গিয়ে 
মধুস্দরন বাচস্পতির কাছ থেকে নাও বেদান্তের পাঠ।” 


কাশীধামে মধুস্্দন বাচস্পতির তখন প্রবল প্রতাপ। পণ্ডিত 
শিরোমণি, বাসুদেব সার্ববভৌমের তিনি ছিলেন প্রিয়তম শিষ্য । মহাপ্রভুর 
কপাধন্য হওয়ার পর সাব্বভৌমের জীবনে ঘটে এক মহ! রূপান্তর । 
আই্বৈততত্ব ও ভক্তি সিদ্ধান্ত অনুসরণ করিয়। বেদাস্তের নব ব্যাখ্যা তিনি 
প্রচার করিতে থাকেন। গুরুর সমীপে তাহাই শিক্ষা! করিয়। মধুস্দন 
বাচস্পতি কাশীধামের শ্রেষ্ঠ আচার্য্যরূপে চিহ্নিত হইয়াছেন । 

নিত্যানন্দপ্রভুর নির্দেশে শ্রীজীব এবার বারাণসীতে বেদান্ত শান্ত 
অধ্যয়নের জন্য উপনীত হইলেন। 

অদ্ভুত মনীষা! এই তরুণ বিদ্যার্থীর। বাচস্পতি বিস্মিত ও মুগ্ধ হইয়া 
যান। চার-পাঁচ বৎসরের মধ্যে এই মহাপ্রতিভাধর বৈষঃব ব্রহ্মচারী 
বেদান্ত শাস্ত্রে পারঙ্গম হইয়া উঠেন। পঁচিশ বৎসর বয়সেই তাহার 
পাস্রজ্ঞানের খ্যাতি চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে__ 

কাশীতে শ্রীজীবেরে প্রশংসে সব ঠাই ॥ 
ন্যায় বেযানানি * শাস্ত্রে এছে কেহ নাই ॥ 
[চৈশ্চ] 

শ্বীস্ত্রাধ্যয়নের পর্ব মৌ করিয়া, বেদ বেদান্তে কৃতী হইয়া তরুণ 
ভাপস ক্ষাঙাল সাধকের বেশে বৃন্দাবনে উপস্থিত হইলেন। সেখানে 
হখন তাহার পিতুব্যছয়_-সনাতন ও রূপ গোস্বামীর একচ্ছত্র প্রতৃত্ব। 
শ্রীচৈতম্য কিছুদিন্বক্ে-নীলাচলে লীলা সন্বপ্লণ করিয়াছেন, গোস্বামীদের 
সানির আিয়াছে, এক শোকের ছায়া + একত্র হইয়া সকলে 

” নবী; একি করিয়া মহাপ্রভুর ভৃক্তিধন্ আন্রুবলনের-নিক্ার সা 


ভারতের সাধক 
করা যায়, ভিত্তিকে কর যায় দৃঢ়তর। 


গোস্বামীর। শাস্ত্ররচনা ও সাধন প্রণালী নির্ণয়ে ব্যস্ত, আর দিনের 
পর দিন বুন্দাবনে জড়ো! হইতেছেন বিশিষ্ট বৈষ্ুব সাধকদল। নব নব 
বিগ্রহ-মন্দির ও কুঞ্জ গড়িয়। উঠিতেছে চারিদিকে । 

এই সময়ে শ্ত্রীজীব সেখানে আসিয়া উপস্থিত। প্রথমেই ভক্তিভরে 
তিনি রূপ ও সনাতনের পদবন্দনা করিলেন । 

অভিজাত বংশের একম।ত্র বংশধর শ্রীজীব। একি ত্যাগ তিতিক্ষ 
তাহার ! কৃষ্ণ সেবার জন্য একি অদ্ভুত আন্তি! রূপ সনাতনের আনন্দ 
আর ধরে না। তখনি সোৎসাহে তাহাকে নিয়া বাহির হইলেন, কুঞ্জে 
কুঞ্জে ঘুরিয়া প্রাচীন আচার্ধ্যদের সহিত তাহার পরিচয় সাধন করাইয়৷ 
দিলেন। শ্রীজীবের নয়নাভিরাম মুক্তি, অতুলনীয় প্রতিভা ও শুদ্ধাভক্তি 
সকলেরই প্রশংস। অজ্জন করিল । 


বুন্দাবনের তখন সুবর্ণযুগ চলিয়াছে। আগে হইতেই লোকনাথ ও 
ভূগঞ্ভ গোস্বামী এই পবিত্র ধামে আসিয়। বাস করিতেছেন। তারপর 
ক্রমে ক্রমে হইয়াছে প্রবোধ।নন্দ, সনাতন, রূপ ও রঘুনাথ ভট্টের আগমন। 
চৈতন্যদেবের তন্ুৃত্যাগের পর একে একে এখানে সমবেত হইয়াছেন 
গোপাল ভট্ট, কাশীশ্বর, রঘুনাথ দাস, কৃষ্তদাস গোস্বামী প্রভৃতি। গোস্বামী- 
প্রধানদের মধ্যে সর্বশেষে আবির্ভূত হইলেন সর্ব্বকনিষ্ঠ, শ্রীজীব। 

সেদিনকার বৈধ্বদের মধো এই নবাগত তরুণ সাধক এক 
আলোড়নের স্থষ্টি করেন। নিতান্ত স্বাভাবিক ভাবেই ব্রজমণ্ডলের ভক্তি- 
সাম্র'জ্যের ভাবী নায়করূপে তাহার ভূমিকাটি চিহ্িত হইয়া যায়। 


সনাতন নির্দেশ দিলেন, “রূপ, শ্রীজীবকে আমি আজ থেকে তোমার 
হাতেই সমর্পণ করলাম। তাকে তুমি বৈষ্ঞবীয় দীক্ষা! দাও, গড়ে তোল 
এখানকার দায়িত্বপূর্ণ কম্মের জন্য ।” ্‌ 

সিদ্ধ সাধক, রূপ গোস্বামীর মন্ত্রদীক্ষা। হইয়া! উঠে চৈত্য্যময় | ইঠকিগ, 


১৭২ 


সাধকের সর্ব্বসত্তায় ইহা প্রেমভক্তির তরঙ্গ তুলিয়া দেয়। গুরু-উপদিষ্ট 
সাধন পথে শ্রীজীব নিষ্ঠাভরে অগ্রসর হইয়া চলেন। ভক্তিশাস্ত্রের নিগৃঢ 
তত্বসমূহ অচিরে তাহার অধিগত হয়। তাহার সহজাত মনীষার সহিত 
মিলিত হয় রূপ গোস্বামীর প্রদত্ত সাধনবল। 

ভারতের নানা অঞ্চল হইতে দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতের! সে সময়ে ব্রজ- 
মগ্ডলে উপস্থিত হইতেন। রূপ গোস্বামী শান্ত্রবিদ্‌ বৈষ্ঞব আচার্যদের 
নেতা, পণ্ডিতেরা আসিয়া প্রথমে দ্াড়াইতেন তাহারই সম্মুখে । কিন্তু 
রূপের এই শাস্ত্রীয় বিতর্কে কোন উৎসাহ নাই। প্রতিষ্ঠাকে শকরী ঝিষ্ঠা 
বলিয়াই এই পরম বৈষ্ণব গণ্য করেন। তাই কেহ কখনো তর্ক বিচারে 
আহ্বান করিলে তিনি সাড়। দিতে চাহিতেন না, আনন্দের সহিত জয়পত্র 
লিখিয়। দিয়। বিদ্ভাভিমানী পণ্ডিতকে তুষ্ট করিতেন । 

গুরুগতপ্রাণ শ্রীজীবের কাছে ইহা অসহ্য । অনধিকারী পণ্ডিতের দল 
কেন ফাঁকি দিয়! এভাবে গুরুর কাছ হইতে জয়পত্র নিবে? শ্ীজীব নিজে 
ভগবৎ-দত্ত মহাপ্রতিভার অধিকারী । এই নবীন বয়সে আত্মবিশ্বাসও 
রহিয়াছে উদগ্র। তাই সুযোগ পাইলে কখনে। এই দিগ্বিজয়ী পণ্ডিতদের 
তিনি ছাড়িতেন না। রূপ গোস্বামী কাছে না থাকিলে আর কথা ছিল না, 
পণ্ডিতদের তিনি পরু্দস্ত করিয়া ছাড়িতেন। 

একবার এরূপ করিতে গিয়া বড় বিপদে পড়েন। রূপ গোস্বামী সে 
সময়ে তাহার বিখ্যাত গ্রন্থ “ভক্তিরসামুতসিন্ধুর' রচন। শুরু করিয়াছেন 
প্রিয় শিষ্য শ্রীজীব নিকটেই বসিয়া থাকেন, গুরুকে সেবা যত্র করার 
সঙ্গে সঙ্গে করেন নানারূপ সাহায্য । কখনো! পুথি খুঁজিয়া দেন, কখনো) 
দেন আকর গ্রন্থের সন্ধান, কখনেো৷ করেন অনুলিখন। 

এমন সময়ে একদিন সেখানে দাক্ষিণাত্যের বৈষ্ণব নেতা, বল্লভ ভট্ট 
আসিয়া উপস্থিত। ভর্রজী বিফুস্বামী সম্প্রদায়ের প্রবর্তক, বৈষুব সমাজের 
এক প্রুতিষ্ঠাবান আচার্ধ্য ৷ রূপ গৌসাই তাহাকে পরম সমাদরে অভার্থনা 
করিলেন। আলাপ আলোচনা করিতে করিতে রূপের সগ্যরচিত গ্রন্থের 
কথাও উঠিল। কিছুটা পড়িয়া শোনানো হইলে, বল্পভ ভট্ট উহার 


১৭৩ 


মঙ্গলাচরণ শ্লোকের ছুই চারিটি ভূল দেখাইয়া! দিলেন । 

গ্রীজীব একপাশে বসিয়া উভয়ের কথাবার্তী শুনিতেছেন। ভট্টজীর 
অভিমত কিন্তু তাহার কাছে মোটেই যুক্তিসিদ্ধ বলিয়া বলিয়া মনে হয় 
নাই। কিন্তু উপায় কি? গুরুদেবের সম্মুখে তিনি মুখ খুলিতে পারেন ন।। 
মনের উত্তেজন। চাঁপিয়! চুপ করিয়াই বসিয়া আছেন। 

রূপ গোস্বামী কিন্তু সবিনয়ে ভট্টজীর সিদ্ধান্ত মানিয়া নিলেন, 
কহিলেন, “আচাধ্যবর, আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। অনবধানতার জন্য 
এ ভুলটি চোখে পড়ে নি। আজ বড় উপকার করলেন আমার ৮ 

উহা সংশোধন করিতেও দেরী হইল না। 

ইতিমধ্যে বেল! বাড়িয়া গিয়াছে, তাড়াতাড়ি ঠাকুরের ভোগরাগের 
যোগাড় করিতে হইবে । কৃঝ কৃষ্ণ” বলিয়া গোস্বামীপ্রভূ বমুনায় স্নান 
করিতে চলিয়। গেলেন। ভজন কুটিরে শুধু বসিয়া রহিলেন বল্লভ ভট্ট 
আর শ্রীজীব। | 

এইবার প্রাথিত সুযোগ মিলিল। গুরুদেব দৃষ্টির অন্তরালে যাওয়ার 
সাথে সাথেই শ্রীজীব ভট্টজীকে বিত্ঁকে আহ্বান করিলেন। ভক্তিশান্্ 
হইতে অজন্্ প্রমাণ উদ্ধৃত করিয়া দেখাইয়। দিলেন, তাহার গুরুর লেখায় 
কোন ভুল ্রীস্তি নাই। লোকোত্তর শ্রীজীবের মনীষা, অকাট্য যুক্তিজাল। 
শাণিত মন্তব্যের আঘাতে বল্লভ ভট্ট বড় দমিত হইয়া গেলেন । 

বিচারে এমনভাবে পরাজিত হইয়া! ভট্টজীর ক্ষোভের অন্ত রহিল না। 
বারবারই কেবল ভাবিতে লাগিলেন, “এমন অমান্ুষী, প্রতিভা তো! কখনো! 
দেখিনি। কে এই শীস্ত্রবিদ্‌ যুবক ? জীবনে কখনও আমি এমন গ্রাতিভাধর 
প্রতিপক্ষের সম্মুখীন হইনি ! 

রূপ গোস্বামী এবার নদীতীর হইতে ফিরিতেছেন। বল্লভ ৪৬ 
মনের ক্ষোভ ও উত্তেজনা! এখনো! কমে নাই, নিকটে গিয়। প্রশ্ন করিলেন, 
“আচ্ছা! গোস্বামীজী, এই তরুণ বৈষ্ণবটি কে, বলুন তো? অসাধারণ 
এর বিষ্াবত্তা» তেমনি অপ্রতিরোধ্য এর সিদ্ধান্ত !” 

ব্যাপার কি তাহ! বুঝিতে রূপের দেরী হইল ন1। বুবিলেন, নিশ্চয় 


১৭৪ 


শ্লোক সংশোধনের প্রশ্ন নিয়া শ্রীজীবের সহিত ইতিমধ্যে ভট্টজীর বিচার 
বিতর্ক হইয়াছে । মুহূর্তমধ্যে বৃদ্ধ রূপ গোস্বামীর দৈন্যময় ভক্তিবিহবল 
রূপটি পরিবন্তিত হইয়। গেল। 

ভজন কুটিরে আসিয়া শ্রীজীবকে নিকটে ডাকাইলেন। তিরস্কার 
করিয়া কহিলেন, “মূর্খ, অব্বাচীন ! শুধু শুধু প্রবীণ আচাধ্যকে কেন তুমি 
মাক্রমণ করতে গিয়েছ ? এতটুকু সম যদি ভেতরে না থাকে, তবে কেন 
নিলে এই ত্যাগ-বৈরাগ্যময়, দৈম্যময় বৈষ্ুব জীবন? কি লাভ তোমার 
এই তিলক, মালা আর কষ্টি ধারণের আভিনয়ে ? তোমার মত মূটের 
মুখদর্শন আমি করতে চাইনে। দূর হও আমার সামনে থেকে !” 

রূপ গোস্বামীর সিদ্ধান্তের নড়চড় হয় না। এই সামান্য অপরাধের 
জন্য শ্রীজীবকে তখনি স্থান ত্যাগ করিতে হইল । 


গুরুর আদেশ শিরে ধারণ করিয়। শিষ্য সেদিন দৈশ্যভরে এক অরণ্য 
মধ্যে আশ্রয় নিয়াছেন। শুরু করিয়াছেন কুচ্ছুত্রতও কঠোর ভজন সাধন । 
পানাহারের কোনরূপ চেষ্টা নাই, ধীরে ধীরে দেহটিকে তিনি শুকাইয়া 
মানিতেছেন। অন্তরে জ্বলিতেছে আত্মগ্রানির তুষানল। 
নিত্যকার ভজন শেষ হইয়া গেলে শ্রীজীব আকাশবুত্তি অবলম্বন 
করিয়। পর্ণ কুটিরে বসিয়া থাকেন, আর ভাবেন তাহার আত্মশোধনের 
কথা, ইঠ্ট প্রপ্তির কথা-- 
দেহ হইতে প্রাণ ভিন্ন করিয়া ত্বরিতে। 
প্রভু পাদপদ্ম পাব এই চিন্তা চিতে ॥ 
ৃ (ভক্তি রত্বাকর ) 
সনাতন গোস্বামী এ সময়ে একদিন কি এক কাজে এই অরণ্যের মধ্য 
দিয়া চলিয়াছেন। লোকমুখে শুনিলেন, এক কৃষ্ছুত্রতী বৈষ্ণব সাধক 
এখানে মরণ-পণ সাধনায় রত। 
শুনিয়াই তাহার কৌতৃহল জাগিল। পর্ণ-কুটিরের দ্বারে আসিয়া 
বিস্ময়ের সীমা রহিল না। এ কি? এষে তাহাদের শ্রীজীব ! দেহখাঁনি 


১৭৩ 


উরি তি 


একেবারে অস্থি-চম্মসার, চিনিবারই যো নাই। শ্রীজীব ক্রন্দন করিয়া 
পিতৃব্যের পদতলে লুটাইয়৷ পড়িলেন। 
সমস্ত ঘটনা! শোনার পর সনাতন গোস্বামীর করুণা হইল । আশ্বাস 
দিয়া কহিলেন, বৎস শ্রীজীব, তুমি মনে কোন খেদ রেখো ন্দ। মহাপ্রতুর 
কৃপায়, এই ছুঃখের ভিতর দিয়েই তোমার জীবনে আস্ছে বৃহত্তর কল্যাণ। 
কোন ভয় নেই । তৃমি আরো! কিছুকাল এখানে থাকো, এম্নি ছঃখদহনের 
ভেতর দিয়ে শুদ্ধতর হয়ে আবার ফিরে এসো । আমি তোমার কথ। 
রূপকে অবশ্যই বলবো 1” 
বুন্দাবনে ফিরিয়াই রূপের সাথে সনাতন গোস্বীমীর দেখা । প্রথমেই 
শ্রীজীবের শঙ্কাজনক অবস্থার কথা বলিলেন না। প্রসঙ্গত্রমে জিজ্ঞাসা 
করিলেন, “ভালে। কথা, রূপ, তোমার ভক্তিরসাম্বত-গ্রন্থের সমাপ্তির আর 
কত বাকী? ভক্তমমাজ যে এ গ্রন্থের আশায় দিন গুন্ছে।” 
সনাতন জানেন, এই মহান্‌ গ্রন্থের রচন।য় শ্রীজীব ছিলেন রূপের 
প্রধান সহায়ক । তাহার অভাবে নিশ্চয়ই মহা অসুবিধার স্থষ্টি হইয়াছে, 
কাজের গতিও মন্থর হইয়! পড়িয়াছে । সুকৌশলে আসল কথাটি উত্থাপন 
করাই তীহার অভিপ্রায়। 
রূপ খানিকক্ষণ চুপ করিয়া রহিলেন, মনে ইতিমধ্যে শ্রীজীবের জন্য 
কিছুট। ক্টও হইয়াছে ।_- 
প্রীরূপ কহেন প্রীয় হইল লিখন। 
জীব রহিলেই শীঘ্র হয় শোৌধন। 
গোস্বামী কহেন জীব জীয়। মাত্র আছে । 
দেখিনু তাহার দেহ বাতাসে হালিছে ! 
| ( ভক্তিরত্বাকর ) 
সনাতন গোস্বামীর ইিতটি সুস্পষ্ট । প্রাণপ্রিয় শিষ্তের সমস্ত কথাই 
রূপ গোস্বামী সেদিন বসিয়া! বসিয়া শুনিলেন। অন্তরে বড় করুণা 
জাগিয়। উঠিল। এবার তাহার সমস্ত অপরাধ ক্ষম৷ করিয়া নিজের কাছে 
ডাঁকাইয়া আনিলেন। ছুহেখের আগুনে পুড়িয়া পুড়িয়! শ্রীজীবের সাধন 


১৭৬ 


| জীবনের ন্বর্ণসম্পদ সেদিন আরো উজ্জ্বল হইয়1 ফুটিয়া উঠিয়াছে। 

বন্দাবনের অরণ্যে কৃঙ্ছুসাধনার পর্ব শেষ করিয়! শ্রীজীব যখন 
ফিরিয়া আসিলেন তখন তিনি এক নূতন মানুষ ! একান্তিক ভক্তি ও 
আত্মবিলুপ্তির পরম চেতনা ফুটিয়! উঠিয়াছে তাহার ত্যাগ তিতিক্ষাময় 
জীবনে । সাধনবল আর মনীষার সেখানে ঘটিয়াছে অপরূপ সমন্বয়। গুরুর 
দেওয়া আঘাতের মধ্য দিয়া শ্রীজীবের অন্তরে এবার জুঁড়িয়া বসিয়াছে 
মানবপ্রেম ও মানব কল্যাণের পরম বোধ। 

শিষ্যের এই রূপান্তর দর্শনে রূপ গোস্বামীর আনন্দ আর ধরে না । 
এবার হইতে তাহার জগ্য পৃথক বিগ্রহ সেবার ব্যবস্থা তিনি করিয়া দিলেন 
-__এই ঠাকুরের নাম শ্রীরাধা-দীমোদর। 

লীলাময়, পরম সুন্দর এই বিগ্রহটি কিছুদিন আগে রূপ গোস্বামীকে 

ন্বপ্পে দর্শন দেন ! সারা অন্তর তাহার এই স্ত্রীমৃত্তির রূপে রসে উদ্বেল 

হইয়া! উঠে। পরদিনই ব্যাকুল হয়া শিল্পী ডাকাইয়া আনেন, তৈরী 
করান তাহার স্বপ্নে দেখা মুস্তি। তারপর নিজের ভজনকুটিরে এ বিগ্রহকে 
স্থাপন করিয়া কিছুদিন সেব! পুজা করিলেন। এবার এই সেবাপুজার 
ভার প্রদান করিলেন প্রিয় শিষ্ের উপর। গুরু-পুজিত এই বিগ্রহের 
সেবার অধিকার পাইয়া শ্রীজীবের আনন্দের সীম। রহিল ন|। 

বৃন্দাবনের শুঙ্গার বটের এক কোণে, রূপ গোস্বামী ও শ্রীজীবের 
ভজনকুঞ্জের কাছে রাধ' দামোদরের এক স্বুরম্য মন্দির স্থাপন কর! 
হইল।নী। নাঁকালে সম্রাট গুরঙ্গজেবের অত্যাচারে বৃন্দবনবাসীরা 
অস্থির হয়৷ উঠেন । এই অত্যাচার এড়ানোর জন্য মন্দিরের মূল বিগ্রহটি 
বৈষ্বের! জয়পুরে সরাইয়া দেন, সেস্থলে স্থাপিত হয় এক প্রতিভূ-বিগ্রহ। 
ইহার সেবাই বুন্দাবনের মন্দিরে এখনো চলিতেছে। 

ইতিমধ্যে বৈষ্ণব সমাজে নামিয়া আসে এক ছুর্দেব, সকলকে শোক 
সাগরে ভাসাইয়। সনাতন গোস্বামী একদিন নিত্যলীলায় প্রবেশ করেন। 
চরণ পাহাড়ী” শিল! ছিল এই প্রবীণ বৈষ্ণব মহাপুরুবের প্রাণাপেক্ষা 
প্রিয় বস্ত। তীহার তিরোধানের পরে জীব গোস্বামী এটিকে শিরে ধারণ 


১২ ১৭৭ 


ভারিতৈর ধক. 


করিয়। নিয়া আসেন, স্থাপন করেন নবনিম্মিত গ্রীমন্দিরে । 

কথিত আছে, বুদ্ধ ও অশক্ত হইয়া পড়িলে সনাতন তাহার চির 
অভ্যাস মত প্রতিদিন গোবর্ধন পরিক্রমা করিতে পারিতেন না। তাই 
গোবিন্দজী কৃপা করিয়া! তাহার কাছে আবিভূ্তি হন, তাহাকে এই চরণ- 
পাহাড়ী প্রদান করেন। প্রতিদিনকার ভজন শেষে, প্রত্যুষে ও সন্ধ্যায়, 
সনাতন তাহার ইষ্টদেবের দেওয়া এই শিলাখণ্ডকেই পরিক্রমা করিতেন । 
শ্রীজীবের রাধা-দামোদর নন্দিরে এই গোবর্দন-প্রতীক আজিও বিরাজিত 
রহিয়াছে । সকল ৈঝুন ভক্তদের কাছেই এই শিলা! এক পরম পাবত্র 
বস্তু, বৃন্দাবনের এক শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ । 

নৃতন মন্দিরের এক প্রকোন্ঠে জীব গোস্বামী গড়িয়া! তোলেন তীর 
বিরাট গ্রন্থশালা। প্রাচীন বৈঞ্ুব সাহিত্যের অমূল্য গ্রস্থরাজী এখানে 
সযত্রে সংগ্রহ করিয়া রাখা হয় । 

শাস্ গ্রন্থের এই সঞ্চয় কবে যেকি ভাবে শুন্য হইয়! গিয়াছে, আজ 
আর তাহা কেহ বলিতে পারেনা । 


সনাতন ও রূপ বিগত হইয়াছেন। নন্দকৃপবাসী প্রবীণ আচ'ধ, 
প্রবোধানন্দও লীলা সম্বরণ করিলেন। লোকনাথ, গোপাল ভট, রঘু ।াথ 
দাস গোস্ব।মী প্রভৃতি তখন বাদ্ধক্যের সীমায় উপনীত, লোক'ন্তর 
যাত্র।র জন্য তাহ।র1 প্রতীক্ষ। করিতেছেন । তখ :ল্ধাব গোস্বামাদের মধ্যে 
একমাত্র শ্রীজীব পু-বিয়ক্ক ও কর্মক্ষম । প্রবীণ বৈধঃ ষদের 
কৃপায় প্রেমভক্তির সাধন। তাহার সার্থক হইয়। উঠিয়াছে | বেক্ষশাস্ত্রেও 
তিনি এ সময়ে অদ্বিতীয় । 

ব্রজমগ্ডলে এখন শ্রীজীবের সমকক্ষ বৈষ্ণব নেতা আর কেহ নাই । 
গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের দায়িত্ব নিবার মত এমন শক্তিধর আচার্ষ্যই বা 
আর কে আছে? তাই নিতান্ত স্বাভাবিকভ!বেই ব্রজমণ্ডলের অধিকর্তা" 
রূপে সকলে সে সময়ে তাহাকে মানিরা নেয়। 

রূপ ও সনাতন একাধারে ছিলেন মহাপগণত ও মহাসাধক। ই'হাদের 


১৭৮ 


শীস্তচর্চা, ভক্তিগ্রস্থ রচনা ও সাধনার ফলে বৃন্দাবন নৃতন করিয়া জাগিয়া 
উঠে, ভক্তি-ধন্মের শ্রেষ্ঠ কেন্দ্ররপে প্রসিদ্ধি অজ্জন করে। আর জীব 
গোস্বামীর সময়েই এই খ্যাতি চরমে পৌছে, ভারতের দিকে দিকে 
ছড়াইয়া পড়ে । এই শক্তিধর আচার্যযের সাধনা ও লোকোত্তর প্রতিভার 
কাছে সমকালীন শিক্ষিত সমাজ মস্তক অবনত করে। 

বহু ভক্ত বৈষ্ণব তখন বুন্দাবনের মহাতীর্থে ধীরে ধীরে সমবেত 
হইতেছে । কেহ আসে ভক্তি-ধন্মে দীক্ষা নিবার জন্য, কেহ চায় ভক্তি- 
শাস্ত্রের পঠন-পাঠন। সবাইকেই কিন্ত শরণ নিতে হয় জীব গোস্বামীরই 
কাছে। ছুই বানু প্রসারিয়া এই মহান নেতা মমুক্ষু মানুষমাত্রকেই 
আশ্রয় দিতে থাকেন। 

দিখ্িজয়ী পণ্ডিতের! প্রায়ই বৃন্দাবনে আসিয়। উপস্থিত হন, শাস্ত্রবিদ্‌ 
বৈষ্ুবদের সহিত তাহাদের বিচার-বিতর্ক চলে। গোস্বামী সমাজের 
মুখপাত্র শ্রীজীব, তীাহাকেই উহাদের সম্মুখীন হইতে হয়। তাহার 
সাধনবল ও অমান্ধুষী প্রতিভার কাছে অনেক পাগ্ডিত্যাভিমানী তার্কিক 
নিগ্খাভ হইয়া যায়। 

গৌড়ীয় বৈষ্বদের মধো এসময়ে আবিডূতি হয় বনু নুন লেখক ও 
টীকা-ভাঙ্যকার। কিন্তু যখনি যাহ! কিছু রচিত হয়, সুধী সমাজে প্রশ্ন 
ওঠে, এ সম্পর্কে শ্্রীজীব কি বলেন ? তাহার লমর্ষণ কই ? শ্ীজীবের 
অনুমোদন ছাড়া কোন গ্রন্থ, কোন ততই প্রামাণ্য বা পঠিতদ্া বলিয়া 
গণ্য হয়না । নান! অঞ্চল হইতে সাধনতত্্র ও শাদপ্রের ব্যাখ্যা চাহিয়া 
পত্র।দি প্রেরিত হয় তাহাঁরই কাছে । দলে দলে তরুণ বেঞ্বেরা আসেন 
এই মহা মনীষীর পরনাশ্রয়ে 


বৃন্দাবনের গোস্বামীদের সাধননিষ্ঠ। ও খ্যাতির কথ। প্রায়ই সম্রাট 
আকবরের কাণে আসে । কৌতুহল ও অনুসন্ধিৎস! তাহার ক্রমে বাড়িয়া 
যায় এবং আনুমানিক ১৫৭৩ সালে তিনি সদলবলে বৃন্দাবনে উপস্থিত 
হন। এসময়ে বৈষ্ণব আচার্ধ্যদের মুখপাত্ররূপে সম্রাটের সহিত সাক্ষাৎ 
১৭৪ 

| 


44০ রি জাজ. 


করেন শ্রীজীব। যেমন মনোহর এই মহাবৈষবের দিব্যপ্রীমপ্ডিত মুক্তি 
তেমনি করুণন্ুন্দর তাহার দেন্যাময় বেশ । ডাহার লোকোত্তর প্রাতিতা ও 
তেজস্থিতা দেখিয়া বাদশাহ যুদ্ধ হইয়! যান। 

বুন্দাবনের ইতিহাসবেত্ত। গ্রাউস সাহেব লিখিয়াছেন” আকবর এই 
সময়ে রাধা-গোঁবিন্দের লীলাভ্ুমি নিধুবন দর্শন করার জন্য উৎন্থুক হন। 
গ্রীজীব প্রভৃতি গোস্বামীব! সম্মতি দান করেন এবং বাদশাহের চোখে 
কাপড় বাঁধিয়। লীলাস্থলীব এক কোণে দাড় কবিয়া দেওয়া হয়। 

এই ভূমিতে দণ্তীয়মান হওয়া মাত্র আকবর শাহ অনুভব কবেন এক 
বিস্ময়কর অলৌকিক অভিজ্ঞতা । ভিন্নধন্মী সম্রাটকে ত্বীকাব করিতে 
হয় যে, সত্যই তিনি এক অতি পবিত্র লীলাভূমি স্পর্শ করার সৌভাগ' 
সেদিন প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। 

মুসলমান সম্রাটদের অনুমতি ছাড়! বৃন্দাবনে আগে হিন্দু মন্দির 
নির্মাণ কব। যাইত না। আকবর এবার এই বাঁধ! অপসারণ করিলেন । 
সানন্দে অনুমতি দিলেন, এবাব হইতে বুন্দীবনে ভক্তের! স্বেচ্ছামত দেব- 
দেউল নিন্মীণ কবিতে পাবিবেন। 

সম্রাট বড় প্রসন্ন হইয়া উঠিয়াছেন। তাহার একান্ত ইচ্ছা, বৃন্দাবনে 
তাহর এই আগমনকে ম্মবণীয় কবিয়া রাখেন । এজন্য যে কোন উদ্যে।গ 
আয়োজন ও অর্থব্যয় করিতে তিনি প্রস্তত। গোস্বামীদেব সবিনয়ে প্রশ্ন 
করিলেন, তাহাদের প্রার্থনীয় কিছু আছে কিনা? 

গ্রীজীব উত্তর দিলেন, “সম্রাট, আমরা দীনহীন কাঙাল বৈষ্ঞব, 
সর্বস্ব ছেড়ে যাতে প্রভূব শরণ নিতে পারি তাই যে আমাদের সাধন।। 
আমাদের কোন কিছুর প্রয়োজন নেই, চাইবারও কিছু নেই 1 

আকবর সহজে ছাঁড়িবেন না । বারবারই তিনি কহিতে লাগিলেন, 
“আপনারা যা হোক একটা কিছু আমার কাছে 0 যে নিন, তাহলে " "মি 
বড় খুশী হবো ।” 

“সম্রাট, শ্রীধাম বুন্দাবনে বৈষ্ুবেরা যাতে নিরস্জেবে ঝাদিতিরণ ও 
শাস্ত্রচর্চা করতে পারেন, সেদিকে আপনি একটু দি রাখাল ভাল হয়। 


১৮৩ 


শ্রজীব গোস্বামী 


প্রাচীন কালের হিন্দু রাজারা একান্ত নিষ্ঠায় তপোবন রক্ষা করতেন। 
আমরা চাই, আপনিও তাই করুন। আরও একটা কথা, বৃন্দাবনের 
অরণ্যে মুগয়! ক'রতে এসে অনেকে প্রাণী হত্যা করেন । কায়মনোবাক্যে 
অহিংস বৈষ্ণবেরা এতে বড় ব্যথিত হন। এই প্রাণীহত্যা আপনি দয়া 
. ক'রে বন্ধ করুন। এই আমাদের প্রার্থনা |” 

সম্মতি তখনি মিলিয়! গেল। 

বাদশাহের ফন্মীন জারি হইল, ব্রজমগ্ডলে আ'র প্রাণীহত্য করা 
চলিবে না। পবিভ্রস্থানের গাছপাল। কাটাও নিষিদ্ধ হইয়া গেল। 

শ্রীজীব প্রভৃতি বৈষ্ণব গোস্বানীদের প্রেমন্্রীম্ডিত মৃত্তি দেখিয়া 
আকবর মুগ্ধ হন। বিশিষ্ট বৈষ্ণব মহাপুরুষদের চিত্র অঙ্কনের জন্য তিনি 
রাজধানী হইতে সুদক্ষ চিত্রকরও প্রেরণ করিয়াছিলেন। কিন্তু গোস্বামীদের 
প্রতিচ্ছবি নেওয়া বড় কঠিন, কেহই উহাতে রাজী হন নাই। এ সময়ে 
ক্রীজীব বাদশাহকে বুঝাইয়া এক পত্র দেন। তিনি লিখেন, ত্যাগ 
বৈরাগ্য ও দৈন্য বৈষ্ণবদের সাধনার এক প্রধান অঙ্গ; ছবি না নিতে 
পারায় সম্রাট যেন ক্ষুণ্ন না হন। 

বৃন্দাবনের বৈষণবদের এই স্মৃতি দীর্ঘকাল আকবরের চিত্ত হইতে 
অপন্যত হয় নাই। উত্তরকালে একবার তাহার সখ হয়, তিনি হিন্দু 
সাধকের সাজে সাজিবেন। এ সময়ে মালা-তিলকধারী বৈষ্ণব গোস্বামীর 
বেশকেই তিনি বাছিয়া নিয়াছিলেন। 


অসামান্ত সাধন! ও মনীষার অধিকারী শ্রীজীবের জীবনে মিলিত 
হইয়াছিল সংগঠন-কুশলতা ও ব্যবহারিক জ্ঞান। 

গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধন্ম্ের প্রচার ও শাস্তগ্রন্থ রচনায় তাহার উৎসাহের 
অবধি ছিল না। তখনকার দিনে এসব গ্রন্থের বেশীর ভাগ তালপত্র বা! 
ভূর্জপত্রে লেখ। হইত, তাই গ্রন্থের অন্ুলিখন ও প্রচার বড় সহজ 
কাজ ছিল না। শ্রীজীবের চেষ্টায় মুঘল রাজধানী হইতে কাগজ আনীত 
হয় এবং ইহার ফলে বৃন্দীবনের শা্তরগ্রন্থ-প্রচার ত্বরাম্থিত হইয়া উঠে। 


১৮১ 


ভারতের সাধক 


সনাতন ও রূপের গ্রন্থাদি রচনার সময়ে জীবগোস্বামী তাহাদের 
সাহাষ্য করিতেন, তাহাদের এই মহান ব্রতের উদযাপনে তিনি ছিলেন 
এক অপরিহাধ্য সহকারী 

সনাতনের পাপণ্ডিত্য আর রূপের কবিত্বের বিস্ময়কর সমাহার দেখা 
গিয়াছিল জীব গোন্সামীর জীবনে, আর এই অনন্যসাধারণ উত্তরাধিকারের 
সঙ্গে মিনন ঘটিয়াছিল অপরিসীম নিষ্ঠার। তাই গৌড়ীয় বৈষ্ণব 
আন্দোলনের তান্ত্িক ভিত্তি নিন্মীণে এমন সাফল্য তিনি অজ্জন করিতে 
পারিয়াছিলেন। - 

ক্রমাগত প্রায় ষাট বৎসরকাল শ্শ্রীজীব শাস্ত্রচ্চায় অতিবাহিত 
করেন। পঁচিশটিরও বেশী মূল্যবান শাস্তরগ্রন্থ তাহার দ্বারা প্রণীত, সঙ্কলিত 
ও ব্যাখ্যাত হয়। ইহার মধ্যে রহিয়াছে তাহার সন্দর্ভ বিচার গ্রন্থ, 
টাকা, ব্যাকরণ, ভাত্ত, সংগ্রহ ও স্তব এবং '্রীগোপাল চম্পু ইত্যাদি 
লীলাগ্রন্থ। 

ভাঁগবতসন্দর্ড' এই মহামনীষীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীন্তি। চিরকালের 
বিদ্বভ্জন সমাজে, দর্শন ও ধন্মগ্রন্থ রচয়িতাদের মধ্যে ইহ। তাহাকে এক 
অসামান্য মর্য্যাদা দান করিয়াছে । 

রূপ, সনাতন, গোপাল ভট্ট প্রভৃতি পূর্ববস্থ্রীরা বৈষ্ণব মতবাদ 
প্রতিষ্ঠার কাজে অসাধ্য সাধন করিয়া গিয়াছেন। তাহাদের ভক্তি-গ্রন্থে 
দেখা গিয়াছে লীলা বর্ণনা; লীলার দৃষ্টান্ত হইতে ভক্তি ও রসতন্ত্বের 
উদ্ধার সাধনও তাহারা যথেষ্ট করিয়াছেন । বেষ্ঞবীয় বিচার ও ভজন রীতি 
সংপ্লিষ্ট বিধি নিষেধের সঙ্কলনও এই সব সাধক ও মনীষীরা কম করেন 
নাই। কিন্ত সকলেরই মনে প্রশ্ন জাগিতে থাকে- শ্রীচৈতন্যের নব- 
প্রবন্তিত ভক্তিধন্মের প্রচার ও প্রসার খুবই হইতেছে, কিন্ত ইহার 
উপযোগী দার্শনিক তত্ববিচারের গ্রন্থ তেমন কই ? 

সনাতন ও রূপ তখন বৃদ্ধ হইয়া পড়িয়াছেন। দেহ আর তেমন 
কর্মক্ষম নাই। তাছাড়া, আজকাল ভজনরসেই সদ। মগ্ন থাকেন। দার্শনিক 
তত্ববিচারের গ্রস্থ্রচনার ভার তাই বয়ঃকনিষ্ঠ, সুপঞ্চিত গোপাল্‌ ভ্টের 


১৮২ 


জীব গোম্বামী 


উপর তাহার! দিয়াছিলেন। ভট্ট গোল্বামী এ মহ] দায়িত্বপূর্ণ কাজ শুরু 
করিয়াছিলেন মাত্র, ইহ1 সমাপ্ত হয় শ্ত্রীজীবের দ্বারা তাহার ষটসন্দর্ভ 
গ্রন্থই এই বনু প্রতীক্ষিত বৈষ্ণব দর্শন গ্রন্থ । তত্ব, ভগবত, পরমাত্মা, 
শ্রীকৃষ্ণ ভক্তি ও '্্রীতি এই ছয়টি সন্দর্ডে ঈহাকে ভাগ করা হইয়াছে। 
সিদ্ধান্ত অনুসরণ করিয়া শ্রীজীব ক্রেমসন্দর্ড নামেও ভাঁগবতের এক টীক। 
রচন1 করেন। একত্রীকৃত এই সন্দর্ভসমূতই জীব গোন্সামীর বিশ্ববিখ্যাত 
'ভাগবতসন্দও? | ভক্তিদর্শনের সারভাগ এই মহাগ্রন্থে নিহিত রহিয়াছে । 
সাধ্য সাধনতত্ত্ের নির্ণয় ও ব্যাখ্যা করা হইয়।ছে অনবদ্য বিচার বিশ্লেষণের 
মধ্য দিয় । 


বন্দাবনের প্রেমভক্তির সাম্রাজ্য এই সময়ে দূর-দূরাস্তে ছড়াইয়। 
পড়িয়াছে। আর সাধন-শত্তি, মনীবা ও কল্ম শক্তিবলে শ্রীজীব প্রার 
একক ভাবে ধারণ করিয়! আছেন তভার পরিচালন-রশ্মি । 

ইহার পর এশা কন্ছের সহয়করূপে বুন্দাবনের রঙ্গমঞ্চে তিন মহা 
নৈষ্ণবের আবির্ভাব ঘটে । শ্রীনিবাস, নরোম ও শ্য।ম[নন্ন শ্রীজীবেব 
পাশে আসিয়া - ড়ান। 

কাটোয়ার নিকটেই চাকন্দি নামক গ্রাম । এখান হইতে আসেন 
মহাভক্ত শ্রীনিবাস। এই দিব্যকান্তি তরুণ বৈষ্বের প্রাণে জাগিয়া উঠে 
কৃষ্ণ প্রেমের তৃষ্ণা, চৈতন্যপার্ষদ নরহরি সরকার ঠাকুরের কৃপা! তিনিপ্রাপ্ত 
হন। ইহার পর ভক্তিবিহবল হৃদয়ে ছুটিতে ছুটিতে বুন্দাবনে আসিয়া 
উপস্থিত হন। সেদিন গোবিন্দজীর মন্দিরে দর্শন করিতে গিয়া শ্রীজীবের 
চরণে তিনি পতিত হইলেন। সেই মুহুর্তে শ্রীজীবের দৃষ্টিতে এই তরুণ 
সাধকের পরম সম্ভাবনাটি ধরা পড়িয়া গেল। 

গোস্বামী গোপাল ভর্টকে বলিয়। এই নবাগত সাঁধককে তিনি দীক্ষা! 
দেওয়াইলেন, নিজে তাহাকে শিক্ষা দিতে লাগিলেন ভক্তিশাস্ত্র। 

ইহার কিছু' পরেই আগমন হয় নরোত্তমের । উত্তরবঙ্গের গরাণহাটি 
পরণণার প্রতাপশালী জমিদার কৃষ্ণানন্দের তিনি একমাত্র পুজ্র। 


১৮ ৩ 


ভারতের সাধক 


গৃহত্যাগ করিয়। নিদ্ষিঞ্ন বৈষণবের বেশে নরোত্তম সেদিন ব্রজে 
আসিয়। উপস্থিত। আপন ত্যাগ তিতিক্ষা ও নিষ্ঠার বলে লোকনাথ 
গোস্বামীর তিনি পরম প্রিয় হইয়া উঠেন, তাহার কাছেই “দীক্ষা গ্রহণ 
করেন। তাহার অধ্যাপনার ভারও শ্রীজীব সোৎসাহে নিলেন। 

তৃতীয় চিহ্নিত সহকারী- শ্ঠি।মানন্দ। উড়িস্যার ধারেন্দা-বাহাছ্রপুর 
গ্রামের দরিদ্র সদ্‌গোপ বংশে তাহার জন্ম। পূর্ববনাম “ছুঃথী কৃষ্ণদাস?। 
বিষয়-বিরক্ত এই কাঙাল সাধক বুন্দাীবনে চলিয়৷ আসেন, ভাগ্যবলে ল[ভ 
করেন রঘুনাথদাস গোন্বামীর কৃপা । দাস গোম্বামী বুঝিলেন, কুষ্দীস 
মহাপ্রভুর প্রেমধন্ম আন্দোলনের এক চিহিন্ত নেতা । সাধনার শেষে 
আবার তাহাকে ফিরিয়া! যাইতে হইবে জনজীবনের মাঝখানে, নব ধন্ম্ের 
প্রচার তাহাকে করিতে হইবে । এ কাজের জন্য চাই প্রস্তুতি, আর'চাই 
তত্বদর্শনের জ্ঞান। তাই ভাবিয়। চিন্তিয়৷ তিনি তাহাকে শ্রীজীবের নিকট 
পাঠাইয়া দিলেন। কৃপালু শ্রীজীব স্বয়ং এই মহাভক্তকে প্রদান করিলেন 
দীক্ষা আর পরমাশ্রয়। 

জীব গোস্বীমীই তখন ব্রজভূমির অনেক কিছুর নিয়ামক। তাহার 
কৃপায় শ্রীনিবাস ভূষিত হইলেন “আচার্য” উপাধিতে, নরোত্তম পরিচিত 
হইয়া উঠিলেন ঠাকুর নরোত্বম-রূপে । আর উড়িয়৷ সাধক কৃষ্ণদাসের 
তিনি নামকরণ করিলেন "্ঘামানন্দ গোস্বামী? । 

ইতিমধ্যে নবরচিত বৈষ্ণবশাস্ত্রের সখ্য নিতান্ত কম হয় নাই। 
সংস্কৃত গ্রস্থকারদের পরে আত্মপ্রকাশ করিয়াছেন ভক্তপ্রবর কষ্খদাম 
কবিরাজ। তাহার অপুবর্ব বাংল! গ্রন্থ 'ক্রীচৈতন্য চরিতাম্বত' বৃন্দাবনে এক 
প্রবল আলোড়ন তুলিয়। দেয়। 


জীব গোস্বামী স্থির করিলেন, বিপুল গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্যকে এব্যর 
হইতে বাংলার বৈষ্ণব সমাজে প্রচার না করিলে চলিবে ন!। ভক্তি-ধন্ম্ের 
শাস্ত্রীয় ভিত্তি রচনা করা» পরিবদ্ধীন ও প্রচারের মধ্য দিয়া উহাকে জন- 
জীবনে ছড়াইয়া৷ দেওয়া এক মহ দায়িত্বপুর্ণ কাজ। মহাপ্রভুর ইঙ্গিতে এ 


১৮৪ 


শ্রীজীব গোম্বামী 


কাজ রূপ ও সনাতন অনেকটা আগাইয়া! দিয়া গিয়াছেন। ধর্মমশাস্ত্র ও 
কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়া প্রেমভক্তির পথকে তাহার! সুগম করিয়াছেন। 
পরবস্তী সাধক ও আচার্যযেরাও গ্রস্থাদি কম লিখেন নাই। . কিন্তু ভক্তি- 
শাস্ত্রের এই অমূল্য সম্পদকে বাংলা দেশের ঘরে ঘরে না পৌছাইয়া 
দিলে মহা প্রভুর ইচ্ছার মর্ধ্যাদ! রক্ষিত হয় কই? 

কিন্ত কাহাকে এই গুরুভার দেওয়া যায়? শ্রীনিবাস মহাভক্ত - 
স্থপণ্তিত এবং কন্মুকুশল। শ্রীজীব তাহাকেই এই শাস্তরগ্রস্থ প্রচারের 
যোগ্যতম ব্যক্তিবূপে নির্বাচন করিলেন। 

শ্রীনিবাসের গুরু, গোপালভট্ট গোস্বামীর অনুমতি আগে হইতেই 
নিয়। রাখা হইল । 

গোবিন্দ মন্দিরে সেদিন বিশিষ্ট ভক্তগণ ভাগবত পাঠ শ্রবণের জন্য 
সমবেত হইয়াছেন। শ্ত্রীজীবের ইঙ্গিতে কয়েকজন গোস্বামী প্রস্তাব 
করিলেন, গৌডদেশে ভক্তিশাস্ত্রের প্রচার অবিলম্বে শুরু করা! দরকার। 
একবাক্যে সকলে শ্রীনিবাস, নরোত্বম ও শ্যামানন্দ এই তিন তরুণ 
আঁচার্ধ্যকে এ দায়িত্ব গ্রহণে আহ্বান জানাইলেন। 

তিন বন্ধুর মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়৷ পড়িল। একি বিপদে আজ 
পড়িলেন ! যমুনাতটে, গোবর্ধানে, রাধাকুণ্ডতীরে তাহারা স্বেচ্ছামত ঘুরিয়া 
বেড়ান, মনের আনন্দে লীলাস্থলগুলি দর্শন করিয়া ফিরেন । ভজনসিদ্ধ 
গোম্বামীদের সানিধ্য লাভও তাহাদের বুন্দাবনে থাকার এক মস্ত বড় 
আকর্ষণ। বড় সাধের এই বৃন্দাবন ত্যাগ করিয়া যাইতে হইবে ! এ 
প্রস্তাব শুনিয়া তাহাদের বুক ফাটিয়া যাইতেছে। 

কিন্ত উপায় নাই। গুরুস্থানীয় প্রবীণ গোম্বামীরা সকলে মিলিয়া 
অনুরোধ করিতেছেন, সব্রবোপরি তোল! হইয়াছে মহা প্রভুর আদিষ্ট ব্রত 
উদ্যাপনের কথা । এ তাহারা কি করিয়া ঠেলিবেন ? শ্রীনিবাস, নরোত্তম 
ও শ্যামানন্দকে সম্মত হইতে হইল । 

শ্রীজীবের কৌশল ও কুশলতার গুণে এই ছুরহ কন্মত্রতের সুচনা 
হয়। এ কদ্ধের প্রভাব সার! বাংলাদেশের বুকে এক নূতন প্রাণস্পন্দন 


১৮৫ 


ভারতের সাধক 


আনিয়া দেয়, নৃতনতর সাংস্কৃতিক চেতন। জাগাইয়। তোলে । 

একটি কাঠের সম্পুটে প্রসিদ্ধ বৈষ্ণব গ্রন্থগুলি থরে থরে সাজানো 
হইল তারপর গোন্বামীদের আশীর্বাদ নিয়া শুভক্ষণে তিন*বন্ধু গড়ের 
কম্মক্ষেত্রের দিকে যাত্রা! করিলেন । 

দীর্ঘ পদযাত্রার পর সকলে বিষুপুর মল্লরাজের রাজ্য সীমান্তে 
পৌছিয়াছেন, এমন সময়ে হঠাৎ এক দুর্ঘটনা ঘটিয়া গেল। 

সযতে ও সতর্কতার সহিত বৈষ্বেরা সিম্ধুকটি নিয়া চলিয়াছেন, 
পথে দস্থ্যদের শ্যেন দৃষ্টি ইহার উপর পড়িল। তবে কি সীধুরা কোন 
গোপন ভাণ্ডার নিয়া কোথাও চলিয়াছে ? গভীর রাত্রে সেদিন বনমধ্যে 
তাহারা বৈষ্ণবদলের উপর আসিয়া ঝাঁপাইয়! পড়ে, শাস্তরগ্রন্থে পূর্ণ 
সম্পুটটি লুট করিয়! নিয়! যায়। 

এ দস্থ্যরা প্রকৃতপক্ষে মল্পরাজ বীর হাম্বীরেরই অনুচরবর্গ। লুন্ঠিত 
সি্কৃকটি খুলিয়া তাহার! হতাশ হয়। ধন রত্ব কিছুই নাই,আছে শুধু গাদা 


গাদা শাস্তগ্রন্থ। 
এদিকে এই অমূল্য গ্রন্থাদির শোকে শ্রীনিবাসের আহার নিদ্র। প্রায় 


ত্যাগ হইয়াছে । তাড়াতাড়ি এই ছুঃসংবাদ বুন্দাবনে শ্ত্রীজীব গোস্বামীকে 
জানানে৷ হইল । গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাধুদের মধ্যে নামিয়া আসিল এক গভীর 
শোকের ছায়া। 

কিছুদিনের মধ্যেই শ্রীনিবাসের চেষ্টায় এই গ্রন্থগুলিকে উদ্ধার করা 
হয়। বিষুপুর-রাজ একদিন শ্রীনিবাসের ভাগবত ব্যাখ্যা শুনিতেছিলেন। 
শ্রীনিবাসের মধুর ভাষণ ও ব্যাখ্যায় সকলে মন্ত্রমুগ্ধ হইয়। যান, রাজাও 
হন ভক্তিবিহবল। এবার আচাধ্যকে ডারিয়া গ্রন্থ লু্ঠনের ইতিহাস 
তিনি খুলিয়া বলেন, অপহৃত শাস্তরগ্রন্থ ফিরাইয়! দেওয়া হয়। মল্লরাজ 
শ্রীনিবাসকে গুরুরূপেও বরণ করিয়া নেন এবং গোড়ার দিকে তাহারই 
সহায়তায় নৃতন করিয়৷ মহাপ্রভুর প্রেম-ভক্তির প্রচার এখানে শুরু হয়। 

বুন্দাবনে এই শুভ সংবাদ দেওয়া হইল। এবার জীব গোস্বামীর 
আনন্দের অবধি নাই। সবাইকে ডাকিয়া কহিতে লাগিলেন, “দ্যাখো, 


১৮৬ 


শ্রীজাব গোম্বামা 


দ্যাখো ! রাধা-দামোদরজী ও মহাপ্রভুর কৃপায় সেদিনকার এই গ্রন্থ-লুষ্ঠনের 
মধ্য দিয়েই আজ নেমে এসেছে র।জ-সহায়ত৷ । শ্রীভগবানের কাজ এবার 
ত্বরান্বিত হতে যাচ্ছে ।» 

ইতিমধ্যে নরোত্রম ঠাকুর উত্তরবঙ্গে গিয়া পৌঁছেন, ভক্তির বন্যা 
সেখানে বহাইয়া দেন। তীহার কীর্তনের তরঙ্গে সেদিন সারা বাংলাদেশ 
উদ্বেল হইয়। উঠে । আর শ্ঠামানন্দ গোন্বামী অবতীর্ণ হন উতভভিষ্যার কশ্ম- 
ক্ষেত্রে। লক্ষ লক্ষ লেক এই মহাবৈষ্বের আশ্রয় পাইয়া ধন্য হয়। 

পুর্ববাঞ্চলের এই তিনটি আচার্য ছিলেন শ্রীজীবের ভক্তিসামত্রাজ্যের 
প্রধান প্রতিনিধি। সমস্ত কিছু কণ্ম উদযাপনের আগে তাহারা গ্রহণ 
করিতেন শ্রীজীবের নির্দেশ, তাহার অনুমোদন ছাড়া কোন বৃহৎ কাজই 
এ সময়ে সম্পন্ন হইতে পারিত না। 

নৃতন গ্রন্থ, নূতন কীর্তন-পদ যখন যাহা কিছু রচিত হইত, তখনই 
তাহ। প্রেরিত হইত বৃন্দাবনে। শ্রীজীবের প্রীতি সম্পাদন ও সমর্থনের 
পর শুরু হইত তাহার প্রচার। আর এই ত্রয়ী প্রতিনিধির পশ্চাতে, 
তাহাদের প্রেরণার উৎসরূপে, সদ বিরাজিত থাকিতেন জীবগোস্বামী । 
সুদূর বঙ্গ ও উড়িষ্যার সহিত স্বীয় আত্মিক যোগন্ুত্রটিকে বজায় রাখিয়া 
জীব গোস্বামী এমনি করিয়া মহাপ্রভুর কন্মরধারাকে দীর্ঘদিন উজ্জীবিত 
রাখিয়াছিলেন । 


ভক্তিশাস্ত্রের সঙ্কলন ও প্রচার, নব-প্রচারিত গৌড়ীয় বৈঝব ধর্মের 
বিস্তার, সব কিছুই শ্রীজীব তাহার নিজ জীবনে দেখিয়া যান। তীাহারই 
প্রেরণায় রাজ মানসিংহের দ্বার! প্রস্তুত হয় গোবিন্দজীর বিরাট মন্দির । 
বুন্দাবনের দিকে দিকে রাধাকৃষ্ণের নয়নাভিরাম দেউলমাল! নিশ্মিত 
হইতে থাকে, গড়িয়া উঠে এক স্ুুসন্বদ্ধ বৈষ্ণব সমাজ । 


এঁী ব্রতের উদযাপন অনেকাংশে সাধিত হইয়াছে-- গৌড়ীয় বৈষ্ণব 
ধর্মের ভিত্তিমূলও হইয়া উঠিয়াছে দৃ়তর ৷ এইবার জীব গোল্বামীর চিহিত 


১৮৭ 


ভারতের সাধক 


জীবনের ভূমিকা সমাপ্তির মুখে আসিয়া দ্রাড়াইয়াছে। সুদীর্ঘ পচাশী 
বৎসরের কশ্মাময় মহাজীবন এবার চাহিতেছে চিরবিশ্রাম । 

১৫৯৬ খৃষ্টাব্দে তাহ।র নিত্যলীলায় প্রবেশের চিহ্িত দিনটি ধীরে 
ধীরে আসিয়া পড়ে। ইষ্টধ্যানে আবিষ্ট হইয়া বুন্দাবনের এই অদ্ভুতকন্মা। 
মহাপুরুষ তাহার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। 

প্রাণপ্রিয় রাধা-দামোদরের মন্দির প্রাঙ্গণে তাহার মরদেহ সেদিন 
শাস্ত গম্ভীর পরিবেশের মধ্যে সমাহিত কর হয়। 


১৮৮ 


দি্ধ কত্দাল 


সপ্তদশ শতকের উড়িষ্যায় সনাতন কানুনগে। ছিলেন এক গ্রাম্য 
জোতদার। জাতিতে তিনি করণ। ক্ষেত খামার ও টাকাকড়ি এক 
জীবনে যথেষ্টই করিয়াছেন। বদ্ধিঞণ গৃহস্থ বলিয়া দশখানা গায়ের লোক 
তাহাকে সম্মান দেখায়, ভক্তিমান বৈষ্ণব বলিয়। শ্রদ্ধাও যথেষ্ট করে। 

প্রৌটত্বের কোঠায় পা দিতে না দিতেই সনাতনের মরজীবনে হঠাৎ 
একদিন ছেদ পড়িয়া যায়। আম্মপরিজন ও বন্ধুবান্ধবের হাদয়ে নামিয়া 
আসে শোকের কালোছায়া । 

পত্বী জরী দাসী সেদিন এ নিদারুণ শোকের আঘাতে মুহাম।ন হইয়া 
পড়িলেন। চিরকালই তিনি পতিগতপ্রণা» পতির বিরহে কি করিয়া 
জীবন ধারণ করিবেন ভাবিয়া পান না। স্থির করিলেন, স্বামীর সাথে 
জ্বলস্ত চিতায় উঠিয়া এ দেহ বিসঙ্জন দিবেন। 

সনাতন কান্ুনগোর স্ত্রী "ঘতী' হইতে যাইতেছেন, আশেপাশের 
গ্রামগুলিতে এ সংবাদ দাবানলের মত ছড়াইয়া পড়িল। চিতার পাশে 
সমবেত হইল কৌতুহলী এক বিরাট জনতী|। 


সাধবী পত্রী মৃত সনাতনের চিতাশযায় উঠিয়া বসিয়াছেন। ধু, 
গুগগুল আর চন্দনের সৌরভে চারিদিক আমোদিত। মশালের আলোক, 
জনতার কোলাহল আর বাগ্ঠভাণ্ডের উচ্চ রবে শ্বশানঘাট মুখরিত হইয়া 
উঠিয়াছে। চিতায় অগ্নিসংযোগের আর দেরী নাই। 

চিতায় উপবিষ্টা৷ জননী হাতছানি দিয়া তিন পুত্রকে কাছে ডাকিলেন। 
এবার শেষ বিদায় তাহাকে নিতে হইবে। 


১৮৯ 


একের পর এক তিন পুজ্রেরই মাথায় তিনি নিজ হস্তে শিরোপা 
বাঁধিয়। দিলেন। প্রথম ছুইজনকে কহিলেন, “বাবা, সদা ধশ্মপথে থেকে, 
ঈশ্বরে নির্ভর রেখে তোমরা ঘর সংসার ক'র।” 

তৃতীয় পুক্র,বালক বটকৃষ্ণের বেলায় কিন্তু দেখা গেল স্বতন্ত্র ব্যবস্থা । 
কহিলেন, “বাবা, তোমার স্থান গৃহে নয়, বৃক্ষতলে। যত শীগগির পার 
তুমি ব্রজে চলে যাঁও। সেখানে গিয়ে শুরু কর কান্থাকরঙ্গধারী বৈষ্ণবের 
দৈম্যময় জীবন। মহাপ্রভু তোমায় কৃপা করবেন” 

অবোধ বালক বটকৃষ্ণ পিতার মৃত্যুর পর হইতেই শোকে শঙ্কায় 
হতভম্ব হইয়া আছে। এবার জননীর বিদায় কালের কথ৷ কয়টি তাহার 
হৃদয়ে চিরতরে গাঁথা হইয়া গেল। 

দাউ দাউ করিয়া চিতার আগুন এবার জ্বলিয়া! উঠে। সে আগুনের 
লেলিহান শিখায় বটকৃঞ্ের পিতা মাতার মরদেহ পুডিয়৷ ছাই হইতে 
থাকে। সমবেত কে উঠে সতীর জয়ধ্বনি, ঢাকের নিনাদে কাণ পাতা 
দায় হয়। অসহায় বালকের ক্রন্দন এ হুল্লোড়ে তলাইয়া যায়। 
_. অগ্রজদের স্মেহ ও আদরে বটকৃষ্ণ মানুষ হইতে থাকে। পরিজনেরা 

নিবিড় ন্সেহ দিয়া সতত তাহাকে ঘিরিয়। রাখিতেছে বটে, কিন্তু এই গুহ- 

পরিবেশ বালকের ভাল ল।গে না। হুদয়ে দিনের পর দিন জাগিয়া! ওঠে 
এক তীব্র আকুলত। | চিতায় উপবিষ্টা “সতী'-মীয়ের শেষ বাণীটি বারবার 
কাণে গুঞ্রণ করিয়া ফিরে-- ব্রজধামে তাহাকে যাইতে হইবে, নিতে 
হইবে নিক্ষিঞ্চন বৈষ্ণবের জীবন। 


জনক জননীর মৃত্যুর পর কয়েক বৎসর অতিবাহিত হইয়াছে। বটকৃষ্ণ 
এখন ষোল বৎসরের কিশোর । উড়িয়া! ছাত্রবৃত্তি শ্রেনীতে সে পড়াশুন। 
করে। কিন্তু কি জানি কেন, এই গৃহ, আত্মপরিজনের এই সান্নিধ্য আর 
তাহার ভাল লাগিতেছে না। 

পূরর্ষ জন্মের ত্যাগ-বৈরাগ্যের সান্বিক সংস্কার ধীরে ধীরে জাগিয়! উঠে, 
বিষয়বিরক্তি পৌছে চরমে। তারপর আপন মনের সন্কল্প নিয়া বটকৃষ্ণ 


১৪৩ 


একদিন গভীর রাত্রে গৃহত্যাগ করে । পদক্রজে ধাবিত হয় বহু আকাতিক্ষিত 
বুন্দাবনের পথে । 

মুক্তির জন্ত প্রাণ তাহার আজ অধীর । ব্রজমণ্ডলের অমৃতময় আকাশ 
বাতাস আর পরম পবিত্র ভূমি বারবার জানাইতেছে আহ্বান। শ্রীরাধা- 
কৃষ্ণের চরণম্পুষ্ট, বুবাঞ্থিত ব্রজের রজে এ দেহখানি লুটাইয়া না 
দওয়া অবধি তাহার আর স্বস্তি নাই। 

ন্দাবনে পৌছিবার সঙ্গে সঙ্গে মহং আশ্রয়ও অচিরে মিলিয়া যায়। 
বন্মাকুণ্ডবাসী বৈষ্বচরণদাস বাবাজী: চগণে সে শরণ নেয়, ভজন শিক্ষা 
সঙ্গে সঙ্গে শুরু হইয়া যায়। 

বাবাজী এ কিশোর সাধকের নামকরণ করিলেন, কৃধন্দাস। 


কয়েক বৎসর পরে বাবাজী মহারাজ তন্ুত্যাগ করিলেন। গুরুর 
এই তিরোধানের পর কৃষ্ণদাসের তীন্র ইচ্ছা জাগিল,জয়পুরে স্থানাস্তরিত 
গোবিন্দজীর শ্রীবিগ্রহ একবার দেখিয়া আসিবেন। 

আকুল প্রাণে ভক্তপ্রবর জয়পুর শহরে ছুটিয়া আসিলেন। এই পরম 
মনোহর বিগ্রহ যেন তাহার কাছে একেবারে জীবন্ত। দর্শন করিয়া 
আশ আর মিটে না, নয়নে ঝরিতে থাঁকে প্রেমাশ্রদর ধারা। দিনের 
পর দিন প্রভৃর অঙ্গনেই তিনি পড়িয়া থাকেন। 

কুক্দাঁদ কেবলি সেবালুদ্ধ হউয়! উঠিতেছেন, হৃদয় কিছুতেই শাস্ত 
হয় না । বার বার ভাবেন, 'আহা ! প্রদ্থুর কৃপায় দি তাহার শ্রীবিগ্রহের 
আষ্টকালীন সেবার ভার পান, তবে এ জীবন ধন্য হয় ।' 

এ বিগ্রহ জয়পুরের মহারাজার স্থাপিত, তাহার অনুমতি ছাড়া 
সেবার এ অধিকার কৃষ্খদাসকে কে দ্রিবে? তাছাড়া, তিনি যে এক 
নিষিঞ্চন বৈষ্ণব । রাজ। তীহার প্রার্থনায় কর্ণপাতিই বা করিবেন কেন ? 
কৃষ্ণদীস ছুশ্চিন্তায় ছটফট করিতে থাকেন। ূ 

প্রাধিত অনুমতি কিন্ত হঠাৎ একদিন মিলিয়া গেল। মহারাজা! 
সেদিন প্রতুজীর দর্শনের জন্য মন্দিরে আসিয়াছেন। দৈন্ের প্রাতিমুক্তি 


১৪৯১ 


কষ্খদাসের প্রতি তাহার চোঁখ পড়িল। শ্ীবিগ্রহের দিকে তরুণ বৈষ্ণব 
 একদৃষ্টে তাকাইয়া রহিয়াছেন, আর ভাবাবেশে দেহে উদ্গত হইতেছে 
সাত্বিক প্রেমবিকার । এই বিগ্রহ সেবার জন্য কষ্চদাসের আগ্রহ, তাহার 
দৈশ্য ও আন্তির কথা মহারাজ। সবই শুনিলেন। কি জানি'কেন, তাহার 
হৃদয় গলিয়া গেল। শ্রীবিগ্রহের সেবার ভার তিনি এই নবাগত তরুণ 
বৈষ্বের উপর সমর্পণ করিলেন। কৃষ্ণদাসের আনন্দের আর সীমা 
রহিল না । এখানে ক্রমান্বয়ে দশ বৎসর তিনি কাটাইয়। দেন। 


সেদিন রাজপ্রাসাদের এক বিশেষ পুজার দিন। মহা! সমারোহে, 
ষোঁড়শোপচারে গোবিন্দজীর ভোগ লাগানে। হইয়াছে। পুজা শেষে 
কৃষ্দাস উৎসাহভরে প্রসাদ গ্রহণ করিলেন। 

কিন্ত এ কি অদ্ভুত কাণ্ড! এই পবিত্র প্রসাদ ভক্ষণের পর হইতেই 
দেখা দিল এক মহা বিপদ। সেবানিষ্ঠ পরম ভক্তের সার! দেহে মনে 
জাগিয়৷ উঠিল তীব্র কামের বেগ। কোনমতেই যে এ চাঞ্চল্য দূর হইতে 
চাহে না । এ কোন্‌ সঙ্কটে তিনি পড়িলেন ? পরিত্রাণেরই বা উপায় কি? 

কৃষ্দাম তখন তরুণ যুবা, বয়স তাহার প্রায় ৩০ বংসর। নিজের 
দিক হইতে দেখিতে গেলে, কোন অনাচারই তো৷ তিনি করেন নাই, 
একনিষ্ঠ ভজন সাধন ও বিগ্রহ সেবা নিয়াই পড়িয়া আছেন। তবে কেন 
তাহার সাধন পথে এই বিশ্ব? 

কোন্‌ মহাত্মার কাছেই বা এ সমস্তার কথ! জানাইবেন, সাহায্য 
চাহিবেন ? এখানে এমন কোন উচ্চস্তরের সাধক নাই যিনি তাহার 
সমস্ত! সমাধানের সুত্র বলিয়া দিতে পারেন ! 

অনন্যোপায় হইয়া কৃষ্ণদাসকে জয়পুর ত্যাগ করিতে হইল, আসিয়া 
উপস্থিত হইলেন ব্রজমণ্ডলের কাম্যবনে। সিদ্ধ মহাত্মা জয়কৃষ্ণ দাসের 
খ্যাতি তাহার আগে হইতেই জান ছিল, এবার সোৌজ। তাহার ভজন 
কুটিরে পৌছিয়া সাষ্টাঙ্গে প্রণত হইলেন, নিলেন একান্ত শরণ। 

আ্ঠোপান্ত সমস্ত কথা সিদ্ধ বাবাজীর কাছে নিবেদন করা হইল। 


১৯২ 


তারপর কষ্ছদাস কীদিতে কীদিতে কহিলেন, “প্রভু, বৈষ্ণবচরণদাস 
বাবাজীর কাছ থেকে যে শিক্ষা, যে সাধন পেয়েছিলাম, একাগ্রচিত্তে তাই 
নিয়েই আমি পড়ে আছি। জ্ঞানত; কোন অন্যায় বা অনাচার করিনি | 
বে কেন গোবিন্দজী আমায় এমন শাস্তি দিচ্জেন ?” 

জয়কুষ্ুদাস উত্তরে কহিলেন, “গাচ্ছা বাবা, একটা গাছকে তাজা 
অবস্থায় কেটে, জলে কিছুদিন ভিজিয়ে রেখে তারপর যদি কেউ তাতে 
আগুন দেয়, তখনি কি তা জলে উঠবে? শুষ্ক ন। হওয়া অবধি তো 
তাতে আগুন ধরবে না? জীবজন্ম জন্ম ধরে সংসার সাগরে তলিয়ে 
আছে । বিষয়-মোহ ত্যাগ করিয়ে আগে তাকে শুকৃনে। ক'রে নিতে হবে, 
ভবে তো! ভক্তির আগুন তাতে জ্বলে উগবে। জানো তে। বাবা, 
বৈষ্জব ভজন যিনি জীবকে শিখিয়ে গেলেন, মেই মহাপ্রভৃও স্বয়ং কি 
রকম সাধন-কঠোরত। দেখিয়ে গিয়েছেন। তার ছিল, তিনবার শীতে 
স।ন, ভূমিতে শয়ন। আর ভার মহাঁভক্ত রথুনাথদাস? আজন্ম না দিল 
জিছবায় রসের স্পর্শন।” 

“কিন্ত প্রভূ, আমার ছুর্দশা যে হ'লো মহাপ্রপাদ থেকে আ্ীগোবিন্দ 
বিগ্রহের প্রসাদ গ্রহণ করার পরই যে এ ছুর্দৈবের শুরু । অথচ চিরদিন 
জেনে আসছি -মহাপ্রসাদ চিন্ময় বস্তু । তবে কেন এই ব্যতিক্রম £ 

“বাবা, এর উত্তর তো মহা প্রভুর নিজের কথাতেই রয়েছে---বিষয়ীর 
অন্ে হয় রাজস নিমন্ত্রণ মহাপ্রসাদ চিন্ময় হয় প্রভূর নিজের জিঙ্ছবায়, 
চ্জানহীন সাধকের জিছব।য় তার স্বরূপ ধরা দেবে কেন ?” 

“বুঝতে পারলুম না! প্রভু, কপ। ক'রে আবো একটু বিশদভাবে বলুন । 

“দ্যাখো, ঠাকুর চিন্ময় বিগ্রহ। তীর কাছে তে চিন্ময় ছাড়া কোন 
কিছু নেই। তাছাড়া, তিনি যে মহ! সমর্থ, বৈশ্বানবের মত সব কিছুই যে 
করতে পারেন আত্মসাৎ। বিচার বিশ্লেষণ করার প্রয়েজন হয় আমাদের 
মত অজ্ঞানদের ক্ষেত্রে । বাবা, নিবেদিত প্রসাদ গ্রথণ করতেই হবে, ত। 
ঠিক। কিন্তু সদাই নেবে তার কণিকা নাত্র, তুলশী মঞ্জরী দিয়ে স্পর্ণক'রে। 
জৈব দেহের খোরাক হিসেবে নিলে তাব ফল যে ভূগতেই হবে 1” 


১৩ ১৯ 


“তা হলে, প্রভূ, আমার ওপর এবার কি আদেশ হয় ?” 

“ভয় নেই বাবা । ভক্ত যে প্রভুর নিজ জন। এ দেহ-মনের চাঞ্চল্য 
তিনি দিয়েছেন, আবার তাতে নিস্তরঙ্গ প্রশান্তি এনে দেবেন তিনিই । 
তৃমি এখানকার এ দোমন-বনে বসে কঠোর ভজনে লেগে যাও ॥ অচিরে 
সব ঠিক হয়ে যাবে ।” 


এবার হইতে এই অরণোো বসিয়া চলিতে থাকে কঞ্*দাসের বিম্ময়কর 
তপশ্চধ্যা। দিন রাতের অধিকাংশ সময় রাধাকৃষ্চের ভজন ও লীলা- 
ধ্যানে কাটিয়া যায়। ছুই চারদিন পর পর নন্দগ্রামে গিয়! গৃহস্থ বাড়ী 
হইতে কিছু আটা চাহিয়া আনেন । কখনো তাহা জলে গুলিয়া গলাধঃকরণ 
করেন, কখনে! বা আগুনের উপর রাখিয়া আঙা করিয়া খান। এই 
খান্ঠের সঙ্গে তরকারী হিসাবে থাকে কয়েকটি নিমের পাতা । 

এমন কৃচ্ছুসাধন ও অর্ধাশনে দেহ কত দিন ঠিক থাকিবে ? কৃষ্ণদাস 
ক্রমে বড় ছুব্বল হইয়া পড়িলেন। কিছুদিনের মধো দৃষ্টিশক্তিও আর 
তেমন রহিল না । ফলে ভিক্ষায় বাহির হওয়! বন্ধ হইয়া গেল । 

ভজন কুটিরের নিকটেই রহিয়াছে একটি কুণ্ড। কোনমতে হাত্ড়াইয়া 
গিয়া কঠোরতপা সাধক এক ফাঁকে সেখানে জল পান করিয়! আসেন। 
কিছুদিন পরে দেহ এত ক্ষীণ ও ছুর্বল হইয়া পড়ে যে, এ কুণ্ডের ধারে 
গিয়৷ জল পান করার সামর্ধ্যও তিনি হারাইয়া ফেলেন । 

এই জীর্ণ শীর্ণ মৃতকল্প দেহ নিয়াও কিন্তু কৃষ্চদাস তাহার নিয়মিত 
ভজন চালাইয় যাইতেছেন। নয়নের জ্যোতি ঠাকুর কাড়িয়৷ নিয়াছেন 
বটে, কিন্ত এত ছুঃখ দহনের পরও অন্তরের আলোক-্দীপ তো জ্বালাইয়। 
দিতেছেন না! এতকাল বড় আশায় তিনি বুক বাঁধিয়া বসিয়া আছেন। 
তিনি যে ভক্ত, তিনি যে ঠাকুরের নিজ জন ! যত কাঙাল যত পতিত 
হোন না কেন, কৃপাময়ের কৃপ। যে তাহার উপর বধিত হইবেই । 

কষ্দাসের সেদিনকার এই কৃচ্ছুত্রত, আকুল ক্রন্দন ও ভজন সাধন 
ব্যর্থ হয় নাই। ব্রজমগ্ডলেশ্বরী রাধারাণীর হৃদয় অবশেষে বিগলিত হয়, 


১৯৪ 


কপামযীর কপার ধারা ঝরিয়া পড়ে এট মহাভক্তের শিরে। 

ভাবতন্ময় সাধক সেদিন ভক্ঞনে বসিরা আছেন। সহসা তাহার ক্ষুদ্র 
পর্ণ কুটিরে বহিয়া যায় অগীঁয় আনন্দের হিল্লোল । 

রুম্বুম্‌ শবে নুপুর বাজাইয়। সম্মুখে ভাসিয়। দাড়ায় এক অনুপমা, 

দিবা-দর্শনা নারীমুন্তি। কোমল কে তিনি প্রশ্ন করেন, “এ বাবাজি, 
,ল, ইয়ে পরসাদ পা লে। মেরা মাঈজী তের ছুখ দেখ কে হামারা 
হাথ সে ইয়ে ভেজ দিয়া 1” আর্থাৎ, বাবাজী, এ প্রসাদ তুমি গ্রহণ কর। 
তোমার ছুঃখ দেখে আমার মাঈজী এ সব পাঠিয়ে দিয়েছেন, এখনি 
তমি খেয়ে নাও । 

এক অপাথিব আনন্দের তরঙ্গে কৃষ্ুদাসের হুাদয় উদ্বেল হইয়। 
উঠিয়াছে। এ তন্তুরোধ তখনি তিনি পালন করিলেন । প্রসাদের পাত্রটি 
হাতে নিয়া তৃপ্তি সহকারে ভোজন করিলেন, তারপর ত্রজেন রজে ঘষিয়া 
নাজিয়! সন্ভর্পণে উহ। এক পাশে রাখিয়। দিলেন । . 

অলৌকিক নারীমুন্তি তাহার আরো কাছ ঘেঁষিয়া ভাসিয়া দড়ায়। 
জন্তরঙ্গ স্্ুরে প্রশ্ন করে, “আচ্ছা বাবাজী, দিনরাত তো। এখানে ভজন 
করে চলেছে, কিন্ত ভজন-যন্ত্র এই দেহটাকেও তো! জীইয়ে রাখছে 
হবে। তুমি গীয়ে ভিক্ষা মাগতে যাওনা কেন, বলতো ?” 

“মা, চোখে যে কিছুই দেখতে পাইনে । ভিক্ষায় বেরুবো কি ক'রে ? 

"বেশ তো । এবার থেকে চোখে দেখতে পেলে তবে ভিক্ষায় 
যাবে তো? ঠিক ক'রে বলে! ।” 

“নিশ্চয় যাবো !” 

“তবে শোন বাবা, মাঈজী এক অদ্ভূত নেত্রাঞ্জন দিয়েছেন তোমার 
জন্য । এখনি আমি তা লাগিয়ে দিচ্ছি। ঘণ্টা খানেক তুমি চোখ তুটো 
বুজে থাকো; তারপর ফিরে পাবে তোমার দৃষ্টিশক্তি ।” 

যে কথ সেই কাজ। দিব্যদর্শন নারী তখনি এক অগ্ুন বাবাজীর 
নয়নে লেপিয়। দিয়! অন্তহিত হইলেন । 

ঘণ্টাখানেক পরে আবার শোন! গেল তাহার নুপুরের গুঞ্জন । কাছে 


১8৫ 


আসিয়া কহিলেন, “বাবাজী, বাবাজী ! একবার চোখ মেলে তাকাও । 
কি দেখবে গ্যাখে। 1” 

এ কি অলৌকিক রহস্য ! নয়ন উন্মীলন করিয়াই কৃষ্ণদাস দেখিলেন, 
ূর্ব্বের দৃষ্টিশক্তি তিনি ফিরিয়া পাইয়াছেন, চারিদিকের সকল বস্তুই 
দেখিতেছেন পূর্ব । কিন্তু যে স্সেহময়ী দেবীর মধুর বচনে তিনি 
পুনরুজ্জীবিত হইয়াছেন, দৃষ্টি ফিরিয়া পাইয়াছেন, তিনি কই? কোথায় 
তিনি অদৃশ্য হইয়া গেলেন ? 

সারা কুটিরটি এ সময়ে এক দিব্য সৌরভে ভরিয়া উঠিল। কিন্ত 
কোথায় এই অপূর্ব সৌরভের উৎস? কোথায় সে দেবী? কৃষ্ণনাসের 
অন্তর আন্তি ও ক্রন্দনে ভরিয়া উঠে। ভাগ্যের একি নিষ্ঠুর পরিহাস! 
পরম বস্ত হাতের কাছে আসিয়াও কোথায় অপস্থত হইল ? 

অনশনে অনিদ্রায় আরে! তিনদিন কাটিয়া গেল, এই অলৌকিক 
নারীমুপ্তির রহস্য উদ্ঘাটন না করিয়া তিনি ছাড়িবেন না। 

তৃতীয় দিনের গভীর রাত্রি। বাবাজীর নয়ন সমক্ষে হঠাৎ উন্মোচিত 
হইল এক অত্যুজ্জল আলোকের বত্মঁ আর ইহার মধ্য দিয়া ধীরে ধীরে 
নামিয়া আসিলেন এক দেবী। তাহার সহাস্ আনন হইতে আনন্দ ও 
মাধুধ্যের রসধার! উৎসারিত হইতেছে । 

প্রসন্নমধুর কণ্ঠে তিনি কহিলেন, “বাবা কৃষ্ণদাস, আর কেন মনে 
ক্ষোভ রাখছে --তোমার কাছে যে আমি আপনা হতেই ছুটে এসেছি। 
এবার হতে যে আমি তোমার, তুমি আমার। আমার অভিন্নহাদয়া সঞ্ধী 
ললিতা তার করম্পর্শ দিয়ে তোমায় চক্ষুদান করেছে । সেই সঙ্গে আমার 
শক্তিও কি তুমি লাভ করোনি ? বাবা, তুমি নিশ্চিন্ত মনে এখন গোবদ্ধনে 
চলে যাও। সেখানে যে সব বৈষ্ণব আমার ভজন ক'রে যাচ্ছেন, প্রেম- 
সাধনার সহজ পথটি তাদের কাছে তুমি উন্মুক্ত ক'রে দাও। এবার হ'তে 
নিরম্তর আমার মাধুর্যরসে তুমি ডুবে থাকো 1” 

প্রিয়াজী, শ্রীরাধিকা এই কথা৷ কয়টি বলিয়াই অন্তর্ধান হইলেন। 
সিদ্ধ কৃষ্ণনাসের হৃদয়ে উত্তাল হইয়া উঠিল সর্ববপরিপ্লাবী প্রেম সমুদ্র 


১৯৩ 


সিদ্ধ কৃষ্ণদাস 


অর্ধবাহা অবস্থায় টলিতে টলিতে তিনি গোবদ্ধানের চাকলেশ্বরে আসিয়। 
উপস্থিত হইলেন । 

রাধাকুণ্ড ও গোবগ্ধনের চারিদিকে এসনয়ে বত ভজনপরায়ণ ও 
স্ুপণ্ডিত বৈষ্ুবেরা! বসবাস করেন। বৈন্ঃব শাস্ত্রে ইহাদের সকলেরই 
অসাধারণ বৃযুৎপন্তি। রাগ-মাীয় ভক্তিসাধনার বনুতর শাস্ত্র গ্রন্থ ইতিমধ্যে 
সংস্কৃত ভাষায় রচিত হইয়াছে, এখানে এ গ্রস্থাদি নিয়া বৈঝুব সাধকদের 
নধ্যে সর্বদা আলোচন। হয়, নান! বিচার বিতর্ক চলে । 

কষ্ণদাস বাবাজীর মনে এক এক দিন বড় তীব্র খেদ জাগিয়া উঠে! 
তাইতো ! সংস্কৃত ভাষ! না পড়িয়া কি ভুলই করিয়াছেন। তাই আজ 
বৈষ্ণব শাস্ত্রের প্রধান গ্রন্থগুলিই রহিয়াছে তাহার আয়ন্তের বাহিরে । 
এগুলি পাঠ করিতে পারিলে বৈষ্ণব শাস্ত্রের প্রকৃত মশ্ম তিনি কত সহজে 
গ্রহণ করিতে পারিতেন ! অবশেষে একদিন স্থির করিলেন, নিয়মিত 
ভাবে সংস্কৃত ব্যাকরণ ও সাহিত্য পাঠ করিবেন । প্রাচীন শাস্ত্রের গন 
শরণ্য তাহাকে ঘুরিয়া আসিতেই হইবে । এক বৃদ্ধ বৈষ্ঞবাচার্ধোর 
কাছে পাঠ নেওয়াও শুরু করিলেন। 

কিন্তু অচিরে দেখ! দিল এক জটিল সমস্ত ! ব্যাকরণ অধ্যয়ন করিতে 
গেলে নিত্যকার ভজনে বিদ্ব দেখা দেয়। আবার সাধন ভজনে জোর 
দিলে পাঠকার্ধ্য হইতে থাকে ব্যাহত । 

বাবাজী বড় দুশ্চিন্তায় পড়িয়া গেলেন। এক একদিন মনের উদ্বেগ 
তাহার চরমে উঠে। ভাবেন, যমুনার জলে প্রাণবিসজ্রন করিয়া সকল 
কালার অবসান ঘটাইবেন। 

সেদিন গভীর রাত্রে, ভজন শেষে বাবাজী কক্ষের বাহিরে আসিয়! 
দাড়াইয়াছেন। অমনি সম্মুখে আবিভূর্তা হইলেন ললিতাজী | 

শ্মিতহান্তে তিনি কহিলেন, “কৃষ্ণদাস, কেন শুধু শুধু তোমার অন্তরে 
এ খেদ, এ জ্বালা পোষণ করছো, বলতো । শাস্ত্রের তত্ব অনন্ত, আর এই 
তত্ব শুধু উদ্ভাসিত হয়ে উঠে সিদ্ধ সাধকেরই অধ্যাত্বসত্বায়। এজন্য 
তোমার আরার যমুনায় প্রাণ বিসর্জন দেবার কথ! মনে আসে কেন? 


১৯৭ 


1 


ভারতের সাধক 


আমার আশীর্বাদ রইলো, আজ থেকে তোমার ভেতরে শান্ত্রতত্ব আপনা 
থেকেই ক্ষুরিত হবে। আরও শোন, তোমা ছার! বু লোকের উপকার 
হবে। বিশেষ ক'রে, তোমার মধ্য দিয়ে বৈষব সাধকদের কাছে নিগুঢ 
ভজনমুদ্রা প্রকাশিত হবে | | 

দেবীর তন্তদ্ধানের সঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধ বাবাজীর অন্তরে জাগিয়। উঠিল 
এক পূর্ণ প্রশান্তি, অন্তস্তল হইতে উদগত হইল নৃতনতর দিবা আনন্দের 
শ্রোতধারা | 


গোবদ্ধনের মরণ্যে এক ঝুপড়ি বাঁধিয়া সাধক কৃষ্ণদাস সে সময়ে 
আপন মনে ভজনানন্দে মাতিয়া আছেন। হঠাৎ সেখানে এক দক্ষিণ 
দেশীয় দিগ্বিজয়ী পণ্ডিত আসিয়া উপস্থিত। বৃন্দাবনের বৈষ্ণব পণ্ডিতদের 
পরাজিত করার জন্য তিনি তাল ঠকিয়। বেড়াইতেছিলেন। এ সময়ে 
সকলে তাহাকে বলিয়। দিল, বৈষ্ণব শাস্ত্রের সত্যকার দিকৃ্পালেরা সবাই 
রহিয়াছেন রাধাকুণ্ডে ও গোবদ্ধনে। সেখানে না গেলে প্রকৃত শক্তিমান 
প্রতিপক্ষের সন্ধান তিনি পাইবেন ন1। 

খোঁজ খবর নিয়া এই দক্ষিণী পণ্ডিত সেদিন গোবদ্ধনে আসিয়া 
উপস্থিত। সিদ্ধ কৃষ্ণদাঁসকে জানাইলেন তর্ক-যুদ্ধের আহ্বান । 

কৃষ্ণদাসের বিরক্তির সীমা রহিল না। নির্জন বনে বমিয়। পরম 
আনন্দে ভজন করিতেছেন, এখানে আবার এ কি উপদ্রব ! 

নিজের ব্যস্ততার কথা বলিয়1 পণ্তিতকে বিদায় দিতে চেষ্টা করিলেন, 
কিন্ত কোন ফল হইল না। পণ্ডিত মোটেই ছাড়িবার পাত্র নন, নিজের 
প্রাধান্য সপ্রমাণ না করিয়া তিনি স্থান ত্যাগ করিবেন না। 

কষ্দাসকে কহিলেন, “বুন্দাবনের পণ্ডিতদের বু প্রশংসাবাদ শুনে 
তাদের সঙ্গে আমি শান্ত্রালাপ করতে এসেছিলাম। দেখলাম, শ্রুতির 
বিচার বিশ্লেষণ এখানে খুব করা হয়ে থাকে, কিস্তু তাদের ভেতর এমন 
কেউ নেই যে স্তদ্ধভাবে শ্র্ঘতি উচ্চারণ করতে পারেন ।” 

সিদ্ধবাবা সবিনয়ে উত্তর দিলেন, “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। 


১৪৮ 


সিদ্ধ কষ্দাস 


সত্যিই তো, আপনার মত বেদজ্ঞ পণ্ডিত এ অঞ্চলে আর কই? তবে 
আপনার কথা শুনে আমার বড় কৌতৃহল জেগেছে । যদি কৃপা ক'রে 
সামবেদের দুচারটি মন্ত্র পাঠ ক'রে শোনান, তবে বড় কৃতার্থ হই |” 

পণ্ডিত তখনি সোংসাহে বেদমন্ত্র উচ্চারণ শুরু করিলেন, স্ুললিত 
বটের ধ্বনিতে ভজনকুটির বলত হইয়া উঠিল। 

আবৃত্তি শেষ হওয়ামাত্র সিদ্ধবাবা গন্ভীরভাবে কয়েকটি জায়গায় 
তাহার মন্ত্রোচ্চারণের স্বরগত ভুল দেখাইয়া দিলেন । 

পণ্ডিত বড় থতমত খাইয়া গিয়াছেন। কহিলেন, “এর চাইতে 

শুদ্ধতর বরে সামবেদ কেউ উচ্চারণ করতে পারে ব'লে আমি জানিনে। 
যদি সামর্থ্য থাকে, আপনি নিজেই উচ্চারণ ক'রে দেখিয়ে দিন দেখি !” 

কৃষ্দাস ভভক্তিভরে হাতজোড করিয়। কিছুক্ষণের জন্য ধানস্থ 
হইলেন। তারপর সামবেদের এ শ্লোক আবুন্তি করিয়া চলিলেন। যেমন 
তপরূপ তাহার উচ্চারণের ভঙ্গী তেমনি স্বরের বিশুদ্ধতা । 

আগন্তক পণ্তিত বিস্ময়ে একেবারে হতবাক হইয়া গিয়াছেন। 
সবিনয়ে কৃষ্ণদাসের চরণে সাষ্টাঙ্গ প্রণাম নিবেদন করিয়া কিলেন,“আমি 
উপলব্ধি করেছি, আপনার বিগ্ভা জাগতিক নয়, এ একেবারে অলৌকিক । 
আপনাকে পরাস্ত কর! কোন লৌকিক বিদ্যাবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পক্ষে 
সম্ভব বলে আমি মনে করি নে।” 

অতঃপর পণ্ডিতের তর্ক ও শীস্ত্রবিচারের মোহ কাটিয়া যায়, ব্রজমগ্ডল 
ত্যাগ করিয়া তিনি স্বদেশ অভিমুখে যাত্রা করেন । 


সিদ্ধবাবার কাছে নবীন বৈষ্ণব সাধকের! মাঝে মাঝে অধ্যয়ন 
করিতে আসেন। তিনি কিন্তু সকল পাঠেরই লক্ষ্যবস্তরূপে স্থাপন করেন 
রাধাকৃষ্ণের যুগলতত্ব। ইহার মধ্যে সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় হয়া উঠে 
তাঁহার ব্যাকরণের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। প্রতোকটি ব্যাখ্যাকে তিনি টানিয়া 
আনেন নিত্যলীলার কোঠায়। শিক্ষার্থী সাধননিষ্ঠ বৈষ্$বদের কাছে লব 
নব ভজনমুদ্রা তিনি উদঘাঁটিত করেন। তাহার পাঠ ও শিক্ষার মধ্য দিয়া 


১৪০৯ 


ভারতের সাধক 

ভক্তদের অন্তরে স্ষুরিত হইতে থাঁকে মধুর ভজনের বন্ুতর নিগুঢ় তন্ধ ! 

শুধু নবীন বৈষ্ণবই নয়, সমবয়স্ক প্রবীণ বৈষ্ণব আচাধ্যের।ও 
সিদ্ধবাবার অভিনব শাস্ত্র ব্যাখ্য।য় মুগ্ধ হইতেন। 

রাধাকুণ্ড অঞ্চলে তখন জগদানন্দ দাঁস বাবাজীর প্রভাব প্রতিপত্তি 
যথেষ্ট । এই প্রাচীন বৈষ্ণব এক একদিন রহস্য করিয়া কহিতেন, “্ভাখে। 
কৃষ্ণদাস, আমরা শাস্ত্রের মন্ম উদ্ঘাটন করি প্রধানতঃ বুদ্ধির সাহাযো, 
আর ভুমি এসব তন্ব বাখ্য। কর মহাপ্রভুর বর প্রভাবে । তুমি নিত্যলীল৷ 
নিজে দর্শন কর, তাই তোমার ব্য।খা। ও ভাষণে তারই ছাপ বেশী 
ক'রে পড়ে । সে অলৌকিক রাজ্যে জামাঁদের প্রবেশের অধিকার নেই । 
তবে একথা আমি বলবোই, ভাই, তুমি হচ্ছে! বরপ্রাপ্ত পর'পেক্ষী, 
আর আমর] বা।খা। করি নিজেদেরই মেধা ও বিচারশক্তি থেকে । তাই 
আমাদের সাথে তোমার তুলনা তো চলবে না।” 

এইরূপ কৌতুক-কলহ তাহাদের প্রায়ই হইত। 


তখনকার দিনে রাগানুগা ভজ.নর ক্ষেত্রে কৃষ্দাস বাবাঁজীর জুড়ি 
ব্রজমণ্ডলে খুব কমই ছিল। নবীন ও প্রবীণ সকল জিজ্ঞাস বৈষ্ণব 
সাধকই তাহার কাছে আসিয়া! জুটিতেন, রাগমার্গীয় ভনতনের পদ্ধতি 
সোৎসাহে শিখিয়া নিতেন । 

বিভিন্ন বেঝ্চবীয় লীলাগ্রন্থ আলোচন। করিয়া সিদ্ধবাবা এ সময়ে 
একটি বিশিষ্ট ধরণের ভজনপদ্ধতি জঙ্কলন করেন। রাঁধাকৃষ্ণের অষ্টকাঁলীন 
লীল। অনুধ্যানের মধা দিয়া সাধকের যাহাতে আগাইয়া যাইতে পারে, 
সে ব্যবস্থা ইহাতে করা হয়। 

রাগানুগ! ভজন শিখিতে যাহারা এ সময়ে তাহার কাছে উপস্থিত 
হইত, তাহাদের জন্য এই সিদ্ধ মহ'পুরুষের যত্ন ও আন্তরিকতার অবধি 
ছিলনা। পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে সকলের অগ্রগতি ও ভূলভ্রান্তি তিনি লক্ষা 
করিতেন, সুস্পষ্ট নির্দেশ পাইয়া ভজনার্থীরাও উপকৃত হইত। 

যে সব সাধক এ সময়ে বাবাজী মহারাজের চরণতলে আশ্রয় লাভ 
২৪৩ 


[সন্ধ কষ্তদাস 


করেন, তাহাদের অনেকেই উত্তরকালে ব্রজমগ্ডলের সিদ্ধ সাধকরূপে 
পরিচিত হইয়া উঠেন। এই সাধকদের মধ্যে উল্লেখযোগা -গোবদ্ধীনের 
দ্বিতীয় কৃষ্ণদাস, মদনমোহন ঠৌরের নিত্যানন্দ দাস, ঝাড়়মগ্ডলের 
বলরাম দাস, স্র্যকুণ্ডের মধুস্দন দাস, কালনার ভগবানদাস বাবাজী, 
লালাবাবু ( কৃষ্ণদাস ) ইত্যাদি । 


ভজনরত কৃষ্ণদাস বাবাজীর সিদ্ধ দেহে প্রায়ই প্রকাশ পাইত নান। 
আলোৌকিক সেবা-চিহ্ন। এক একদিন এ সব দর্শন করিয়! সঙ্গী ভক্ত ও 
দর্শ্নীদের বিস্ময়ের সীমা থাকিতনা | 

প্রসিদ্ধ বৈষ্ণব গ্রন্থকার শ্রীহরিদীস দাস তাহার 'বৈষ্ণব-জীবনী' 
গ্রন্থে সিদ্ধবাব! কৃষ্দাসের একাধিক অলৌকিক সেবা-লীলার কাহিনী 
পরিবেশন করিয়াছেন £ 

সে দিন ভজনে উপবিষ্ট বাবাজী মহারাজ ধ্যানদৃষ্টিতে রাধাকৃষ্চের 
হোলি লীল। উপভোগ করিতেছেন । সঙ্গে সঙ্গে ভাবে ও ভঙ্গীতে নিজেও 
হইয়া! গিয়াছেন রাধারাণীর মনুগত। এক মঞ্জরী। হোলীর আনন্দরঙ্গ 
তাহার হৃদয়ে যেমন ঢেউ তুলিয়াছে, তেমনি সারা দেহে পরিব্যাঞ্ত 
হইয়াছে আবীর কুস্কুম ও চন্দন কপ্ুর। 

ভাবাবিষ্ট অবস্থায় সিদ্ধ বাবাজী তাহার ভজন কুটির হইতে বাহিরে 
আসিয়াছেন। ভক্ত বৈষ্ুব ও আচাধ্যের। তাহার চরণ বন্দনার জন্য 
ভক্তিভরে দগণ্ডায়মান। সকলে সবিস্ময়ে দেখিলেন, বাবাজী মহারাজের 
সার! দেহে ফাগ-উৎসবের রঙ. । আর তাহার ডোর-কৌপীন ও বহিবর্বাসও 
একেবারে সুগন্ধে ভরপুর হইয়া উঠিয়াছে। 

কৌতৃহলী হইয়া সকলে তাহাকে চ।পিয়! ধরিলেন, নানা প্রশ্ম বধিত 
হইতে লাগিল। তিনি শুধু সলভ্জভাবে উত্তর দিলেন, “বাবা, ভজনে 
বসে এইমাত্র হোলী লীলার কথা ভাবছিলুম। এসব আর কিছু নয়, 
রাধারাণীর কৃপাচিহ 1” . | 

প্রবীণেরা৷ কহিলেন, এসব চিহ্ন বাবাজী মহারাজের ভজন-সিদ্ধির 


২৩১ 


ভারতের সাধক 


প্রকাশ ছাড়া আর কিছু নয়__মহাপুরুষের ভাবদেহের বৃত্তি ও লক্ষণ 
বাহাদেহেও স্ফুরিত হইয়া উঠিয়াছে। 

আর একদিনের কথা । ভজনরত সিদ্ধবাবার সক্ষম সততায় অপ্রাকৃত 
ব্রজের পরম রমণীয় দৃশ্ঠট ফুটিয়! উঠ্িয়াছে। বেল! তখন প্রায় দিপ্রহর । 
তিনি ধ্যানানন্দে দেখিতেছেন, রাধারাণী ও শ্রীগোবিন্দ পরমানন্দে মানস- 
গঙ্গায় নামিয়া স্নান করিতেছেন । সখী ওমঞ্জরীর দল মনোহর পরিচ্ছদ ও 
আভরণ ইত্যাদি হাতে করিয়া! তীরে দ্ীড়াইয়া আছেন ! তদ্গত ভাবনার 
মধ্য দিয়া সিদ্ধবাবাঁও এসময়ে বনিয়া গিয়াছেন অন্যতম 'লীলা-সহচরী? | 
স্থগন্ধি আতরের শিশিটি হাতে করিয়া তিনি অপেক্ষা করিতেছেন-__- 
জলকেলির শেষে শ্রীরাধ। কৃষ্ণ ঘাটে উঠিলে এই আতর তাহাদের আক্ষে 
ছিটাইয়৷ দিবেন। কিন্তু এই আনন্দঘন যুগলমুত্তি দেখিতে দেখিতে সিদ্ধ 
কুষ্দাসের দেহে দেখা দিল সান্তিক প্রেমবিকার--স্তম্তন। দেহ তখন 
একেবারে অসাড় । হস্তস্থিত আতরের শিঁশটি হঠাৎ কখন এ সময়ে 
ভাঙ্গিয়া পড়িল। 

এত বেল! হইয়া গিয়াছে, অথচ বাবাজী ভজন কুটির হইতে বাহির 
হইতেছেন ন।। সেবক ভক্তের ব্যস্ত হইয়। স্নানের জন্য তাহাকে ডাকিতে 
আসিলেন। দুয়ার খুলিয়া! ঘরে প্রবেশ করামাত্র সকলেরই নাকে আসিল 
আতরের তীব্র গন্ধ । 

কারণ জিজ্ঞাসা করায় বাবাজী মহারাজ সখেদে উত্তর দিলেন, “কি 
করবো ভাই, বল ? আমি যে মহ অপরাধী, সেবার যোগ্যতা কিছুমাত্র 
নেই । শ্রীরাধাকৃ্ণ স্নানলীলায় রত ছিলেন, আমি অপেক্ষা করছিলুম 
আতরের শিশি হাতে নিয়ে । নিজ দোষে তা ভেঙ্গে ফেলেছি, সব আতর 
পড়ে গেলে চারদিকে ছড়িয়ে । সেই গন্ধই তোমর] পাচ্ছে ।” 


ধ্যানাবিষ্ট বাবাজীর অলৌকিক শক্তি এক একদিন গোবদ্ধনের 
ভক্ত ও সাধকমগ্ডলীতে মহ চাঞ্চল্যের স্ষ্টি করিয়া বসিত। 
সেদিন তিনি একাকী নিজের করোয়াটী হাতে নিয়া মানসগঙ্গায় 


হ৬২ 


সিদ্ধ কষ্চদাস 


স্নান করিতে গিয়াছেন, হঠাৎ কখন জাগিয়া উঠিল তীব্র ধ্যানাবেশ | 
মনশ্চক্ষের সম্মুখে উদ্ঘাটিত হইল রাধাকৃষ্ণের জলকেলির দৃশ্য । সঙ্গে 
সঙ্গে বাহাজ্বান হারাইয়! জলে পড়িয়া গেলেন। 

সেবক ভক্তেরা সেদিন কেহ সিদ্ধবাবার সঙ্গে আসেন নাই, 
কাজেই তাহার এ আকন্মিক জলসমাধি কাহারো চোখে পড়ে নাই। কিন্ত 
এত দেরী তাহার কখনো হয় না । সকলেই মহ চিন্তিত হইয়া ঘাটে 
আসিয়া উপস্থিত হইলেন । কিন্তু কই তিনি? ভক্ত ও শিষ্যমগ্ুলীতে 
তুমুল আলোড়ন পড়িয়া গেল। সিদ্ধবাবাজী কোথায় আত্মগোপন 
করিলেন, তাহ এক ছর্ভে্ঠ রহস্থা ! 

পাহাড়, প্রান্তর বনাঞ্চল কোথাও খোঁজাখুজির বাকী রহিল না। 
এভাবে সাতদিন ততিবাহিত হইয়া গেল । 

সেদিন মধ্যাহ্ন সময়ে ভক্ত ও অন্তরাগীর দল মানসগঙ্গার তীরে 
বসিয়া জল্পনা! কল্পনা ও খেদোক্তি করিতেছেন। সিদ্ধবাবার তাদর্শনে 
সকলেই বড অ্রিয়মান। 

হঠাৎ কিছু দূরে জলমধ্য হইতে তাহাকে উঠিতে দেখা গেল, যেন 
এইমাত্র স্নান সমাপন হইয়াছে । সকলের বিশ্ময় বিমূঢ় দৃষ্টির সম্মুখে 
ধীর পদক্ষেপে তিনি তীরে উঠিয়া আসিলেন। হাতে রহিয়াছে তাহার 
সেই পুরাতন করোয়াটি। 

ভক্তের ব্যস্ত সমস্ত হইয়। নিকটে ছুটিয়৷ গেলেন । কহিলেন, “বাবাজী 
মহারাজ, আপনাকে খুঁজে খুঁজে আমরা সব হয়রাণ হয়ে গিয়েছি । শুধু 
গোবদ্ধনেই নয়, আশেপাশের কোন স্থানই অন্তসন্ধান করতে ছাঁড়িনি। 
কি আশ্চর্য্য! এ সাতদিন কোথায় ছিলেন ?” 

নির্বিবকার চিত্তে সিদ্ধ বাবাজী উত্তর দিলেন, “সে কি বাবা? আমি 
যে একটু আগেই ভজনকুটির থেকে বেরিয়েছি। এইমাত্র চান্‌ সেরে 
আসছি। সাতদিন আমায় দেখোনি, এ তোমরা কি বলছে! ?” 

বাবাজী মহারাজের অন্তর্ধান কাহিনী নিয়! জল্পনা-কল্পনার সীমা 
রহিল না। কিন্ত এ রহস্য সেদিন কে ভেদ করিতে পারে নাই। 


ভারতের সাধক 


ভরতপুরের রাজা যশোবস্ত সিংহ বড় ভক্তিপরায়ণ, বৈষ্ণব সেবা! ও 
মন্দির বিগ্রহাদি স্থাপনের সংকাজে ত্রাহার উৎসাহের অস্ত নাই । একদিন 
সিদ্ধবাবার ভজনকুটিরে আসিয়া করজোড়ে নিবেদন করিলেন, বাবাজী 
মহারাজ, বুন্দাবনের বনু সাধু মোহান্ত কপা ক'রে আমার সেবা গ্রহণ 
করেছেন, দানব্রত উদযাপনের সুযোগ আমায় দিয়েছেন। আমার ব্ড় 
ইচ্ছে, আপনার সেবার জন্য কিছু অর্থ দান করি। কৃপা ক'রে আপনি 
আজ আমার সেব। তক্গীকার করুন 1৮ 

সিদ্ধবাব। মহা ব্যস্ত হইয়া কহিলেন, «না-- না বাবা, আমরা হচ্ছি 
কান্থাকরঙ্গধারী দীন বৈষ্ব। আমাদের জন্য আবার অর্থ ব্যয় কর! 
কেন? আমার কিছুরই প্রয়োজন নেই, বাবা! তুমি বরং দীন দরিদ্র 
ব্রজবাসীদের দান কর। তাদের সেবা ক'রলেই আমার সেবা কর হবে। 
শগাহ। ! এই ব্রজবাসীরাই যে হচ্ছে রাধা গোবিন্দের প্রকৃত আপন জন। 
যদি পার এদের জন্যই কিছু কর।” 

একথা শোনার পর ভরতপুরের রাজা বৃন্দাবনধামের বু দরিদ্র 
অধিবাসীকে সাহায্য করিয়াছিলেন । 

ইহার পর আবার একদিন তিনি গোবদ্ধনে আসিয়া উপস্থিত । 
সবিনয়ে সিদ্ধবাবাকে কহিলেন, “বাবাজী মহারাজ, আপনার ইচ্ছে 
গনুষায়ী এখানে আমার সাধ্যমত সাহায্য অনেককে দিয়েছি । কিন্ত প্রভু, 
এতে আমার তৃপ্তি হয়নি, মন ভরেনি। আমার প্রাণ কেবলই চাইছে, 
আপনি নিজের জন্য কিছু অঙ্গীকার করুন ।” 

“বেশ তাই হবে, মহারাজ। তোমার তো! শুনেছি অনেক রাণী 
আছে। এদের মধ্যে সব চাইতে যে তোমার প্রিয়, তাকে একলাটি 
আমার কাছে আজ পাঠিয়ে দিও ।” | 

এ প্রস্তাবের রহস্য কিছু বুছ। গেল না? কিন্তু রাজা তাহার প্রিয়তম 
মহিষীকে পাঠাইতে রাজী হইলেন। 

রাণী তরুণী, পরম রূপলাবণ্যবতী । পার্দানসীনভাবে চলাফেরা 
করাই তাহার অভ্যাস। সেইদিনই একটি দীর্থ বস্ত্রাবাস দিয়া ভজন 


২৩৪ 


কুটিরের চারিদিক ঘিরিয়া দেওয়া হইল। এখানেই হইবে উভয়ের 
সাক্ষাৎ । সিদ্ধবাবার ভজন কুটির অবধি নিয়া আস হইল। 

রাণী লছিমা একাকিনী সম্মুখে আসিয়া দড়াইয়াছেন। নূপুর 
কিক্কিনীর নিক্কনে চমকিয়া৷ উঠিয়! বাবাজী তাহার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ 
করিলেন। একি অপরূপ সৌন্দর্ধা এই তরুণীর ! এত রূপ কি মানুষের 
হয়? মুহূর্ত মধ্যে বাবাজীর অন্তরে জাগ্রত হইয়া উঠিল পরম মাধুধ্যময়ী, 
কষ্ণপ্রিয়া রাধ।রাণীর স্মৃতি । তীাহারই ধ্যানে তৎক্ষণ।ৎ তিনি নিমজ্জিত 
হইয়া গেলেন । 

বাবাজীর সারা দেহে ফুটিয়া উঠিয়াছে অশ্রু-স্বেদ-পুলক প্রভৃতি 
অষ্ট সাত্বিক বিকার। ভার এই অদ্ভুত প্রেমোন্সত্ততা দর্শনে রাণী লছমিনী 
হইয়া গিয়াছেন ভাবাবিষ্ট। বাহ্জ্ঞান তাহার নাই, মন্ত্রমুদ্ধের মত তিনি 
নীরব নিস্পন্দ হইয়া দীড়াইয়া আছেন। 

প্রায় এক প্রহর কাল এ অবস্থায় চলিয়া গেল। বাবাজী অর্থবা 
রাণী কাহারো। কোনই সাড়। শব্দ নাই। 

পরিচারিকার ইতিমধ্যে মহ। ব্যস্ত উঠিয়াছে । তাহারা বস্ত্রবেষ্টনী ফাক 
করিয়া দেখিল বাবাজী ও রাণী উভয়েই চিত্রাপিতের মত রহিয়াছে ন। 
দিব্য ভাবাবেশে তাহার! ভরপুর ! 

অতঃপর সিদ্ধবাবা এ একই আসনে বসিয়। ধ্যানস্থ হইয়া পড়েন। 
তিন দিন নিরবচ্ছিন্ন ধ্যানে নিবিষ্ট থাকার পর.তাহ।র বাহাজ্ঞান ফিরিয়। 
আসে। 

রাণীর সহিত তাহার এ সাক্ষাৎ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হইলে তিনি উত্তর 
দেন, “রাণীর কাকন আর নৃপুরের আওয়াজ শুনেই আমার মনে 
জেগে -ওঠে প্রিয়াজীর কথা। তারপর রাণীর অনুপম সৌন্দর্ধা আর 
মাধুরিমা জাগিয়ে তোলে উদ্দীপনা, ব্রজেশ্বরীর মধুর স্মৃতি-ধ্যানে ডুবে 
গিয়ে.আমি বাহ্জ্ঞান হারিয়ে ফেলি ।” 

সিদ্ধ মহাপুরুষের সেদিনকার ভাবময় দৃষ্টিপাত রাণী লছিমার জীবনে 
আনিয়া দেয় এক অপুর্ব রূপান্তর । তাহার জীবনধারা এক নুতনতর 


৪৩৫ 


খাতে প্রবাহিত হয়। প্রেম ভক্তি সাধনার পরম পথটি তিনি গ্রহণ 
করেন। 

ভরতপুর-রাণীর বৈষ্ণবীয় সেবানিষ্ঠা ও দান-ধ্যানের নানা কীন্তির 
কথা এখনো ব্রজমণ্ডলে শোন যায়। 

বৈষ্ণব সেবায় তাহার উৎসাহ ও নিষ্ঠা ছিল অতুলনীয়। একবার 
কয়েকজন বিশিষ্ট বৈষ্ণব মহাত্মর ভোজনের জন্য কিছু অর্থ দান করিতে 
তিনি উদগ্রীব হন। কিন্তু এই বৈষ্বের। একেবারে বাঁকিয়া বসিলেন, 
বিষয়ীর অন্ন ব1 আর্থ তাহারা কিছুতেই গ্রহণ করিবেন না। 

রাণী ক্ষোভে দুঃখে কাদিয়া ফেলিলেন। অস্ররুদ্ধ কে কহিলেন, 
“আপনাদের চরণে আমার এই প্রার্থনা, যদি আবার জন্মগ্রহণ করি 
'তবে রাজকুলে যেন জার না৷ পড়ি। দীনাতিদীন৷ হয়ে, বৈষ্ব সেবার 
তাধিকারিণী হয়েই যেন পরের বার আমি জন্মলাভ করি।” 

মহাত্মারা এই দৈন্যময় উক্তিতে প্রসন্ন হইয়। উঠিলেন। ভাবিয়া 
চিন্ত্িয়া তাহারা কহিলেন, “মা, তোমায় তা হলে এক কাজ করতে হবে। 
তুমি গাভীর গোবর থেকে ঘুটে প্রস্তুত কর। তা বেচে যে অর্থ পাবে, 
তাই দিয়ে ঠাকুরের ভোগান্নের যোগাড় ক'রে আনো । এই প্রসাদ 
ভোজনই হবে আমাদের গ্রীতিপদ 1” 

রাণী লছিমার আনন্দ আর ধরে না। যাক, তবু তো এই ভাবে : 
'্টাহার জীবনের এক বনুপ্রাধিত স্বযোগ ঘটিয়! গেল। মহাতআ্বাদের 
সেবা করিয়। ধন্য হইতে পারিবেন। সিদ্ধবাবার নিকট রাণীর এই 
ভক্তিনিষ্ঠার সংবাদ পৌছিলে তিনি পরম তুষ্ট হন, বারবার তাহাকে 
আন্তরিক আশীব্বাদ জানান। 


ব্রজমগ্ডলের অগাণত ভক্ত, দর্শনার্থী শিষ্যদের মধ্যে সিদ্ধবাব। তাহার 
কৃপা ছড়াইয়। যান। যে প্রেমভক্তির বীজ চারিদিকে তিনি রোপন 
করেন ধীরে ধীরে তাহ! অস্কুরিত ও পুষ্পিত হইতে থাকে । 

মহাপুরুষের সুদীর্ঘ ভজনময় জীবনলীলাটি ইহার পর আসিয়! পড়ে 


২০৬ 


শেষ অঙ্কে। যুগল ভজনের প্রেমমধুর পদ গাহিতে গাহিতে প্রবীণ ও 
নবীন সকল বৈষ্ণবদের পরম প্রিয় এই মহাসাধক প্রবিষ্ট হন রাধা- 
গোবিন্দের নিত্যলীলায়। ব্রজমগ্ডলের পাদপীঠ হইতে রাগানুগা ভজনের 
একটি নিষ্ষল প্রদীপ (সেদিন নির্ব।পিত হইয়া যায়। 


গণ 


রাসঠাকুবর 


কামাক্ষার শক্তিগীঠে সেদিন অস্ববাচীর উৎসব চলিতেছে । হাজার 
হাজার নরনারী বৎসরের এই জময়টিতে এখনে আসিয়! জড় হয়। সার! 
পাহাড় তীর্থ স্পন্দিত হইয়া উঠে এক নৃতনতর চেতনায়। 

নান। স্তরের মানুষ, নানা জাতি, নানা দেশের মানুষ, এখানে ভীড় 
জমাইয়াছে। পুণ্যলে।ভী ভক্ত, ধনজনপুক্রকামী গৃহস্থ যেমন এ উৎসৰে 
' আসিয়াছে, তেমনি দর্শন দিয়াছেন শত শত সাধক--ক্রিয়াবান তান্ত্রিক, 
উদাসী, যোগী ও বৈদান্তিক। প্রতি বংনরই ভারতের দিক দিগন্থ 
হইতে উহার! উপস্থিত হন মহাশক্তি কামাক্ষা-মাঈর চরণতলে। উৎসব 
শেষে আবার বাহির হইয়৷ পড়েন নিজ নিজ পরিব্রীজনের পথে । 

ভক্তের সবাই পবিত্র কুণ্ডে সান তর্গণ সমাপন করে, তারপর দলে 
দলে যোগ দেয় দেবীর মহাপুজায়। পূজারীদের মন্ত্রেচ্চ।রণ ও স্তবগানে 
মন্দির-গর্ড বার বার ধ্বনিত হইয়া উঠে। মেলাক্ষেত্রের কোলাহল আর 
মানুষের ভীড়ে পাঞ্ছাড়ের বুকে জাগিয়া উঠে অপূর্র্ব প্রাণচঞ্চলতা। 
জনবিরল সপিল বনপথে জনতার ধারা অবিরাম বহিরা! চলে । 

এই জনস্রোতে গা ভাসাইয়া বালক রামচন্দ্র সেদিন এখানে 
আসিয়াছে । পথে সাথী জুটিয়া গিয়াছিল কয়েকজন । এ কয়দিন সবাই 
এক সঙ্গেই চলাফেরা করিয়াছে, কিন্তু আজিকার এই ভীড়ে তাহারা 
কে কোথায় হারাইয়! গেল, সারাদিনের চেষ্টায়ও রাম তাহাদের খু'জিয়া 
বাহির করিতে পারে নাই । 

নিজের কাছে পয়সা কড়ি কিছুই নাই। এ জঙ্গীদের সাহায্যেই 
কোনমতে কিছু কিছু আহার এ কয়দিন জুটিতেছিল । কিন্তু এবার একেবারে 


ও ৮ 


অন্ুপায়। সারা দিন উপবাসে কাটিয়াছে, রাত্রেও যে কোন কিছু 
আহার জুটিবে সে ভরস! নাই। 

অন্বুবাচীর আজ নিবৃত্তি দিবস। 'রজস্বলা' দেবীগীঠের সম্মুখে মাথা 
ঠেকাইয়। পুণ্যার্থী নরনারী যে যাহার ঘরে ফিরিয়া যাইতেছে । মেলার 
চত্বরে এবার ধরিয়াছে ভাঙন। আশেপাশের জঙ্গলে, বৃক্ষতলে বন সাধু 
সন্গ্যাসী জাস্তান! গাড়িয়াছিলেন, তাহারাও এবার ডের! ডাগ্ড উঠাইতে 
ব্যস্ত। 

রাত্রি ক্রমে গভীর হইয়! আসিল। রাম ক্ষৎপিপাসায় বড় পীড়িত, 
ক্লান্ত দেহটিকে আর যেন টানিয়া বেড়ানো যায় না। তাছাড়া, ভাগ্যে 
আজ যখন আহার জুটিবেই না, কি আর করা? বরং বাকী রাতটা জপ 
করিয়াই কাটাইয়া দেওয়া যাকৃ। 

মন্দিরের চবুতারার কোণে কোণে কুমারী পুজার স্থান। রাশিরাশি 
ফুল, বেলপাতা ও নৈবেগ্ সেখ।নে একাকার হইয়া রহিয়ছে। কিছুটা 
জায়গা পরিষ্কার করিয়। নিয়া বালক এক কোণে বসিয়। পড়িল। শুরু 
হইল তাহার জপ ধ্যান। 

গভীর রাত্রি। অন্ধকার আর নৈঃশব্দে মিলিয়া চারিদিক একেবারে 
থম্‌ থম্‌ করিতেছে । হঠাৎ অদূরে শোনা গেল কাহার গুরশস্তীর কণ্ঠের 
আহ্বান-“রাম !” 

জপ তখনি থামিয়া যায়। 

এত রাত্রিতে, অপরিচিত কে কে এভাবে তাহার নাম ধরিয়। 
ডাকিতেছে ? নাঁ_এ তাহারই শুনিবার ভুল? 

উৎকর্ণ হইয়া সে বসিয়া আছে। আবার শোন! গেল সেই রহস্তময় 
কণ্ঠের আহ্বান । এবার আরে। কাছে, আরও স্পষ্ট । --বৎস রাম! 
শুন্ছে। ? উঠে এসো আমার কাছে।” 

ক্ষণপরেই প্রাচীরের অন্তরাল হইতে আবিষ্ভত হইলেন এক 
বিশালকায় সন্ন্যাসী । শুর্লুপক্ষের টাদ্রের আলো ছড়াইয়া পড়িয়াছে 
তাহার সারা অঙ্গে । দীর্থায়ত দেহে নামিয়৷ আসিয়াছে জটাজাল। সুঠাম 


১৪ ৩9৪ 


ভারিতৈর সাঘক 

দেহ, আজানুলম্বিত বাহু। চক্ষু দুইটি জ্বলিতেছে যেন অগ্নি গোলকের 
মত। ললাটে রক্তচন্দনের সুবৃহৎ ফোটা, আর গলায় জড়ানো রুদ্রাক্ষের 
মাল৷। ভীমকাস্তি, মহাশক্তিধর এক তান্ত্রিক পুরুষ তাহার সম্মুখে । 

একি! এ মৃন্তি তো রামের অপরিচিত নয়! কয়েক বৎসর 
আগে রাত্রিতে স্বপ্নযোগে ইহাকেই সে দেখিয়াছে। স্বপ্লেই মহাপুরুষ 
তাহাকে বীজমন্ত্র দিয়া গিয়াছেন, আর সে মন্ত্রও ছিল চৈতন্যময়। বারো 
বংসরের বালকের পুর্ব জন্মের অধ্যাত্মসংস্ক'র এক মুহুর্তে এ মন্ত্র সেদিন 
জাগ্রত করিয়। দিয়াছে । এই দৈবী মন্ত্র আর এ মন্ত্রদাতাকে যে বিস্থৃত 
হইবার উপায় নাই। রামের হৃদয়পটে এই মহ্াপুরুষের মৃন্তি চিরতরে 
সেদিন অঙ্কিত হইয়া গিয়াছে। ইহারই জন্য গৃহে আর তাহার মন টিকে 
নাই, কাজকন্ম্ন সন্ধানের অছিলায় সে গৃহত্যাগ করিয়াছে । স্বপ্নলন্ধ 
এই গুরুর খেজেই এতদিন ছিল ভাম্যমান। 

বিদ্যুৎবেগে ছুটিয়। গিয়। মহাপুরুষের চরণতলে সে পতিত হইল। 
আজ সে তাহারজীবনের পরমাশ্রয় খু'ঁজিয়। পাইয়াছে! 


_ আকাবাকা পার্বত্য পথ বাহিয়া উভয়ে ভুবনেশ্বরী মন্দিরের সম্মুখে 
আগিলেন। কাছেই জঙুলাকীর্ণ পাঁকদপ্তির পথ সপিল ভঙ্গীতে নীচের 
দিকে নামিয়া গিয়াছে । মহাপুরুষ যাইতেছেন আগে আগে, আর রাম 
চলিয়াছেন তাহার পিছু পিছু। 

বর্ষণক্ষান্ত আধাটঢ়ের আকাশতলে উঁকি দিতেছে মেঘ-ভাঙ৷ চাঁদ। 
সারা বনপথ জ্যোতস্মায় ভরা। দূরে পাহাড়ের সান্থুদেশ বাহিয়া আপন 
মনে ছুটিয়৷ চলিয়াছে প্লাবন-প্রমন্ত, উদ্দাম ব্রন্মপুজ্র। 

কিছুদূর গিয়াই সম্মুখে পড়ে আর এক পাহাড়ের চড়াই। একটু 
আঁগাইতেই দেখা গেল ঘন জঙ্গলে ঢাকা এক পর্বত গহ্বর। রামকে 
অন্ুদরণের ইঙ্গিত করিয়া মহাপুরুষ এই গুহারই অভ্যন্তরে প্রবেশ 
করিলেন। চারিদিক নিরন্ধ অন্ধকার ! চকমকি ঠকিয়৷ প্রদীপ জ্বালানো 
হইলে দেখ। গেল- সম্মুখে একটি প্রশস্ত ভূগর্ভ কক্ষ। 


১৩ 


রামঠাকুর 


সার! পথে মহাপুরুষ একটি বাক্যও উচ্চারণ করেন নাই, রামও 
কোন কথা বলিতে সাহসী হয় নাই, মোহাবিষ্টের মত এতক্ষণ সে শুধু 
ভাহার অনুসরণ করিয়! চলিয়াছে। 

স্নেহভরে মহাপুরুষ কহিলেন, “বৎস তুমি শ্রাস্ত, ক্ষুধাতৃষ্ণায় কাতর । 
বিশ্রামের পর কিছু আহার কর, সুস্থ হও ।” 

বড় বিস্ময়কর তাহার সান্নিধ্য ও স্পর্শের প্রভাব। রামের দেহে 
এখন শ্রান্তি ও অবসাদের চিহনমাত্র নাই । অপার শাস্তি ও তৃপ্তিতে মন 
তাহার ভরপুর হইয়া! উঠিয়াছে। 

কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর আদেশ হইল, “বৎস, এবার ওঠো । গুহার 
শেষ প্রান্তে গিয়ে চ্যাখো, মুৎপাত্রে ছুটি ফল তোলা রয়েছে । তোমার 
ভোজন সমাধা ক'রে নাও ।” 

ক্ষীণ দীপালোকে গুহার সবটা স্থান দৃষ্টিগোচর হয় না। ক্ষুধা 
খুবই লাগিয়াছে সন্দেহ নাই, কিন্তু এত রাত্রে রামের ভোজনে তেমন 
উৎসাহ নাই। নীরবেই সে বসিয়া রহিল । 

হঠাৎ দেখা গেল এক অলৌকিক কাণ্ড! মুহূর্তমধ্যে মহাঁপুরুষের 
দক্ষিণ হস্তটি হইয়া! উঠিল জ্যোতিশ্্য়__তারপর ধীরে ধীরে দীর্ঘতর হইয়া 
উহ] গুহার প্রাস্তদেশে গিয়া ঠেকিল। ফলসহ ম্ৃৎপাত্রটি অবলীলায় 
তুলিয়া আনিয়! রামের সম্মুখে তিনি স্থাপন করিলেন। 

বালকের ছুই চোখে ফুটিয়া উঠিল অপার বিস্ময়। সঙ্গে সঙ্গে হৃদয়ে 
ক্ষুরিত হইয়া! উঠিল, এক নূতন উপলব্ধি। এ অলৌকিক দৃশ্ঠটির ভিতর 
দিয়া মহাপুরুষ আজ জানাইয়! দিলেন-তাহার বরাভয় এমনিভাবেই 
স্থানকাল নিধিবশেষে নবীন সাধক রামকে রক্ষা করিবে, আর তাহার 
সর্ববগামী বাহুদ্ধয় এই পৃথিবীর দূরতম প্রান্তে গিয়াও আশ্রিতকে করিবে 
রক্ষা, দান করিবে স্েহচ্ছায়। | 

বিস্মিত বালক অপাঙ্গ দৃষ্টিতে মহাপুরুষের দিকে চাহিয়া ফল ছইটি 
গলাধঃকরণ করিল । 

আবার আদেশ হইল, “চেয়ে গ্ভাখো,অদূরেই তোমার জন্য তৃণ শহ্য। 

২১১ 


তৈরী রয়েছে। এবার শয়ন কর। তুমি যে আজ আসবে ত৷ জানতাম । 
তাই আহার ও শয্যার ব্যবস্থা করাই ছিল।” 

প্রত্যুষে বালকের ঘুম ভাঙাইয়। দিয়া মহাপুরুষ কহিলেন, “রাম, 
এবার তোমায় তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হয়ে নিতে হবে। সামনের বনপথ 
দিয়ে সোজা নেমে চলে যাও ব্রহ্মপুত্র নদে ডুব দিয়ে এসো । লগ্ন সমাগত, 
তোমায় আমি আজ দীক্ষা দান করবে।1” 

দীক্ষা! গ্রহণের সময় রামের কিন্তু বিস্ময়ের অবধি রহিল না। ষ্ষে 
বীজমন্ত্র স্বগৃহে থাকাকালে সে স্বপ্রযোগে পাইয়াছে, সেই মন্ত্রই এবার 
মহাপুরুষ আনুষ্ঠানিকভাবে তাহার কর্ণে প্রদান করিলেন। 

সেদিনের এই দীক্ষাই বালকের জীবনে আনিয়া দেয় অসামান্য দৈবী 
কৃপার ধারা, উন্মুক্ত হয় আলোকলোকের সিহদ্বার। সাধন! ও সিদ্ধির 
সরণি বাহিয় তিনি প্রাপ্ত হন ব্রাহ্মীস্থিতি, দিকে দিকে সংপূজিত হন 
শ্রীরামঠাকুর নামে । মহাঁশক্তিধর সাধক ও ব্রহ্মজ্রূপে ভারতের অধ্যাত্ম- 
সমাজে তিনি পরিচিত হইয়া উঠেন। 

তন্ত্র ও যোগের যুগ্মরশ্মি রামঠাকুর অবলীলায় ছুইহস্তে ধারণ করিতে 
সমর্থ হন। শক্তি ও জ্ঞানের যে অপরূপ লীলা নিজ জীবনের মাধ্যমে এই 
মহাসাধক প্রকটিত করিয়! যান তাহার তুলনা বিরল। 

ঠাকুরের অধ্যাত্মজীবনের মহাশিল্পী, তাহার এ সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান 
গুরুদেবের প্রকৃত পরিচয় আজো উদ্ঘাটিত হয় নাই । তিনি নিজে কখনো 
সাহাকে প্রকাশ করিতে চাহেন নাই, শিবকল্প গুরুর প্রকৃত পরিচয়টি 
গোপন রাখিয়া নানা সময়ে তাহার উল্লেখ করিয়াছেন অনঙ্গদেব নামে । 
অনঙ্গদেব, অর্থাৎ অঙ্গ নাই ধাহার-_বিদেহী সত্তারূপে সর্বভূতে যিনি 
বিরাজিত। গুরুর এই সার্বজনীন ও নৈব্যক্তিক পরিচয়টিকেই এই নাম- 
করণের মধ্য দিয়! ঠাকুর প্রকাশ করিতে চাহিয়াছিলেন। “ভগবানের 
স্বরূপ্রশক্তি' বলিয়াও কখনো! কখনো স্বীয় গুরুর কথ শ্রদ্ধাভরে তিনি 
উল্লেখ করিতেন। 

. ফরিদপুরের এক ক্ষুত্র গ্রাম ডিঙামাণিক। এই গ্রামেরই এক 


১ 


রামঠাকুর 

সাধারণ মধ্যবিত্ত ব্রাহ্মণ বংশে মহাসাঁধক রামঠাকুর আবিভূর্ত হন। পিত। 
রাধামাধব চক্রবর্তী ছিলেন একজন ক্রিয়াবান তন্ত্রসাধক। উদারতা, 
পরোপকার এবং ভক্তিপরায়ণতার জন্য মাতা কমলাদেকীর খ্যাতিও গ্রামে 
কম ছিল না। 

সিদ্ধ তন্ত্রাচাধ্য মৃত্যুঞ্জয় তর্কপধ্চাননের কাছে দীক্ষা নিয়া রাধামাধব 
কঠোর সাধনায় ব্রতী হন, এক বিশিষ্ট তন্ত্রসাধকরূপে তিনি পরিচিত 
হইয়া উঠেন। তাহার অলৌকিক শক্তিলীভের নানা কাহিনী সে সময়ে 
শুম। যাইত। 

শক্তিসাধক রাধামাধবের অন্তিম সময়ের ঘটনাটিও কম বিস্ময়কর নয়। 
হুঃসাধ্য রোগে তিনি একেবারে শষ্যাশায়ী, জীবনের কোনই আশ নাই। 
এসময়ে তাহার হৃদয়ে জাগ্রত হইল ছুনিবার ইচ্ছা,--শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ 
করার আগে গুরুদেবের চরণধূলি একবারটি তিনি মস্তকে ধারণ 
করিবেন । 

তস্্রাচার্ধ্য মৃত্যুঞ্জয় তখন বহু ঘূরে রহিয়াছেন। অপর একটি শিশ্বের 
গৃহে তাহার যাইবার কথা। গ্রীমারের টিকিটও কেন! হইয়াছে। সিঁড়ি 
দিয়া ডেকে উঠিতে যাইবেন, হঠাৎ অনুভব করিলেন, পিছন হইতে সজোরে 
কে যেন তাহাকে আকর্ষণ করিতেছে, বহু চেষ্টায় এই আকর্ষণ এড়ানো 
যাইতেছে না। 

হঠাৎ মৃত্যুঙ্জয় ঠাকুরের মামসপটে ভাসিয়া উঠিল তাহার প্রিয় শিশ্ 
রাধামাধবের রোগশধ্যার দৃশ্ঠ । তখনই তিনি ডিঙামাণিক অভিগুখে 
রওন। হইলেন । ৰ 

গুরুদেব শিয়রে আঁসিয়! দাড়াইয়াছেন। মৃত্যুপথযাত্রী শিষ্য মুহুর্তের 
জন্য নয়ন উদ্দীলন করিলেন । গ্রয়র চরণ শিরে ধারণ করার সঙ্গে সঙ্গে 
দেখ! গেল শেষ নিঃশ্বাস তিনি ত্যাগ করিয়াছেন । 

রাধামাধব চক্রবর্তীর বয়স তখন পঞ্চাশ বৎসর । 

রাজঠাকুরের মাতা কমলা দেবীর জীবনেও দেখ। গিয়াছিল আদর্শ 
চট্জিত্র ও অসামান্য ধর্দনিষ্ঠা । শুন! যায়, মৃত্যুর ছয় মাস পুর্বে নিজের 


২১৩ 


ভারতের সাধক 


আসন্ন মৃত্যু দিবসটির কথা এই মহিয়সী মহিলা সঠিকভাবে স্ডাহার 
আত্মজনদের নিকট বলিয়া দিয়াছিলেন। 


রাধামাধব ও কমল! দেবীর তৃতীয় পুক্রবরূপে ১৮৬ সালের ২রা 
ফেব্রুয়ারী রামঠাকুর ভূমিষ্ঠ হন। মনীষী, অধ্যাপক শ্্রীদীনেশচজ 
ভট্টাচার্য্য ঠাকুরের জন্ম সন্বন্ধে লিখিয়াছেন__ 

১২৬৬ বঙ্গাবদে বৈশাখা শুক্র তৃতীয়া অর্থাৎ অক্ষয় তৃতীয়া তিথিতে 
তিনি মাতৃগর্ভে প্রবেশ করিয়াছিলেন_ তাহার শ্রীমুখনিঃস্থত এই 
স্থৃতিকথ! জাতিম্মরতার অদ্ভুত প্রকাশরপে গ্রহণীয় । 

“তাহার ভূমিষ্ঠ হওয়ার বৃত্তাস্তও অলৌকিক। রাধামাধব চক্রবর্তী 
মহাশয় প্রতিদিন ব্রান্গমুহুর্তে শয্যা ত্যাগ করিয়া পঞ্চবটীতে যাইয়া 
উপাসনা করিতেন। এঁ সনের মাঘী দশমী তিথিতে কমল! দেবী 
প্রসব বেদন] অনুভব করিয়া স্বামীকে পঞ্চবটাতে যাইতে নিষেধ করেন। 
কিন্তু স্বামী ধীরভাবে তাহাকে অভয় ও আশ্বাস দিয়া পঞ্চবটাতে চলিয়। 
যান, কেবল পুকুরপারের আশ্রিত এক (নীচ জাতীয় ) রমণীকে ঘরে 
রাখিয়া গেলেন। অল্ল কাল মধ্যেই প্রসব হইয়া গেল-_কোন শিশু 
নহে, পরন্ত থলিয়ার মত একটা চশ্মময় বস্ত। রমণীটি তাহা বাহির 
করিয়া এক বকুল গাছের তলে ফেলিয়া দিয়া আসিল এবং বৃষ্টির পর 
শীত নিবারণের জন্য আগুন জ্বালিল। এ থলিয়াটিকে বেষ্টিত করিয়। 
শৃগালের দল মুহুমু্ছ এক স্থরে আনন্দধ্বনি করিতে লাগিল। 

“বহুক্ষণ পরে একটি শৃগাল তাহা মুখে করিয়া দলবলসহ পঞ্চবটাতে 
গিয়া উপস্থিত হইল । তখন বেশ বেল! হইয়াছে এবং চক্রবর্তী 
মহাশয় ধ্যানস্থ। শুগালের চীৎকারে তাহার ধ্যানভঙ্গ হইলে তিনি 
দেখিলেন, শুগালের দ্বারা উপস্থাপিত থলিয়াতে ছুইটি শিশু অক্ষত 
শরীরে ক্রমান্বয়ে ক্রন্দন করিয়া উঠিল । জ্যোতিঃশান্ত্র অনুসারে জাতকের 
ক্রদ্দনধ্বনিই প্রকৃত জন্মকাল ও লগ্ন সুচনা করে। ঠাকুর স্পষ্টাক্ষরে 
বলিয়াছেন, জন্মকালে কোন নরনারীর ছারা তাহার নাড়ীচ্ছেদ হয় 


১৪ 


নাই, হইয়াছিল মাতৃরূপিনী শিব! দ্বারা । তাহার সিদ্ধিস্থান পঞ্চবটাতেই 
তিনি ভূমিষ্ঠ হইয়াছিলেন।” 

বাল্য ও কৈশোরকালে তেমন কিছু অসাধারণত্ব রামঠাকুরের 
জীবনে ফুটিয়! উঠিতে দেখা যায় নাই। গ্রামের আর পাঁচটি ছেলের 
মতই হাসি-কান্না ও খেলাধুলার মধ্য দিয়া তিনি কাল কাটাইয়াছেন। 

ধন্নিষ্ঠ পরিবারে, ভগবদ্ভক্ত পিতামাতার সস্তানরূপে তাহার 
জন্ম। পারিবারিক পরিবেশ ও পিতা-মাতার ধম্মভাব বাল্যকাল 
হইতেই তাহার জীবনে সঞ্চারিত হয় নিতান্ত সহজ এবং স্বাভাবিক 
ভাবে। 

যমজ সন্তানদ্বয়, রাম ও লক্ষ্ণকে নিয়া মাতা কমলা দেবী প্রায়ই 
রামায়ণ গান শুনিতে যান। রামের অন্তস্তলে চিরতরে দাগ কাটিয়া বসে 
এই অপুর্ব পৌরাণিক আখ্যায়িকা, আর তাহার ভক্তিসমৃদ্ধ সঙ্গীত। 
বালকোচিত খেলাধূলার মধ্যে এক এক দিন দেখা যায় রামের অদ্ভুত 
খেয়ালিপনা। সঙ্গীদের একত্র করিয়া সে মৃত্তিকা দিয়া দেবদেবীর মস্তি 
তৈরী করে, তারপর পরমানন্দে শুরু হয় এই বালখিল্যদের পূজা ও 
নাম কীর্তন । 

রামের বয়স যখন মাত্র আট বৎসর রাধামাধব চক্রবর্তী সে সময়ে 
লোকান্তরে গমন করেন। পিতার এই শোকাবহ মৃত্যুর ঘটনাটি তাহার 
অন্তরে সেদিন এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়া যায়। 


তিন চার বংসর পরের কথা। বালক রাম সে রাত্রিতে গভীর 
নিত্রায় নিগ্র। হঠাৎ স্বপ্নযোগে দেখা দিলেন এক বিরাট-বপু সন্গ্যাসী। 
বালকের কাণের কাছে মুখ নিয়া বীজমন্ত্র উচ্চারণ করিয়া কহিলেন, 
“বৎস প্রতিদিন নিবিষ্ট মনে এই শক্তিমন্ত্র জপ ক'রে যাও, মুক্তির পথ 
তোমার অচিরে উন্মুক্ত হয়ে যাবে ।” 

অমোঘ এই স্বপ্রশ্রুত মন্ত্রের প্রভাব! বালক রামের আত্তজ্জীবিনে 
ইহ তুলিয়া দেয় প্রবল আলোড়ন। এ মন্ত্রের জপ যেমনি স্বয়ংক্রিয় 


২১৫ 


ঞখতেেওর পাধক 


তেমনি তাহা অন্তলীনি শক্তির উদ্বোধক। জন্মান্তরের সান্তিক সংস্কাররাশি 
এ মন্ত্র জাগাইয়া তুলিতেছে, আর সেই সঙ্গে আপনা হইতে উদ্গত 
হইতেছে আসন, প্রাণায়াম, মুদ্রা, বন্ধ প্রভৃতি। অবিরল ধারে কেবলি 
নামিয়া আসিতেছে ধ্যানআ্রোত। অথচ লৌকিক জীবনে এসব বসতর সঙ্গে 
বালকের এযাবৎ কোনদিনই পরিচয় ঘটে নাই। 

নিজে সদ প্রচ্ছন্ন থাকিতে চেষ্টা করিলেও বাড়ীর লোকের কাছে 
রামের এই নূতনতর স্বরূপটি কিছুট। ধরা পড়িয়া যায়। ক্রমে তাহার! 
কিছুটা তভ্যন্ত হইয়াও উঠেন । ভাবিয়া নেন, এ বালক দৈবী কৃপাপ্রান্ত__ 
দৈবী প্রসাদে কিছুটা শক্তি সে অজ্জন করিতে সমর্থ হইয়াছে। 

সে-বার দূর সম্পর্কের এক পিসিম। রামকে ধরিয়া বসিলেন, তাহাকে 
চন্দ্রনাথ দর্শন করাইয়া আনিতে হইবে। তীর্থ দর্শন এবং পুণ্যলাভের 
লোভ রামচন্দ্রের কম নয়, সোৎসাহে তখনি তিনি এ প্রস্তাবে রাজী হইয়া 
পড়িলেন। 

বড় হুর্গম পথ এই তীর্ঘের। জঙলাজীর্ণ, পিচ্ছিল পার্বত্য পথ বন্ছু 
কষ্টে অতিক্রম করিতে হয়। বালক ভ্রাতুষ্পুক্রকে সঙ্গে নিয়া বৃদ্ধ পিসীমা 
ইাপাইতে হাঁপাইতে উপরে উঠিতেছেন। খানিক বাদেই অদূরে দেখ 
গেল গিরিশীর্ষ, আর চন্দ্রনাথের পবিত্র মন্দির । যাক্‌, এবার তবে আসিয়া 
পড়! গিয়াছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়িয়া! বৃদ্ধ একটা বড় পাথরের উপর 
বসিয়া পড়িলেন। ক্লান্ত হইয়াছেন, কিছুটা বিশ্রাম করিবেন । 

কিন্ত পুজার উপচার গোছগাছ করিতে গিয়াই তো তাহার চক্ষু স্থির । 
কি সর্ধনাশ! মহাদেব সদাই থাকেন বেলপাতায় তুষ্ট-_-আর সেই 
বেলপাত। আনিতেই যে ভুল হইয়া গিয়াছে! এখন উপায়? কাছাকাছি 
কোথাও তো বিন্ববৃক্ষ নাই। পাহাড়ে উঠিতে এতক্ষণ ছুজনেরই প্রাণাস্ত 
হইয়াছে । নীচে গিয়। বেলপাতা৷ সংগ্রহ করা, আবার এই চড়াই-এর 
পথ অতিক্রম করা যে এক প্রাণাস্তকর ব্যাপার | 

হঠাৎ বৃদ্ধার স্মরণে আসিল রামের দেবী কৃপা! প্রাপ্তির কথা । সত্যিই 
তো, এ ঘোর জঙ্কটে সে কি তার ঠাকুরকে বলিয়া একটা ব্যবস্থা করিতে 


২১৬ 


রামঠাকুর 
পারে না? নহিলে যে তাহার পুজাই ব্যর্থ হইয়া যাইবে । 

অনুনয়ের স্বরে কহিলেন, “বাবা রাম, তুই আমায় আজ এ বিপদে 
উদ্ধার কর। যে করেই হোক, ছুট বেলপাতা৷ আমায় এনে দে। আমি 
জানি, তুই ইচ্ছে করলে এ কাজ এখানে বসেই করতে পারিস্।” 

বিরান্তির চিহ্ন ফুটিয়া উঠে রামের চোখে মুখে । উত্তর দেন,“পাগলের 
মত কি যত সব বকৃছে তূমি পিসী । দেখলে তো, পথে কোথাও একটা 
বেলগাছ নেই । অচেন! জায়গা-_জনমানব কাছাকাছি নেই, এখানে 
বেলপাতা আমি কোথায় পাবো & 

“আর আমায় জ্বালাস্‌ নে বাপ ! তুই ধরে বস্লেই ঠাকুর তোকে 
সন্ধান দেবেন। বেলপাতা না নিয়ে আমি মন্দিরে ঢুকতে পারবোন। 
এখান থেকেই নীচে লাফিয়ে পড়ে মরবো। আমার প্রাণ বাঁচা আজ। 
তুই ছাড়া আমার গতি নেই ।” 

বৃদ্ধার নয়ন হুইটি অশ্রুতে ছলছল । রামের মন ভিজিয়! গেল । কিছুক্ষণ 
চক্ষু যুদিয়।৷ থাকিবার পর অস্গুলি নির্দেশে দেখাইয়া দিলেন অদূরস্থিত 
একটি নাতিবৃহৎ শিলাখণ্ড । কহিলেন, পগ্যাখো! পিসী, এ পাথরের নীচেই 
আছে তোমার বেলপাতা ।” 

পাথরটি নাড়া দিতেই দেখ! গেল, বিশ্ববৃক্ষের একটি ক্ষুদ্র চারা 
সেখানে আত্মপ্রকাশের প্রতীক্ষায় রহিয়াছে । নবোদ্গত কচি পাতা- 
কয়টি চয়ন করিয়া বৃদ্ধার আনন্দের সীম! রহিল না । বালক ভ্রাতুম্পুজকে 
বার বার তিনি অন্তরের আশীর্বাদ জানাইতে লাগিলেন। 


রাম ষোল বৎসরে পদার্পণ করিয়াছেন। কি জানি কেন আজকাল 
এই গৃহজীবন আর মোটেই তাহার ভাল লাগিতেছে না। ধীরে ধীরে 
তিনি কেবলই হইয়া উঠিতেছেন অন্তম্মুখীন। | 
স্বপ্নের মাধ্যমে অহেতুক গুরুকুপা এ জীবনে তিনি লাভ করিয়াছেন। 
সুক্তির ছুনিবার আকাঙ্্ষা আজ তাহাকে পাইয়। বসিয়াছে। আবার সেই 
সঙ্গে তেমনি আকুতি জাগিয়াছে একটিবার তাহার সেই স্বপ্নে দৃষ্ট কপালু 


১৭ 


ভারতের সাধক 


গুরুর চাক্ষুষ দর্শন লাভের জন্য। স্বপ্নের ছায়াছবি কবে গ্রহণ করিৰে 
বাস্তব রূপ? কল্পমায়া' কবে কায়া ধরিয়া আবিভূর্তি হইবে জীবনের 
দ্বারে ? আজ কেবল সেই চিন্তাই তাহাকে পাইয়৷ বসিয়াছে! 

কান্তিকপুরের স্কুলে রামকে ইতিপূর্বে ভত্তি করা হইয়াছিল, কিন্তু 
পড়াশুনা আর বেশীদূর অগ্রসর হয় নাই। এশী কৃপা ও জন্মান্তরের 
সুককৃতির ফলে বালকের জীবনে জাগিয়া উঠিয়াছে এক পরমবোধ, তাই 
পাঠমন্দিরের আকর্ষণ তাহার কাছে বড় হইয়া! উঠিতে পারে নাই। 
অচিরেই শিক্ষাপব্র্বের সমাপ্তি ঘটিয়াছে। বাড়ীর লোকে স্বভাবতঃই রামের 
জন্য চিন্তিত হইয়া! উঠে। পড়াশুনা তো তাহার হইল না, এখন সে কি 
করিবে? জীবিকা অজ্জনেরই বা কোন্‌ পথ বাছিয়া নিবে? 

বাড়ীতে এ সময়ে তখন তীব্র অর্থাভাব চলিতেছে । জননীর মুখ 
প্রায়ই থাকে বিষ ও গম্ভীর । এবার বাড়ীর ছেলেদের সকলেরই কিছু 
কিছু রোজগার করা দরকার, নহিলে সংসার যে একেবারে অচল হইয়! 
পড়িবে । রাম্ও স্থির করিয়াছেন, আর ঘরে বসিয়া থাকিবেন না। তাই 
চাকুরীর সন্ধানে বাহির হইয়া পড়িলেন। 


ঘর ছাড়িয়! তো৷ পথে বাহির হওয়া! গেল, কিন্তু কাজকন্ম জোটানো 
যায় কই ? নানা স্থানে ঘোরাঘুরির পর কিশোর রাম সেদিন নোয়াখালির 
ফেনী সহরে আসিয়া উপস্থিত। 

স্থানীয় এ্রক উকিলের সঙ্গে পথে হঠাৎ আলাপ পরিচয় হয়। 

রাম নিবেদন করেন, “দেখুন, আমি এখানে চাকৃরির খৌজে এসেছি । 
কিন্ত শহরের কারুর সঙ্গে পরিচয় নেই । আপনি কি দয়া ক'রে কোথাও 
আমার একট। থাকবার জায়গা ক'রে দিতে পারেন ?” 

“আমি ব্রাহ্মণ।” 

“রান্না করতে পারবে? তা হলে আমার বাসায় থাকতে পারো, 
যতদিন না তোমার চাকরী জোগাড় হয়।” 


২১৮৮ 


7 


রামঠাকুর 

উপায়ান্তর নাই। রাম তৎক্ষণাৎ রাজী হইয়া গেলেন। শ্তরু হইল 
তাহার পাচকবৃত্তি। ব্যবহারিক জীবনের এ এক নৃতন অভিজ্ঞত|। 

রাত্রে রান্নাবান্নার কাজ সমাপ্ত হইয়া! গেলে রাম তাহার নিজস্ব জপতপ 
সাধনক্রিয়। শুরু করিতেন। তরুণ পাচকের এই সাত্বিক আচার ও সাধন 
জনের নিষ্ঠাকে বাড়ীর কর্তা এবং আরো অনেকে কিন্ত স্বাভাবিক গুদার্য্যের 
সহিত গ্রহণ করিতে পারেন নাই। অনেক সময় এ সব নিয়া বিদ্ধপ 
করিয়। রামকে তাহারা উত্যক্তও করিতেন। 

গৃহে সেদিন কালীপুজার আয়াজন চলিতেছে । উকিল বাবু তাহার 
ছেলের কল্যাণের জন্য কি এক মানৎ করিয়াছিলেন, তাই এই পুজার 
অনুষ্ঠান। কিন্তু হঠাৎ শেষ সময়ে খবর পাওয়া গেল, পুরোহিতকে পাওয়া 
যাইবে না, তিনি অসুস্থ । 

গৃহকর্তা উদ্বিগ্ন হইয়া উঠিয়াছেন। তাইতো! এখন এই অসময়ে 
পৃজারী ব্রাহ্মণ কোথায় পাওয়া যাইবে? 

বাড়ীর একজন বলিয়। উঠিল, “এজন্য আপনি এতো ব্যস্ত হচ্ছেন 
কেন? বামুনঠাকুর রামচন্দ্র তো দেখছি রোজই জপ-তপ করে। তাকে 
দিয়েই কোন মতে কাজ চালিয়ে নেওয়া যাকৃ।” 

রাম সম্মুখেই দণ্ডায়মান। উকিলবাবুও পরিহাসের স্বরে কহিলেন, 
“কিগো। ঠাকুর, এতো৷ যখন জপ-তপ চালাচ্ছো, আমাদের কালী পুজোটা 
কি আর সেরে দিতে পারবে না ?” 

শীস্ত নিবিববাঁদী পাচক সবিনয়ে উত্তর দিল, “আজ্ঞে, আপনি আদেশ 
করলে নিশ্চয়ই পারবো 1” 

রামকেই পুজার পুরোহিত নিযুক্ত করা হইল। 

কালীপুজায় উকিলবাবু উদ্ভোগ আয়োজনের কোন ক্রি করেন নাই। 
মহা সমারোহপুর্ণ অনুষ্ঠান । প্রীয় শতাধিক নিমন্ত্রিত ব্যক্তি সে রাত্রে 
সেখানে উপস্থিত হইয়াছেন । 

রাম নিষ্ঠাভরে তাহার পৃজা সম্পন্ন করিলেন বটে, কিন্তু কেহই যেন 
এই তরুণ পাচক ব্রাহ্মণকে তেমন গুরুত্ব দিতে চাহে না। 


২১৪৮" 


-ভারতের সাধক | 

সবে মাত্র তিনি পুজা সমাপন করিয়া বাহিরে আসিয়াছেন, কয়েকটি - 
তরলমতি লোক বারবার বিদ্রেপ করিতে থাকে, “ও ঠাকুর, বলনা একবার । 
পূজোর পর মা কালী তোমায় কি বল্লে ?” ূ 

উত্যক্ত রামঠাকুরের মুখ দিয়া হঠাৎ বাহির হইয়া পড়ে__“তা হলে 
বলতেই হবে? মা কালী বল্লেন, বাবুর যে ছেলের জন্য মানৎ-এর পূজো 
হলো সে ছেলেটাকে তিনি খেয়ে ফেলবেন ।৮ 

পাগলের প্রলাপ ছাড়। আর ইহাকে কি বলা যায়? কেহ পাচককে 
তিরস্কার করে, কেহ মারিতে যায়, কেহব৷ ঠাট্টা বিজ্ূপ করে। তাহাকে 
ঘিরিয়! শুরু হইল এক মহা হট্টগোল । অনেক কষ্টে রাম সেখান হইতে 
সরিয়। গিয়া পরিত্রাণ পাইলেন । 

পরের দিন, উকিলবাবুর ছেলেটি যথারীতি স্কুলে গিয়াছে । অপরাহ্ন 
কালে হঠাৎ দেখা! গেল, কয়েকজন তাহাকে ধরাধরি করিয়া গৃহের দিকে 
আনিতেছে। ছেলেটি মারাত্মক ধরণের কলেরা রোগে আক্রান্ত হইয়াছে। 
বহু চেষ্টাও এই বালকটিকে বাঁচানো গেল না, সেই রাত্রেই তাহার 
গ্রাণবিয়োগ ঘটিল। 

রাত্রির অন্ধকারে গ! ঢাক! দিয়া রামঠাকুরও হইলেন নিরুদ্দেশ । 

উত্তরকালে ভক্তের! তাহাকে প্রশ্ন করিয়াছিলেন, “ঠাকুর, আপনি 
অমন ক'রে ওখান থেকে পালালেন কেন? আপনার তো! কোন দায়িত্ব 
ছিল না এতে ?” 

শ্মিতহাস্তে ঠাকুর উত্তর দিয়াছিলেন, «না পালালে কি সেদিন আর 
আমার প্রাণ বাঁচতো ? লোকে তে। নিয়তির তত্ব বোঝে না! আমায় 
তার সেদিন মেরেই ফেলতো৷ !” 

ফেণী হইতে পলায়ন করার পর ঠাকুর বাহির হন পরিত্রাজনের 
পথে। শক্তি-সাধকদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থ কামাক্ষ্যার কথ তিনি লোক 
পরম্পরায় শুনিয়াছেন। এবার সেই দিকেই সারা অন্তর হইয়া! উঠে উন্মুখ । 
এখনকার মত ট্রেনের প্রচলন তখন হয় নাই। পদত্রজে বন্ধুর, বন- 
জঙ্গলময়, দীর্ঘ পথ অতিক্রম করিয়! কয়েকটি সঙ্গীসহ পৌছিলেন সেই 


৩ 


পৰিত্র শৈলতীর্ঘে। এখানেই মিলিল তাহার বনুপ্রাধিত গুরুসাক্ষাৎকার 
সুচনা হইল অধ্যাত্মপথের নূতন অভিযাত্রার । 


দীক্ষালাভের পর শুরু হয় রামঠাকুরের পরিব্রাজক জীবন। গুরুর 
সহিত কামাক্ষ্যাধাম তিনি ত্যাগ করেন। আরও ছুইটি গুরুত্রাতাও এসময়ে 
ভাহাদের অনুগামী হন। পদত্রজে হুর্গম অরণ্য ও পার্বত্য অঞ্চল 
অতিক্রম করিয়া সকলে আগাইয়। চলেন হিমালয়ের দিকে । 

ভারত-সাধনার অমৃতধারা নিরন্তর নিং্যন্দিত হয় এই হিমালয় 
হইতে। কত তপস্তাপৃত নিভৃত গিরিগুহ! ইহার স্তরে স্তরে বিরাজিত। 
লোক লোচনের অন্তরালে এই নগাধিরীজের কোলে প্রচ্ছন্ন রহিয়াছে কত 
সিদ্ধপীঠ, কত সিদ্ধাশ্রম। কত শিবকল্প মহাযোগী, কত সমাধিবান 
তাপস দীর্ঘ বৎসর ধরিয়া আত্মগোপন করিয়া আছেন এই স্বপ্রাচীন 
গিরি-অঞ্চলে 

রহস্যময় দেবভূমি হিমালয় ও তাহার শক্তিধর সাধকদের কিছুটা 
পরিচয় গুরু এই নবীন শিষ্যকে দিতে চাহেন ! সর্বজ্ঞ গুরু জানেন, 
রাম এক উচ্চতম সাধনা ও সিদ্ধির অধিকারী, এক চিহিচিত মহাসাধক 
তিনি। জনহিতার্থে এই শি্কাকে উত্তরজীবনে লোকালয়ে গিয়াই 
প্রধানত; বাস করিতে হইবে, ইহাও তাহার অজানা নাই। তাই এই 
পরিব্রাজনের মধ্য দিয়া লোকোত্তর সাধনক্ষেত্র হিমালয় ও এখানকার 
্রহ্মাবি্‌ পুরুষদের মাহাত্ম্য নবীন সাধক রাম উপলব্ধি করুন, ইহাই 
তিনি চাহেন। 

গুরুদেবের এই উদ্দেশ্ট সিদ্ধ হয়। শিষ্য রামচন্দ্র এসময়ে বহুতর 
অজ্ঞাতপূর্্ব সাধনগীঠ দর্শন করেন, বহু অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন সাধকদের 
সান্নিধ্যও তিনি লাভ করেন। এ সব কিছুরই স্মৃতি অন্তরে তিনি 
শ্রদ্ধাভরে বহন করিয়া আনেন । 

হিমালয় অঞ্চলের এই ভ্রমণ সেদিন তাহার কাছে আরও এক কারণে 


কল্যাপবহ হইয়াছিল। এই সব সাধনগীঠ এবং দেবপ্রতিম সাধকদের 
১ 


পরিপ্রেক্ষিতে স্বীয় গুরুদেবের মাহাত্ম্যটিও তিনি নৃতন করিয়৷ উপলব্ধি 
করিলেন, গুরুদেবের লোকোত্তর মহিমা ও করুণাঘন রূপটি চিরতরে 
ডাহার মানসপটে অঙ্কিত হইয়! গেল। 

কত নদ নদী, বন, পাহাড়, উপত্যকা তাহার! অভির করিলেন, 
তারপর উপস্থিত হইলেন হিমালয়ের পৃ্ববাঞ্চলের এক ছুরধিগম্য 
সিদ্ধগীঠে। স্থানটির নাম যোগেশ্বর আশ্রম। হিমবন্তের তুষার রাজ্য 
সেখানে শুরু হয় নাই। লতাবিটগীপুর্ণ একটি অনুচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে 
এই আশ্রমটি অবস্থিত। কোন মন্দিরাদি এখানে নাই । চারিটি প্রস্তর 
স্তস্তের মধ্যস্থলে উন্মুক্ত প্রান্তরে অবস্থিত রহিয়াছেন স্ষটিক নিশ্মিত 
তুষারশুন্র এক বিশাল শিবলিঙ্গ । এক অপাধিব অপরূপ জ্যোতি এই 
স্ক্টিকলিঙ্ষের চতুর্দিক হইতে অবিরাম বিচ্ছুরিত হইতেছে। এই 
অলৌকিক দৃশ্য দেখিয়া রামঠাকুর ও অপর গুরুভ্রাতাদের বিন্ময়ের সীমা 
রহিল না। 

এই যোগেশ্বর শিবলিঙ্গের আরাধিকা এক শক্তিশালিনী সাধিকা। 
এ জময়ে সকলে তাহাকে দর্শন করিলেন। জটাজুটমণ্ডিতা, অপরূপ 
রূপলাবণ্যবতী এই তাপসী নারী দিনের পর দিন ধ্যানস্থা হইয়া এই 
জ্যোতিশ্মিয় শিবলিঙ্গের সম্মুখে উপবিষ্টা রহিয়াছেন। রামঠাকুর ও তাহার 
সতীর্ঘগণ এই ধ্যানমগ্না সাধিকার নাম দিয়াছিলেন গৌরী । 

এই গীঠস্থলীর দিব্য পরিবেশে তাহার! পাঁচ দিন অবস্থান করেন। 
রোজই এ সময়ে তাহার! সবিম্ময়ে দেখিতেন, একদল পাহাড়ী মেয়ে 
নীচের উপত্যকা হইতে পুম্পাভরণে সাজিয়া এখানে আসে, নাচিয়া 
গাহিয়া স্থানটিকে আনন্দমুখর করিয়া তোলে। তারপর নৃত্যগীত 
শেষে সকলে পরমানন্দে যোগেশ্বর শিব ও তাহার এই রহস্তময়ী 
সাধিকার গলায় ফুলের মালা পরাইয়া দেয়। তারপর আবার নীচে 
তাহাদের উপত্যকায় ফিরিয়। যায়। 

এই দেবস্থানে অপরূপ শাস্তি ও আনন্দ বিরাজিত। উত্তরকালে 
রামঠাকুর নেক সময় এ স্থানটির প্রসঙ্গে বলিতেন, “যোগেশ্বরের 


২২ 


মত এমন শান্তি, এমন পবিত্রতা সার! হিমালয়েও ছিল দুরলভ।” 


ভ্রমণ করিতে করিতে তাহার! সে-বার এক স্থৃদীর্ঘ সুড়ঙ্গপথে প্রবেশ 
করেন। 

স্ৃচিভেগ্য অন্ধকারে এ পথ সমাচ্ছন্ন। সারা প্রকৃতির প্রাণ-স্পন্দন 
যেন এখানে 'আসিয়! থমকিয়া দাড়াইয়াছে। জীবজগতের কোন 
অস্তিত্বই অনুভূত হয় না। ধীরে ধীরে এই বন্ধুর অনালোকিত পথ 
অতিক্রম করার পর রামঠাকুর ও তাহার সঙ্গীর! দেখিলেন, অন্ধকারের 
আবরণ ক্রমেই যেন স্বচ্ছতর হইয়া আসিতেছে । তারপরই সম্মুখে 
উদ্ভাসিত হইয়া উঠিল গোধুলির রক্তরাগচ্ছটা। 

তবে কি স্ুড়ঙ্গপথের শেষে তাহারা অস্তগামী সুর্যের আলোকম্পর্শ 
পাঁইতে চলিয়াছেন ? 

অল্পক্ষণ পরেই কিন্তু তাহাদের ভুল ভাঙিল। দেখা গেল, অদূরে 
অপরূপ মহিমায় উপবিষ্ট রহিয়াছেন এক বিশালকায় মহাপুরুষ। তপঃসিদ্ধ 
দেহ হইতে যে দিব্য জ্যোতি নিরস্তর নিঃস্থত হইতেছে তাহারই আলোকে 
এই সুড়ঙ্গপথ আলোকিত । 

রাম ও তাহার সতীর্থদের উদ্দেশ করিয়া গুরু অস্ফুটস্বরে কহিলেন, 
«“তোমর। এই ব্রহ্মবিদ্‌ মহাত্মাকে ভক্তিভরে প্রণাম কর, তারপর ধীরে 
ধীরে অগ্রসর হয়ে চল ।” 

জ্যোতিশ্মীয় মহাপুরুষ সমাধিস্থ । নীরব নিসম্পন্দ হইয়া তিনি বসিয়। 
আছেন। রাম ও তাহার গুরুভ্রাতাগণ সাষ্টাঙ্গে তাহাকে প্রণাম করিয়া 
আবার রওন! হইলেন । 

কিছুকালের মধ্যে তাহার! সুড়ঙ্গের প্রান্তভাগে আসিয়া পৌছিলেন। 
মাথার উপর আবার দেখ। দিল নিঃসীম আকাশের মহাবিস্তার। 


অতঃপর সকলে উপস্থিত হন কৌশিকী পর্বতে । এই পর্র্বতেরই 
কোলে বিধৃত রহিয়াছে এক ব্হস্তময় আশ্রম। আপ্তকাম যোগী ঝষি ও 
১৬৬০ 


উচ্চকোটি সাধকদের স্পর্শপৃত এই স্থান। উদ্ধে আকাশের বুকে তরঙ্গিত 
হইয়া উঠিয়াছে তুষারমণ্ডিত শুভ্র পর্ববতশ্রেণী, আর নীচে তুষার এবং 
শৈত্য-মুক্ত এক শিলাময় পবিত্র আশ্রম । অদূরে নীচ দিয়! খরবেগে হিয়া! 
চলিয়াছে ক্ষীণকায়! সআ্রোতস্থিনী । 

এতদিন সকলে কৌপীনবন্ত হইয়। হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিব্রাজন 
করিতেছিলেন। এবার পবিত্র কৌশিকী আশ্রমের প্রবেশদ্বধারে শেষ 
পরিধেয়টুক ছাড়িয়া সকলকে একেবারে উলঙ্গ হইতে হইল। 

রাম ও তাহার সঙ্গীরা এখানকার স্থানমাহাত্য দেখিয়া একেবারে 
অবাক হইয়া গেলেন। সমগ্র আশ্রমটিতে মৃত্তিকার লেশমাত্র নাই, 
সমস্তই শিলাময়। কিন্তু কি আশ্চর্য্য কাণ্ড এখানকার শিলাখণ্ড ভেদ 
করিয়া নানা শ্রেণীর অজজ্র লতাগুল্স গজাইয়! উঠিয়াছে। প্রচুর পরিমাণে 
উৎপন্ন হইতেছে নানাবিধ সুস্বাহ ফল, কন্দজাতীয় খাগ্েরও অভাব 
এখানে নাই। 

আশ্রম-গুহার প্রশস্ত কক্ষ মধ্যে একদল যোগীপুরুষ সারি সারি 
বসিয়া আছেন, সকলেই নিমীলিতনয়ন-_-নীরব, নিস্পন্দ, সমাধিস্থ। হঠাৎ 
দৃষ্টিপাত করিলে মনে হয়, এ যেন প্রাচীন যুগের প্রস্তরীভূত এক সারি 
মানব দেহ। 

উত্তরকালে রামঠাকুরের মুখে এই মহাত্মাদের বর্ণন। শুনিয়া অধ্যাপক 
দীনেশচন্দ্র ভট্টাচার্য লিখিয়াছেন, “( ইহাদের ) হাতের ও অন্যান্ত 
অঙ্গের চম্ঘন পাথরের মত কর্কশ ও স্থানে স্থানে যেন ফাটিয়৷ গিয়াছে। 
কাহারও জটা খসিয়া কীধের উপর পড়িয়া আছে। তাহারা এত 
দীর্ঘকায় যে উপবিষ্ট অবস্থায়ও তাহাদের মস্তক ঠাকুর চঁড়াইয়াও 
নাগাল পান নাই ! পাশে পা৷ দিয়। উঠিয়। ফুলের মাল! দেওয়া হইয়াছিল। 
তাহাদের মুখমণ্ডল অতি বৃহৎ-_চক্ষুদ্বয় চন্বে আবৃত এবং প্রায় এক 
বিতস্তি পরিমাণ ভিতরে কোটরগত। বৃহৎ নেত্রগোলক “বল্‌ জবল্‌ 
করিতেছে । মুখমগুলের লৌহিত্য জীবন চিইন্ূপে বিদ্মান। 
তাহার। কত যুগ যুগান্তর ষে একাসনে উপবিষ্ট তাহার হয়ত! নাই। 


২২৪ 


ঠাকুর বলিয়াছেন, 'কায়া পরিবর্তন করিয়া তাহার! বাঁচিয়া নাই-_ 
'করিলে তাহাদের দেহ নবীনাকার ধারণ করিত। তাহাদের শরীরই 
তপোবলে একেবারে চৈতগ্যনয় হইয়া গিয়াছে--তাহাদের আর দেহপাত 
হইবে না? 1” 

গুরুদেব অনঙ্গন্বামী এই সময়ে কিছুদিনের জন্য কোথায় অন্ততিত 
হঈলেন। যাইবার পুর্বে নির্দেশ দিলেন, “তোমরা কিছুদিন এই 
নহাআ্মাদের সানিধ্যে থ।কো, মনপ্রাণ দিয়ে এদের সেবা যত কর। এদের 
কৃপা লাভ করলে সব্ধব অভীষ্ট তোমাদের পুর্ণ হবে।” 

রাম ও তাহার ছুই গুরুভাই এই যোগীদের সেবাকাধ্যে আত্মনিয়োগ 
করিলেন। রোজই সযত্বে তাহার! ইহাদের সম্মুখে ফলমূল রাখিয়া 
যাইতেন। ভক্তপ্রাণের এ নৈবেগ্ কিন্তু একদিনও উপেক্ষিত হয় নাঈ । 
মহাতআ্সারা কুপাভরে এগুলি হঈতে কিছু কিছু ভোজন করিতেন। 

একাদিক্রমে প্রায় পনের দিন রামঠাকুর ও তাহার সঙ্গীরা কৌশিকী 
আশ্রমের এই দেবপ্রতিম তাপসদের সান্নিধ্যে বাস করেন। অতঃপর 
গুরুদেব তাহার সাময়িক অজ্ঞাতবাস হইতে ফিরিয়া আসিলে আবার 
সকলে বাহির হন পরিব্রাজনে । 

কৌশিকী আশ্রম ত্যাগের সময় কিন্তু এক অপূর্ব দৃশ্য দেখা গেল। 
সমাধিস্থ মহাঁপুরুষেরা এই এক পক্ষকাল আগন্তক নবীন সাধকদের 
সঙ্গে কোন কথাবার্ত।ই বলেন নাই । নীরব, নিশ্চল হইয়া ধ্যান ও 
সমাধির গভীরেই তীহারা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত ডূবিয়া 
রহিয়াছেন। প্রতিদিন একটি বার মাত্র নয়ন উন্মীলন করিয়া নবাগত 
তরুণ সেবকদের প্রদত্ত নৈবেগ্ তাহারা গ্রহণ করিতেন, তারপরই আবার 
হইতেন সমাধিস্থ । 

এবার বিদায় নিবার পালা । আত্মসমাহিত ধ্যানগন্ভতীর যোগী- 
পুরুষদের মধ্যে ফুটিয়৷ উঠিল এক করুণাঘন রূপ । হস্ত উত্তোলন করিয়া 
অভয়মুদ্র দ্বার! প্রণামরত তরুণদের তীহারা আশীষ জানাইলেন। তরুণ 
সাধক রাম ও তাহার সঙ্গীদের হ'দয়তন্ত্রী এক দিব্য আনন্দের সুরে 


১৫ ২২৫. 


বন্কৃত হইয়! উঠিল । 

উত্তরকালে অনুসন্ধিৎস্থু ভক্তদের কেহ কেহ ঠাকুরকে কৌশিকী 
আশ্রমের এই মহাত্মাদের সম্পর্কে নান। প্রশ্ন করিতেন। কিন্তু এই 
লোকোত্তর সাধকদের প্রকৃত তথ্যাদি তাহার নিকট হইতে "বাহির করা 
যায় নাই। 

কৌশিকী আশ্রমের অবস্থান সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হইলে ঠাকুর 
বলেন, “মানস-সরোবর এই মহা! পবিত্র আশ্রম থেকে বছুদূরে_ উত্তর 
দিকে অবস্থিত।৮ 

যুক্তিবাদী ভক্তের দল সহজে দমিবার পাত্র নন, প্রতিপ্রশ্ণ করেন, 
কিন্ত ঠাকুর, আজকালকার বিজ্ঞানের যুগে হিমালয়ের কোন অংশই 
তো আর অজানা নেই। সাহেবের জরীপ কম করেনি, তন্নতল্প ক'রে 
হিমালয়কে তারা খুঁজে দেখেছে। কিন্তু কৌশিকী আশ্রমের মত কোন 
স্থানের সন্ধান তে। পায়নি ।” 

ঠাকুর শ্মিতহাস্তে উত্তর দেন, “আপনাদের এই সাহেবের! তো! শিব 
খোঁজে না। যে বন্ত্ব না খোজ। যায়, তা পাওয়া যায় কই? যোগসিদ্ধ 
দেহ না নিয়ে এসব আশ্রমে যাবার কোন উপায় নেই। আপনাদের 
মত কোন ভদ্রলোক" সেখানে যে যেতেই পারবেন না । মনের সব কিছু 
আসক্তি, দেহের সব কিছু পরিচ্ছদ, আবরণ ছেড়ে তবে সেখানে যেতে হয়। 
আমরা তো। সবাই উলঙ্গ হয়েই সেখানে গেলাম ।” 


হিমালয়ের এই সকল অপ্রাকৃত সাধনভূমিতে প্রবেশের অধিকার 
সহজলভ্য নয়। এই অধিকার রামঠাকুর লাভ করিয়াছিলেন তাহার 
মহাসমর্থ গুরুদেবেরই কৃপায়। পরিব্রীজনের ফাঁকে ফাঁকে “এই মহা- 
অধিকারী নবীন শিষ্ের জীবনের স্তরে স্তরে আত্মপ্রকাশ করিতেছিল 
সাধন ও সিদ্ধির নৃতন নূতন অভিজ্ঞতা । অধ্যাত্মপথের নান। নিগুঢ় 
নির্দেশ গুরু দিনের পর দিন দান করিতেছিলেন। ষোগ ও তন্ত্রের 
উচ্চতর সাধন ক্রিয়ার মধ্য দিয়! ঠাকুর অঞ্জন করিতেছিলেন বছুতর 


হও 


সাধনৈশ্বর্ধ্য । বল! বাহুল্য, সবই পাইতেছিলেন গুরুকৃপায়। 

শিবকল্প গুরুদেব শুধু যোগ ও তন্তরশক্তির শিখরদেশেই অধিষ্ঠিত নন, 
মহাকরুণারও তিনি এক উৎসম্বরূপ। স্মযোগ্য শিষ্য রামের জন্য তাহার 
অপার স্মেহ সতত বরিয়া পড়িতেছে। আপন সাধনার এশ্ব্যা-ভাণ্তার 
এই শক্তিধর শিষ্যের মহান আধারে ঢালিয়৷ দিতেও তিনি সদ! উৎসুক 
রহিয়াছেন। 

হর্গম পর্বত ও গহন অরণ্যে অবিরত সকলকে পরিভ্রমণ করিতে 
হইতেছে। এক এক দিন তাহাদের চোখের সম্মুখে ধ্বসিয়। পড়ে মারাত্মক 
হিমবাহ, কখনো বা তুষার ঝটিকা ও পার্বত্য ঝঞ্কায় প্রাণাস্ত হইবার 
উপক্রম হয়। রাম ও তাহার সঙ্গীরা এ সব কোন বিপদেই কিন্তু নিজেদের 
অসহায় মনে করেন নাই। গুরুদেবের অলৌকিক শস্তি ও তাহার 
কল্যাণহস্ত যে সব্বত্র প্রসারিত, তাহাদের রক্ষণে যে সদ নিযুক্ত, এ 
বিশ্বাস তাহাদের দুট হইয়। উঠিয়াছে। 

এই দীর্ঘ পরিব্রাজনের পথে গুরুদেবের বৈশিষ্ট্যটি রামের দৃষ্টি এড়ায় 
নাই। কঠোরতপা৷ তাপস, আগ্তকাম মহাযোগী, তন্ত্রসিদ্ধ পরমহংস, 
অনেকের সাক্ষাংই এ পথে মিলিয়াছে। কিন্তু লক্ষ্য কয়াছেন, গুরু 
অনঙ্গদেবের প্রতি উহাদের কলেরই আচরণ পরম সশ্রদ্ধ। এই 
দীর্ঘ পরিক্রমার পথে তাহার গুরুদেবকে তিনি কখনো কাহারে চরণে 
প্রণাম নিবেদন করিতে দেখেন নাই । জর্ধবজ্ঞ, সর্বশক্তিমান এই 
মহাতাপস যখন যে গীঠ বা সিদ্ধাশ্রমেই গিয়াছেন, অবলীলায় তিনি 
আকর্ষণ করিয়াছেন সেখানকার সাধকদের শ্বতোৎসারিত শ্রদ্ধা ও 
আন্তরিক অভিনন্দন । 

ইতিমধ্যে রাম ইহাও উপলব্ধি, করিয়াছেন, গুরু তাহার সর্বশক্তিমান, 
এমন কিছু যোগৈঙ্বর্য্য নাই-_ইচ্ছা! করিলে যাহা তিনি এই শিষ্বের 
সাধন-আধারে ঢালিয়া৷ দিতে না পারেন। বল! বাহুল্য, তাহার এই 
ইচ্ছ! ও কৃপার ধারা সধগলিত হইতে পারে শুধু শিশ্কেরই একাস্ত 
আত্মসমর্পণের ফলে। - হিমালয়ের পরিব্রাজন ও গুরুর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের 


০, 


মধ্য দিয়া এই আত্মসমর্পণের তন্বটির দিকেই নবীন সাধকের মন দিনের 
পর দিন কেন্দ্রীভূত হইয়া উঠিয়াছে। 


এ সময়কার একটি অত্যাশ্চর্যয, অলৌকিক অভিজ্ঞতার কথা 
উত্তরকালে ঠাকুর তাহার শিষ্যদের কাছে বলিয়াছিলেন। পার্বত্য 
অঞ্চলের এক গহন অরণ্যে সে-বার তাহারা উপস্থিত হইয়াছেন । 
"চারিদিক নীরব নিস্তব্ধ, জনমানবের চিহ্ন কোথাও নাই। সম্মুখেই 
রহিয়াছে এক প্রাচীন সাধন-গুহ1। এই গুহার সম্মুখে ধুনী জ্বালাইয়া 
এক অতিবৃদ্ধ, বিশালকায় নহাপুরুষ সমাঁসীন। 

গুরুদেব রামকে আড়ালে ডাকিয়া কহিলেন, “এই মহাতআ্া হচ্ছেন 
এক দেবকল্প মহাসাধক। এ'র দেহটি অতি প্রাচীন। বহু শত বৎসর ধরে 
এখানে বসে তিনি সাধনা করছেন। এবার তার সঙ্কল্প হয়েছে, কায়। 
পরিবর্তন করার জন্য । বহু পুণ্যবলে আজ তোমরা স্বচক্ষে এ অলৌকিক 
অনুষ্ঠান দেখবার সুযোগ পেয়েছ। মহাত্বার ধুনী থেকে কিছুটা দূরে 
ঈাড়িয়ে, নীরবে তোমরা! এই অপরূপ দৃশ্য দেখে নাও ।” 

যোগাসনে উপবিষ্ট, নিমীলিতনেত্র মহাপুরুষের মুখে শুনা যাইতেছে 
অক্ষুট মন্ত্রের গুঞ্জরণ। ধুনীর অগ্নিতে মাঝে মাঝে প্রদত্ত হইতেছে 
আন্তি, আর থাকিয়া থাকিয়। অগ্নিশিখা৷ ধবক্‌ ধ্বকৃ করিয়া জ্বলিয়। 
উঠিতেছে। | 
কিছুক্ষণ মধ্যেই কোথ! হইতে হঠাৎ সেখানে আবিরভূতি হইল এক 
অতিকায় নাগরাজ। যন্ত্রচালিতবৎ মহা! সর্পটি ধুনীর অগ্নি কয়েকবার 
প্রদক্ষিণ করিল। তারপর মহাপুরুষের সম্মুখে আগাইয়া আসিয়। হইল 
নিশ্চল, নতশির । 

রাম ও তাহার সঙ্গীর! সবিস্ময়ে দেখলেন, মহাপুরুষ এ সর্পটিকে 
ধরিয়া! কুগুলী পাকাইতেছেন। ক্ষণপরেই এটিকে তিনি এ প্রজ্জলিত 
ধুনীর আগুনে নিক্ষেপ করিলেন। , 

নাগরাজের দাহকাধ্য চলিতেছে, এমন সময় কয়েকবার কমগুলুর 


২২৮ 


রামঠাকুর 


' মন্্রঃপৃত বারি ছিটাউয়া দিয়। মহাপুরুষ অগ্নি নির্বাপিত করিলেন। 

সর্পদেহটি তখনো পড়িয়া! একেবারে নিঃশেষ হয় নাই। চিম্টা দিয়া 
টানিয়া আনার পর পাওয়া গেল একতাল মর্ধদগ্গ গলিত মাংসম্তপ। 
মহাপুরুষ এটি হইতে কয়েকটি পিণু প্রস্তুত করিলেন । 

এবার শুরু হইল তাহার অভিনব হোমক্রিয়া | 

'ুনীর আগুন তেমনিভাবে প্রজ্বলিত রহিয়াছে। আর মন্ত্রোচ্চারণের 
সঙ্গে সঙ্গে মহাপুরুষ একটি করিয়। সর্পদেহের পিগ্ উহাতে আহ্ছতি 
দিতেছেন। সবশেষ পিগুটি কিন্ত অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হইল না। আসনে 
বসিয় নিধিবকার চিত্তে তিনি উহা! গলাধুকরণ করিলেন । 

নবীন সাধক রাম ও তাহার সতীর্ঘগণ বিম্ময় বিষ্ষারিত নয়নে এই 
অদ্ভুত দৃশ্যের দিকে চাহিয়া আছেন। কিন্তু উহ্ার পর যে অলৌকিক 
দৃশ্ঠটি তাহাদের সম্মুখে উদ্ঘাটিত হইল সমগ্র জীবনে তাহার! সেটি আর 
ভুলিতে পারেন নাই ! 

সর্পের এ দেহপিগুটি ভক্ষণের পরই বৃদ্ধ তাপস নিজ আসনের 
উপর দেহখানি এলাইয়া দিলেন । স্পন্দনহীন, নীরব নিশ্চল দেহটি দেখিয়া 
মনে হয় না যে, উহাতে প্রাণের চিহ্নমাত্র রহিয়াছে । খানিক পরে দেখা 
গেল, মহাপুরুষের দেহটি ক্রমে ক্রমে স্ফীত হইয়া! উঠিতেছে। এই স্ষীতি 
আরো বৃদ্ধি পাইলে উহা! হঠাৎ সশব্দে বিদীর্ণ হইয়া গেল, অভ্যন্তর 
হইতে বাহির হইয়া আসিল এক অনিন্ব্যসুন্দর, তরুণ তাপসমূর্তি। এ যেন 
এক দিব্য ইন্দ্রজাল ! 

বিগতপ্রাণ, প্রাচীন মহাপুরুষের দেহটি তখন এক পাশে নিঃসাড় 
অবস্থায় পড়িয়া রহিয়াছে । নবস্থষ্ট তরুণ সাধক এটিকে তুলিয়া নিয়া 
অবলীলায় ধুনীর অগ্নিতে নিক্ষেপ করিলেন । 

তারপর দেখ! গেল, বৃদ্ধ প্রাচীন তাপসের পরিত্যক্ত আসন, চিমটা ও 
কমগুলু নিয়! ধীরে ধীরে তিনি অরণ্যের গভীরে কোথায় যেন অস্তহ্থিত 
হইয়া! গেলেন। ্‌ 

: বলাম ও তাহার সতীর্থেরা এই অকল্পনীয় দৃশ্যের দিকে নিগিমেষে 


খনি 


ভারতের সাধক 


চাহিয়। আছেন। বিস্ময়ে কাহারো বাকৃক্ষুপ্তি হইতেছে না। হঠাৎ 
গুরুদেবের আহ্বানে তাহারা চমকিয়া উঠিলেন, বাস্তব জীবনের বোধ 
আবার ফিরিয়া আসিল । 

প্রসন্মমধুর কণে গুরুদেব রামকে কহিলেন, “বৎস, কায়া৷ পরিবর্তনের 
যে অলৌকিক পন্থা তোমরা আজ দেখলে, তা৷ মহাসমর্থ সাধকদেরই 
আয়ন্তাধীন। তোমর! তন্ত্র ও যোগরাজ্যের ছুরূহ সাধনায় ব্রতী হয়েছ । 
এখানে এসে এ রাজ্যের মাহাত্ম্য প্রত্যক্ষভাবে কিছুটা আজ জানতে 
পারলে । এটাই হল বড় লাভ ।” 


হিমালয় পরিব্রাজনের পথে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতাই না এ সময়ে 
রামঠাকুর লাভ করিয়াছেন। সেবার তিনি ও তাহার এক গুরুভাই 
গুরুদেবের পিছনে পিছনে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল দিয়া চলিয়াছেন। হঠাৎ 
পথে শুরু হইল প্রচণ্ড তৃষার ঝটিকা । ব্যাত্রগর্জনের সঙ্গে এক একবার 
বিছ্যৎরেখা৷ ঝলকিয়। যায়, আর তুষারমগণ্ডিত সারা গিরিশিখর আলোকে 
উদ্ভাসিত হইয়া উঠে। তারপর আবার সব কিছু অবলুপ্ত হয় স্ুচীভেছ্চ 
অন্ধকারে । একল। পথ চলিবার আর উপায় থাকে না। 

এদিকে কিন্তু হাড়-কীপুনে শীতে রামঠাকুর ও তাহার গুরুভ্রাতাদের 
দেহ একেবারে নিঃসাড় হইয়া পড়িয়াছে। কোনমতেই তাহার আগাইতে 
পারিতেছেন না। এই সঙ্কট সময়ে প্রকটিত হইল গুরুদেবের এক 
বিস্ময়কর যোগ বিভূতি। রাম এবং অপর শিষ্যটিকে ছুই হাতে ধরিয়া তিনি 
তাহার নিজের দিকে আকর্ষণ করিলেন । সঙ্গে সঙ্গে দেখা গেল, অলৌকিক 
শক্তিবলে তীহার দেহটি এক বিশীলকায় যুন্তিতে পরিণত হইয়াছে। 
তরুণ শিত্যদ্য়কে অবলীলায় কুক্ষির ভিতরে প্রবিষ্ট করাইয়৷ তিনি এই 
তুষার ঝটিকার মধ্য দিয়া স্বচ্ছন্দে আগাইয়া চলিলেন। উত্তরকালে ঠাকুর 
বলিয়াছেন, এ তুষার ঝড়ের দাপাদাপি কয়েক দিন ধরিয়া চলিতে থাকে 
এবং এ কয়দিন তাহার! গুরুদেবের নবস্ষ্ট বিশীল কলেবরের আশ্রয়ে 
থাকিয়াই আত্মরক্ষা করেন। 


ন্‌ ৩৩ 


পামহাকুর 


এই সময় গুরুদেব কোথা হইতে ছুইটি ফল সংগ্রহ করিয়া আনেন 
এবং শিশ্যদ্ধয়কে তাহা ভোজন করিতে দেন। ঠাকুর বলিয়াছেন, “এই ফল 
যেন স্বগয় ফল। উহা খাওয়া মীত্রই আমার ও আমার গুরুভাই-এর 
দেহে মনে এক দিব্য আনন্দের সঞ্চার হলো! । এর পর থেকে দেহের 
উত্তীপ 'এমন বেড়ে যায় যে, তুষারাঞ্চলের তীব্র শীতে কোন কষ্টই কারুর 
হয়নি । ক্ষুৎ-পিপাসার বোধও কিছুদিনের মত ছিল না !” 

গুরুর অলৌকিক কায়৷ নিন্মীণ ও সেই কায়ার আশ্রয়ে বাস করার 
ঘটনাটি শিষ্যের মনে সেদিন চির অঙ্কিত হইয়া গেল। গুরুর বিদেহী 
সত্তার বৈশিষ্ট্য ইতিপূর্ব্বেই রামের কাছে কিছুটাধরা পড়িয়াছে। তিনি যে 
দেহধারী হইয়াও সব্বতোভাবে দেহাতীত, স্থুল দেহ বলিয়া যে তাহার 
কিছু নাই__এ সত্যটি তাহার উপলব্ধিতে অ।সিয়। গিয়াছে । দ্েহাতীত 
মহাসত্বারূপে গুরুদেব তাহার সদ! বিরাঁজিত, শুধু তাহাই নয়, পঞ্চভূত 
সর্বদা তাহার নিয়ন্ত্রণাধীন, শাসনাধীন এই পরম সত/টিও তরুণ শিষ্তের 
আন্তরে স্ফুরিত হইয়া উঠিয়াছে। 

যৌগিক ও তান্ত্রিক নানা বিভুতি, নানা লীলা প্রদর্শনের মধ্যে দিয়া 
গুরুদেব নিজের স্বরূপতত্বকে মাঝে মাঝে প্রকট করিয়া তুলিতেছেন। 
শিল্কু বুঝিয়াছেন, আশ্রয়দাতা গুরুর অলৌকিক শক্তি সীমাহীন, আর এ 
শক্তি চিরদিন তাহার আশ্রিতকে রাখিবে বিধূত। এই গুরুশক্তিই এবার 
হইতে তাহার সাধন জীবনে যোগাইবে উদ্দীপন ও সঙ্জীবনী-মন্ত্র ৷ 


ভ্রমণ করিতে করিতে একদিন তাহার! হিমালয়ের শিখরস্থিত এক 
গুহায় আসিয়া! উপস্থিত। গুরুদেবের ইচ্ছাঃ এখানে সকলে মিলিয়া 
কিছুকাল বিশ্রাম করিবেন। 

এ কয়দিন গুরুই তরুণ শিষ্যদের বহিয়। বেড়াইয়াছেন। তাহাদের জন্য 
কোথা হইতে ফলমূল আহরণ করিয়] আনিয়াছেন। গুরুর সেবাধিকার 
শিশ্াদের ভাগ্যে এ অবধি জুটে'নাই। পরিব্রাজনের এই বিরতির সময়ে 
রামঠাকুরের অভিলাষ হইল, গুরুদেবের একটু সেব। যত্ব করিবেন, 


৭৩৩১ 


ভারতের সাধক 


খুজিয়। পাতিয়। কিছু ফল তাহার জন্য সংগ্রহ করিয়া আনিবেন। 

কিন্ত ফলমূলের কথ! দূরে থাকুক, আশেপাশে কোন লতাগুল্ম ব৷ 
বৃক্ষই নাই। নিরন্তর ভুবারপাতের ফলে এ অঞ্চলে এসব একেবারে 
নিশ্চিহ্ন হইয়া! 'গিয়াছে। 

তবুও ইষ্টনাম স্মরণ করির ঠাকুর গুহা হইতে বাহির হইলেন, 
গুরুসেবার জন্য যদিই ব! কিছু ফলের সন্ধান পাওয়া যায়। 

ঘুরিতে ঘুরিতে দূরে এক বরফ টিলার কাছে গিয়াছেন, হঠাৎ এক 
অলৌকিক দিব্য দৃশ্ঠ তাহার সম্মুখে উদ্ঘ।টিত হইল। সবিস্ময়ে চাহিরা 
দেখিলেন, এক অপরূপ যুগল মুস্তি তাহার দিকে তাকাইয়া। প্রসন্ন মধুর 
হাসি হাসিতেছেন, আর চারিদিক এক অনির্ববচনীয় স্বর্গীয় আনন্দে 
পুর্ণ হইয়া উঠিয়াছে। 

নিকটে গিয়া রাম ভক্তিভরে এই যুগল খুত্তির চরণে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত 
ঝকরিলেন। মাতৃমূর্ভিটি পরম ন্েহভরে একটি সুস্বাদু ফল রামের করপুটে 
প্রদন করিলেন। ক্ষণ পরেই দেখা গেল, তাহারা কোথায় অন্তহিত 
হইয়া গিয়াছেন। 

অয।চিতভ।বে এই অপুব্ব ফলটি পাইয়া রামের আনন্দের আর 
অবধি রহিল না। তখনি ছুিয়া আসিয়। গুরুদেবের সম্মুখে এটি ধরিলেন। 
কহিলেন, *প্রভু, আপনার সেবার জন্য কিছু ফলমূল সংগ্রহ করতে আমি 
বেরিয়েছিলাম, ভাগ্যক্রমে এক দিব্যদর্শন। মাতৃমুত্তি এই ফলটি আমায় 
দিয়েছেন। আপনি কৃপা ক'রে গ্রহণ করুন।” 

গুরু সহাস্তে কহিলেন, “বৎস, এ ফল তোমারই জগ্য এসেছে । তুমিই 
এটি ভোজন কর। তোমার ভাগ্যের সীমা! নেই । পার্বতী দেবী আবিভূ্তা 
হয়ে নিজ হাতে তোমায় এ ফল দিয়ে গিয়েছেন ।” 

ঠাকুর এ ফলটি শ্রদ্ধাভরে শিরে ধারণ করিলেন, তারপর গুরুর 
নির্দেশমত উহা! ভোজন করিয়া ফেলিলেন। 

পরিব্রাজনের পর এবার শুরু হইল ঠাকুরের কঠোর তপশ্চর্ধ্যার 
পালা । পর্বতের সানুদেশস্থ এক গুহায় গুরু তাহাকে বসাইয়া দিলেন, 


৩২ 


রাম্ঠাকুর 


দিনের পর দিন, মাসের পর মাস চলিতে লাগিল যোগ ও তন্ত্রের নানা 
নিগৃঢ় ক্রিয়া ও কঠোর তপস্তা ৷ 

অবশেষে এ গুহার অভান্তরে অনুষ্ঠিত হইল এক বিশেষ যজ্ঞানুষ্ঠান। 
গুরুর আদেশে এই যঙ্ঞাগ্রিতে পুর্ণাহুতি দিয়া রাম হইলেন আন্তকাম। 
গুরুকৃপায় সব্বসিদ্ধি তাহার করতলগত হইল। 


হিমালয়-বান এবার পরিসনাপ্তির পথে আসিয়া পড়িয়াছে | গুরু এই 
মহ1-অধিকারী নবীন সাধককে আদেশ দিলেন, “রাম, তুমি এবার লোকা- 
লয়ে ফিরে যাও। যোগ ও তন্ত্রসিদ্ধির যে মহাশক্তি ভগবৎকৃপায় তোমার 
আধারে নিহিত হোল, তা পল্পবিত ও পুম্পিত হয়ে উঠুক। এবার থেকে 
জীবের কল্যাণে তুমি বিশেষভাবে আত্মনিয়োগ কর ।” 

সজল চক্ষে গুরুর পদ-বন্দন। করিয়া রাম বিদায় গ্রহণ করিলেন। 
আসন্ন বিরহের বেদনায় হৃদয় তাহার জঙ্জরিত। শুধু এই ভরসায়ই 
সেদিন তিনি বুক বাঁধিতে পারিয়।ছিলেন যে, বিদেহী গুরুর কল্যাণহস্তটি 
সর্ধ্বন্্র সর্বব সময়ে তাহার উপর প্রসারিত থাকিবে । 

গুরুর কাছে ঠাকুর বিদায় গ্রহণ করিতেছেন, এসময়ে এক গুরুত্রাতা 
কাছে আগাইয়। আসিলেন। কে তাহার সযতনে ঝোলানে। রহিয়াছে 
এক নারায়ণ শিলা । কহিলেন, “ভাই, তুমি লোকালয়ে ফিরে যাচ্ছো, 
তোমার ওপর একটা পবিত্র ভার আমি ন্যস্ত করতে চাই। আমার 
কণ্ঠের এই পবিত্র শিলার কথ তুমি জানো । গুরুদেব আদেশ দিয়েছেন, 
এবার এই নারায়ণ শিল। আমায় ত্যাগ করতে হবে । তুমি এইটি তোমার 
সঙ্গে নাও স্থযোগমত কোথাও সেবার একটা বন্দোবস্ত ক'রে দিও 1” 
." যাত্রারআগে রাম শ্রদ্ধাভরে এই পবিত্র শিলাকে কণ্ঠে ধারণ করিলেন। 
গুরুদেব ও তাহার অন্যান্য শিষ্যগণ ধীরে ধীরে চলিয়া গেলেন এক পাহাড়ের 
অন্তরালে । হিমালয়ের একটি বিশেষ অঞ্চলস্থিত শিবভূমিতে এবার ডাহার! 
পরিব্রাজন শুরু করিবেন। - 

. এই নারায়ণ শিলার কৌতুহলকর কাহিনীটি রামঠাকুর উত্তরকালে 


৩৩ 


ভারতের সাধক 


শিষ্যদের কাছে মাঝে মাঝে বর্ণনা করিতেন। ইহার একটি অলৌকিক 
বিশেষত্বের কথ। তাহার এবং গুরুত্রাতাদের জানা ছিল। শিলাটি ঘোর 
কুষ্ণবর্ণ কিন্তু গুহার অন্ধকারে বসিয়া লক্ষ্য করিলে দেখা যাইত, পৃণিমার 
রাতে ইহার অভ্যন্তর হইতে এক দিব্য আলোকচ্ছটা বাহির হইতেছে । 
তিথির আবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিলার অভ্যন্তরস্থ এই আলো! ক্রমে ক্রমে 
হইয়া আসিত ক্ষীণতর। এ আলোকের তারতম্য লক্ষ্য করিয়াই তাহার! 
সকলে তিথি নির্ণয় করিতেন। 

এবার এই নারায়ণ শিল। নিয়া রামঠাকুর কিন্তু পড়িলেন এক মহা 
সমস্তায়। কোথায়, কাহার কাছে এটিকে রাখিবেন ? কি করিয়াই ব1 
ন্ত্যকার সেব! পুজার ব্যবস্থা হইবে, ভাবিয়া পান না। 

পথ চলিতে চলিতে এক ক্ষুদ্র পার্বত্য রাজ্যের সীমান্তে সেদিন 
আসিয়া পড়িয়াছেন। সামনেই এক রাজ! সাহেবের মনোরম উপবন। 
ঠাকুর মনে মনে ভাবিলেন, এ এক স্ুবর্ণ সুযোগ, নারায়ণ শিলার ভার 
এখানকার রাজ। সাহেবের উপরই এবার দিয়া যাইবেন। এ শিল। 
বড়ই জাগ্রত। তছপরি এক পবিত্র দায়িত্ব হিসাবে ইহার ভার তিনি 
গ্রহণ করিয়াছেন, উপযুক্ত সেব1 ও অর্চনার ব্যবস্থা না হইলে তাহার যে 
হুঃখ রাখিবার ঠাই থাকিবে না। ভক্তিমান কোন রাজ-রাজড়া যদি এই 
গুরু দায়িত্বের ভার নেয়, তবেই সব দুশ্চিন্তা কাটিয়া যায়, জানন্দে 
তিনি দেশে ফিরিয়া যাইতে পারেন। 

উপবন-প্রাসাদের এক অলিন্দে রাজ। স্তুরাপানে মন্ত। চারিদিকে 
নর্তকী ও পারিষদের! তাহাকে ঘিরিয়! বসিয়াছে। এমন সময় মুণ্ডিমান 
ছন্দপতনের মত তরুণ তাপস সেখানে গিয়। উপস্থিত। 

সকলের আনন্দ কলরব এক মুহুর্তে থামিয়৷ গেল। স্ুরা-রাগরঞ্জিত 
নয়নে রাজাসাহেব ক্রুদ্ধস্বরে হীক দিলেন, “ওরে, কে এই বেয়াদপ, 
ভিখিরী বামুনটাকে এখানে আসতে দিয়েছে? কি চাস্‌ তুই?” 

ঠাকুর শান্ত কণ্ঠে মিনতি করিয়া কহিলেন, “রাজা সাহেব, আমার 
'গলদেশে বিলম্বিত এই নারায়ণ .শিলাটির ভার আমি আজ আপনার 

২৩৪ 


রামঠাকুর 

ওপর দিয়ে যেতে চাই। এর অর্চনা ও সেবার ব্যবস্থা আপনি রাজ 
সরকার থেকে করুন, এই প্রার্থনা 1% 

রাজা! সাহেব এবাব রোষে ফাটিয়া পড়িলেন-- “কে আছিস্, এখনি 
এই বামুনটাকে গলাধাকা দিয়ে দূর ক'রে দে! এত বড় আস্পর্থা ! 
যত সব বাজে কথা নিয়ে এমন স্ষুন্তিটা মাটি করতে এসেছে !” 

রক্ষীদল ইতিমধ্যে হন্তদন্ত হইয়। ছুটিয়! আসিয়াছে । রাজ। সাহেব 
হুকুম দিলেন, “এ অসভ্য বামুনটাকে এখনি বাঘের মুখে ফেলে দিয়ে 
আয়। দূরে গভীর বনে ওকে তোরা রেখে আসবি, সেখান থেকে আর 
যেন ফিরতে না পারে । ওর সাধের নারায়ণ শিল৷ গলায় বেঁধে বাঘের 
পেটেই এবার চলে যাকৃ।» 

তখনি গলাধাক্কা দিতে দিতে প্রহরীর৷ ঠাকুরকে উপবনের বাহিরে 
আনিয়া ফেলিল। উত্তরকালে এই লাঞ্কনার কাহিনী বর্ণন। করার সময় 
ঠাকুর হাসিয়া হাসিয়া তাহার স্বভাবসিদ্ধ নিরাসক্তি ও কৌতুকপ্রিয়ত! 
নিয়া বলিয়াছিলেন, “গলায় এক একট। প্রচণ্ড ধাকা লাগবার পর বিনা 
চেষ্টাতেই এক একবারে অনেকটা! পথ এগিয়ে যেতে লাগলাম, তবে 
গুরুকপায় তখন ধরাশায়ী হতে হয়নি |” 

গভীর অরণ্যের মধ্যে ঠাকুরকে রাখিয়া রাজপ্রহরীরা৷ ফিরিয়া গেল ॥ 
বেল! তখন দ্বিপ্রহর। ক্ষুৎপিপাসা, পথশ্রম ও উৎগীড়নের ফলে ঠাকুরের . 
দেহ একেবারে অবসন্ন হইয়। পড়িয়াছে। কিন্তু হঠাৎ মনে পড়িল, তাইতো» 
মধ্যাহ্ন অতীত হইয়া চলিল কিন্তু এখনও যে নাঁরায়ণকে সান করানে॥ 
হয় নাই । ভোগরাগেরই বা! ব্যবস্থা কই ? এই গহন বনে কাহার কাছে 
যাইবেন ? নিজের ক্লান্তি ও অবসাদের কথা বিস্মৃত হইয়া ঠাকুর তখনই 
ব্যস্ত হইলেন পবিত্র শিলার সেবার জন্য । 

অদূরেই চোখ পড়িল নাম-না-জানা একটি রসপুষ্ট লতার দিকে । 
লতাটি হাতে নিয় চাঁপ দ্রিতেই মট্‌. করিয়া! উহা! ভাঙ্গিয়। গেল, নিঃম্থত 
হইতে লাগিল ছৃপ্ধের মত শুভ্র রসধারা। এ রস মুখে দিয়া রাঁমঠাকুর 
তে। অবাক,! একি ! এ যে দেখ! যাইতেছে ছুধেরই মত সুস্বাহ। তকে 


২৩৪৫ 


ভারতের সাধক 


হৃধেরই অনুকল্পরূপে ইহাকে ব্যবহার করিতে বাধা কোথায় ? 

তখনি পাতার ঠোঙায় করিয়া ঠাকুর এই শুভ্র রসধার। সঞ্চয় 
করিলেন। এই অন্ুকল্প দুধ দিয়া সম্পন্ন হইল তাহার নারার়ণ শিলার 
ন্নানাভিষেক। বনমধ্যে এক রসাল ফলের গাছও ভাগ্যন্রমে মিলিয়া 
গেল। নারায়ণের ভোগরাগ শেষ হইতে এবার বিলম্ব হইল না। 
প্রসাদ পাইয়া তবে ঠাকুর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিলেন। 

বেলা শেষে গহন অরণ্য জুড়িয়া নামিতেছে অন্ধকার । ঠাকুর বড় 
চিন্তায় পড়িলেন। হিংস্র বাঘ, ভন্গুক ও সর্পাদির ভয় এ বনে যথেষ্ট 
রহিয়াছে । এমন একটি নিরাপদ স্থান কোথায় পাওয়া যায়, যেখানে 
নারায়ণের শষ্য দিয়া নিজেও তিনি ঘুমাইতে পারেন ? 

স্থান নির্বাচন করিতে গিয়াও বিপদ কম নয়। হঠাৎ কোথা 
হইতে একটি বিশালকায় বাঘ ঠাকুরের নিকটে আসিয়া দীড়াইল। কিন্তু 
বড় বিস্ময়ের কথা, হিংস্র বাঘ আজ কি জানি কেন তাহার হিংসা 
ভুলিয়। গিয়াছে । ঠাকুরের শরীর ঘেঁষিয়া কড়াইয়া পরমানন্দে উহা 
গাত্র কণডুয়নে রত হইল। শুধু তাহাই নয়, বিষধর জর্প ঠাকুরের পায়ে 
জড়াইয়া পড়ে, কিন্তু মনে হয়, এ যেন পোষ! জীবটি। ফন! উদ্যত 
করিতেও ভুলিয়৷ গিয়াছে । 

ঠাকুরের নয়ন ছুইটি ভক্তিরসে সজল হইয়া আসে। অলৌকিক 
কপার একি নূতন এক দৃশ্য জীবনপ্রতু তাহাকে দেখাইতেছেন £ গুরু- 
শক্তির রক্ষা-কবচেই হোক, বা এই জাগ্রত নারায়ণ শিলার প্রসাদেই 
হোক, সার! প্রকৃতি যেন অসামান্য প্রীতি ও আম্গুগত্য দিয়া এই 
অন্ধকারময় গহন বনে তাহাকে সাহায্য করিতে চাহিতেছে ! 

রামঠাকুর মনে মনে ভাবিলেন, “দুর ছাই, তবে কেন শুধু শুধু 
নারায়ণ শিলার শয়ন-স্থান খোজার জন্য ব্যস্ত হচ্ছি। যেখানেই হোক 
(কোথাও এবার ঠাকুরের শয়ন দিয়ে নিজে খানিকটা ঘুমিয়ে নিই । শরীরটা! 
আজ বড়ই ক্লান্ত । 

পবিত্র শিলাখগুটিকে পাশে রাখিয়া ঠীকুর গভীর নিদ্রায় অভিভূত 


২৩৬ 


রহিয়াছেন। রাত্রি তখন প্রায় তিন প্রহর। এমন সময় হঠাৎ ঘুম 
ভাঙ্গিয়া গেল। একি? অদূরে এত মশালের আলো কেন? একদল 
লোক যে হৈ চৈ করিতে করিতে তাহার দিকেই আদিতেছে। 

একটু বাদেই কাণে আসিল, আগন্তকদের চীৎকার,. “সাধু বাবা, 
আপনি কোথায় রয়েছেন? একবার দয়া ক'রে বেরিয়ে আস্মুন |৮ 

তাড়াতাড়ি শিলাখণ্ডটি গলায় বাঁধিয়া রামঠাকুর উঠিয়া দীড়াইলেন। 
তবে কি ইহারা তাহারই অনুসন্ধান করিতেছে? তবে এটা স্পষ্টই 
বুঝা যাইতেছে যে, লোকগুলি কোন কু-অভিসন্ধি নিয়া আসে নাই। 
ধীর পদে তিনি মশালধারীদের সম্মুখে আগাইয়। গেলেন। 

ঠাকুরকে দেখিয়াই আনন্দ কলরব পড়িয়া! গেল, যেন হারানো কোন 
নহাসম্পদ সকলে খুঁজিয়া পাইয়াছে। 

রামঠাকুর সবিম্ময়ে দেখিলেন, রক্ষীদলসহ রাজা সাহেব ও রাণী 
সাহেবা তাহার সম্মুখে উপস্থিত। যুক্তকরে, সাশ্রুনয়নে রাজা! সাহেব 
বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করিয়। কহিলেন, “সাধু বাবা, আমি মহা পাতকী, 
আপনার চরণে আমি যে অপরাধ করেছি তার ক্ষমা নেই। কিন্ত 
আপনি নিজগুণে আমায় ক্ষমা করুন। নইলে এবার আমি ধনে প্রাণে 
মীরা যাবো? 

রাজ। ও রাণী উভয়েই কাতরভাবে রামঠাকুরের চরণতলে পতিত 
হইলেন। 

কান্নাকাটি ও কাতরোক্তি থামার পর প্রকৃত ঘটনাটি জানা গেল। 

রামঠাকুরকে যে দিন অপমান কর! হয়, সেই দিনই রাত্রে রাজা ও 
রাণী উভয়ে এক আতঙ্ককর স্বপ্ন দর্শন করেন। স্বপ্নে আবির্ভূত দেবতী, 
রোষকষাঁয়িত নয়নে বলিতে থাকেন, «ওরে, তোরা নিজেদের একি 
সর্বনাশ আজ করলি, বল্‌তো৷ ? জাগ্রত নারায়ণ শিলা সঙ্গে নিয়ে এই 
তপঃসিদ্ধ ব্রাহ্মণকুমীর দ্বারে এসেছিলেন। মূর্খ তোর! । নারায়ণের 
সেবা পুজার ভার নেওয়া তে! দূরের কথা, তাকে তোরা করেছিস্‌ চরম 
লাঞ্ছনা ও অপমান। এখনই গিয়ে তার কাছে নতজানু হয়ে ক্ষমা 

খ্ওণ' 


ভিক্ষা কর্‌, নতুবা! তোদের এ রাজ্য আর থাকবে না, বংশও নাশ হয়ে 
যাবে। ব্রাহ্মণকুমারের কাছ থেকে নারায়ণ শিলাটিকে তোরা এখনই 
ভিক্ষা! চেয়ে নে, তারপর শ্রদ্ধাভরে মন্দির মধ্যে তাকে স্থাপন ক'রে 
সেবা-পুজার বন্দোবস্ত ক'রে দে।” 

রাজ সাহেব ও রাণী বারবার অনুনয় করিতে থাকেন, “প্রভু, 
আমাদের আপনি ক্ষমা করুন, আর দয়। ক'রে একবার আমাদের প্রাসাদে 
পদার্পণ করুন। নারায়ণ-শিলার প্রতিষ্ঠা আমরা অবিলম্বে করছি 1” 

কাণ্ড দেখিয়! রামঠাকুর মনে মনে হাস্ত করিতেছেন। কৌতুকী 
ঠাকুরের এ বড় অপুব্ব অভিনয়। এক নাটকীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়া 
ইতিমধ্যে নিজেই নিজের সেবা ও ভোগরাগের আয়োজনটি বেশ পাকা 
করিয়া ফেলিয়াছেন। মাঝখান হইতে বেচারা রামঠাকুর শুধু শুধু 
হইলেন লাঞ্ছিত ! 

রাজ। ও রাণীকে ক্ষমা! করিতে রামঠাকুরের মোটেই দেরী হয় নাই। 
কিন্তু এ রাজধানীতে নারায়ণ শিল। নিয় ফিরিয়া যাওয়ার প্রস্তাবে তিনি 
রাজী হইলেন না। কহিলেন, “বেশ তো, রাজা সাহেব । এই নাঁরায়ণ- 
শিলার সেবার জন্য আপনি যদি উৎস্থকই হয়ে থাকেন, তবে এই বন- 
মধ্যেই তার আয়োজন করতে বাধা কি? অর্থ সাম্যের অভাব তো৷ 
আপনার নেই । এখানেই এক মন্দির গড়ে তুলুন, নারায়ণকে স্থাপিত 
করুন তার ভেতর । সেবা-অর্চনার জন্য পুরোহিত ও সেবকের স্থায়ী 
ব্যবস্থাও ক'রে দিন। এতে আপনার আপত্তি হবে কেন ?” 

রাজ! সাহেব এ প্রস্তাবে সম্মত হইলেন, অল্প সময়ের মধ্যে এক 
মনোরম মন্দির নিক্মিত হইয়া গেল। পবিত্র শিলার প্রতিষ্ঠা-উৎসবের 
শেষে ঠাকুর রওন। হইলেন আপন গন্তব্যপথে। | 


পার্বত্য অঞ্চলের বন জঙ্গলের মধ্যে আপন মনে তিনি আগাইয়া 
চলিয়াছেন। পথে সঙ্গী কেহ নাই, কাছাকাছি জনমানবের কোন চিহও 
দেখা যায় না। এ সময়ে একদিন হঠাৎ তাহার দেহে প্রবল জরের 
২৩৮ | | | 


আক্রমণ দেখা! দিল। 

দেহের তাপ ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে, অবশেষে জরের ঘোরে ঠাকুর 
একেবারে মুচ্ছিত হইয়া পড়িলেন। 

জ্ঞান ফিরিয়া আসিলে সবিন্ময়ে দেখিলেন, গুরুদেবের কোলে তিনি 
শয়ন করিয়া আছেন । দেহে তাহার জরের তাপ তো নাই-ই-_ক্লাস্তি, 
অবসাদ ও ক্ষুৎ-পিপাসাও কোথায় অন্তহিত হইয়াছে । বিস্ময়ের ঘোর 
কাটিয়া গেলে হষ্টচিত্তে গুরুর চরণে লুটাইয়া পড়িলেন। 

কয়েকদিন শিশ্যকে আপন সাহচর্যো রাখিয়া আরো কয়েকটি নিগৃঢ় 
সাধন প্রক্রির! গুরুদেব শিক্ষা দেন। অতঃপর তাহার ভিতরে সঞ্চারিত 
করেন নৃতনতর শক্তি। 

গুরুদেবের কৃপায় এবার হইতে রামঠাকুর ক্ষুধা-তৃষ্ণার আক্রমণ 
হইতেও চিরতরে মুক্তিলাভ করিলেন । 

বিদায় কালে গুরুর নির্দেশ রহিল, “রাম, পথে আর বেশী বিলম্ব 
করো না, এখন সোজা দেশে চলে যাও ।” 


আপন মনে রামঠাকুর আবার আগাইয়া চলিয়াছেন। একদিন 
তাহার দৃষ্টি পড়িল পথিপার্থস্থ এক কুষ্ঠরোগীর উপর। সারা অঙ্গ তাহার 
যেন পচিয়। গিয়াছে, হুর্গন্ধে কাছে যাইবার উপায় নাই । রোগীটির কাতর 
মিনতিতে হৃদয় গলিয়! গেল, সেবাশুশ্রষার জন্য তখনই তিনি তাহার 
পাঁশে বসিয়া পড়িলেন। 

ঠাকুরের ত্রাতুণ্পুক্র শ্রীমহেন্দ্র চক্রবর্তী লিখিয়াছেন, “তিনি সেই 
গলিত পুতিগন্ধময় কুষ্টরোগীর পাশে বসিয়৷ একটি একটি করিয়! কীট 
তুলিয়া ফেলিতে লাগিলেন। কিছু সময় পরে আবার গুরুদেব সেখানে 
উপস্থিত হইয়া! ঠাকুরকে বলিলেন, “একটি একটি করিয়া কীট কতদিনে 
ফেলিবে ? র 

“ঠাকুরের হাতে একটা গাছের পাতা দিয়া রোগীর গায়ে এ পাতার 
রস তিনি মালিস করিতে বলিলেন। সেই রস মালিস কর! মাত্রই 


২৩৯ 


রোগীর সমস্ত শরীর রক্তবর্ণ হইয়া গেল। অতঃপর গুরুদত্ত আর একটি 
পাতা গায়ে বুলাইয়া! দেওয়ায় রোগী সম্পূর্ণরূপে আরোগ্যলাভ করিল, 
এমন কি গায়ে একটু দাগ পধ্যন্ত রহিল না। গুরুদেব (ভাহাকে চলিয়া 
যাইতে বলিয়া অন্তহিত হইলেন ।”* 

প্রতি পদে, প্রতি মুহূর্তে সর্বশক্তিমান গুরু তাহাকে রক্ষা করিয়া 
চলিয়াছেন। জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া রামঠাকুর প্রতিদিন 
এ সত্যটি নৃতন করিয়া! উপলব্ধি করিতেছেন । মন তাহার অপার তৃপ্তি ও 
প্রসন্নতায় ভরিয়৷ উঠিল। 

তুষারমৌলী হিমালয়-শৃঙ্গের মত অপরিমেয় এশ্বধধ্য ও মহিমা নিয়া 
গুরু তাহার জীবনের সম্মুখে দণ্ডায়মান। কিন্ত এ তুষারচূড়া যে উত্ত ক, 
একেবারে অভ্রংলিহ ! এ যে মৃত্তিকার মানুষের প্বর ছেয়ার বাহিরে ! 
সাধক রামঠাকুর সত্যই পরম ভাগ্যবান, তাই তো এই আকাশচুন্বী 
গুরুমহিমা আজ মহা করুণার ধারারূপে গলিয়া ঝরিয়া পড়িতেছে, আর 
তাহার অধ্যাত্ব-জীবনের স্তরে স্তরে হইতেছে বিস্তারিত। 


দীর্ঘ প্রবাসের পর ঠাকুর দেশে প্রত্যাবর্তন করিলেন। 

গৃহে আর তিনি কখনো ফিরিয়া আসিবেন না, ইহাই ছিল সকলের 
ধারণ! । পুত্রের জন্ত স্নেহময়ী জননীর হৃদয় ব্যথাতুর হইয়া আছে, এবার 
তাহাকে ফিরিয়া! পাইয়া আনন্দের অবধি রহিল না। 

গুরুর সান্নিধ্য ও হিমালয় পরিব্রীজনের পর হইতেই ঠাকুরের জীবনে 
আসিয়াছে এক দূরপ্রসারী অধ্যাত্ম-রূপাস্তর। সাধন জীবনের সিদ্ধি ও 
অসামান্য শক্তি বিভূতিরও তিনি অধিকারী হইয়াছেন। এবার গৃহ 
জীবনের পরিবেশে আসিয়া এই খদ্ধি-সিদ্ধি একেবারে চাপিয়। গেলেন ॥ 
নিজেকে সংহরণ করিয়া অসামান্য সাধক আত্মপ্রকাশ করিলেন এক 
সামান্ত গৃহী যুবকরূপে। এ যেন ডিামাণিকের আগেকার সেই অতি, 

* ভ্রীত্রীরামঠাকুরের জীবন কথা -শ্রীমহেন্ত্রনাথ চক্রবর্ভাঁ, হিমানি, ৪ঠা 
এপ্রিল, ,৫৮। ্ 


রামঠাকুর 


পরিচিত রামচন্দ্র । সংসারের আর পাঁচ জনেরই মত একজন _-সকলেরই 
সঙ্গে নাড়ীর বন্ধনে তিনি জড়িত, সকলেরই স্খ-ছুঃখের ভাগী। 

সংসারের আধিক অবস্থা কোন দিনই তেমন ভাল নয়। তখনও খুব 
অভাব অনটন চলিতেছে । রাম বাড়ীর বুদ্ধিমান যুবক ছেলে, টাকাকড়ি 
কিছু রোজগার না করিলে চলিবে কেন? তাহাকে তাই চাকুরীর খোজে 
বাহির হইতে হইল। 


লেখাপড়া শিখেন নাই, চাকুরীই বা! সহজে কি করিয়া মিলিবে? 
অবশেষে নোয়াখালিতে গিয়া! পি. ডব্রু ডি'র এক ইঞ্জিনিয়ারের গৃহে 
পাচকের কাজ গ্রহণ করিলেন। চলনসই রান্নার কাজ আগে হইতেই 
কিছুটা! জানেন, এবার বটতলার এক 'পাকপ্রণালী” কিনিয়া নান। ধরণের 
উপাদেয় খাগ্ভ তৈরীর কৌশলও শিখিয়া ফেলিলেন। 

ঠাকুর যখনই যাহা কিছু করিতেন নিষ্ঠাভরেঈ করিতেন । পাচক- 
বুত্তিও এ সময়ে তিনি চালাইয়া যান নিখুঁতভাবে । গৃহকর্তা ও তাহার 
দ্রী ঠাকুরের প্রকৃত স্বরূপ তখনো চিনিতে পারেন নাই, চিনিবার কথাও 
নয়। রোজকার রান্নাবান্না শেষ হইলে ঠাকুর সযত্বে মনিবকে অন্ন- 
বাঞ্জনাদি পরিবেশন করেন। মনিব অফিসে চলিয়! গেলে সমাপ্ত হয় 
গৃহকত্রীর ভোজন এবং এই ভোজন শেষ হইলেই তিনি দিবা নিদ্রায় 
মগ্ন হন। 

কাজকন্ম শেষ হইয়া গেলে ঠাকুর একটি থালায় নিজের আহার্ধ্য 
সাজাইয়! রাখেন ছুপুর বেলায় এ সময়ে রান্নাঘরের দিকে কেহ বড় 
একট। আমে না» নৃতন পাঁচকের দিকে কেহ লক্ষ্যও করে না। এই 
সুয়োগে স্নান আহক ও সাধন ক্রিয়াদি তিনি সারিতে থাকেন। ক্রমে 
বেলা গড়াইয়া যায়। তারপর এক ফাঁকে কখন নিজের আহার্্য নিকুটটগ্ছ 
জন্রললে ফেলিয়! দিয়া আসেন, কেহ জানিতেও পারে না । ঠাকুর কিন্ত এ 
কাঞ্জ 'গ্লোজই করেন, আর রোল্ই ছুইটি শুগাল আসিয়া তারার থালার 


১২৩ 


ভরিতে সাধক 

একদিন সমস্ত ব্যাপারট! প্রকাশ হইয়! পড়ে । গৃহকর্তা জানিতে 
পারেন, রাম কোনদিনই নিজের আহার্ধ্য গ্রহণ করে না। পাচকবৃত্তি 
নিয়া নিজের পরিচয় গোপন রাখিলে কি হয়, আসলে মে এরজন উন্নত 
স্তরের সাধক । 

লজ্জিত হইয়! ইঞ্জিনিয়ার সেই দিনই ঠাকুরকে তাহার রান্নাঘরের 
কাজ হইতে সরাইয়! নেন, ভদ্তি করিয়া দেন নিজেরই অধীনস্থ এক 
ওভাঁরসীয়ারের সরকারের কাজে। 

নোয়াখালিতে থাকিতে ঠাকুর প্রায়ই গভীর রাত্রিতে সহরের 
' নিকটস্থ এক জঙ্গলে গিয়া সাধন ভজন করিতেন। এই সময়ে কয়েকটি 
ঘটনার মধ্য দিয়! প্রকাশ হইয়৷ পড়ে যে, রামঠাকুর এক অলৌকিক 
ক্ষমতাসম্পন্ন সাধক। জনসমাজে ক্রমে তিনি কিছুটা পরিচিত হইয়াও 
উঠেন। 


ঠাকুরের জীবনের এই সময়কার এক প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে তাহার 
্রাতুদ্পুক্র শ্রীমহেন্্র চক্রবর্তী লিখিতেছেন__ 

“নোয়াখালি সহরেই শ্রীশ্রীঠাকুরের কন্ম্জীবন আরম্ভ হয়। 
এখানেই তিনি প্রথমে যোগাভ্যাসে নিযুক্ত হন। এ সময়ে তিনি দিন 
কতক দেশে আসিয়া! স্বগৃহে বাস করিয়াছিলেন। তৎকালে আমাদের 
বাড়ীতে একখান খড়ের ঘরে তিনি অনেক সময় দরজ! বন্ধ করিয়া 
একাকী থাকিতেন। এ ঘরে এত সময় একাকী কি করেন তাহ! 
জানিবার জন্য আমাদের কৌতুহল হইত। বেড়ার ফাক দিয়! দেখিতাম, 

'্রীত্রীঠাকুর পদ্মাসনে বসিয়া গভীর ধ্যানে মগ্ন। সারাঁদেহ নিষ্পন্দ, শ্বাস 
প্ন্থীসের গড়ি রুদ্ধ। রক্তবর্ণ নেত্রঘয়ের দৃষ্টি ভ্রমধ্যে নিবদ্ধ, গ্রীবাদেশ 
স্ষাত্। ক হইতে, মধ্যে মধ্যে এক একটা বিকৃত স্বর নির্গত হইতেছে 
ক্ষয় ঘণ্টার পর ঘণ্ট! চলিয়া যাইত, আর তিনি এ অবস্থায়ই 
উপবি্টঁকিতেন। 

. ্ররেরংখ সময়কার 'আাহার সক চক্রবর্তী মহাশয়, ঝখিয়াছেন-- 


নু ও 


পামগাকুব 


'প্্ীশ্রীঠাকুর যতদিন দেশে ছিলেন একদিনও তাহাকে অন্ন গ্রহণ 
করিতে দেখি নাই। স্নান করিবার পর কোন দিন একটু বেলপাতা, 
কোন দিন হয়তো 'একটু বেলের কষ খাইতেন। সময় সময় এক ফোটা 
্ৃত জিহবায় দিতে দেখিয়াছি । এরূপ একপ্রকার অনাহারে থাকিলেও 
তাহার দেহের কান্তি পুষ্টি বিন্দুমাত্র হাস পায় নাই, শক্তির কোন 
অপচয়ও ঘটে নাই। বরং উত্তরোত্তর তাহার দেহ আরও সবল এবং 
উজ্জ্বল হইয়াছিল ।” 

মাতিসেবায় ঠাকুরের বড়ই নিষ্ঠা ও জান্তরিকতা ছিল। বাড়ীতে 
যখন থাকিতেন, উতৎমাহ সহকারে স্বতস্তে জননীর জন্য রন্ধন করিতেন, 
নিজেই সযত্রে করিতেন পরিবেশন । রান্নীবান্না করিয়া পুজ্র তাহাকে 
ভোজন করাইবে কিন্ত নিজে এক কণা খাগ্িও গ্রহণ করিবেনা, জননীর 
এ ছুঃখ রাখিবার ঠাই ছিলনা । 

প্রথম প্রথম ব্যস্ত হইয়া আহারের জন্য পুজকে তিনি পীড়াগীডি 
করিতেন কিন্তু ঠাকুরের হইত মা বিপদ। আহার করিতে কিছুতেই 
তাহার ইচ্ছ৷ হয় না। অথচ মাতৃআজ্ঞা পালন করিতে ন! পারিয়াও 
সার! অন্তর ব্যথাতুর হইয়া উঠে। 

" সেদিন সামান্য কিছু আহারের জন্য জননী বারবার তাহাকে চাপ 
দিতেছেন। ঠাকুর কাতিরভাবে বুঝাইতে থাকেন? “মা, তুমি আমায় মাপ 
কর। গুরুর আদেশে আমি আজকাল আর খেতে পারিনে 1” 

_ কিন্তু জননী তাহার কোন ওজর আপত্তিই শুনিতে রাজী নন। 
অন্ততঃ কিছুটা ছুগ্ধ তাহাকে গ্রহণ করিতেই হইবে । 
' এ জনির্ধ্বন্ধ অনুরোধ এড়ানো বড় কঠিন। বাধ্য হইয়া ঠাকুরকে 
সেদিন স্বল্প পরিমাণ ছুধ পান করিতে হইল । ইহার পরেই কিন্তু দেখা 
গেল, গুরুতররূপে তিনি অসুস্থ হয়া পড়িয়াছেন। 

জননী আর কোনদিন পুক্রকে আহারের জন্য গীড়াগীড়ি করেন 
নাট. 
২৬ই অময়কার পারিবারিক জীবনে আপন যোগৈষ্বয্যকে ঠাকুর সতত 


৪৩ 


ভান্াতের সাধক 


সংহত রাখিতেন, গোপন রাখিতেন। কি পরিবারের লোক, কি বন্ধুবান্ধব 
কাহারে কাছে সিদ্ধ জীবনের প্রকৃত পরিচয় কখনো তিনি উদ্ঘাটন 
করেন নাই। সকলে তাহাকে শুধু একটি সং ও সাধননিষ্ঠ যুবক 
হিসাবেই ধরিয়া নিয়াছিল। 
মাঝে মাঝে কিন্ত কোন কোন অসতর্ক মুহূর্তে তাহার যোগবিভূতি 
হঠাৎ প্রকাশিত হইয়া পড়িত। 
শ্রীমহেন্দ্র চক্রবন্তী একটি ঘটনার বিবরণ দিয়াছেন। _ ঠাকুরের 
ভ্রাতা শ্রীজগদ্ব্ধু চক্রবর্তী তখন রাঈপুর-এ সপরিবারে বাস করিতেছেন। 
এ সময়ে মাঝে মাঝে ঠাকুর সেখানে সাক্ষাৎ করিতে যাইতেন। একদিন 
সন্ধ্যাকালে ঘরের দরজা বন্ধ করিয়া তিনি তাহার যোগক্রিয়াদি 
করিতেছেন, এমন সময় ভ্রাতৃবধূ প্রসন্নদেবী আঙিনার কোণে তূলসীমঞ্চে 
প্রদীপ দিতে আসিয়াছেন। কাছেই সেই ঘরটি যেখানে ঠাকুর রোজ 
রুদ্ধকক্ষে কি যেন সব যোগ-যাগ করেন। হঠাৎ প্রসন্নময়ীর কৌতুহল 
জাগিয়া উঠিল, একবার উঁকি দিলে হয়ন1 ? 
দরজার ফাক দিয়া কক্ষের ভিতরে তিনি দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলেন। যে 
দৃশ্য চোখে পড়িল তাহাতে বিস্ময়ের সীমা রহিলনা। 
দেখিলেন, দেবর ধ্যানস্থ হইয়া পদ্মাসনে উপবিষ্ট । কিন্তু মৃত্তিকাঁর 
সহিত তাহার সম্পর্ক নাই, সার! দেহটি শূন্যে উ্থিত হইয়া রহিয়াছে । এ 
কি অদ্ভূত কাণ্ড! ভয়ে বিস্ময়ে মহিলাটির ক হইতে দিগত হইল, “সোন। 
ঠাকুর, একি ! এ আপনি কি করছেন !” 
কথা কয়টি শোনামাত্রই ঠাকুর সশব্দে ভূমিতে পড়িয়া যান। 
তারপর বারবার ভ্রাতৃবধূকে অনুরোধ করিতে থাকেন, বাড়ীর কেহ যেন 
এ ঘটনার কথ! না! জানিতে পারে ।* 
একবারকার একটি অলৌকিক ঘটনার কথা ডক্টর ইন্দুভৃষণ 
বন্দ্যোপাধ্যায় তাহার সম্পার্দিত “বেদবাণী'র (ঠাকুরের পত্রাবলী ) 
* শ্রীত্ারামঠাকুরের জীবন কথা-্মহেন্দ্র নাখ চক্রবর্তী । হিমার্রি, 
৪ এপ্রিল, *৫৮ 
২৪৪." 


আানতাকুর 


ভূমিকীয় লিপিবদ্ধ করিয়াছেন। এক প্রত্যক্ষদর্শীর নিকট হইতে এই 
বিবরণটি তিনি সংগ্রহ করিয়াছিলেন । 

বিক্রমপুর বেজগার সতীশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের বাড়ীতে 
সে-বার ঠাকুর কিছুদিনের জন্য অবস্থান করেন। ডক্টর বন্দ্যোপাধ্যায় 
লিখিতেছেন, “তিনি ঠাকুরের অত্যন্ত ন্যাওটা হইয়া পড়িয়াছিলেন 
এবং অনেক সময়েই ঠাকুরের সঙ্গে সঙ্গে থাকিতেন। ঠাকুরও তাহার 
ন্সেহের অত্যাচার হাসিমুখেই সহ করিতেন। একদিন দিপ্রহরে ঠাকুর 
তাহাকে লইয়া বাহির বাড়ীর একখানা টিনের ঘরে শুইয়। ছিলেন। 
অল্লক্ষণের মধ্যেই বালক ঘুমাইয়া পড়িল। কিছুকাল পরে হঠাৎ কোন 
কারণে তাহার ঘুম ভাঙ্গিয়া গেল। জাগিয়াই বালক দেখিল যে, 
ঠাকুর পল্মাসনে শৃন্যে বসিয়া রহিয়াছেন, তাহার মাথা ঘরের চালে 
যাইয়া ঠেকিয়াছে। বালক চিৎকার করিয়া উঠিতেই ঠাকুর তাড়াতাড়ি 
নামিয়া আসিলেন এবং নানা কথা৷ বলিয়া বালককে ভুলাইতে চেষ্টা 
করিলেন। সতীশ বাবুর এই কথার সতাতা সম্বন্ধে আমি ঠাকুরকে 
জিজ্ঞাস! করিয়াছিলাম। ঠাকুর বলিয়াছিলেন এরকম তো হয়ই ।” * 


পরবস্তীকালে নোয়াখাপসির কর্মস্থল হইতে রামঠাকুর ফেনীতে 
বদূলী হইয়া আসেন। কবি নবীনচন্দ্র সেন তখন মহকুমার ভারপ্রাপ্ত 
অফিসার । তরুণ সাধক রামঠাকুরের সহিত এ সময়ে তাহার বেশ 
ঘনিষ্ঠতা জন্মে। 

ঠাকুরের অলৌকিক জীবনের কিছু [কছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কবিবর 
জানিতে ষক্ষম হন। তাহার ছুই একটি বিশেষ বিভূতিলীল! দর্শনের 
সৌভাগ্যও তিনি লাভ করেন। নবীনচন্দ্র ঠাকুর সম্বন্ধে যে সংক্ষিপ্ত 
বিবরণ আত্মজীবনীতে লিখিয়াছেন, ঠাকুরের তৎকালীন জীবনের একটি 
মনোজ্ঞ রেখাচিত্র তাহার মধ্য দিয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে। 

কড়ি এ গ্রন্থে লিখিয়াছেন, “-.. ফেনীতে যে নূতন জেলখানা প্রস্তত 

ৃ ্ড র ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত 'বেদবাণী'__২য় খণ্ড 





২৪৫ 


স্ভাসততিয় সাধক 


হইতেছিল রামঠাকুর তাহার সরকার হইয়া আসিল। লোকে 
বলিতে লাগিল ষে, কখনও তাহাকে গৃহে আহ্কিক করিতে দেখা গেল, 
এবং পরের মুহুর্তে রামঠাকুর অদৃষ্য হইয়া গেল। কেহ কেহ তাহাকে 
রাত্রিশেষে রক্তচন্দন চচিত অবস্থায় কোনও বৃক্ষ হইতে অবতরণ করিতে 
দেখিয়াছে। সর্প দংশন করিয়া গরু মহিষ মারিতে আসিতেছে, আর 
রামঠাকুর হাত তুলিয়া বারণ করা৷ মাত্র চলিয়া! গিয়াছে । নিজে কিছুই 
আহার করে না, কচিৎ ছৃগ্ধ বা ফল আহার করে, অথচ তাহার 
সুস্থ সবল শরীর। পর সেবায় তাহার পরমানন্দ। জেলখানার 
ইটখোলার গৃহে পাবলিক ওয়ার্কস প্রভূদের বারাঙ্গনাগণ কখন পালে 
পালে উপস্থিত হয়। কিন্ত রামঠাকুর তাহাদের ঘ্বণা কর! দূরে থাকুক 
বরং সন্তোষের সহিত নিজে রাধিয়া৷ তাহাদের অতি যত্বে আহার করায় 
এবং মাতাল হইয়া পড়িলে তাহাদের আপন মাতা ও ভগিনীর মত 
শুজঙষাকরে। . ্‌ 

“সে সময়ে নোয়াখালি হইতে বহুদূরে ভবানীগঞ্জে গিয়া ্টিমারে 
উঠিতে হইত। রামঠাকুর একদিন একটি আত্মীয়কে ্রিমারে তুলিয়া 
দিয়া ফিরিতে রাত্রি হইলে একটি মসজিদে শাশ্রয় গ্রহণ করিল। গভীর 
রাত্রিতে দ্বেখিল মসজিদ আলোকিত হইয়াছে এবং তাহার গুরুদেব আর 
ছুইজন সন্াসীর সঙ্গে তাহার সমক্ষে দ্াড়াইয়া আছেন। তিনি 
বলিলেন, তাহার! কৌধিকী পর্বত হইতে চন্দ্রনাথ যাইতেছেন_ নিজ্জন 
স্থানে একাকী গভীর রাত্রে রামঠাকুর ভীত হইয়াছে দেখিয়া তাহাকে 
দেখিতে আসিলেন ।% 

«আর একটি গল্প বছ লোকের মুখে, সব্বশেষ রামঠাকুরের নিজ 
মুখেও, শুনিয়াছিলাম। সে বৎসর শিবচতুর্দশীতে চন্দ্রনাথে তাহার 

রঃ রামঠাকুরকে এ এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হইলে তিনি বলিয়াছিলেন, ককি 
নবীনচন্দ্র ভুল লিখিয়াছেন। তাহার গুরুদেবের সহিত এ সময়কার সাক্ষাৎ 
ঘটয়াছিল পূর্বব নির্দিষ্ট ব্যবস্থা অঙ্গযাঁী। শিষ্য ভীত হওয়ায় তিনি আবিভূতি 
হইয়াছিলেন, এ কথার কোন ভিত্তি নাই । প্রঃ ভূমিকা, বেদবাণী-_২য়-খণ্ড | 
২৪৬ 





সঙ্গে সাক্ষাৎ করিবেন বলিয়া তাহার গুরুদেব প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন। 
রামঠাকুর ছুটির দরখাস্ত করিয়াছিল, কিন্তু একৃজিকিউটিভ, ইঞ্জিনিয়ার 
পরিদর্শনে আসিবেন বলয়! ওভারসিয়ার ছুটি দিলেন না। রামঠাকুর 
শিবচতুর্দশীর দিন প্রাতে বড় মনছুঃখে বসিয়া, গুরুদেব কেন তাহাকে 
দর্শন হইতে বঞ্চিত করিলেন, ভাবিতেছে। এমন সময় সিসিরানানি 
সাহেব আসিলেন না। তাহার ছুটি মঞ্তুর হইল। 

“রামঠাকুর আনন্দে আত্মহারা হইয়া চন্দ্রনাথ দর্শনে ছুটিল। কিন্তু 
অকস্মাৎ উত্তেজনায় ভ্রান্ত হইয়া দক্ষিণমুখে না৷ গিয়া উত্তরমুখে চলিল। 
কিছু দূর গেলে একজন লোকের সঙ্গে সাক্ষাৎ হইল । সে বলিল, রামঠাকুর 
চন্দ্রনাথের বিপরীত দিকে যাইতেছে। 

“তখন ভ্রম বুৰিয়া৷ এক বৃক্ষতলায় সন্তপ্ত হৃদয়ে বসিয়া আছে । এমন 
সময় এক সন্ন্যাসী আসিয়া উপস্থিত হইয়া» রামঠাকুর কি চন্দ্রনাথ যাইবে, 
_ জিজ্ঞাসা করিল। 

“রামঠাকুর বলিল, সে ভ্রমবশতঃ বিপরীত দিকে আসিয়াছে ! 
অতএব সে দিন আর চন্দ্রনাথ পৌছিবার সম্ভাবন! নাউ। 

“সন্াসী তাহার সঙ্গে যাইতে বলিলেন এবং পাহাড়ের ভিতর 
প্রবেশ করিয়া! পার্বত্য পথে তাহাকে সন্ধ্যার পৃ চন্দ্রনাথ পর্বতের 
সান্ুদেশে উপস্থিত করিলেন। সেস্থান হইতে চন্দ্রনাথ চল্লিশ মাইল 
এবং ফেনী হইতে ত্রিশ মাইল পথ। চতুর্দশী রাত্রি সীতাকুণ্ডে অতিবাহিত 
করিবার পরদিন আবার সেরূপ অজ্ঞাতভাবে তাহাকে আনিয়া ফেনীর 
উত্তর দিকে একটি স্থানে রাখিয়া গেলেন। এখানে প্রত্যুষে একজন: 
পেয়াদার সঙ্গে রামঠাকুরের সাক্ষাৎ হইলে সে জঙ্গলে লুকাইতেছিল। 
পেয়াদা তাহাকে পাকড়াও করিল এবং তাহার দ্বারা, মহম্মদের. এক 
রাত্রিতে বিশ্বত্রমণের মত, এই অদ্ভুত তীর্থদর্শন কাহিনী প্রথম প্রচারিত 
হইল । 

“্রামঠাকুর দেখিতে ক্ষীণাঙ্গ, শ্ছন্দর ও শান্ত-মুণ্তি। নিতান্ত 
গীড়াপ্টীড়ি না: করিলে কাহারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করেনা, কাহারও সঙ্গে কথা. 


২৪৭ 


কয় না। পূর্বেই বলিয়াছি, তাহার আট হইতে বার বৎসর বয়স 
পর্ধ্যস্ত সামান্য বাঙ্গাল শিক্ষামাত্র হইয়াছিল ! কিন্তু ধন্মের নিগুঢ় তব 
এমনকি প্রণবের অর্থ পর্য্যন্ত সে জলের মত বুঝাইয়া দিত। আমি 
তাহাকে বড় শ্রদ্ধা করিতাম, মধ্যে মধ্যে আমি তাহাকে বড় গীড়াপীড়ি 
করিয়া আমার গৃহে আনাইতাম, এবং পতি পত্তী মুগ্ধচিত্তে তাহার অদ্ভুত 
ব্যাখ্য। সকল শুনিতাম। বলা বাহুল্য, সে পেশাদারি হিন্দু প্রচারকের 
ব্যাখ্যা নহে। 

“একদিন রাণাঘাটে উাক্ষণে জাগিয়া স্ত্রী বলিলেন যে, তিনি 
সে-বার কালী দর্শন করিতে গিয়া শুনিয়াছিলেন, রামঠাকুর কাঁলিঘাটে 
আসিয়াছিল। আমাদের সঙ্গে কেন দেখা করিলনাঃ তিনি জিজ্ঞাস। 
করিলেন । আমি বলিলাম, কেমন করিয়া বলিব? মুখ প্রক্ষালন 
করিয়া আমি হাকিম কক্ষে সোফার উপর বসিয়া যেই বাহির দিকে 
দেখিতেছি, দেখি, আমার সম্মুখে বারাগ্ডায় অধোমুখে স্থিরভাবে 
রামঠাকুর দীড়াইয়া আছে। আমার বোধ হইল যেন, রামঠাকুর আকাশ 
হইতে সে স্থানে অবতীর্ণ হইয়াছে । অন্যথা আমি তাহাকে আসিতে 
দেখিতে পাইতাম। তাহার সঙ্গে আমার আর দেখা! হয় নাই ।” 

অসামান্য যোগবিভূতির অধিকারী এই রামঠাকুর। কিন্তু এশী নির্দিষ্ট 
কর্দুত্রত উদযাপনের জন্য এক নিতান্ত সাধারণ মানুষের মতই তিনি 
দিন যাপন করিতেছেন। তবে এ প্রচ্ছন্নতা৷ এবার হইতে আর রাখ! 
চলিল না। ধীরে ধীরে তাহার চারিদিকে জড়ো হইতে লাগিল কৌতুহলী 
দর্শনার্থী ও গুণমুগ্ধ ভক্তের দল। 


এসময়ে হঠাৎ একদিন গুরুদেবের নির্দেশে ফেনী শহর তিনি ত্যাগ 
করেন, আবার বাহির হইয়া পড়েন নৃতন তপশ্চর্য্যার পথে। শক্তিধর 
সাধকের জীবনে শুরু হয় আর এক বিশিষ্ট অধ্যাষ। 

এই সময়কার রহস্যময়, প্রচ্ছন*জ্টীবনেই রাষমঠাঞ্চুর অতিক্রম করেন 
তীহার সাধন জীবনের শেষ স্তর। ছুশ্চর তপস্া ও নিগুঢ় অত্ত্রাক্ত 


২৪৮ 


ক্রিয়াদি সম্পন্ন করিয়া কৃপালু গুরুর নিকট হইতে মহাসাধক লাভ করেন 
তাহার পরম প্রান্তি। যোগ ও তত্ত্ব সাধনার উচ্চতম শিখরে তিনি হন 
অধিরূঢ়। সার! ভারতের উচ্চকোটি সাধক সমাজে এক মহাব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ- 
রূপে তিনি পরিচিত হইয়া উঠেন। 

ফেনী হতে রহস্তাগয় অন্তর্দানের পর প্রায় সতের বৎসর কাটিয়া 
গিয়াছে । দীর্ঘ অঙ্ঞাতবাস্র শেষে, আবার তিনি লোকালয়ে ফিরিয়া 
আসিয়াছেন। 

্রক্মবিদ্‌ মহাসাধক পূর্বববৎ প্রচ্ছন্নভাবেই তাহার এসময়কার দিনগুলি 
অতিবাহিত করিতে থাকেন। গুরুর আদেশে এবার তিনি গ্রহণ করেন 
লোক-হিতৈষণার পথ । আপন করুণার স্পর্শে চিহ্নিত ভক্তদের জীবনে 
ফুটাইয়া৷ তুলিতে থাকেন অধ্যাত্বজীবনের চরম সার্থকতা । সাধারণ 
ভক্ত মানুষের কাছেও তিনি আঁগাইয়া আসেন এক পরমাশ্রয়রূপে । 


এ সময়ে প্রায়ই তাহাকে কলিকাতা, হুগলী, উত্তরপাড়। প্রভৃতি 
অঞ্চলে অবস্থান করিতে দেখা যাঁইত। 

সে-বার ঠাকুর বাঁশবেড়ের নিকটে এক ভক্ত দম্পতির গৃহে অবস্থান 
করিতেছেন। কিছুদিনের মধ্যে গৃহকর্তীর বালক পুক্রটি বাতরোগে 
আক্রান্ত হয়। রোগ ক্রমে ছুঃসাধ্য হইয়া উঠে এবং বালক একেবারে 
শয্যাশায়ী হইয়া পড়ে। 

অভিজ্ঞ ভাক্তারদের দিয়! বনু চিকিৎসাই করা হইল, কিন্তু রোগীর 
অবস্থার কোন উন্নতি দেখা গেল না, বরং সঙ্কট আরো ঘনাইয়া আসিল । 
বালকের পিতামাতা একেবারে অনন্যোপায়। ঠাকুরের কাছে তাহার! 
আত্মসমর্পণ করিলেন। অশ্রুরুদ্ধ স্বরে বার বার অন্থুরোধ করিতে 
লাগিলেন, যে করিয়াই হোক এই বালককে বাঁচাইতেই হইবে, 
ঠাকুরের কৃপা ছাড়।৷ আর গত্যন্তর নাই। 

প্রথমটায় ঠাকুর তাহাদের এড়াহিবার চেষ্টা করেন। কিন্তু অরশেষে 
এই ঈম্পতির ক্রন্দন ও আন্তিতে তাহার হূদয় বিগলিত হয়। 


২৪% 


গুহের নিকটেই পুণযতোয়া গঙ্গার ধারা বহিয়া চলিয়াছে। সেদিন 
গভীর রাত্রিতে নদীতীরের এক কাশবনে গিয়। তিনি তাহার আসন 
পাতিয়।! বসিলেন। 

স্বল্লকাল মধ্যে বালকটি নিরাময় হইয়! যায়, কিন্তু এই ছঃসাধ্য রোগ 
ঠাকুরের দেহকে আশ্রয় করিয়া বসে। সার! দেহ একেবারে অসাড় 
হইয়া উঠে, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ একটুও নড়ানোর উপায় থাকে না। 

কিছুক্ষণ পরেই কিন্ত দেখা গেল, ঠাকুরের গুরুদেব তাহার সম্মুখে 
আবির্ভূত হইয়াছেন । কোনরূপ কথাবার্থা। না বলিয়া তিনি শিষ্যের পশ্চাৎ 
দিকে চলিয়া গেলেন। তারপর সেখানে ীড়াইয়াত্াহার উপর হানিলেন 
এক প্রচণ্ড পদাঘাত। সঙ্গে সঙ্গে ঠাকুরের দেহটি দূরে ছিট্কাইয়া 
পড়িল। 

গুরুদেব গম্ভীর কণ্ঠে কহিলেন, “রাম, এবার আমার কাছে ীরে 
ধীরে এগিয়ে আসতে চেষ্টা কর।” 

অতি কষ্টে হাটুর উপর ভর দিয়া ঠাকুর নিকটে আসিলেন। 

গুরুদেব আবার কহিলেন, “দেখছি, দৌষ কিছুটা থেকেই গেল। 
দেহ যতদিন আছে, গতততদিন মাঝে মাঝে এই বাতের আক্রমণে তোমায় 
ভুগতে হবে ।? 

কথা কয়টি বলার সঙ্গে সঙ্গে দেখ! গেল, যেমনি আকস্মিকভাবে 
গুরুদেব আসিয়াছিলেন, তেমনিভাবে ঘটিয়াছে তাহার অন্তর্ধান | 

এ বাতব্যাধিটি পরবর্তীকালে মাঝে মাঝে আত্মপ্রকাশ করিত। 
মুক্তির মহাকাশে ত্রহ্মবিদ্‌ ঠাকুরের মন সদাই থাকিত উড্ভীয়মান। কে 
জানে, এই ব্যাধির মাধ্যমে গুরুদেব তাহার মনকে নীচেকার জনজীবনের 
স্তরে টানিয়া রাখিতে চাহিয়াছিলেন কিনা ? 


শক্তি ও জ্ঞানের তুঙ্গ শিখরে রামঠাকুর আপন মহিমায় অধিষ্টিত, 
তাই উচ্চ নীচ, ভাল মন্দের পার্থক্য-ঠাহার কাছে কিছু নাই। সন্ন্যাস 
আর সংসারাশ্রমের ভেদ রেখাও তাহার কাছে অবলুপ্ত। তাই দেখা! 


ছি ৫? 


যায়, নিতান্ত সাধারণ মানুষের মত এসময়ে তিনি দিন যাপন করিতেছেন” 
গৃহস্থদের মধ্যে অবলীলায় করিতেছেন ঘোরাফেরা । 

ডিামাণিক গ্রামে নিজ ভবনে গিয়াও এসময়ে এক একবার তিনি 
উপস্থিত হন। প্রয়োজন হইলে মুমুষু€ স্বজনদের রোগশয্যার পাশেও 
কল্যাণ হস্তটি প্রসারিত করিয়া তিনি দ্রাড়াইয়া। থাকেন। বাড়ীর জীর্ণ, : 
পতনোনুখ রান্নাঘরটির হয়তো সংস্কার চলিতেছে । দেখা যায়, পরম 
উৎসাহে তিনি সেই কাজেই নামিয়া পড়িয়াছেন, কৃষাণদের কাজের 
যোগান দিতেছেন। এদৃশ্ট দেখিয়।৷ কে বলিবে যে, ইনিই সেই অপরিমেয় 
খদ্ধিসিদ্ধির অধিকারী __মহাত্রক্গজ্ঞ রামঠাকুর ? 

সে-বার এক ভ্রাতুপ্ুত্র তাহাকে জোর করিয়া চাপিয়া ধরিলেন, আর 
এমন ঘরছাড়। বিবাগী হইয়া থাক! তাহার চলিবে না। এবার তাহাকে 
বিবাহ করিয়া সংসারী হইতেই হইবে, গৃহ ও আত্মপরিজনের দায়িত্ব গ্রহণ 
করিতে হইবে। 

বাড়ীর আর সকলেও মহা উৎসাহী হইয়া উঠিলেন। ঠাকুরকে 
সকলের এ অনুরোধ রাঁখিতেই হইবে । বিবাহ না করিলে কোন মতেই 
এবার আর তাহাকে ছাড়া হইবে না। ভ্রাতুপ্পুভ্রটি তো! আবেগভরে 
ঠাকুরের পায়ের উপরই পড়িয়া গেলেন, তীহার মুখের কথ না! নিয়া 
তিনি ভূমিশ্য। ত্যাগ করিবেন না। ঠাকুরের যুক্তিতর্ক, অনুরোধ 
উপরোধ সমস্ত কিছুই ব্যর্থ হইল। 

ঠাকুর যেন এক মহা সমস্তায় পড়িয়া গিয়াছেন। তাই তো কি 
করা যায়? সকলে এমন করিয়া ধরিয়াছে, এবার তো আর এড়ানো 
যাইবে না। অবশেষে নিরুপায় হইয়া তিনি সম্মতি দিলেন। বাড়ীর 
লোকদের কহিলেন, “আচ্ছা» কি আর করা যায়, এবার তবে তোমরা 
ভাল ক'রে পছন্দসই কনের খোঁজ খবর কর।” 

কিন্তু পরক্ষণেই আবার কহিলেন, এ্যা, ভাল কথা মনে পড়েছে। 
কোলকাতায় কৃষ্ণবাবু নামে এক “ইঞ্জিনিয়ার আছেন, তার বড় ইচ্ছে, " 
আল্মীয় তাঁর একটি বন্া। দান করেন। আমিও কথ। দিয়েছি, বিয়ে যদি 


৫১. 


ভাকাতেরস্পাবফস্” 


করতেই হয়, তার মেয়েকেই করবো তাকেই বরং এজন্য এক জরুরী 
চিঠি দেওয়া যাঁক।” 

সেই দিনই ব্যস্ত সমস্ত হইয়া কৃষ্ণবাবুর কন্ঠার পাণিগ্রহণ্রে প্রার্থনা 
জানাইয়। তিনি চিঠি দিলেন। বেশ কিছুদিন কাটিয়া গেল, কিন্তু 
কলিকাতা হইতে কোন উত্তর আর আসিল না। ইতিমধো ঠাকুরও 
একদিন স্থযোগমত বাড়ী হইতে অন্তহিত হউলেন। 

মাসাধিককাল পরে কৃষ্ণবাবুর বনু প্রত্যাশিত পত্রটি পাওয়া গেল। 
লিখিয়াছেন, ঠাকুর কপা। করিয়। তাহার কন্যাকে গ্রহণ করিবেন জানিয়৷ 
তিনি মহা আনন্দিত। তাহার পরম সৌভাগ্য যে তাহার বংশ এভাবে 
ধন্য হইতে যাইতেছে । আরো! জানাইলেন, কলিকাতায় প্লেগের 
প্রাহর্ভাব হওয়ায় তিনি সপরিবারে সিমলায় আসিয়াছেন, তাই পত্র 
দিতে এত বিলম্ব হইল। 

বল! বাহুল্য, ভাবী বর ইতিপুর্ব্বেই স্যোগ বুঝিয়া কোথায় সরিয়। 
পড়িয়াছেন। ঠাকুরের সেদিনকার এই স্বুচতুর অভিনয়টির প্রত্যক্ষদর্শী 
হিসাবে শ্রীমহেন্দ্র চক্রবস্তী লিখিতেছেন__ 

“এই বিবাহ ব্যাপারে ঠাকুর যে একটু রসিকতার অবতারণ! 
করিয়াছিলেন, তাহা সে সময় বেশ উপভোগ্য হইয়াছিল । রাত্রিতে 
বিছানায় বসিয়া বিবাহের প্রসঙ্গ তিনি করিতেছিলেন। আমরা ছোট 
ছোট বালক ই! করিয়া তাহার কথা গিলিতেছিলাম। প্রথমতঃ তিনি, 
কুষ্ণবাবু ও তীহার কন্যার কথা৷ বলিলেন, কন্তাটি অতি ধন্মপরায়ণা, 
প্লচ্চরিত্রা, সেও যোগ অভ্যাস করে ইত্যা্দি। তারপর বিবাহের কথা-_ 
বিবাহ কলিকাতায় হইবে, আমরা তাহার বিবাহে বরযাত্রী হইয়া 
কলিকাতায় যাইব। কলিকাত৷ প্রকাণ্ড শহর, খুব সাবধান হইয়া 
চলাফেরা করিতে হয়। কৃষ্ণবাবু খুব বড়লোক, আমাদের মত তাহারা 
নোংরা থাকেন না। আমাদিগকে ভব্যসভ্য হইয়া চলিতে হইবে। 
আমাদের বাড়ীর ঘর দরজা, পথঘাট সব পরিষ্কার করিতে হইকে। 
একখানা নতুন ঘরও তৈয়ার করা আবশ্তক, ইত্যাদি কত ঝা